৪ – বক্সা টাইগার রিজার্ভ

পরদিন সকাল সকাল সবাই মিলে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম হোম স্টে থেকে। বাদলবাবুর গাড়িতে আজ এক নতুন গাইড, গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ। এই রেঞ্জে দুটো ওয়াচটাওয়ারের কাছে যাওয়ার প্ল্যান রয়েছে। পঁচিশ আর ছাব্বিশ মাইল। বনে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে, ঢুকে পড়লাম রাজাভাতখাওয়ার অন্দরে। গভীর জঙ্গলে তখন দুটো মাত্র গাড়ি। আমাদের সামনের গাড়িতে বসে দুই বন্ধুর পরিবার, সাথে বাচ্চারাও রয়েছে। কিছুদূর এগিয়ে আমি গাইডকে অনুরোধ করাতেই, আমাদের গাড়ি স্লো হয়ে গেলো। সামনের গাড়িটি আমাদের দৃষ্টির অগোচরে চলে যেতেই, আবার আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো।

রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ

সকালের জঙ্গল সবসময়ই এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে রোদের লুকোচুরি খেলা, পাখিদের কলকাকলি, মৃদু বয়ে চলা বাতাস, এইসব উপভোগ করতে করতেই এগিয়ে চললাম পঁচিশ মাইলের দিকে। রাস্তায় বেশ কয়েকটি বার্কিং ডিয়ারের দেখা মিললো। সেগুলো গাড়ির আওয়াজ  শোনামাত্রই, নিমেষের মধ্যে হারিয়ে গেলো অরণ্যের গভীরে। চলার পথেই দেখা মিললো ময়ূর দম্পতির, খাবারের আশায় ঘোরাঘুরি করছে।

এইভাবে চলতে চলতে, এক জায়গায় গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লো। জঙ্গলের এই জায়গাটা বেশ ভালো। আমাদের বামদিকে এক বিশাল ঘাসজমি আর সেখানে ঘাসের উচ্চতা প্রায় পাঁচফুট হবে। সেই জমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু মরে যাওয়া গাছের কঙ্কাল। এই ঘাসজমিটা পুরো ঘেরা, যাতে গজরাজের পদার্পন না ঘটে। দেখলাম কঙ্কালসার এক গাছের মাথায় বসে একটা ঈগল পাখি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নীচের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজে চলেছে।

ময়ূর

আমাদের ডানদিকের পুরো এলাকা ঘন জঙ্গল। এখানে সব গগনভেদী গাছেদের সম্ভার। গাইড বললো – স্যার এইখানেই আমি এর আগে চিতাবাঘ দেখেছি। ওই গাছের ডালে বসে ছিলো।

কৌতূহলী হয়ে সবকটা গাছের ডাল দেখতে লাগলাম।

হঠাৎ গাইড বলে উঠলো – স্যার, ওই দেখুন।

আঙ্গুল দিয়ে আমাদের বামদিকের ঘাসজমির ওপারে একটি ফাঁকা জায়গার দিকে দেখালেন।

ঈগল

আমিও মনোযোগ সহকারে দেখতে গিয়ে দেখলাম, এক প্রকান্ড কালো রঙের প্রাণী। পেশীবহুল ওই প্রাণীর শরীর, মাথার জায়গাটায় একটু সোনালী লোম এবং হালকা নীলচে বাদামী রঙের ধারালো উদ্ধত শিং জোড়া। এটিকেই বলা হয় গাউর। ডুয়ার্সের অধিকাংশ জঙ্গলেই দলবেঁধে ঘোরাঘুরি করে এরা। তবে গাউরকে দেখতে গেলে, যে পাখিটির সাহায্য দরকার সেটি হলো বক। আমি প্রথমে একটি বককেই দেখেছিলাম কালো রঙের একটি পাথরে বসে থাকতে। পরে পাথরটি নড়ে উঠতেই আমার ভুল ভাঙলো। বাইনোকুলার যে কি কাজের জিনিস, তা এবারে ভালোভাবে টের পেলাম। প্রায় একশো মিটার দূরে দাঁড়ানো গাউরকে চোখের সামনে এনে দিলো।

এখান থেকে এগিয়ে চললাম। ঘাসজমির ঘেরা অংশ পেরোতেই দেখতে পেলাম একদল চিতল হরিণ। আমাদের গাড়ির পাশে পাশে ছুটে চলেছে। ক্যামেরা, মানুষ, গাড়ি, এগুলোর কোনটাতেই এরা তেমন বিচলিত হয় না। সবকিছুই এদের কাছে, অদ্ভুত রকমের স্বাভাবিক। এই হরিণের দলে একটি বাচ্চার দিকে আমার নজর গেলো, আমাদের গাড়ির দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রয়েছে। যেন ওদের বাড়িতে এক অদ্ভুত দেখতে প্রাণীর আগমন ঘটেছে। হরিণের বাচ্চাটি আমাদের দেখতে গিয়ে ওর দল থেকে একটু পিছিয়ে পড়েছিল, এরই মধ্যে ওই দলের এক বড়ো হরিণ ওই বাচ্চার দিকে তাকাতেই, বাচ্চাটি ছুট্টে ওই দলে যোগ দিল। হরিণের দল দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পঁচিশ মাইল টাওয়ার।

চিতল হরিণ

 গাড়ি দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে নামলাম। এই জায়গায় জঙ্গল একটু ফাঁকা ফাঁকা। একটি ফরেস্ট বাংলোর মতন বানানো এই টাওয়ারটি। এখানে বসার বেশ ভালো জায়গা রয়েছে। রয়েছে টয়লেট। কিছু লোকজন এখানে থাকে। সেরম একজনকে আমাদের গাইড গিয়ে কি যেন বলতেই, সে মাথা নেড়ে সায় দিলো। বুঝলাম চায়ের অর্ডার হয়েছে।

গাইড – স্যার, এরা তো কোনো দোকান চালায় না। কিন্তু চা বানাতে আপত্তি নেই। খুশি হয়ে যা দেবেন তাই নেবে।

দেখলাম রোগা ভদ্রলোকটি চা বানানোয় মনোনিবেশ করেছেন। গায়ের রং কালো, পরনে একটা সাদা গেঞ্জি আরেকটা ময়লা হয়ে যাওয়া লুঙ্গি। পাশে চলছে আরো খাবারের আয়োজন। হয়তো ব্রেকফাস্টের আয়োজন করছেন। এখানে যারা থাকেন, তারা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিতে সক্ষম। তার মধ্যেও যে আমার আর আমার পরিবারের জন্য চা বানিয়ে দিচ্ছেন এটা অন্তত আমার কাছে এক উপরি পাওয়া। কৌতূহল জাগে এই ভেবে যে এই শ্বাপদ সংকুল অরণ্যে, এরা দীর্ঘদিন কিভাবে জীবন কাটান? এঁদের বাড়ি কোথায়? পরিবারকে ছেড়ে কিভাবে থাকেন এই জনবিহীন অরণ্যে?

এসব ভাবতে ভাবতেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। এটি ফেন্সিং দেয়া একটা দোতলা বাড়ি । দেখলাম দোতলাতে থাকার জায়গা, বসার জায়গা ও টয়লেট রয়েছে। নীচে রান্নার জায়গা এবং একটি খাবার জায়গা রয়েছে। এই খাবার জায়গাতেই আমাদের আগের গাড়ির পরিবার বসে রয়েছে। দোতলার বারান্দা থেকে চিতল হরিণের দলকে দেখা যাচ্ছে, তার সাথে একঝাঁক টিয়া আর ময়ূর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিছু ছবি তুলে আবার নীচে নেমে এলাম। চা রেডি। ভদ্রলোক আমাকে, আমাদের গাইডকে হাসিমুখে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিলেন। খুশি না হয়ে পারা যায়! পকেট থেকে একশো টাকা বার করে দিতে গিয়েও লজ্জা বোধ করলাম। গাইডের হাতে দিয়ে বললাম দিয়ে দিতে। দেখলাম ভদ্রলোক টাকাটা নিয়ে গাইডকে নমস্কার করে আবার রান্নার কাজে মন দিলেন। ভাবলাম, সবাই হয়তো এখানে এসে টাকা হাতে দিয়েই চলে যায়, আমরাও সবাই হতে চাইলাম। খারাপ লাগলো। তাই আমি ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম।

বললাম – কাকু, চা টা খুব ভালো হয়েছিলো।

আমার দেখাদেখি আমার মা ও স্ত্রীও আমার সাথে গলা মেলালো।

ভদ্রলোক বললেন – আপনাদের ভালো লাগসে?

মাথা নাড়লাম আর বললাম – খুউউব।

ভদ্রলোক বললেন – খুশি হইলাম।

আমি আর ওনার নাম জিজ্ঞেস করিনি। এরম নাম না জানা কত মানুষ হয়তো নিজেদের কাজের প্রশংসা পেলে খুশি হন, যে খুশি টাকার মূল্যের ওপর কোনোভাবেই নির্ভর করে না। এই খুশি আসে মানুষের সাথে মানুষের সহমর্মিতা বোধ থেকে, পেশাগত শ্রেণীবিভাগ থেকে নয়।

পঁচিশ মাইল থেকে, গাড়ি এবার আমাদের নিয়ে চললো ছাব্বিশ মাইলের দিকে। প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট গভীর জঙ্গলে চলার পর, দেখতে পেলাম, এক ওয়াচটাওয়ার। এটিকে ছাব্বিশ মাইল বলে। এই টাওয়ারে ফরেস্ট গার্ডরা থাকেন। টাওয়ারের কাছে পৌঁছতে দেখতে পেলাম, এক গার্ড চা হাতে নীচে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে। আমাদের দেখেই স্থানীয় ভাষায় চেঁচিয়ে কি যেন বলে উঠলো। গাইডকে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো, এইখানে কিছুক্ষন আগে একটা হাতির দল এসেছিলো। ওয়াচটাওয়ার এর পশ্চিমদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে গাইড বললো ঐদিকে গেছে। গাড়ি থামতেই, চটজলদি ওয়াচটাওয়ারের তিনতলায় উঠতে লাগলাম। দোতলায় গার্ডরা থাকে। তিনতলায় উঠে চারপাশে দেখতে লাগলাম যদি হাতির দলের দেখা পাওয়া যায়। অনেক দূরে আওয়াজ পাওয়া গেলেও, হাতির দলের দেখা মিলল না। কিছুক্ষন ধরে খুঁজলাম, অপেক্ষা করলাম, তারপর নেমে এলাম।

চিতল হরিণের দল

আমাদের সাফারি এখানেই শেষ হলো। এই সাফারিতে উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণের দেখা না মিললেও, উপভোগ করলাম গহীন অরণ্যের পরিবেশকে। গাড়িতে চেপে বসতেই, গাড়ি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে চললো জয়ন্তীতে। গাইড জানালো, এরপর আমাদের পোখরি লেক যেতে হবে। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রিভারবেডে পড়লাম। এখানে আবার সেই চিতল হরিণের দলকে দেখতে পেলাম। আবার জঙ্গলের রাস্তা ধরে আধঘন্টা যাওয়ার পর পৌঁছে গেলাম জয়ন্তী। সফর এখানে শেষ হলো না। এবার নতুন গাইড পেলাম। বাদলবাবু নিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাজারে। আমাদের বিস্কুট আর মুড়ি কিনে দিলেন। বিস্কুট আমাদের খাওয়ার জন্য, আর বললেন, মুড়ি আপনাদের পোখরি লেকে লাগবে। হোমস্টে তে না ফিরেই, আবার গাড়ি চললো পোখরি লেকের দিকে।

পোখরি লেকের পথে

পোখরি লেক যাওয়ার রাস্তাটি ভারী সুন্দর। রাস্তার দুধারের গাছের সারি প্রথমেই আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। গাইড বললেন , এখানে মোবাইলে ভিডিও তুলতে পারেন , দারুন লাগবে। পকেটে থাকা যন্ত্রটিকে পকেটেই সুখে শান্তিতে থাকতে দিলাম। বরং চোখ রাখলাম দুপাশের জঙ্গলের দিকে।  রহস্যময়ী জঙ্গলে কখন যে কিছুর দেখা মিলবে , কেই বা বলতে পারে। রাস্তার ধারেই একদল ময়ূরকে ছুটে পালিয়ে যেতে দেখলাম। এক দুজন গ্রামবাসীকেও দেখতে পেলাম বোঝাই করা শুকনো কাঠ মাথায় নিয়ে যেতে। গাড়ি যত এগোতে লাগলো , বুঝতে পারলাম আমরা সমতল ভূমি ছেড়ে উপরে উঠছি। জঙ্গল কোথাও ঘন আবার কোথাও কৃশ। মিনিট কুড়ি চলার পরে এক জায়গায় একটু সমতল ভূমি দেখা গেলো। গাড়ি এইজায়গায় এসে দাঁড়ালো। দেখলাম, একদিকে পাহাড় বেয়ে রাস্তা ওপরের দিকে উঠে গিয়েছে আর অন্যদিকে পাহাড়ের ঢাল নীচে  নেমে গিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে এবার আমাদের উপরে উঠতে হবে।

” কতটা পথ ?” – জিজ্ঞেস করলাম।

গাইড হেসে জানালো – ওই ধরুন আটশো মিটার মতো । তবে চাপ নেবেন না , সময় আছে, ধীরে সুস্থে, চলুন ।

সহধর্মিণীকে সাহস জুগিয়ে বললাম – চলোই না। দেখা যাক পারি কিনা ।

এতক্ষনে গাইড ভদ্রলোক দুটো গাছের ডাল ভেঙে এনে আমাদের দিয়েছেন। এই লাঠিগুলোতে ভর দিয়ে উঠতে হবে। মা আর আমার ছেলেকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে আমরা দুজন গাইডের পেছন পেছন পাহাড়ে ওঠার পথ ধরলাম।

এতক্ষন গাইডের নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি। নাম জিজ্ঞেস করাতে  উনি বললেন – শুভঙ্কর, শুভঙ্কর দত্ত । গায়ের রং শ্যামবর্ণ , বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। ছিপছিপে গড়ন , পরনে বক্সার গাইডদের মতো ফরেস্ট গ্রিন জামা এবং কালো প্যান্ট। পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছিলেন।

জিজ্ঞেস করলাম – উপরে দেখার কি আছে , বলুন তো ? যার জন্যে আমরা মুড়ি নিয়ে যাচ্ছি  ?

মুচকি হেসে শুভঙ্কর উত্তর দিলো  – উপরে এক দেবীমন্দির আছে , তার পাশেই রয়েছে একটা ছোট্ট জলাশয়। মুড়ি কেন নিয়ে যাচ্ছেন , সেটা উপরে গেলেই দেখতে পাবেন।

পোখরি লেক

কিছুটা করে উঠছি , আরেকটু রেস্ট নিচ্ছি। আমরা দুজনেই শুভঙ্করের কথা মন দিয়ে শুনছি। শুভঙ্কর আমাদের এই এলাকা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে চলেছে। কিছুটা ওঠার পর , শুভঙ্কর বললো –  স্যার এই দেখুন !

দেখলাম এক বিশাল গাছ মাঝখান থেকে ফাঁপা হয়ে রয়েছে। মরে যাওয়া গাছটির অবশিষ্ট উচ্চতা প্রায় দশ ফুট হবে । অবশিষ্ট এই কান্ডটি ফাঁপা হয়ে একটা অর্ধচন্দ্র আকার ধারণ করেছে। শুভঙ্করের কথায় গাছটিতে প্রবল বজ্রাঘাত হওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে। এই অবস্থাতেও গাছটির সৌন্দর্য্য দেখে, মোহিত না হয়ে পারলাম না। মরে  গিয়েও যারা এতো সুন্দর আকার ধারণ করতে পারে , তারা বেঁচে থাকলে কত সুন্দর আকার ধারণ করতে পারে , এটা কোনো প্রকৃত বৃক্ষপ্রেমীর থেকে জেনে নেয়া উচিত। প্রকৃতিই এখানে সৃষ্টি এবং সংহারকর্তা , দুটি ভূমিকাই পালন করেছে।

কিছুটা এগোতেই একটা মরে যাওয়া গাছের কাণ্ডতে চোখ পড়লো। একফুট উচ্চতার এই অবশিষ্ট কাণ্ডটাকে নিজের আঁকার ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেছে এক ধরণের পোকা। অসংখ্য বক্ররেখা এঁকে দিয়ে , গাছটার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে। প্রত্যেকটি বক্ররেখার মধ্যে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য রয়েছে , দেখলে মনে হয় যেন অসামান্য হাতের বুটিকের কাজ। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোন বের করে ছবি তুলে নিলাম। শুভঙ্করকে ধন্যবাদ জানালাম , এতো সুন্দর প্রাকৃতিক কাজ, ও না থাকলে চাক্ষুস করতে পারতাম না।

উপরে উঠতে উঠতে একটি গাছের গুঁড়ির  পাশে আমার স্ত্রীকে দাঁড়াতে দেখে , আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিছুটা এগিয়ে গিয়েও শুভঙ্করও দাঁড়িয়ে পড়লো।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মৌমিতা বললো – একটু দাঁড়াও , হাঁপিয়ে উঠেছি।

কি হলো স্যার ? – জিজ্ঞেস করলো শুভঙ্কর ।

আমি – ওই একটু জিরিয়ে নিচ্ছি আর কি ! 

ঠিক আছে , আর খানিকটা পথই বাকি – শুভঙ্কর বললো।

এতক্ষণে একটা জিনিস অনুভব করলাম। আমাদের আগেও কিছুজনকে আমরা যেতে দেখেছি , তবুও এই জঙ্গলে তাঁদের কোনো আওয়াজ শুনতে পেলাম না। যেন আমরাই কথা বলছি মনে হচ্ছে। সমস্ত কোলাহলকে যেন নীরবে গিলে ফেলেছে এই অরণ্য। উঁচু গাছগুলোকে দেখে বলতে ইচ্ছে হলো , তোমরা কে ? মানুষের সৃষ্টি করা সমস্ত ধরণের দূষণকে কিভাবে ধ্বংস করো তোমরা ? সে মানুষেরা যখন উন্নয়নের মোড়কে তোমাকেও কেটে ফেলে , তাও কি করে নীরবে তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও ? কেন শুষে নাও এ দূষণ ? তোমার মধ্যে কি প্রতিহিংসা জন্মায় না ? মাঝে মাঝে মনে হয় তোমরাই দেবতা। তোমরাই ধরে রেখেছো এই পৃথিবীকে। আমরা মূর্খ , তাই  দেবতাকে মন্দিরে খুঁজি , যেখানে এ জগতের স্রষ্টা তোমাদের পাঠিয়েছেন আমাদের পালনকর্তা হিসেবে।

প্রকৃতির ক্যানভাসে

এবার চলুন স্যার , নয়তো দেরি হয়ে যাবে  – শুভঙ্করের কথায় , ইহজগতে ফিরে এলাম।

স্ত্রীকে বললাম –  চলো , আরেকটু পথ বাকি।

আর পঞ্চাশ মিটার উপরে উঠতে হলো , তারপর আবার একশো মিটার মতো নিচে নেমে পৌঁছে গেলাম পোখরি লেক।  পাহাড়ের ঢালে অদ্ভুত ভাবে তৈরী এই জলাশয়। দেখলাম আমাদের আগে যাঁরা  এসেছিলেন, তারা ফিরে যেতে লাগলেন। লেকের একধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে জলাশয় টিকে দেখতে লাগলাম , মনে হলো একরাশ রহস্য যেন এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে।

মুড়ির প্যাকেটটা খুলুন এবার  – শুভঙ্কর বলে উঠলো।

আমার স্ত্রী মুড়ির প্যাকেট খুলে নিলো , শুভঙ্করের কথামতো সেই মুড়ি, যেইনা জলাশয়ের দিকে ছড়িয়ে দিলো , সেই মুহূর্তে ওই শান্ত জলাশয়ে এক বিশাল আলোড়নের সৃষ্টি হলো। দেখলাম শয়ে শয়ে কানমাগুরের দল হাঁ করে মুড়ি খেতে আসছে। গোলাপী রঙের সেই হাঁ মুখ নিয়ে,একে  অন্যের ঘাড়ে অবধি উঠে পড়ছে। এইভাবেই পুরো মুড়ির প্যাকেট খালি করা হলো। জলাশয়ের পাড় ঘেঁষে একটা বড় কাঠ পড়ে  ছিল। সেই কাঠে দেখলাম দুটি কচ্ছপ আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমাদের ছেটানো মুড়ির কিছু অংশ তাদের কাছেও পৌঁছেছিল। অবাক হলাম কচ্ছপগুলিকেও মুড়ি খেতে দেখে।

মাগুরের দল

এই জল থেকে কেউ মাছ ধরে খেলে , তার নির্ঘাত মৃত্যু ঘটে  – সাবধানবাণীর মতো করে শুভঙ্কর বলে উঠলো। এরম প্রশ্ন আসতে পারে জেনেই হয়তো বললো।

এখানে একটা পুজো হয় বলছিলেন , সেটা কোথায় ?  – আমি জিজ্ঞেস করলাম। শুভঙ্কর হাতের ইশারায় দেখালো – ঐদিকে।

আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম এক ভীষণদর্শনা দেবী মূর্তি। দেবীর গায়ের রং নীল। বাঘের ছালের আসনে উপবিষ্ট তিনি এবং তাঁকে  বহন করছে এক হরিণ। এরম ঘন অরণ্যে এরম দেবীমূর্তি থাকার একটাই কারণ হতে পারে , এ দেবী নির্ঘাত বনদেবী। এই বিপুল অরণ্যে বসবাসকারী সমস্ত পশু, পাখি , পোকা মাকড় এবং তরুকূলের দেবী উনিই।

বনদেবী

ফেরার পথ ধরলাম। আগে আগে শুভঙ্কর , তারপরে আমি আর আমার ছায়াসঙ্গী হিসেবে আমার স্ত্রী মৌমিতা।

যাই বলুন , আপনারা স্বর্গের খুব কাছেই থাকেন। আপনারা সৌভাগ্যবান। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আছেন – শুভঙ্করের উদ্দেশ্যে বললাম।

সবই মানলাম স্যার। তবে এখানে থাকার অন্যরকম সংগ্রাম আছে – শুভঙ্কর উত্তরে বললো।

কিরকম – আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

এখানে আমাদের রোজগার সংক্রান্ত বিস্তর সমস্যা আছে। কেউ আমরা স্থায়ী চাকরি করি না , আপনাদের মতো। ট্যুরিস্ট এলে তবে কিছু রোজগার হয় , তাও আপনি ভালোই জানেন যে এর মধ্যেও রোটেশন হয়। তাতে করে কতই  বা রোজগার হয় ! – শুভঙ্কর বলতে লাগলো।

এছাড়াও জঙ্গলের জানোয়ারদের সাথে থাকার একটা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম। কখনো হাতি আসে , কখনো চিতাবাঘ। দুক্ষেত্রেই আমাদের কিছু না কিছু ক্ষতিই হয়। তবে আমরা এই জীবনের সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আপনারা দুদিনের জন্যে এসেছেন , আপনাদের সবই ভালো লাগবে ” – এবার কিছুটা ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গীতে বলে উঠলো শুভঙ্কর।

তুমি ঠিকই বলেছো। আমরা কজনই বা আর তোমাদের কথা শুনি বা ভাবি ! তবুও তোমার মুখে তোমাদের সংগ্রামের কথা খুবই শুনতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে তোমাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রামের কথা  – আমি উত্তর দিলাম।

এবার শুভঙ্কর বললো – ধন্যবাদ স্যার। অন্তত এইটুকু সহমর্মিতা দেখানোর জন্যে। জানেন স্যার , শুনছি এই জঙ্গল , এই এলাকা সরকারের , মানে বন  দফতরের অধীনে চলে যাবে। পরের বার এলে আর এইভাবে ঘোরাতে পারবো কিনা জানি না।

সেকি, কেন ? – আমি চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

এটাতো বক্সা টাইগার রিজার্ভ , অথচ টাইগার নেই। টাইগার রিজার্ভ দেখাতে পারলে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড পায় বন দফতর। শুনছি এই এলাকা খালি করা হবে। আমরা যারা এখানে থাকি , তাদের পুনর্বাসন দেয়া হবে। তার বদলে এখানে বাঘ ছাড়া হবে। বাঘের বাসস্থান হিসেবে দেখানো গেলে , অনেকদিন অবধি ফান্ড পেতে থাকবে সরকার। তবে একটা মুশকিল আছে !

কি  ! – এবার আমি আরো উৎসুক হয়ে উঠলাম।

এখানে সেই ডলোমাইট কারখানার আমল থেকে পুরোনো লোকেদের বসবাস। আমাদের আগের পুরুষদের জন্ম, বিয়ে, সব এইখানেই। আমরাও এই জয়ন্তী স্কুলেই পড়েছি। আমরা এই পুরোনো ভিটে ছাড়বো কেন বলতে পারেন ? এখানে আগে আমরা ছিলাম , বন দফতর পরে এসেছে। ১৯৮৬ সালেরও  পরে এই এলাকা ন্যাশনাল পার্ক হয়েছে।  – এই বলে শুভঙ্কর একটু থামলো। আঙুলের ইশারায় কি যেন দেখাতে লাগলো।

আমি খেয়াল করে দেখলাম , পাহাড়ের এক অসামান্য দৃশ্য। এক পাহাড় থেকে দাঁড়িয়ে অন্যদিকের পাহাড় আর তার মাঝে জয়ন্তী নদীর অবর্ণনীয় রূপ। এককথায় অসাধারণ দৃশ্য। লক্ষ্য করলাম কথা বলতে বলতে আমরা অনেকটাই গাড়ির কাছে এসে পড়েছি। পিছনে তাকিয়ে স্ত্রী কে জিজ্ঞেস করলাম – এরপর কোথায় যাবে ? ফুন্টশোলিং না বক্সা ফোর্ট ?

এবার শুভঙ্কর বললো – ফুন্টশোলিং যেতে পারেন স্যার। বক্সা ফোর্টে গিয়ে লেপচাখা তে যদি না থাকেন তবে পুরো লস !

তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। গাড়ির কাছে পৌঁছে মাকে বললাম – আমরা ব্রেকফাস্ট করেই রওনা দেবো । 

মা জিজ্ঞেস করলো – কোথায় যাচ্ছি ?

আমি বললাম – ভুটান, আধার কার্ড রেডি রেখো।   

গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো হোমস্টে। যাওয়ার পথে ভাবতে লাগলাম শুভঙ্করের কথা। এ এক এমন পরিস্থিতি যেখানে কারোরই কিছু করার নেই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে যেমন বন্যপ্রাণেরও দরকার, তেমনই এই জঙ্গল এলাকার, আদি বাসিন্দাদের কথাও ভাবা দরকার। এরম যদি ভাবি যে, সরকার বা বন দফতরের আরো কোনো সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিলো , তাহলেও ভুল করা হবে। পুনর্বাসন আর ক্ষতিপূরণ দুটোই সরকারের থেকে আসছে। প্রকৃতির কাছেই প্রার্থনা করা উচিত, যাতে সবাই ন্যায় বিচার পায়। 

হোমস্টে তে পৌঁছে দেখি , স্বপনবাবু রেডি হয়ে গাড়ি নিয়ে হাজির।

বললাম – দেরি হয়ে গেছে অনেক, একটু ওয়েট করতে হবে। আমরা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসছি।

স্বপনবাবু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হেসে, ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। আমাদের ব্রেকফাস্ট করে রেডি হতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগলো। বয়স্ক মানুষটি দাঁড়িয়ে রয়েছেন ভেবে খারাপ লাগছিলো। ঘড়িতে তখন সোয়া দশটা মতো বাজে। আমরা গাড়ি চেপে রওনা হলাম জয়গাঁও বর্ডার।

এবার স্বপনবাবু গাইড আর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে করতে আমাদের নিয়ে চললেন জয়গাঁও। আমার কৌতূহলী মনকে, বক্সার ভৌগোলিক তথ্য দিয়ে, প্রশমিত করতে লাগলেন। আমরা প্রথমে রাজাভাতখাওয়া এসে সেখান থেকে আরেকটি পথ দিয়ে সোজা চললাম হাসিমারার দিকে। স্বপনবাবুও দেখাতে লাগলেন রাস্তার দুধারের সবুজ চা বাগান , মাঝে মাঝে রাস্তার ওপরের ব্রীজ , ট্রেনলাইন এবং আলিপুরদুয়ার জেলার প্রকৃতি। ভুটানের নম্বর প্লেট দেখে কিভাবে চিনবো , এসব সবই বললেন।

কথায় কথায় জানা গেলো, স্বপনবাবু হেভি ভেহিকল চালাতেন। দীর্ঘদিন কলকাতার ডানলপে থেকেছেন। বড় বড় ট্রাকে ভর্তি মাল নিয়ে খিদিরপুর , বেহালা চত্বরে যাতায়াতও করেছেন। তার পরিবার, বরাবরই জয়ন্তীর বাসিন্দা। তাঁর দুটি সন্তান। এক ছেলে এবং আরেক মেয়ে। মেয়ের অলরেডি বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন এক আর্মি অফিসারের সাথে। সে এখন অরুণাচলে তার স্বামীর সাথে থাকে। স্বপনবাবুর ছেলে বক্সার ফরেস্ট গাইড। ছেলেরও বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে তার স্ত্রী , ছেলে আর ছেলের বৌ নিয়ে থাকেন।

আলিপুরদুয়ারের শেষ মাথায় যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সাড়ে এগারোটার মতো বাজে। দেড় ঘন্টার কাছাকাছি লাগলো এই চল্লিশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আসতে। স্বপনবাবু গাড়ি পার্ক করে দেখালেন ভুটান ইমিগ্রেশন অফিস। অফিস লাগোয়া বিশাল বড় পাঁচিল। পাঁচিলের ঐপারে ভুটানের ফুন্টশোলিং শহর। আধার কার্ড দেখিয়ে প্রবেশ করতে হয় ভুটানে । ফুন্টশোলিং এ ঘোরার জন্য প্রচুর গাইড ট্যাক্সি নিয়ে, এপার আর ওপারে দাঁড়িয়েই রয়েছে। যেখান থেকে খুশি , টাকা পয়সার দরদাম করে বেছে নেওয়া যায়। আমরা এপারেই এক গাইডের সাথে কথা বলে নিলাম , ঠিক হলো সেই ১৩০০ টাকা নিয়ে ফুন্টশোলিং এর ৪টে জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে। 

ভুটানে প্রবেশ করতে গেলে আধার কার্ড লাগে। দিনের দিনেই ফেরত আসলে , কোনো চার্জেস লাগে না। আমরা ভুটানে প্রবেশ করার পরে ঘড়িতে দেখলাম প্রায় ১২ টা বাজে। শুরু হলো আমাদের ফুন্টশোলিংএ ঝটিকা সফর। আমাছু ব্রিজ দিয়ে শুরু করে আরো তিনটে মনাস্ট্রি আর বুদ্ধ গুম্ফা দেখে নিলাম। ফুন্টশলিং ও এখন ধীরে ধীরে নগরায়নের কবলে। তৈরী হচ্ছে কংক্রিটের জঙ্গল। সব জায়গা ঘুরে, আমরা ভুটানের প্রবেশ দ্বারের কাছে নেমে গেলাম। এক ভুটানি রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া সেরে জয়গাঁওতে ফিরে এলাম প্রায় চারটের দিকে। স্বপনবাবুকে ফোন করতেই উনি চলে এলেন, তারপর সবাই মিলে রওনা দিলাম জয়ন্তীর দিকে।

কথায় আছে জঙ্গলে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে নামে। দেখতে পেলাম। সূর্য যেন তাড়াতড়ি ঢলে যেতে লাগলো। বর্ডার এর কাছের এলাকা বেশ জমজমাট হলেও , যত এগোতে লাগলাম , কমতে লাগলো জনবসতি। আমরা, আবার সেই চা বাগানের শোভা দেখতে দেখতে হাসিমারা পৌঁছে গেলাম। স্বপনবাবু গাড়ি থামালেন। বললেন – জলদাপাড়া যেতে হলে হাসিমারা দিয়ে যেতে হয়।

দেখলাম স্বপনবাবু গাড়ি থেকে নেমে এক পাঁঠার মাংসের দোকানে ঢুকলেন। হঠাৎ মনে পড়লো , আজ রবিবার। বাঙালির এক চিরকালীন আচার এর মধ্যে পড়ে এই রবিবারে মাংস খাওয়া। সেটা আরো জমে যায় যখন দুপুরের দিকে হয়। আজ আমাদের জন্যে স্বপনবাবু বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ করতে পারেননি। নৈশভোজ টা অন্ততঃ ভালো ভাবে হোক। ভাবলাম , আমরা ঘুরতে কেন যাই ? কোথাও ঘুরতে গেলে আমরা যা খরচ করি, সেই খরচে আরো কয়েকটা পরিবারের স্বচ্ছন্দে কয়েকটা দিন চলে। যদিও বেশি বুঝি না, তবে মনে হয় এইভাবেই ইকোনোমি চলে। আমাদের কেউ টাকা দ্যায়, আমরা অন্য কাউকে সেই টাকা দিই। এইভাবেই চলতে থাকে অর্থনীতি। ঠিক যেমনটা চলে জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রে। আর এভাবেই পরিবেশ নিজের ভারসাম্য বজায় রাখে। বক্সার জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। এই জঙ্গল যেন ধীরে ধীরে আমার মধ্যে এক অদ্ভুত প্রভাব বিস্তার করেছে। এক একটা দিন কাটাচ্ছি , আর এই অরণ্যের স্থিরতা ধীরে ধীরে আমার মধ্যেও প্রবেশ করছে।

গাড়ি থামলো। স্বপনবাবুর ডাকে ভাবজগৎ থেকে ফিরে এলাম। দেখলাম পৌঁছে গেছি হোমস্টে। হঠাৎ টকটক করে এক তীব্র আওয়াজ শুনলাম।

স্বপনবাবু হেসে বললেন – ওটা তক্ষকের আওয়াজ। টিকটিকির মতো, কিন্তু বিকট দেখতে। এখানে অনেক পাওয়া যায়।

আমার মাও বলে উঠলেন – হ্যাঁ, আমি দেখেছি এর আগে।

এবার স্বপনবাবু ফিসফিস করে বললেন – কিছু মানুষ এগুলো ধরে পাচার করে। সুদূর চীনে এর চাহিদা আছে। এই পাচারের ব্যবসা করে সেই লোকেরা লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিয়েছে।

পরের পর্ব – অনন্তকথা

১ – যাত্রাশুরু

রবিবারের দিনটা আর চারটে দিনের থেকে আলাদা। এদিন বাড়িতে আমরা সবাই একসাথে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করি। বিশেষ পদের রান্নাও হয়। ভাত , ডাল , ভাজা, তরকারি থেকে শুরু করে মাছ , মাংস , চাটনি , শেষপাতে দই এসব থাকেই। যাকে বলে একেবারে এলাহি  খাওয়াদাওয়া। 

আজকের দিনের মেন্যুতে ছিল ভেটকি মাছ , আর তার সাথে কাচকি মাছ ভাজা। কয়েকটি কাচকি মাছভাজা চিবোতে চিবোতে, আমার স্ত্রী মৌমিতা  আমার দিকে তাকিয়ে বললো – গরমের ছুটিতে কোথাও ঘুরতে গেলে হয় না ? ধরো এই তিন চার দিনের জন্য ?

আমি মনে মনে হাসলাম। কারণ একটাই , ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে আমার সবসময়ই হয়। এবার যখন অন্যতরফ থেকে তাল উঠলো , তখন তালে তাল মিলিয়ে বলে উঠলাম – চলো, পাহাড়ে যাই। দার্জিলিং , গ্যাংটক কিংবা সিল্করুট ? যাবে ?

একথা বলে ভাবলাম, আমার স্ত্রী বেজায় খুশি হবে , কিন্তু হলো ঠিক তার উল্টো। সহধর্মিনী কিছুটা বিরক্তির স্বরে বললে – আরে  ধুর ! সবাই এখন ঐদিকেই যাচ্ছে। কাতারে কাতারে লোক ভীড় জমাবে পাহাড়ে। বাঙালি কি জিনিস জানো ? এই গরমেও একবার পুরী বা দার্জিলিংয়ের টিকিট কেটে দেখাও দেখি ?

আমি ভেবে দেখলাম কথাটা ঠিক। ভীড় এড়াতে যেদিকে যাওয়া, সেদিকে গিয়ে আবার ভীড়ের মধ্যে পড়লে সেটা তো খুব সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না। তাই বললাম – হুম, বুঝেছি , একটু ভাবতে দাও !

কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা অন্য গন্তব্যের কথা মাথায় এলো। তবে মনে মনে ভাবলাম, আমি তো যেতেই পারি, আমার ভালো লাগবেই, কিন্তু আমার স্ত্রী, কিংবা মা কি রাজি হবে ? একটু ধন্দের মধ্যে থেকেও ঠিক করলাম , বলেই ফেলি।

মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললাম – ডুয়ার্স যাবে ? সেই পনেরো ষোলো বছর আগে স্কাউট ক্যাম্পের জন্যে একবার গেছিলাম গরুমারা। ব্যাস ওই শেষ ! তারপর আর সুযোগই হয়নি ! এবার যাবে ?

আমার স্ত্রী মৌমিতা ঘুরতে খুবই ভালোবাসে। কিন্তু তার একটি পছন্দের উইশ লিস্ট আছে। সৌভাগ্যবশত ডুয়ার্স সেই লিস্টে ছিলো। তাই এককথায় রাজী হয়ে বললো –  হ্যাঁ যাওয়াই যায়। আমার তো কখনোই যাওয়া হয়নি। শুধু শুনেছি আর ছবি দেখেছি। আশা করি মা আর ঈশানেরও ভালোই লাগবে।

আমাদের ভ্রমণ প্ল্যান সবসময় চারজনের কথা মাথায় রেখেই করতে হয় । আমরা দুজন ছাড়া , আমাদের দলের অন্য দুই সদস্য আমার মা আর আমার ছেলে ঈশান। একটা দুটো জায়গা ছাড়া, আমরা সব জায়গাতেই মা কে নিয়েই গিয়েছি , সে পাহাড় হোক কিংবা জঙ্গল। আমার মা এর আগে মালবাজার গেলেও, ডুয়ার্সে প্রবেশের সুযোগ পাননি । এবারে যাতে সেই অভিযোগ না থাকে, সেইমতো পুরো ভ্রমণের খুঁটিনাটি ছকে নিলাম। তৈরী করে ফেললাম দুই রাত তিন দিনের বক্সা ভ্রমণের প্ল্যান। আর দুটো রাত, আমাদের ট্রেনে কাটাতে হবে । প্ল্যান হলো এক শুক্রবার যাবো , আর মঙ্গলবার সকালে ফিরে আসবো।  

নিজের কয়েক বছরের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছি যে, কোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে, বিশেষ করে যখন গন্তব্য উত্তরবঙ্গ , তখন ট্রেনের টিকিট আগে কেটে নিতে হয়। তাই কোনো পরিকল্পনার আগেই টিকিট কেটে নিলাম কলকাতা শিলচর এক্সপ্রেসে। একমাত্র এই ট্রেনটিই সকাল সকাল নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছয়। আলিপুরদুয়ার দিয়ে যেতে গেলে, অনেকটাই দেরি হবে। ট্রেনটি কলকাতা স্টেশন থেকে দুপুর তিনটের সময় ছেড়ে নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছয় পরদিন সকাল ছটা  নাগাদ। ট্রেনটি প্রতিসপ্তাহে শুধুমাত্র শুক্রবারই ছাড়ে। ফেরার ট্রেন আলিপুরদুয়ার থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। দুটি ট্রেনেই অনায়াসেই মিললো টিকিট। ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা যখন হয়ে গেলো, তখন বাকি রইলো থাকা, খাওয়া আর ঘোরার ব্যবস্থা। আজকাল এই সবকিছুর দায়িত্ব হোমস্টে বা হোটেল নিয়ে নেয়। তাই এবার খোঁজ করা শুরু করলাম, কোন হোটেল বা হোমস্টে তে থাকবো। দুদিন ধরে খোঁজাখুঁজি করার পর পেলাম এক হোমস্টের সন্ধান। আমার হোমস্টে বেছে নেয়ার একমাত্র মানদণ্ড ছিলো , হোমস্টেটিকে জঙ্গলের কাছে থাকতে হবে। সেইদিক থেকে এই হোমস্টেটি একেবারে উপযুক্ত।  জঙ্গলের ধারে অবস্থিত , বলা যায় জঙ্গলের সীমারেখার পাশেই। এই হোমস্টের লোকেশন, জয়ন্তী। সত্যি কথা বলতে, আমাদের কাছে বক্সাও যা, জয়ন্তীও তাই। এই এলাকা সম্বন্ধে আমাদের কারোর কোনো ধারণাই নেই ।

হোমস্টের মালিক বাদল ছেত্রীর সাথে প্রথমবার কথা বললাম । হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম, ভদ্রলোক পরিষ্কার বাংলা বলেন। হোমস্টের, কোন রুমটি আমাদের চারজনের থাকার জন্য ভালো হবে? কিরম খরচ হবে? সবই উনি জানালেন। যে জিনিসটা আমার সবথেকে ভালো লাগলো, সেটি হলো , ভদ্রলোকের নিজস্ব সাফারির গাড়ি রয়েছে , আর উনি নিজেই একজন ফরেস্ট গাইড। ভেবে দেখলাম, এর থেকে ভালো আর কিছু হয় না। সাথে সাথে, ওনাকে কিছু টাকা পাঠিয়ে রাখলাম। আগাম বুকিংও হয়ে গেলো।

অনেকদিন পর, ঠিক আমাদের যাত্রাশুরুর  আগেরদিন, ওনার সাথে দ্বিতীয়বারের জন্যে কথা বললাম। উনি জানালেন পরিকল্পনা মাফিক সমস্ত সাফারির বুকিং উনি করে রাখবেন , শুধু আমাদের ঠিক সময়ে পৌঁছে যেতে হবে । আমাদের, নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে গাড়ি পিক আপ করে নিয়ে আসবে জয়ন্তীতে। গাড়ির ড্রাইভারের ফোন নাম্বারও বাদলবাবু সঙ্গে সঙ্গেই শেয়ার করে দিলেন । এখন আমাদের কাজ হচ্ছে , সময়মতো ড্রাইভারকে ফোন করা , উনি স্টেশনেই থাকবেন। অজানাকে জানার একটা কৌতূহল বাঙালী মাত্রেই থাকে। সেই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সমস্ত ক্যামেরা চার্জ করে রাখলাম। আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম শুক্রবারের জন্যে।

শুক্রবার অফিস থেকে কলকাতা স্টেশনে পৌঁছনোর প্ল্যান ছিল। ঠিক করেছিলাম, আমার পরিবার গাড়ি নিয়ে আমার অফিসে আসবে , সেখান থেকে সবাই মিলে কলকাতা স্টেশন যাবো। প্রথম ধাক্কাটা খেলাম শুক্রবার দুপুর বারোটায়। আইআরসিটিসির থেকে মেসেজ পেলাম যে ট্রেনটা দুঘন্টা লেট্। যেটাকে ইংরেজিতে রিশিডিউল বলে, সেটাই ট্রেনটার সাথে হয়েছে।  দুপুর তিনটের পরিবর্তে ট্রেনটি বিকেল পাঁচটায় ছাড়বে। পৌঁছবেও দেরিতে। ভ্রমণসূচি পুরোই ঘেঁটে  গেলো। বাড়িতেও জানিয়ে দিলাম দেরি করে বেরোতে। তিনটে নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। প্ল্যান অনুযায়ী, আমার পরিবার নির্ধারিত সময়ে আমার অফিসের কাছে পৌঁছে গেলো।  আমরা সবাই মিলে, যখন কলকাতা স্টেশনে পৌঁছলাম, তখন প্রায় পৌনে চারটে  বাজে। ভাগ্যবশত রাস্তায় কোনো জ্যাম ছিল না। যেটা ছিল , সেটা হলো, জুন মাসের একটা ভ্যাপসা গরম। এতক্ষণে যখন মেসেজ দেখার সুযোগ পেলাম, দেখলাম বাদলবাবু যে নম্বরটা শেয়ার করেছিলেন, তাতে লেখা, স্বপন দত্ত জয়ন্তী। বুঝলাম আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোকের নাম স্বপন দত্ত। ভাবলাম ট্রেনে উঠে ওনাকে ফোন করবো।

ট্রেন পাঁচটায় ছাড়েনি , পনেরো কুড়ি মিনিট দেরি হয়েছে। এবার খেলাম দ্বিতীয় ধাক্কা, তাও আবার ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। দার্জিলিং মেল, পদাতিক বা কাঞ্চনকন্যা যতটা ভালো, এ ট্রেন ঠিক তার উল্টো। পরিচ্ছন্নতার ওপর যদি পরীক্ষা নেয়া হতো , তাহলে এই ট্রেনটিকে শূন্য দেয়াও বাড়াবাড়ি হয়ে যেত । একটি টয়লেটে জল নেই আবার আরেকটিতে জল লিক করে পুরো ভাসাভাসি অবস্থা। কিছুই করার নেই। মনের মধ্যে একরাশ বিরক্তি আর হতাশা দানা বাঁধলো।  ভাবলাম শুরুটা এরম হলে, পুরো ভ্রমণটা হতাশাজনক হতে চলেছে। এদিকে, ট্রেন ছেড়ে দেয়ার প্রায় ঘন্টা দুই পর, আমার কাছে স্বপনবাবুর ফোন এলো। আমার ফোন করার আগেই, উনি ফোন করলেন। ফোনে প্রথমবার ওনার গলা শুনেই বুঝতে পারলাম, ফোনের ওপারের ব্যক্তি বৃদ্ধ। ওনার বাচনভঙ্গিতেও কিছু সমস্যা আছে। সে সমস্যা হয়তো শারীরিক , কিংবা বয়সজনিত। যাই হোক, ওনাকে জানালাম ট্রেনের লেট্ ছাড়ার কথা। উনি জানালেন, নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে গেলে, ওনাকে ফোনে যেন জানিয়ে দিই । উনি ঠিক সময়ে চলে আসবেন।

পরদিন সকাল ছটায় ট্রেন পৌঁছে গেলো নিউ জলপাইগুড়ি। ট্রেন অর্ধেক খালি হয়ে গেলো ওখানেই। আমি অবশ্য সহযাত্রীদের সাথে আগেই আলাপ করেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম ট্রেন নিউ জলপাইগুড়িতেই খালি হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের গন্তব্য নিউ আলিপুরদুয়ার । তাই অপেক্ষায় বসে রইলাম। নির্ধারিত সাফারির টাইম ছিল সকাল নয়টা। ঠিকঠাক চললেও, ট্রেনটি নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছলো সাড়ে আটটার পর। সৌজন্যে বন্দে ভারত। নেতা মন্ত্রীদের গাড়ির মতো ইনি গেলে, বাকিদের যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ! ট্রেনের মধ্যেও একরকম বর্ণ বৈষম্য আছে কি না !

নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনটি ছোট, কিন্তু বেশ ছিমছাম। ভীড় খুব বেশি চোখে পড়লো না। ট্রেন আমাদের বাঁদিকের প্ল্যাটফর্মে নামালো। আমি দুহাতে লাগেজ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে স্টেশনের বাইরে বেরোনোর গেটের দিকে এগোতে লাগলাম। আমার পেছনে আমার পরিবার আমাকে অনুসরণ করতে লাগলো। স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই দেখলাম, রাস্তার দুধারে দুটো সারিতে বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ গাড়িই সাদা রঙের। এতগুলো সাদা গাড়ির মধ্যে, একটিমাত্র কালো স্করপিও দাঁড়িয়ে। বাদল ছেত্রীর থেকে জেনেছিলাম কালো স্করপিও পাঠাবে , তাই বুঝতে পারলাম এটিই আমাদের গাড়ি।  স্করপিওটির দিকে একটু এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, কালো স্করপিও তে হেলান দিয়ে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে আছেন । ভদ্রলোকের চেহারায় চোখ গেলো। লম্বায় ছ ফুটের কাছে , কিন্তু ভীষণ রোগা। পরনে একটা হাফ হাতা পাঞ্জাবি আর ফুল প্যান্ট। দেখে মনে হলো, বয়স আনুমানিক ষাট হবে । কাঁচাপাকা চুল আর দাড়ি। গাল গুলো ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। ভদ্রলোক যেন আমাদেরই খুঁজছিলেন। নির্দ্বিধায় ওই ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে বললাম – স্বপনবাবু ? উনি আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে, সেই বিশেষ বাচনভঙ্গিতে উত্তর দিলেন – হ্যাঁ। ওনার গলার স্বর, শারীরিক অসুস্থতার কারণে খ্যাসখ্যাসে। গাড়ির দিকে হাত দেখিয়ে বললেন – বসুন। আমাদের মালপত্র স্বপনবাবু নিজেই স্করপিওর পেছনের সিটগুলোতে রেখে দিলেন। মাঝে মা, স্ত্রী আর ছেলেকে রেখে আমি স্বপনবাবুর পাশে গিয়ে বসলাম। এরপর চললাম বক্সার উদ্দেশ্যে।

স্বপনবাবুর সাথে আলাপ জমানোর শুরুতেই বললাম আমার বিরক্তির কথা। ট্রেন লেট্ করাতে আমাদের ভ্রমণ সূচি কিভাবে ঘেঁটে গেলো। স্বপনবাবু রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে মৃদু হাসলেন। যেন এরম ব্যাপার প্রায়ই হয়ে থাকে। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে একটা কি যে ব্যাপার ছিল , যে তৎক্ষণাৎ আমার মনে হলো , এই বিশাল দেশের এই বিশাল রেল নেটওয়ার্কে কারো না কারো সাথে এই জিনিস হতেই পারে। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তার জন্যে, এই একরাশ বিরক্তি জমিয়ে রাখা এককথায় অপ্রয়োজনীয়। স্বপনবাবুর দিকে তাকিয়ে, মনের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলাম। মনে হলো, হয়তো প্রকৃতিই আমাকে ধীর স্থির হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

এবার স্বপনবাবু মুখ খুললেন। রাস্তায় যেতে যেতে নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনের ব্যাপারে বলতে লাগলেন। এই স্টেশনটি একটু দূরে। আলিপুরদুয়ার স্টেশন থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার। বললেন, বক্সার সবচাইতে কাছের রেল স্টেশন রাজাভাতখাওয়া । কিন্তু এখানে সব ট্রেন দাঁড়ায় না। তার জন্যে এখানে আসতে গেলে, আলিপুরদুয়ার স্টেশনে নেমে আসা সব থেকে ভালো উপায় । যাওয়ার পথে উনি আলিপুরদুয়ার স্টেশনটিকেও দেখালেন। এটিই এই এলাকার একটা পুরোনো স্টেশন। স্টেশনকে বামদিকে রেখে, ধীরে ধীরে নগর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগলাম, আর বাড়তে লাগলো রাস্তার দুধারে দাঁড়ানো গাছের সারি।

কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম এক সুবিশাল বটগাছ। বটগাছের নীচে কয়েকটা দোকানপাট, সেগুলোকে ঘিরে কিছু মানুষের আনাগোনা দেখতে পেলাম। এই বটগাছ এই গরমেও যে ছায়া প্রদান করছে, তাতে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা আচ্ছাদন রয়েছে , মনে হলো।  এই গাছকে কেউ কাটেনি , এমনকি এর কোনোরকম ডালপালাকে ছাঁটাও হয়নি। অবাধে বেড়ে গিয়েছে। বটগাছের নিচ দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার সময় দেখলাম রাস্তার ডানদিকে আরেকটি রাস্তা চলে গেছে। তখন বুঝলাম, এটি একটি মোড়। গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের জায়গাকে বটতলা বলা হয়। 

সুপ্রাচীন বটগাছ

আরো যত এগোতে লাগলাম, দেখলাম পথের দুধারে গাছের ঘনত্ব বাড়তে লাগলো। বাড়ি ঘর , মানুষজন এর সংখ্যা কমে যেতে লাগলো। বুঝতে পারলাম, এ এক অন্য জগতে প্রবেশ করতে চলেছি। নগরজীবন ও নগরায়নের প্রভাব এই এলাকায় প্রায় নেই বললেই চলে। এই জগতে কোলাহল বলতে শুধুই পাখিদের কলকাকলি। পিচ রাস্তা, ভেজা।  স্বপনবাবু জানালেন গতকাল রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। যতটা এগোতে লাগলাম, তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। খেয়াল করলাম, একটি ট্রেনলাইন সমান্তরাল পথে আমাদের পাশে পাশে এই অরণ্যগামী পথে চলেছে। স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করাতে, উনি বললেন – এটিই সেই রাজাভাতখাওয়ার ট্রেন লাইন। এই পথেই, আলিপুরদুয়ার থেকে মাল জংশন হয়ে ট্রেনগুলি শিলিগুড়ি যাচ্ছে। যদিও আমরা এই পথ দিয়ে আসিনি , তবে ফেরার সময় এই পথ দিয়ে ফিরবো। 

এইভাবে চলতে চলতে অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর দেখতে পেলাম, এক সাইনবোর্ড, যাতে লেখা রয়েছে –  আপনি আমাদের দেশের সবচাইতে সুন্দর বনভূমির মধ্যে প্রবেশ করছেন – সৌজন্যে বক্সা  টাইগার রিজার্ভ । লেখাটার সততা যে কতটা, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সবাই বুঝতে পারলাম। আমার মার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো – আহা। বুঝলাম, প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য, হয়তো আমার মার মনেও প্রভাব বিস্তার করছে। এরপর আমরা আরো নিবিড় বনাঞ্চলে প্রবেশ করলাম। প্রকৃতির এতো কাছে এসে বুঝলাম , আমার মনের সমস্ত বিরক্তি , হতাশা এই সুবিশাল অরণ্যভূমির কাছে তুচ্ছ। শত অত্যাচারের পরেও প্রকৃতি যতটা সহনশীলতা প্রকাশ করে , তার সামান্য কিছুটা আমার মনের গভীরেও প্রবেশ করলো। মনের ভেতরের অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করা দুস্কর হয়ে উঠলো। তাই শুধু অনুভব করতে লাগলাম এই বনাঞ্চলকে। মনের গভীরে এক পরিতৃপ্তির অনুভব হলো। মনে হলো যেন, নিজের শেকড়ের কাছে চলে আসতে পেরেছি। চারপাশে তাকিয়ে বুঝলাম, এখানের  অধিকাংশ গাছই প্রাচীন। নির্বাধায় বেড়ে উঠেছে , উপর থেকে দেখলে মনে হবে , পুরো অঞ্চল জুড়ে কেউ যেন এক সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিও, এই চাদর  ভেদ করে মাটিতে পৌঁছতে পারছে না। কিছু কিছু জায়গায় রবিরশ্মীর লুকোচুরি খেলা চলছে, কিন্তু অধিকাংশ জায়গাই গাছের ছায়ায় ঢাকা। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হতে লাগলো , জীবনের অন্তত কিছুদিন, প্রকৃতির এই সুপ্রাচীন অভিভাবকদের মাঝে কাটাতে পারবো। আমার চোখমুখ দেখে, স্বপনবাবু কিছু হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আমাকে এই জঙ্গলের বিভিন্ন গল্প শোনাতে লাগলেন। আমি ঠিক ততটাই কৌতূহলী হয়ে শুনতে লাগলাম।

বক্সার প্রবেশদ্বারের সাইনবোর্ড

স্বপনবাবুর কথায় – বক্সা, ডুয়ার্স এলাকার এমন একটি জঙ্গল, যা প্রায় সাতশো কুড়ি বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ডুয়ার্সের অন্য কিছু  এলাকার মতো এটি গ্রাসল্যান্ড নয়। এটি ট্রপিক্যাল ফরেস্ট। এখানে নানান রকম পশু পাখির বাস। আমরা যেখানে চলেছি সেটা জয়ন্তী গ্রাম। এই ছোট্ট গ্রামে প্রায় দুহাজার মানুষ বসবাস করেন। বয়সের দিক থেকেও এই জনপদ যথেষ্ট প্রাচীন। জনপদকে একদিকে বেষ্টিত করেছে জয়ন্তী নদী আর অন্যদিকে বক্সা জাতীয় উদ্যানের জয়ন্তী রেঞ্জ। জয়ন্তী রেঞ্জের আরেকদিকে বয়ে চলেছে বালা নদী। এই এলাকায় ব্রিটিশ আমলে, ট্রেন চলাচলও করতো। একটা সময় এখানে ডলোমাইট খনি থাকার কারণে , বেশ রমরমা একটা ব্যাপার ছিল। বসবাস ছিল বহু মানুষের। আজ সেগুলো কিছুই নেই। পুরো এলাকাই নিবিড় অরণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে । স্বপনবাবুর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। অনেকটা ডাটা ট্রান্সফার করার মতো।

পথের ধারের গাছ

কথা বলতে বলতে স্বপনবাবু গাড়ি থামালেন। দেখলাম আমরা বক্সার প্রবেশদ্বারে পৌঁছে গেছি। এই জায়গার নাম রাজাভাতখাওয়া। এইখানেই অনুমতি নিতে হয়, জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করার। এই অনুমতিপত্র একদিন অবধি বৈধ থাকে। রাস্তার ডানদিকে একটি টিনের ছাউনি দেয়া বাড়ি। সেখানেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা টিকিট ঘর। কাউন্টারে কোনও ভীড় নেই। সেখানে ১০৮০ টাকা দিয়ে, চারজনের আর গাড়ির অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হলো। স্বপনবাবু জানালেন, স্থানীয় লোকেদের এই অনুমতিপত্রের দরকার পড়ে না। অনুমতিপত্র নিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। স্বপনবাবু স্টার্ট করলেন। ধীরে ধীরে আমাদের গাড়ি, ফাটক পেরিয়ে প্রবেশ করলো বক্সার অন্দরমহলে। বনানী এখানে, আরো আরো নিবিড় হয়ে এলো। মাঝে মাঝে কিছু গাড়ির দেখা মিললেও , পুরো রাস্তা ছিল খালি । পিচের রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে, আর দুধারে ঘন বনাঞ্চল। আর দেখা যাচ্ছে না, সেই ট্রেনলাইন । পথের দুধারে শুধুই তরুকূলের সমাগম। মাঝে মাঝে কিছু অচেনা পাখির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাকি আর কোনো শব্দই নেই। আমরা এখন সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। এই সুন্দর চারিপাশকে সাক্ষী রেখে , আমাদের গাড়ি পিচরাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে চলেছে।  স্বপনবাবু জানালেন, প্রথম দশ কিলোমিটার আমাদের এই পথে সোজা চলতে হবে। আমরা পিচ রাস্তার দুপাশের এই যে বনাঞ্চল দেখতে পাচ্ছি, সেটা বক্সার রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জের অন্তর্গত। স্বপনবাবুর কথা শুনতে শুনতে, খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেলো, প্রথম দশ কিলোমিটারের দূরত্ব। পৌঁছলাম জয়ন্তী মোড়।

রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ

এখানে গাড়ি দাঁড়ালো। স্বপনবাবু দেখালেন, সোজা রাস্তা চলে গেছে সান্তালবাড়ির দিকে, আর জয়ন্তী জনপদ যেতে গেলে, ডানদিকের বাঁক নিয়ে আরেকটি পিচের রাস্তা ধরতে হবে। আমাদের গাড়ি, ডানদিকে চললো। এইদিকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গেলে তবেই পৌঁছে যাবো জয়ন্তী। এইপথেও উঁচু উঁচু গাছ দিয়ে সাজানো, এই বনাঞ্চলের অনবদ্য শোভা। রাস্তা এখানে খুব ভালো। দশ মিনিট অরণ্যের সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে কেটে গেলো। আমরা পৌঁছে গেলাম এক রিভারব্রীজের কাছে। স্বপনবাবু এখানে গাড়ি দাঁড় করালেন। আমি গাড়ি থেকে না নেমেই দেখতে লাগলাম এই নদীটিকে। অসংখ্য নুড়ি পাথর ভর্তি এই নদীতে। । এটিকে রিভারবেড বলে। গতকালের বৃষ্টির কারণে এখানে একটি শীর্ণকায়, কর্দ্দমাক্ত জলরাশি বয়ে চলেছে। তবে সেই জলরাশির ব্যাপ্তি খুবই সামান্য। পুরো রিভারবেড  জুড়ে বয়ে চলার মতো বৃষ্টিপাত এখনো হয়নি। রিভারবেডের  দুধারে ঘন জঙ্গল। ব্রীজের ওপর থেকে দাঁড়িয়ে আমার বামদিকে আর ডানদিকে দুদিকেই দেখলাম ঘন জঙ্গল। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, ব্রীজের বাঁপাশে কিছুটা দূরে দুটো স্তম্ভ । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, পুরোনো ব্রীজের ভগ্নাংশ। স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি জানালেন – ওটি পুরাতন রেল ব্রীজের স্মৃতি। ওই রেল ব্রীজ আর নেই , রয়ে গিয়েছে শুধু ওই দুটি স্তম্ভ। বহুকাল আগে , গৌতম ঘোষের ” আবার অরণ্যে ”  ছায়াছবিতে ওই ব্রীজের বেশ কিছু অংশ দেখা গিয়েছিলো।

বালা রিভারব্রীজ

ব্রীজে দাঁড়িয়ে উপরদিকে তাকিয়ে দেখলাম , একটা সার্পেন্ট ঈগল পুরো এলাকার ওপর নজর রাখছে। অনেকসময় জঙ্গল থেকে পশু পাখিরা এই রিভারবেডে জল খেতে বা এপাশের জঙ্গল থেকে অপর পারে যাওয়ার জন্যে বেরিয়ে আসে। তখন তাদের দেখা পেলেও, পাওয়া যেতে পারে। স্বপনবাবু জানালেন, এই নদীর নাম বালা। গাড়িতে আবার উঠে বসলাম। মিনিট পাঁচেক গাড়ি চলার পর , আগাম আভাস মিললো যে, সামনে কোনো জনপদ রয়েছে।

জয়ন্তী জনপদের যে মূল বাজার এলাকা, সেই জায়গায় পৌঁছে দেখলাম রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সুবিশাল বটগাছ। সেই গাছকে কেন্দ্র করে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে বেশ কিছু খাবার দোকান। এখানে চা থেকে শুরু করে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং হয়তো অর্ডার দিলে ডিনারও পাওয়া যায়। বটগাছের নিচেই রয়েছে একটি মোড়। সোজা গেলে জয়ন্তী নদীতীরে পৌঁছনো যায়। সরকারি থাকার জায়গা রয়েছে সেখানে। নদীর দিকে মুখ করে তাকালে, বটগাছের বামদিকে রয়েছে একটি সেনাছাউনি। ডানদিকে গেলে দেখা যায় প্রচুর স্থানীয় লোকেদের ঘরবাড়ি । কিছু কিছু  হোমস্টেও রয়েছে । লক্ষ্য করলাম, এখানে সব বাড়িতেই টিনের ছাউনি দেয়া। বাড়িগুলির নির্মাণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঠের প্রয়োগ করা হয়েছে। আমরা বটগাছের গা ঘেঁষে নেমে যাওয়া ডানদিকের রাস্তা দিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম বাদল ছেত্রীর বাড়ি। পর্যটকদের সুবিধার্থে এই বাড়ির এক খুব সুন্দর নাম দেয়া হয়েছে। সেই পোশাকি নাম – ডুয়ার্স প্রকৃতি ।

জয়ন্তীর পথে

গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই এগিয়ে এলেন বাদলবাবু। লম্বা এবং ছিপছিপে চেহারা। গায়ের রং ফর্সা। পরনে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাঢ় সবুজ রঙের জামা এবং একটি কালো প্যান্ট। মাথার চুল সাদাকালো। আজকাল অনেকে এটিকে সল্ট পেপার বলেন। বাদলবাবুর বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে। এগিয়ে এসে বললেন – স্যার আপনাদের লেট্ হয়ে গেছে। সাফারির টাইম হয়ে গেছে। আঙ্গুল দিয়ে ডানদিকের বাড়িটির দোতলাটা দেখিয়ে বললেন – আপনারা মালপত্র রেখে, দশ মিনিটে যা ফ্রেশ হওয়ার হয়ে নিন। আর মনে করে ব্রেকফাস্ট এর অর্ডার দিয়ে দিন। আঙ্গুল দিয়ে নিজের পেছনদিকের একটি ঘর দেখালেন। বুঝলাম ঐটি কিচেন। আমরা সাফারি থেকে ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করবো।

ঘড়িতে দেখলাম, সকাল নটা বেজে গেছে। যে বাড়িটির দোতলায় উঠলাম, সেটি সম্ভবত ডুয়ার্স প্রকৃতি নয়। কারণ বাদলবাবু আমাকে আগেই রুমের ছবি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের দেরি করলে চলবে না।  আমরাও তড়িঘড়ি করে ওই ঘরে ব্যাগপত্র রেখে, মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নিলাম। এরপর দোতলার ঘর থেকে নিচে নেমে যে রান্নাঘর দেখেছিলাম , সেখানে সবার জন্যে লুচি তরকারির অর্ডার দিয়ে দিলাম। সঙ্গে করে কেক, বিস্কুট ট্রেনে ওঠার আগেই নিয়েছিলাম, এবার সেটা হাতের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম । সকলেরই খিদে পেয়েছে, সাফারির সময় কাজে লাগতে পারে। সবাই মিলে বাড়ির বাইরে যখন এলাম , তখন আর স্বপনবাবুকে দেখতে পেলাম না। উনি বাড়ি চলে গেছেন। তাড়াহুড়োর মাথায় ওনাকে বিদায় জানাতে পারলাম না । গল্প করতে করতে বলেছিলেন, ওনার বাড়ি এখানেই। ভাবলাম, উনি যখন এখানেই থাকেন, তখন এই দুদিনে নিশ্চই দেখা হয়ে যাবে। তাছাড়া আমাদের তো স্টেশনে ড্রপও লাগবে, তখন না হয় বাদলবাবুকে বলে স্বপনবাবুর গাড়িটি ভাড়া করবো। এইসব ভাবছি , সেইসময় বাদলবাবু  এসে বললেন – স্যার গাড়ি রেডি।

পরের পর্ব পড়ুন