আজ আপনাদের বলবো সিঙ্গুরের কথা। রাজনৈতিক কারণে জনপ্রিয় হলেও সিঙ্গুরের একটি প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছোট করে সে ইতিহাস জেনে রাখা ভালো। খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে কলিঙ্গের রাজকুমারীর পুত্র সিংহবাহু, যিনি এই নাম একটি সিংহকে হত্যা করে অর্জন করেছিলেন, তিনি সরস্বতী নদীর তীরে নিজের রাজধানী তৈরী করেন যার নাম দেন সিংহপুর।
সিংহবাহুর পুত্র বিজয় সিংহ নিজের মন্দ কাজের জন্য রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। সাতশো অনুচর নিয়ে তিনি পাড়ি দেন এক দ্বীপে, সে দ্বীপ জয় করে নিজের রাজ্য সেখানেই স্থাপন করেন ও রাজ্যের নাম দেন সিংহল। যা এখন শ্রীলংকা নাম পরিচিত। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিক সিংহপুরকে ভারতের নানা জায়গায় চিহ্নিত করেন। কেউ সিংহপুরকে অন্ধ্রপ্রদেশে চিহ্নিত করেন তো কেউ রাজস্থানে। কিন্তু ইতিহাসবিদ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে সিংহপুর হলো বর্তমানের সিঙ্গুর।

সিঙ্গুর স্টেশন থেকে রেলগেট ক্রস করে পৌঁছে গেলাম সিঙ্গুর বাজার। সেখান থেকে টোটো করে প্রথমে এলাম ডাকাত কালী মন্দির। অনেক আগে এই এলাকা ডাকাতির জন্যে প্রসিদ্ধ ছিল। কথিত আছে একবার মা সারদা অসুস্থ রামকৃষ্ণদেব কে দেখতে কামারপুকুর থেকে দক্ষিনেশ্বর যাচ্ছিলেন। এই এলাকাতেই তার পথ আটকায় একদল ডাকাত। পরে তার মুখে মা কালির অবয়ব দেখতে পাওয়ায়, ডাকাতরা তাঁকে সেই রাত্রে এখানে আশ্রয় দ্যায় এবং খেতে দ্যায় চাল ও কড়াইভাজা। সেই থেকে ডাকাতরাই এখানে কালীপুজোর সূচনা করে, পরে এখানে মন্দির নির্মিত হয়।

আজও মা কালীকে ভোগ স্বরূপ চাল ও কড়াইভাজা দেয়ার প্রথা প্রচলিত। মা কালী এখানে নিত্যপূজিত, আর আপনি চাইলে দিনের যে কোনো সময় এখানে এসে মা কালির দর্শনলাভ করতে পারেন। আমরা এখানে দুপুরবেলায় পৌঁছেছিলাম। কালীমন্দিরের সামনেই একটি নাটমন্দির আছে। প্রতিবছর কালীপুজোর সময় এখানে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। ত্রিখিলান প্রবেশদ্বারের এই মন্দিরের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষন করা হয়। শ্রাবন মাসে জলযাত্রীরা তারকেশ্বর যাবার পথে এই মন্দিরে মা কালির দর্শনের জন্য ভীড় জমান।
Map Location: https://goo.gl/maps/kBTsMyLWEXhGgCZ88

রাস্তার পাশেই একটি আটচালা শিবমন্দির আছে, তা দেখে একটু এগিয়ে পৌঁছলাম বৈদ্যবাটী তারকেশ্বর রোডে। এই রোড ধরে পুরুষোত্তমপুরের দিকে কিছুটা হাঁটলেই রাস্তার বামদিকে আছে বন বিশালাক্ষি মন্দির। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই মন্দিরে একটি প্রতিষ্ঠা ফলক রয়েছে, যদিও ঠিকঠাক পড়তে পারিনি তবুও এই মন্দির থেকে ১১৩৫ বঙ্গাব্দের মধ্যে স্থাপিত। মন্দিরের টেরাকোটার কাজ কিছুটা নষ্ট হয়ে গেলেও, যা আছে তার গুরুত্ব অপরিসীম।


এই মন্দিরে কয়েকটি পাথরকে পূজা করা হয়, কোনো মূর্তি নেই। মন্দিরে দুবার পুজো হয় একটি সকালে, আরেকবার মন্দির বিকেল ৫ টার পর খোলে। বন্ধ মন্দিরের দরজায় দুটো ছোট জানালা করা রয়েছে, তা দিয়েই দর্শন করা যায়। কথা বলেছিলাম কয়েকজন স্থানীয়দের সঙ্গে, তারা জানালেন এই মন্দির অনেকবার সংস্কারের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু যেই উদ্যোগ নিয়েছে তার ক্ষতি হয়েছে। মন্দিরের পাথরের মূর্তি পাশের পুকুরের জলে ডুবে রয়েছে।
Map Location: https://goo.gl/maps/5THHyVaG6F5i18159

এই মন্দির থেকে নসিবপুরের দিকে একটু যেতেই দেখলাম বিশালাক্ষি তলা। এখানেও মা বিশালাক্ষির পুজো হয়। মন্দিরের দেবী দর্শন করে চলে এলাম নসিবপুর – চন্দননগর রোডের ক্রসিংয়ে।

এখান থেকে টোটো করে পৌঁছে গেলাম নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা। এই যে মন্দিরটি নীচে দেখছেন, এটি মা ব্রহ্মময়ী মন্দির। প্রায় ৮০-১০০ বছরের এই মন্দিরের দেবী স্থানীয় লোকেদের কাছে খুবই জাগ্রত। মন্দিরটি একটি আশ্রমের ন্যায় পরিচালিত।

মন্দির চত্বরের পিছনে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী, যা সংস্কারের অভাবে একটি খালে পরিণত হয়েছে। মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে,ডানদিকের রাস্তা চলে গেছে চন্দননগর আর বামদিকের রাস্তা চলে গেছে নসিবপুর। এই মন্দির আস্তে গেলে নসিবপুর স্টেশনে নেমে চন্দননগরের অটো ধরে নামতে হবে নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা তে।

Map Location: https://goo.gl/maps/LD3WNg5GoXL9sJmB9
সিঙ্গুর হাওড়া – তারকেশ্বর রেল শাখার দ্বাদশতম স্টেশন। হাওড়া থেকে তারকেশ্বর , সিঙ্গুর বা আরামবাগ লোকাল ধরে পৌঁছতে পারেন সিঙ্গুর ও তার ঠিক আগের স্টেশন নসিবপুর। সেখান থেকে ঘুরে নিতে পারেন এই জায়গাগুলি।