৫ – অনন্তকথা

সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম। আজকের ভোরবেলার কোনোরকম পরিকল্পনা আমাদের নেই। সকালবেলায় হোমস্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম একজোড়া বসন্তবাউড়ি কে। এগুলো আকারে একটু বড়ো এবং গলার কাছটা নীল রঙের। প্রকৃতি অনেকরকম রং ছড়িয়ে দিয়েছে পাখিটির গায়ে। অনেকক্ষন ধরে পর্যবেক্ষণ করার পর বুঝলাম , মৃত এক গাছের কাণ্ডের অবশিষ্ট এক কুঠুরিতে এই পাখিজোড়া তাদের সাধের বাসা বানিয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে খাবার জোগাড় করে বারে বারে ওই মৃত গাছের কাছেই ফিরে আসছে। বৃক্ষের কান্ড থেকে পাওয়া কাঠের বাড়িতে আমরাও কয়েকদিনের জন্যে আশ্রয় নিয়েছি আবার ওই পাখিগুলোও তো তাই করেছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বিহঙ্গরা মরে যাওয়া এক বৃক্ষের কাণ্ডে  আশ্রয় নিয়েছে , আর আমরা অনেক সময় আশ্রয় পেতে, বৃক্ষের কান্ড কেটে তাদের হত্যা করছি।

ঘড়িতে তখন আটটা বাজে। দরজায় মৃদু আঘাতের শব্দ এলো , খুলে দেখি বড়কাদা দাঁড়িয়ে। বললেন – “স্যার ব্রেকফাস্ট রেডি হচ্ছে , আপনারা রেডি হয়ে নিন। “

আমার মা আর ছেলে ততক্ষনে রেডি। বাকি শুধু আমি আর আমার স্ত্রী। একে একে আমরাও রেডি হয়ে নিলাম। আজ বক্সায় আমাদের শেষদিন। বকেয়া বিল মিটিয়ে বাদলবাবুর হোমস্টে ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে হবে আজকে। বিকেলের দিকে আলিপুরদুয়ার থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে ফেরার টিকিট কাটা রয়েছে। আজকের দিনে আমাদের জন্যে স্বপনবাবুই কিছু পরিকল্পনা করেছেন। তিনি কয়েকটা জায়গায় নিয়ে যাবেন আমাদের। ব্রেকফাস্ট সেরে , বাদলবাবুর বিল মিটিয়ে দিলাম। সমস্ত মালপত্র আমাদের ওপরের ঘর থেকে বড়কাদা নামিয়ে নিয়ে এসেছেন। সোয়া নয়টার সময় এসে গেলেন স্বপনবাবু। আমরাও মালপত্র গাড়িতে তুলে নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি , এমন সময় বাদলবাবুর স্ত্রী এলেন। আমাদের কেমন লাগলো সব জিজ্ঞেস করলেন। আমাদের ভালো লাগার কথা জেনে খুব খুশি হয়ে আমাদের বিদায় জানালেন। বাদলবাবুকে বিদায় জানিয়ে আমরা ডুয়ার্স প্রকৃতি থেকে রওনা হলাম। ধীরে ধীরে জয়ন্তী জনপদ ছাড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। গাড়ি থেকে দেখলাম , এই দুদিনের আমাদের আশ্রয় ক্রমে ক্রমে দৃষ্টির অগোচরে চলে যাচ্ছে।

আমার মা এমনিতে খুব বেশি কথা বলেন না, কিন্তু এবার স্বপনবাবুকে বললেন – ” এতদিন আপনাদের এখানে ছিলাম , আজকে চলে যাচ্ছি খুব খারাপ লাগছে। “

আমিও বলে উঠলাম – ” হ্যাঁ , কিছু কিছু জায়গা হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে থাকে , যে মনে হয় বারবার যাই। বক্সা আমার কাছে এরম একটা জায়গা হয়ে উঠলো। “

স্বপনবাবু মুচকি হেসে বললেন – ” আসবেন আবার। অন্য কিছু জায়গা দেখাবো। একটু সময় নিয়ে আসবেন , মোটামুটি ৩-৪ দিন। “

আমি বললাম – ” তাহলে এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি ? “

স্বপনবাবু বলতে লাগলেন – ” এই কয়দিন আমরা রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী মোড়ে এসে ডানদিকে আসছিলাম। আজ আপনাদের আমি জয়ন্তীমোড় থেকে ওই সোজা রাস্তাটা যেদিকে গেছে সেদিকে নিয়ে যাবো। “

আমি জিজ্ঞেস করলাম – ” সান্তলাবাড়ি ? “

মনাস্ট্রি

স্বপনবাবু আমার উত্তরে হেসে মাথা নাড়লেন। আমরাও বালা নদীর ব্রীজ পেরিয়ে জয়ন্তী মোড় এর দিকে এগোতে লাগলাম।

জয়ন্তী মোড়ে একটি ছোট্ট মন্দির আছে। সম্ভবত এই মোড়ে, দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্যে করা। রয়েছে একটা পুরোনো ওয়াচটাওয়ার। খুব উঁচু নয় , তবে এটা থেকে এলাকার ওপর নজরদারি করা যায়। আমরা জয়ন্তী মোড় থেকে ডানদিকে বাঁক নিলাম। সেই রাস্তায় কিছুদূর এগোতেই প্রকৃতি নিজের রূপ পাল্টে ফেললো। এতক্ষন যেরকম ঘন বনানীর মধ্যে দিয়ে আসছিলাম , এখন দেখতে পেলাম সে বনানী আর নেই। স্বপনবাবু এখানে শুধুই প্ল্যান্টেশন দেখালেন। পথের দুধারে দেখতে পেলাম বেশ সুন্দর ছোটছোট কাঠের বাড়ি। বাড়িগুলোর বাইরে কাঠের সিঁড়িও রয়েছে। বাড়িগুলো কাঠের তৈরি অসংখ্য স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। এগুলোকেই জঙ্গলে থাকার সেরা ঠিকানা হিসেবে ধরা হয়। অনেকে বলেন ফরেস্ট বাংলো। স্বপনবাবু জানালেন এইগুলি প্রত্যেকটিই হোমস্টে। যারা জয়ন্তীতে থাকেন না , তারা এইজায়গাতে থাকেন। বাগান দিয়ে সাজানো, বাঁশের  তৈরী পাঁচিল দিয়ে ঘেরা হোমস্টে গুলো দেখলে , আমাদের মতো পর্যটকেরা থাকতে চাইবেই।  এই ছোট জনপদ দিয়ে যত এগোতে লাগলাম , সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে পড়তে লাগলো। কিছুদূর এগিয়ে চোখে পড়লো বাচ্চাদের স্কুল , খেলার মাঠ এবং একটি ছোট্ট মনাস্ট্রি। আমি একটুও অবাক হলাম না। এই চত্বরে হয়তো বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মানুষেরা থাকেন। আমার খটকা লাগলো অন্য জায়গায়।

স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম – ” আচ্ছা , এটা তো জঙ্গলের একটা দিক , এখান থেকে জয়ন্তী রেঞ্জ কিছুটা দূরে। তাহলে পর্যটকেরা এখানে থাকতে চাইবেন কেন ? জঙ্গলের মধ্যে থাকতে গেলে তো জয়ন্তী বেস্ট অপশন ? “

স্বপনবাবু নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হাসলেন। আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন – ” আপনি কি কিছু খেয়াল করেছেন ? আমরা যে এই যাচ্ছি সেই রাস্তায় ? “

আমি – ” কই সেরম কিছু নাতো ? “

এবার আমার স্ত্রী মৌমিতা বলে উঠলো – ” আমরা উপরে উঠছি , পাহাড়ে। তাই না স্বপনবাবু ? “

স্বপনবাবু বললেন –  ” ঠিক ধরেছেন ! “

স্বপনবাবু ব্রেক কষে গাড়ি থামালেন। আমাকে বললেন – ” এইবার নামুন , আর ডানদিকটা দেখে আসুন। নিজেই বুঝতে পারবেন। “

আমি গাড়ি থেকে নেমে , ডানদিকে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম , তাতে আমার সমস্ত ক্লান্তি জুড়িয়ে এলো। কৌতূহল শেষ হলো। মনে প্রচন্ড আনন্দ হতে লাগলো , যেন আমিই প্রথম এই জায়গা আবিষ্কার করেছি। রাস্তার ডানদিকে পাহাড়ের ঢাল নেমেছে। এখানে কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওই দূরে বালা নদী। অনেক নিচে। বুঝলাম রিভারবেড থেকে দূরে যে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিলো , এখন আমরা সেরম এক পাহাড়ে উঠেছি। এই জনপদে বেশ একটা পাহাড়ি ব্যাপার আছে , তার ওপর জঙ্গলও কাছেই। গাড়িতে ফিরে স্বপনবাবুকে বললাম – ” সব উত্তর পেয়ে গেছি ! “

গাড়ি আরো কিছুটা গিয়ে পৌঁছলো সান্তলাবাড়ি। এই মোড়ে এসে আমাদের গাড়ি এক জায়গায় পার্ক করতে হলো। মোড়ের যেদিকে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। তার বাঁদিকের রাস্তা ধরে যাওয়া যায় রাজাভাতখাওয়া। ডানদিকের রাস্তা ধরে যেতে হয় জিরো পয়েন্ট। আমাদের গাড়ি যে রাস্তায় দাঁড়ালো , এই রাস্তার আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে এই জনপদের বাড়ি ঘরগুলি। আমাদের গাড়ির পেছনের দিকে রয়েছে ফরেস্ট বাংলো। আমাদের গাড়ির সামনে দুটো মারুতি ওমনি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। আমার ছেলে ঈশানকে দেখলাম ওই গাড়িগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আমি বললাম – ” এইগুলো কিডন্যাপার্স কার। যারা পড়াশুনা করে না , তাদের ধরে নিয়ে যায় ! “

স্বপনবাবু বললেন – ” চলুন ওই সামনের চায়ের দোকানে একটু চা খাই। এই ওমনি গাড়িগুলো এখান থেকে যায় জিরো পয়েন্ট। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পৌঁছনো যায় বক্সা ফোর্ট। ফোর্ট পেরিয়ে আরো এগিয়ে গেলে পৌঁছনো যায় লেপচাখা গ্রাম। “

এই লেপচাখা গ্রামের ব্যাপারে আমি শুনেছি আমার এক বন্ধুর থেকে । ভুটান বর্ডারের কাছে অবস্থিত এই গ্রামে নিরিবিলিতে কাটানো যায় একদিন। যারা বক্সার ফোর্টে ঘুরতে যায় , তারা একবার এই গ্রামে চাইলে ঘুরতে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ , পুরোটাই ট্রেকিং রুট।

চা খাওয়া শেষ করলাম। বিল মেটাতে গিয়ে দেখি, দোকানী ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করছেন – ” মোমো খাবেন ? “

আমি বললাম – ” না না। আমরা খেয়েই বেড়িয়েছি। তাছাড়াও সকালবেলা মোমো খাওয়ার ইচ্ছেও নেই। “

পাহাড় মানেই মোমো , এই মতবাদের স্রষ্টা বাঙালীরা, এই চাহিদার জেরে আজকাল প্রায় সব দোকানেই মোমো বানানো হয়। 

গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আমার মা আর স্ত্রী মৌমিতাকে দেখলাম ওই দোকানী মহিলার সাথে কথা বলছে। আর ঈশান তখনও ওই ওমনি গাড়িটাকে পরখ করে নিচ্ছে। ভাবছে, হয়তো ভয় পাচ্ছে ওকেও না ধরে নিয়ে যায় ! স্বপনবাবু গাড়ি স্টার্ট করেই বললেন –  ” এবার চলুন রাজাভাতখাওয়া মিউজিয়াম। “

ভাবলাম ঈশানের কথা। মিউজিয়াম দেখে ও না আবার বোর হয়ে যায় !

গাড়ি এবার দ্রুত চলতে লাগলো। কোনো জায়গায় প্রথমবার যাওয়ার সময় যেমন কৌতূহল বা আকর্ষণ থাকে , একবার ঘুরে নিলে আর ততটা থাকে না। তাই ফেরার সময়টা দ্রুত পেরিয়ে যায়। জয়ন্তী মোড় পেরিয়ে আবার চলে এলাম রাজাভাতখাওয়ার জঙ্গলে। মন দিয়ে দেখতে লাগলাম রহস্যময়ী এই বনানীকে। আবার জঙ্গলে এসে যেন অক্সিজেন পেতে লাগলাম। উঁচু উঁচু গাছের সারি যেন জিজ্ঞেস করছে – ” এই প্রকৃতিকে ফেলে চলে যাবি ? “

প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র

এবার রাজাভাতখাবার মূল ফটক পৌঁছনোর আগেই গাড়ি বামদিকে বাঁক নিলো। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখতে পেলাম লেখা আছে নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। মনে মনে ভাবলাম , নাঃ এতো মিউজিয়াম নয় ! নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারের বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র। এখানে কোনো প্রবেশমূল্য লাগে না। ভেতরে প্রবেশ করতেই বামদিকে দেখলাম এক প্রকান্ড হাতির মূর্তি। ডানদিকে বড় এলাকা জুড়ে রয়েছে বাগান। নুড়িপাথরের পথে আর কিছুটা এগোলেই প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র। সচরাচর জঙ্গলে আমরা যেরম সরকারি বাড়িগুলি দেখে থাকি, এটিও সেরকম। প্রবেশ দ্বারের মুখেই লেখা রাজাভাতখাওয়া নামের ইতিহাস।

গল্পটা অনেকটা এরকম।

১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে কোচবিহারের রাজ্ সিংহাসনে বসেন রাজা ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণ রায়। তিনি সিংহাসনে বসার পর থেকে এই বক্সা এলাকা নিয়ে ভুটানের রাজার সাথে মতবিরোধ হতে থাকে। সীমা সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে ঝামেলাও বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে দুই পক্ষের সহমতে অনুষ্ঠিত এক বার্ষিক সভায়, কোচবিহারের রাজাকে বন্দী করেন ভুটানের রাজা। তাকে ভুটানের তৎকালীন রাজধানী পুনাখা তে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এদিকে স্থায়ী রাজা না থাকায় , ওই ঘটনার পর থেকে কোচবিহারের বিভিন্ন এলাকায় ভুটিয়া প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। পরে ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে , কোচবিহার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে রাজ্য থেকে সমস্ত ভুটিয়া সেনাছাউনি ভেঙে দেয়া হয়, তৎপর কোচবিহারকে ভুটিয়ামুক্ত করা হয়। এই ঘটনার পরে রংপুরের কালেক্টর ভুটানের রাজাকে চিঠি দেন যাতে রাজা ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণ রায়কে ছেড়ে দেয়া হয় , নয়তো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভুটানের রাজধানী দখল করবে। এর ফলে,   তিব্বতী কর্তৃপক্ষ তিশু লামার মধ্যস্থতায় , দুই পক্ষের সন্ধি হয়। সন্ধির তারিখ ২৩শে এপ্রিল , ১৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দ। চুক্তির অন্যতম শর্তানুসারে রাজা বক্সার পথ দিয়ে কোচবিহারের দিকে অগ্রসর হন। তখন সেই খবর পেয়ে কোচবিহারের রাজপুরুষেরা এগিয়ে যান রাজাকে অভ্যর্থনা জানাতে। এই জায়গাতেই রাজার স্বদেশে প্রথম অন্নগ্রহনের ব্যবস্থা করা হয়। সেই থেকে এই জায়গার নাম রাজাভাতখাওয়া।

প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্রে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো একটা রিসেপশন ডেস্ক। ডেস্কের পেছনে দাঁড়িয়ে এক যুবক। সুঠাম চেহারা , দেখলেই বোঝা যায় নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। মুখে চাপদাড়ি , চুল ছোট করে কাটা , যেমনটা আর্মি দের থাকে। আমি এগিয়ে গিয়ে আলাপ করে জানতে পারলাম ওই যুবকের নাম মৃন্ময়। ফরেস্ট গার্ড হিসেবে কাজ করেন। ওনার সাথে এক ভদ্রলোক ছিলেন , তিনি সাততাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলেন। যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে পড়ে গেছে।

জিজ্ঞেস করলাম – ” উনি হুড়োহুড়ি করে কোথায় গেলেন ? “

মৃণ্ময়বাবু জানালেন – ” প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্রকে ভালোভাবে উপভোগ করতে হলে, ভালো লাইটের ব্যবস্থা দরকার। উনি লাইটের ব্যবস্থা করতে গেছেন। “

কথায় কথায় জানতে পারলাম মৃন্ময় বাবুর ছবি তোলার শখ রয়েছে। ফরেস্ট গার্ড হিসেবে তিনি শুধু যে বক্সার ছবি তুলেছেন তা নয় , ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন জঙ্গলে আর ছবিও তুলেছেন বিস্তর। ছবিগুলোর মধ্যে সবরকমের বন্যপ্রাণের দেখা মেলে। মোবাইল খুলে কিছু ছবি দেখালেন।

মৃন্ময় – ” এই ছবিটা দেখুন স্যার। প্রায় সাড়ে সাত মাস অপেক্ষা করার পর এই জন্তুটিকে ক্যামেরাবন্দী করতে পেরেছি ! “

ছবিটা দেখে আমি অবাক হলাম। এতো কালো চিতাবাঘের ছবি। জিজ্ঞেস করলাম , ” এটিরও দেখা মেলে এখানে ? “

মৃন্ময় – ” সচরাচর দেখা মেলে না , হ্যাঁ তবে এই জঙ্গলে আছে। “

হঠাৎ করে চারিদিক আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো। বুঝলাম এতক্ষন কারেন্ট ছিল না। ওই ভদ্রলোক জেনারেটর চালিয়ে এলেন। মৃন্ময় বাবু, এবার আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। স্বপনবাবু ঠিকই বলেছেন, এটি কোনো মিউজিয়ামের থেকে কম নয়। বাঘের ছাল থেকে অজগরের ছাল , ময়ূরের ডিম্ থেকে শুরু করে রংবেরঙের প্রজাপতি, কি নেই এখানে ! তার সাথে রয়েছে রোমহর্ষক কিছু গল্প। এখানে সংরক্ষিত প্রত্যেকটি প্রাণীর সাথে কিছু না কিছু গল্প জুড়ে রয়েছে। মৃণ্ময়বাবু সেই গল্পগুলোই বলছিলেন। আমাদের মতো শ্রোতা পেয়ে তিনি উচ্ছসিতও ছিলেন। লক্ষ্য করলাম ওনার চোখের দিকে। প্রতিটি গল্প বলার সাথে সাথে চোখ জ্বলে উঠছে। ক্রোধে নয় , হিংসায় নয় এ জ্বলা নিজের কাজকে জনসমক্ষে তুলে ধরার আনন্দে। আমাদের শহরে, যেখানে লোকেরা নিজেদের কাজ নিয়ে সবসময়ই নিন্দা করতে ব্যস্ত , সেখানে এই ভদ্রলোক নিজের  কাজকে এতটা ভালোবাসেন যে সেটাতে পুরোপুরি ডুবে রয়েছেন। বুঝলাম, এই গভীর জঙ্গলের মধ্যে না আছে বেশি রোজগারের সুযোগ , না আছে সমস্ত সুবিধা, কিন্তু যেটা আছে সেটা হলো এই বনাঞ্চলের জন্যে কিছু করার মানসিকতা। এই মৃন্ময়ের মতো লোকেরা সেই মানসিকতা নিয়েই প্রতিদিন কাজে যায়। এরাই বনদফতরের সম্পদ ।

বিভিন্ন প্রাণীর ডিম্

বাইরে বেরিয়ে মৃন্ময়কে জিজ্ঞেস করলাম – ” কিছু গুডিস পাওয়া যাবে ? কিনতে চাই।  “

মৃন্ময় টিশার্ট দেখালো একটা। সাইজ দেখে মনে হলো ঈশানের জন্যে ঠিক আছে। ঈশানকে দারুন মানাবে। কেনার পর মৃন্ময় আমাকে, বক্সার এক স্মৃতি হিসেবে দুটি পোস্টার দিলো। পোস্টারগুলোতে বক্সায় বসবাসকারী বিভিন্ন বন্যপ্রাণের ছবি দেয়া। মৃন্ময়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে দেখি স্বপনবাবু গাড়িতেই বসে আছেন। অনেক জায়গায় ঘুরেছি , অনেক জায়গায় গাড়ি নিয়েও গেছি , তবে ড্রাইভার হিসেবে এই ভদ্রলোকের ধৈর্য্যের কোনো তুলনা হয়না। আমরা গাড়িতে উঠতেই , স্বপনবাবু বললেন – ” চলুন এবার সিকিয়াঝোরা “।

চিতাবাঘ

সিকিয়াঝোরার দূরত্ব রাজাভাতখাওয়া থেকে প্রায় ষোলো কিলোমিটারের মতো। এপথে স্বপনবাবু দেখালেন, কোন রাস্তা শিলিগুড়ি যায় আর কোন রাস্তাটি চলে যায় আসাম রাজ্যে। আমরা আসাম রোড ধরে এগিয়ে চললাম। পেরোলাম অজস্র ছোট বড় চাবাগান। সড়কপথে ওঠার পর থেকেই বুঝতে পারলাম যে জঙ্গল থেকে আমরা বেরিয়ে চলে এসেছি। এবারের মতো উদ্ভিদদের দেশকে বিদায় জানাতে হবে। আবার কবে এই জঙ্গলে আসতে পারবো জানি না। স্বপনবাবু মন দিয়ে সড়কপথের দিকে তাকিয়ে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি , এনাকেও আজ আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রেনে উঠতে হবে। কবে আবার দেখা পাবো কে জানে ! একই জীবনে, এরম কত প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার কোনো হিসেব নেই। কিছু পূরণ করতে পেরেছি, আর অধিকাংশই পারিনি। তবে এই প্রতিশ্রুতিটা কেন যেন পূরণ করতে বার বার ইচ্ছে হচ্ছে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে সেই জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট জনপদ জয়ন্তীতে।

সড়কপথ থেকে আমাদের গাড়ি এবার বামদিকে বাঁক নিলো। এবার একটি ছোট্ট গ্রামীণ সড়ক ধরে এগিয়ে চললাম। পথের দুধারে ফাঁকা মাঠ , চাষের জমি আর মাঝে মাঝে কয়েকটা বাড়ি। এ দৃশ্য আমার খুব পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামের এই একই দৃশ্য , সে বর্ধমান হোক কিংবা মেদিনীপুর। বাংলার প্রকৃতি সব জায়গাতেই নিজের মায়াবী রূপ মেলে ধরেছে। বেশ কিছুটা চলার পর , একটা ছোট্ট রিসোর্টের কাছে চলে এলাম বলে মনে হলো। বাইরে পথের ধারে স্বপনবাবু গাড়ি পার্ক করলেন। আমরাও নেমে এলাম। এই জায়গায় ঢুকতেই বুঝতে পারলাম , এটি একটি সরকারি পার্ক ছাড়া কিছুই না। প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করেই ডানদিকে একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ। অর্ডার দিলে খাবার পাওয়া যাবে। রেস্তোরাঁ লাগোয়া একটি জায়গায় প্লাস্টিকের টেবিল চেয়ারে বসে এক ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন – ” কজন ? “, উত্তরে বললাম ” আমরা চারজন “।

সিকিয়াঝোরার বোটরাইড

চারজনের হিসেবে প্রবেশমূল্য দিয়ে পার্কে ঢুকে পড়লাম। রেস্তোরাঁর দিকটায় পর্যটকদের থাকার জন্যে তৈরী হচ্ছে দোতলা কিছু বাড়ি। তার সামনের পুরো এলাকা জুড়ে সাজানো বাগান। নানান রঙের ফুলে সমৃদ্ধ এই বাগানে বেশ কিছু ছবি তুললাম। এতক্ষন আমার নজর প্রবেশদ্বারের বামদিকটায় পড়েনি। এবার যখন এক ঝলকে দেখলাম , ছুটে গেলাম সেইদিকে। একটি সংকীর্ণ জলস্রোত বয়ে চলেছে এই পার্কের বাঁপাশ দিয়ে। জলস্রোতের অন্যপারে সেই বক্সার জঙ্গল। যে অরণ্যকে মনে মনে বিদায় জানিয়ে ফেলে খারাপ লাগছিলো , সে অরণ্য ভিন্ন রূপে আবার আমার সামনে দাঁড়িয়ে। এই ভালোলাগার অনুভূতি ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। প্রতিটি মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দী করবার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার এই ছুটোছুটি দেখে আমার স্ত্রী মৌমিতা চেঁচিয়ে উঠলো – ” আরে কি করছো ? বোটিং টা ঐদিকে তো ” ! মৌমিতার হাত যেদিকে নির্দেশ করছে সেদিকে তাকিয়ে দেখি একটা ছোট ঘাট। সংকীর্ণ জলধারা ওই ঘাটের কাছটায় অনেকটাই প্রশস্ত। খোঁজ নিয়ে জানলাম , একদল পর্যটক এখন ওই বোটে করে ঘুরছে ,ওরা ফেরত এলে তারপর আমরা যেতে পারবো। আমি ঘাটের চারপাশটা দেখে যা বুঝলাম , তাতে বক্সার জঙ্গলের একপাশে অবস্থিত সিকিয়াঝোরা। এখানে বোটে করে পৌঁছে যাওয়া যায় জঙ্গলের অনেক গভীরে। তখন দেখা যাবে এই জলধারার দুপাশেই জঙ্গল। অনেকটা সুন্দরবনের খাঁড়ির মতো। স্থানীয় গাইডরা এই জায়গাকেই বলে বক্সার আমাজন। কেন বলে সেটা তখনও আমি ঠিক করে বুঝিনি।

কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখতে পেলাম বোট ফিরে আসছে। বোট এলো , হৈহৈ করে কিছু পর্যটকেরা নামলেন। অল্পবয়সী কিছু ছেলে মেয়ে এবং তাদের সাথে কিছু নব্য বিবাহিতা নারী। এদিক ওদিক দৌড়োতে লাগলো ওরা । কেউ ফুলের সামনে দাঁড়ালো।  কেউ বা ফুলকে চুম্বন দেবার ভঙ্গীতে ফুলের কাছে মুখ রাখছে । কিছুক্ষন পর বুঝলাম যে ওদের দলের মধ্যে যে ছেলে দুটি ছিল , তারা ওই মেয়েদের বিভিন্ন চলার ভঙ্গী , দাঁড়ানোর ভঙ্গী সব ক্যামেরাবন্দী করছে। মনে মনে ভাবলাম এগুলো চলতেই থাকবে। এরই নাম রিল। আমরা সবাই বোটে গিয়ে উঠলাম। আমাদের বোটিং এর গাইড ভদ্রলোক, ছোটোখাটো চেহারার , বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব। রোগা চেহারার ওই মুখে গালভর্তি খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি , মাথার চুলের অধিকাংশই সাদা। পরনে একটা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি।

বললেন – ” স্যার একটু বসেন। মাঝিভাই আসতেছে। দশ মিনিটের মধ্যেই ছাড়ে দিবো। “

জিজ্ঞেস করলাম – ” এখন তো দুপুর বারোটা বাজতে যায় , কিছু তো সেরকম দেখতে পাবো বলে মনে হয় না , তাই না ? “

গাইড বললেন – ” ঠিক বলছেন স্যার , সকালবেলায় যদি আসতেন, ভালো হইতো। দুদিন আগেই এখানে চিতাবাঘ দেখা গেসলো। “

আমি অবাক হলাম – ” তাই নাকি ? সেটাও তো ভাগ্যের ব্যাপার ! “

গাইড বললেন – ” হ্যাঁ , ঠিক। কয়েকদিন আগে আমরাই তো হাতি দেখতে পাইছিলাম। তখন বিকাল প্রায় চারটা। “

আমি মাথা নেড়ে বললাম – ” ওটাই তো সময় ! হয় সকালে বা বিকেলে। আমরা তো এই ট্রেন ধরার আগে ঘুরে দেখতে এলাম। খুব একটা প্রত্যাশা নেই, যে অনেক কিছু দেখতে পাবো। “

অল্পবিস্তর যা পাখি চিনি , তাতে দেখলাম একটা স্টর্ক বিলড মাছরাঙা আমাদের থেকে কিছুটা দূর দিয়ে উড়ে গেলো। দেখলাম খানিকটা দূরে একটা ছোট্ট ওয়াচটাওয়ারের মতন রয়েছে , সেইখানে পাখিটা গিয়ে বসলো। তবে সেই টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত , মানুষের চড়ার মতো একদমই নয়। দেখলাম এক ভদ্রলোক এলেন , এনার পরনে টিশার্ট এবং একটি হাফপ্যান্ট। কোমরে গামছা বাঁধা। কোনো কথা না বলেই বাঁশের দাঁড় উঠিয়ে বোট ঠেলা শুরু করলেন। গাইড ভদ্রলোকও যেন এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনিও শুরু করলেন, এই জায়গার ভৌগোলিক অবস্থান , কি কি আছে এইসব সম্পর্কে তথ্য বিতরণ করতে লাগলেন। লক্ষ্য করলাম ভদ্রলোকের পরনে যতই মলিন কাপড় থাকুক না কেন , ওনার মুখের হাসি একেবারেই অমলিন। ভালো লাগলো সেই মুখের হাসি । জিজ্ঞেস করলাম – ” আপনার নাম কি ? ” , উত্তর এলো – ” স্যার , আমার নাম অনন্ত রাভা , কাছাকাছিই আমাদের গ্রাম। “

জিজ্ঞেস করলাম – ” অনন্তবাবু , এই যে জলস্রোত দিয়ে চলেছি , এটা কি এগিয়ে গিয়ে আরো সংকীর্ণ হয়েছে ? কিছুটা খাঁড়ির মতো ? “

অনন্তবাবু – ” হ্যাঁ স্যার “

কথা শেষ না হতেই লক্ষ্য করলাম , একঝাঁক প্রজাপতি নৌকোর চারপাশে উড়ছে। দুপাশের জঙ্গলে কিছু রংবেরঙের ফুলও দেখলাম। খেয়াল করলাম, এই প্রজাপতির উপস্থিতি আমার ছেলে ঈশানকে যারপরনাই বিচলিত করে তুলেছে। তাই ও বেচারা ভয়ে নিজের মার কোলে মুখ গুঁজে শুয়ে রয়েছে। অনন্তবাবু চারপাশটা দেখাতে লাগলেন। কোথায় কবে কি জানোয়ারের দেখা মিলেছে , সেই কাহিনী শোনাতে লাগলেন। আমাদের মাঝি কিন্তু নীরব। তিনি শুধু দুপাশে দেখতে দেখতে নৌকো ঠেলছেন। মোটর নৌকো নয়, তাই কোনো শব্দও হচ্ছে না। প্রায় সাত আট মিনিট হয়েছে , আমরা এবার গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। আবার অরণ্য , আবার আমরা , তবে এবার গাড়িতে নয় , নৌকোতে। দুপাশের বনানী কখন যে কাছে চলে এসেছে বুঝতে পারিনি। যে নৌকোয় আমরা যাচ্ছি , তার দুদিকে দশফুটের মধ্যেই নিবিড় অরণ্য। আর নিরিবিলি অরণ্যের সেই শব্দ , আশেপাশে নেই কোনো জনপদ , নেই কোনো আওয়াজ। এই বক্সার আমাজনে শুধুমাত্র আমরাই। অনন্তবাবুর প্রত্যেকটি কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি , ঈশানের ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শ্বাস নেয়ার শব্দ , মাঝির দাঁড় বাওয়ার শব্দ , সবই যেন আমার কানে স্পষ্ট। ভাবলাম এটা কি হলো ? ইন্দ্রিয় কি করে এতো সজাগ হয়ে গেলো ? পরমুহূর্তেই মনে হলো, আমরা তো সভ্য শহরের বাসিন্দা। প্রকৃতির এই শব্দ শোনার অভ্যেস আমাদের  নেই , আমাদের কান অভ্যস্ত শহুরে কোলাহলে। আমার সেটাকে মনে হলো , আমার ইন্দ্রিয় সজাগ হয়েছে। হাসি পেলো , আমার ইন্দ্রিয়গুলি স্বাভাবিক ভাবেই কাজ করছে। তবে সভ্যতার সঙ্গে যে তার জুড়ে ছিল , সেটা ছিন্ন হয়ে গেলো। প্রবেশ করলাম গহন অরণ্যের ভেতরে।

অনেকগুলো বাঁক নেয়ার পর আমরা যে জায়গায় আছি , এখানে এবার আমার একটু ভয় করতে লাগলো। হঠাৎ মনে হলো , কিছু যেন একটা উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে গেলো , সেদিকে তাকাতেই দেখলাম পাতা একটু নড়ছে। কিছুক্ষণ আগেও কেউ যেন এখানে ছিল। মনে হলো , বন্যপ্রাণেরা আমাদের ওপর নজর রেখেছে।

অনন্তবাবু বললেন – ” চিন্তা নাই বাবু , ওটা বার্কিং ডিয়ার ! ” , বোধ হয় বুঝতে পেরেছেন যে আমি একটু ভয় পেয়েছি। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছে কিছু যেন একটা দেখা যেতে পারে। মোটের ওপরে এটা তো টাইগার রিজার্ভ , ভয় একটু পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

জিজ্ঞেস করলাম – ” অনন্তবাবু , কখনো এখানে টাইগার দেখেছেন নাকি ? “

অনন্তবাবু বললেন – ” চিতাবাঘ দেখসি , কিন্তু বাঘ দেখিনাই। বাঘ দেখতে পাইলে, আর আমাকে দেখতে পাইতেন না। “

এবার নৌকোর নীচের দিকে হাত ঢুকিয়ে একটা কাটারি বার করে দেখালেন। বললেন – ” আমাদের যাই হোক , পর্যটকরা বিশ্বাস করে আমাদের সাথে আসেন , তাদের কোনো ক্ষতি হইতে দিব না। তবে বাঘ দেখতে পাইলে , ওর চোখের দিকে তাকাবেন , তাকায় থাকবেন। কিছু করবে না। যেই মুহূর্তে চোখ ঘুরাইসেন , মরতে হইবেই। “

অনন্তবাবু বলতে লাগলেন – ” আমরা টুরিস্ট নিয়ে আসি তো , প্রায়ই জংলী শুয়োর , হরিণ , জংলী কুত্তা , হাতি এগুলা দেখতে পাই। একবার তো নৌকায় করে যাচ্ছিলাম , কিছুদূর যায়ে দেখি কালো মতো কি একটা যেন জলের মাঝখানে দেখা যাচ্ছে। আমি তো দেখেই বুঝে গেছি ও হাতির শুঁড়। চান করতেছে। টুরিস্ট গুলা ভয় পায়ে গেছলো। বললাম ভয় পাবেন না , চেঁচাবেন না , শান্ত থাকুন ,ওরা চলে যাবে। হইছিলোও তাই। দশ মিনিট দাঁড়ায় ছিলাম , তারপর একটা বাচ্চা হাতি জল থেকে উঠে দৌড় মারলো। “

এই বলেই জলের ধারে এক জায়গা আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন অনন্তবাবু। দেখলাম কিসের যেন গর্ত। মনে হচ্ছে কেউ ধারালো কিছু দিয়ে ঐজায়গায় গর্ত খুঁড়েছে। অনন্তবাবু বললেন – ” ঐগুলা হাতিতে করছে। ঐভাবে ওরা দাঁত পরিষ্কার করে। “

নৌকো এবার পুরো ইউ টার্ন নিলো। সামনে যাওয়ার রাস্তা আরো সংকীর্ণ। গাছেরডাল গায়ে এসে লাগবে। এই অবধি শুধুমাত্র কৌতূহলের বশে  এসেছিলাম। অনন্তবাবুকে এক্সট্রা টাকা দেব বলেছিলাম। নৌকো যেই না ঘুরেছে অমনি দেখলাম, একটা কমন কিংফিশার উড়ে গেলো জঙ্গলের দিকে। সামান্য আওয়াজও, এখানের বন্যপ্রাণদের কাছে কোলাহলের মতো। একটু এগোতেই দেখতে পেলাম একজোড়া বালিহাঁস জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল , কিন্তু আমাদের আসার ক্ষীণ আওয়াজেই উড়ে পালিয়ে গেলো। অনন্তবাবু আজ একটু হলেও খুশি ছিলেন। আমাকে যোগ্য শ্রোতা হিসেবে অনেক গল্প শোনালেন , তার ওপর একটু এক্সট্রা টাকাও পাবেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – ” আপনারা কোথা থেকে আসতেছেন বাবু ? “

বললাম – ” আমরা এমনি তো কলকাতার বাসিন্দা , এখানে এসেছিলাম বক্সায়। আজই বাড়ি ফিরবো। বিকেল তিনটের দিকে ট্রেন। ফেরার আগে ঘুরে গেলাম আর কি ! “

অনন্তবাবু উচ্ছসিত হয়ে বললেন – ” জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে আসবেন। পাখি থাকবে অনেক , জন্তুও দেখতে পাবেন। আমি ঘুরায় দেখাবো। “

বললাম – ” হ্যাঁ , আসবো নিশ্চই। আপনি কি এই কাজই করেন ? “

অনন্তবাবু উত্তর দিলেন – ” না বাবু , এই জুন মাসে ক্ষেতে কাজ কম থাকে। তাই এখানে চইলে আসি , সপ্তায় কখনো তিনদিন আসি। নয়তো চাষের কাজ তো থাকেই । শীতের সময় ভীড় বেশি থাকলে তখন কয়েকদিন এস্ট্রা কাজ কইরে নেই। “

আমি জিজ্ঞেস করলাম – ” এইখানে কি থাকার ব্যবস্থা হচ্ছে ? এতো সুন্দর জায়গায় থাকার ব্যাবস্থা থাকলে অনেকের সুবিধা ! “

অনন্তবাবু বললেন – ” হ্যাঁ , শুনতেছি তো অনেক কিছুই হবে। ঐগুলা আবার লিজে দিবে। যারা লিজ পাবে , তারাই তখন গাইড দিবে, নৌকা দিবে , পুরা প্যাকেজ সিস্টেম। “

আমি – ” তাই নাকি ! এরম তো আজকাল অনেক জায়গাতেই হয়। “

অনন্তবাবু এবার আমার মার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন – ” ছোট ছেলেটা আমার জঙ্গলের ডিএফও হতে চায়। জঙ্গল খুব ভালোবাসে। বলে জঙ্গলের জন্যে কিছু করবে। বন্ধুবান্ধবের সাথে বায়না ধরছিল কলকাতায় যায়ে পড়বে। প্রথমে ভাবলাম টাকা কিভাবে জোগাড় করবো ? তারপর কি মনে করে, পাঠায় দিলাম। জুলজি না কি নিয়ে যেন পড়তেছে। আমি ওগুলা বুঝি না। আমার বড় ছেলে মাঝে মাঝে যায় , ওই বুঝে জিনিসগুলা। এই বছরেই পাশ করে যাবে। ডিএফও হওয়া কি এমনি এমনি ব্যাপার ! পরীক্ষা দিতে হয়, পাশ করতে হয়। ঝামেলা আছে। “

আমি বললাম – ” হ্যাঁ , ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস। কঠিন পরীক্ষা , তাও অনেকেই দেয় , পাশও করে। “

আমার মা অনন্তবাবুকে বললেন – ” দেখুন আশা তো রাখতেই হবে , কে বলতে পারে আপনার ছেলে হয়তো একবারেই পাশ করে যেতে পারে। “

” তাই যেন হয় , ঠাকুরকে বলি , ছেলেটার একটা কিছু করে দাও মা ! ” – এই বলে অনন্তবাবু থামলেন। নৌকোও এবার অনেকটা পথ পেরিয়ে চলে এসেছে পাড়ের কাছে।

অনন্তবাবুকে বললাম – ” এখানে খাবার ব্যবস্থা কি ওই রেস্তোরাঁয় ? “

অনন্তবাবু – ” হ্যাঁ বাবু , কিন্তু আগে থেকে অর্ডার দিতে হতো যে ,ওরা বানায় রাখতো ? “

” আমি একদম ভুলে গেছি ! দেখি গিয়ে কি পাওয়া যায়। ” – এই বলে দেখলাম নৌকো এবার পাড়ে এসে গেছে, ঈশানও কখন যেন ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। অনন্তবাবুর কথা শুনতে শুনতে ঈশানের দিকে তাকাতেই ভুলে গিয়েছিলাম । সবাই মিলে নৌকো থেকে নাবলাম, অনন্তবাবু এবং মাঝি কে প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে বিদায় জানিয়ে রেস্তোরাঁয় এলাম। রেস্তোরাঁয় দেখলাম স্বপনবাবু বসে রয়েছেন । রেস্তোরাঁয় জিজ্ঞেস করতে ওনারা জানালেন শুধু ডিমভাত হবে। মনে মনে ভাবলাম , এটাই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় খাবার। আমরা সবাই ডিমভাত খেলাম , স্বপনবাবু আর আমার মা নিরামিষ খেলেন। খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়ে দেখলাম ঘড়িতে প্রায় দুটো বাজে।

স্বপনবাবু বললেন – ” চিন্তা করবেন না, ঠিক সময়ে পৌঁছে দেব। স্টেশন বেশিদূর নয়। বড়জোর চল্লিশ মিনিট। “

আমরা রেস্তোরাঁর বিল মিটিয়ে, সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠে এসে বসলাম। মন কেড়ে নিলো সিকিয়াঝোরার জঙ্গলে ঘেরা বোটরাইড।

স্বপনবাবুকে বললাম – ” দারুন একটা জায়গায় নিয়ে এলেন। বেশ ভালো লাগলো। জঙ্গলের এরম পরিবেশ আগে কখনো দেখিনি। “

স্বপনবাবু হাসলেন। গাড়ি স্টার্ট দিলেন। জাতীয় সড়কে উঠে দেখতে পেলাম , এক হাতি নিশ্চিন্তে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে , পিঠে মাহুত বসে রয়েছে। জঙ্গলের সেই হাতি আর এই হাতির মধ্যে বিস্তর ফারাক। বুঝলাম ধীরে ধীরে আমরা সভ্যতার কাছাকাছি চলে এসেছি। যে সভ্যতার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে এই দুদিন জঙ্গলকে উপভোগ করলাম , আবার সেই সভ্যতাকেই সঙ্গী করে ফিরতে হবে দৈনন্দিন জীবনে। শুরু হবে ঈশানের স্কুল। আমাকে আর আমার স্ত্রীকেও ফিরতে হবে অফিসে। সবাইকে পেছন থেকে সাপোর্ট করবে আমার মা।

স্বপনবাবু কথা রাখলেন। চল্লিশ মিনিটেই মধ্যেই নামিয়ে দিলেন আলিপুর দুয়ার স্টেশনে। ঘড়িতে তখন পৌনে তিনটে। ট্রেন তিনটে পনেরোর কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। ব্যাগপত্র নামিয়ে একটু সাইড করে রাখলাম। স্বপনবাবু গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি স্বপনবাবুর কাছে এগিয়ে গেলাম। বললাম – ” আপনার চেহারার সাথে আমার স্বর্গীয় কাকুর অনেক মিল রয়েছে। কাকু বেঁচে থাকতে কখনও কাকুকে কিছুই উপহার দিতে পারিনি । আমি আপনার ভাইপোর মতো , তাই এই যে আপনি আমাদের ঘুরিয়ে দেখালেন এতো কিছু , তার জন্যে আমার তরফ থেকে একটা ছোট্ট উপহার ” , এই বলে ওনার হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিলাম। উনি ওই নোট হাতে নিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমার দিকে তাকালেন। বললাম – ” ভাববেন, এক ভাইপো তার কাকুকে দিয়েছে। “

এবার উনি সেই চেনা হাসিটা হাসলেন। খুশি হলেন কিনা জানি না , তবে আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। ধীরে ধীরে গাড়ি স্টেশন চত্বর পেরিয়ে , বক্সার রাস্তায় উঠে গেলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই দৃষ্টির অগোচরে চলে গেলো। আমরাও মালপত্র নিয়ে সোজা স্টেশনে এসে গাড়িতে চেপে বসলাম। সঠিক সময়ে গাড়ি ছেড়েও দিলো। জানলার ধারে বসে ছিলাম। আলিপুরদুয়ার স্টেশন ছেড়ে ট্রেন বেরিয়ে আবার জঙ্গলে প্রবেশ করলো।

মনে মনে ভাবলাম, এ প্রকৃতির কেমন সৃষ্টি ! একদিকে প্রকৃতি নিজের মোহময়ী রূপে ধরা দেয় , অন্যদিকে এক অনিশ্চয়তার পাহাড় গড়ে তোলে। পর্যটকরা কিছু বন্যপ্রাণ দেখবার আশায় আসে , কিন্তু তাতেও থাকে অনিশ্চয়তা। আবার অনন্তবাবুর মতো জঙ্গলকে ঘিরে বসবাস করা লোকেদের থাকে জীবিকার অনিশ্চয়তা। কিন্তু জঙ্গল কাউকেই নিরাশ করে না। পর্যটকেরা আসেন , ঘুরে বেড়ান , অর্থ খরচ করেন। সেই অর্থে রোজগার হয় স্বপনবাবু কিংবা বাদলবাবুর মতো লোকেদের। ঘুরতে থাকে অর্থনীতি। আমরা এর মধ্যে কি খুঁজছি, সেটাই আসল। আমি জঙ্গলের বিভিন্নরকম রূপ দেখতে চেয়েছি এবং পেয়েছি। অনন্তবাবুকে জঙ্গল আশা দিয়েছে , হয়তো একদিন তার ছোট ছেলে ফিরবে বক্সাতে। ডিএফও হয়ে। ভবিষ্যতে কি হবে, তা আমরা তুচ্ছ মানুষেরা কি বলতে পারি ? তবে বক্সার জঙ্গল, আমার মনের মধ্যে, স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। দিনের শেষে মনে হচ্ছে , এই তো সেদিন এলাম। স্বপনবাবু , বাদল ছেত্রী , শুভঙ্কর , মৃন্ময় , অনন্তবাবুদের কথা খুব মনে পড়ছে। সবথেকে বেশি মিস করছি বক্সার সেই গভীর রহস্যময়ী বনানীকে। এখন ট্রেনও সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছে। এবারের মতো বিদায় জানাতে জঙ্গলও চলেছে আমার সাথে , যতদূর যাওয়া যায়। বিভূতিভূষণের লেখা আরণ্যকের সেই লাইনটা খুব মনে পড়ছে , জঙ্গল সত্যিই আমাকে পেয়ে বসেছে।

৪ – বক্সা টাইগার রিজার্ভ

পরদিন সকাল সকাল সবাই মিলে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম হোম স্টে থেকে। বাদলবাবুর গাড়িতে আজ এক নতুন গাইড, গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ। এই রেঞ্জে দুটো ওয়াচটাওয়ারের কাছে যাওয়ার প্ল্যান রয়েছে। পঁচিশ আর ছাব্বিশ মাইল। বনে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে, ঢুকে পড়লাম রাজাভাতখাওয়ার অন্দরে। গভীর জঙ্গলে তখন দুটো মাত্র গাড়ি। আমাদের সামনের গাড়িতে বসে দুই বন্ধুর পরিবার, সাথে বাচ্চারাও রয়েছে। কিছুদূর এগিয়ে আমি গাইডকে অনুরোধ করাতেই, আমাদের গাড়ি স্লো হয়ে গেলো। সামনের গাড়িটি আমাদের দৃষ্টির অগোচরে চলে যেতেই, আবার আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো।

রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ

সকালের জঙ্গল সবসময়ই এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে রোদের লুকোচুরি খেলা, পাখিদের কলকাকলি, মৃদু বয়ে চলা বাতাস, এইসব উপভোগ করতে করতেই এগিয়ে চললাম পঁচিশ মাইলের দিকে। রাস্তায় বেশ কয়েকটি বার্কিং ডিয়ারের দেখা মিললো। সেগুলো গাড়ির আওয়াজ  শোনামাত্রই, নিমেষের মধ্যে হারিয়ে গেলো অরণ্যের গভীরে। চলার পথেই দেখা মিললো ময়ূর দম্পতির, খাবারের আশায় ঘোরাঘুরি করছে।

এইভাবে চলতে চলতে, এক জায়গায় গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লো। জঙ্গলের এই জায়গাটা বেশ ভালো। আমাদের বামদিকে এক বিশাল ঘাসজমি আর সেখানে ঘাসের উচ্চতা প্রায় পাঁচফুট হবে। সেই জমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু মরে যাওয়া গাছের কঙ্কাল। এই ঘাসজমিটা পুরো ঘেরা, যাতে গজরাজের পদার্পন না ঘটে। দেখলাম কঙ্কালসার এক গাছের মাথায় বসে একটা ঈগল পাখি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নীচের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজে চলেছে।

ময়ূর

আমাদের ডানদিকের পুরো এলাকা ঘন জঙ্গল। এখানে সব গগনভেদী গাছেদের সম্ভার। গাইড বললো – স্যার এইখানেই আমি এর আগে চিতাবাঘ দেখেছি। ওই গাছের ডালে বসে ছিলো।

কৌতূহলী হয়ে সবকটা গাছের ডাল দেখতে লাগলাম।

হঠাৎ গাইড বলে উঠলো – স্যার, ওই দেখুন।

আঙ্গুল দিয়ে আমাদের বামদিকের ঘাসজমির ওপারে একটি ফাঁকা জায়গার দিকে দেখালেন।

ঈগল

আমিও মনোযোগ সহকারে দেখতে গিয়ে দেখলাম, এক প্রকান্ড কালো রঙের প্রাণী। পেশীবহুল ওই প্রাণীর শরীর, মাথার জায়গাটায় একটু সোনালী লোম এবং হালকা নীলচে বাদামী রঙের ধারালো উদ্ধত শিং জোড়া। এটিকেই বলা হয় গাউর। ডুয়ার্সের অধিকাংশ জঙ্গলেই দলবেঁধে ঘোরাঘুরি করে এরা। তবে গাউরকে দেখতে গেলে, যে পাখিটির সাহায্য দরকার সেটি হলো বক। আমি প্রথমে একটি বককেই দেখেছিলাম কালো রঙের একটি পাথরে বসে থাকতে। পরে পাথরটি নড়ে উঠতেই আমার ভুল ভাঙলো। বাইনোকুলার যে কি কাজের জিনিস, তা এবারে ভালোভাবে টের পেলাম। প্রায় একশো মিটার দূরে দাঁড়ানো গাউরকে চোখের সামনে এনে দিলো।

এখান থেকে এগিয়ে চললাম। ঘাসজমির ঘেরা অংশ পেরোতেই দেখতে পেলাম একদল চিতল হরিণ। আমাদের গাড়ির পাশে পাশে ছুটে চলেছে। ক্যামেরা, মানুষ, গাড়ি, এগুলোর কোনটাতেই এরা তেমন বিচলিত হয় না। সবকিছুই এদের কাছে, অদ্ভুত রকমের স্বাভাবিক। এই হরিণের দলে একটি বাচ্চার দিকে আমার নজর গেলো, আমাদের গাড়ির দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রয়েছে। যেন ওদের বাড়িতে এক অদ্ভুত দেখতে প্রাণীর আগমন ঘটেছে। হরিণের বাচ্চাটি আমাদের দেখতে গিয়ে ওর দল থেকে একটু পিছিয়ে পড়েছিল, এরই মধ্যে ওই দলের এক বড়ো হরিণ ওই বাচ্চার দিকে তাকাতেই, বাচ্চাটি ছুট্টে ওই দলে যোগ দিল। হরিণের দল দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পঁচিশ মাইল টাওয়ার।

চিতল হরিণ

 গাড়ি দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে নামলাম। এই জায়গায় জঙ্গল একটু ফাঁকা ফাঁকা। একটি ফরেস্ট বাংলোর মতন বানানো এই টাওয়ারটি। এখানে বসার বেশ ভালো জায়গা রয়েছে। রয়েছে টয়লেট। কিছু লোকজন এখানে থাকে। সেরম একজনকে আমাদের গাইড গিয়ে কি যেন বলতেই, সে মাথা নেড়ে সায় দিলো। বুঝলাম চায়ের অর্ডার হয়েছে।

গাইড – স্যার, এরা তো কোনো দোকান চালায় না। কিন্তু চা বানাতে আপত্তি নেই। খুশি হয়ে যা দেবেন তাই নেবে।

দেখলাম রোগা ভদ্রলোকটি চা বানানোয় মনোনিবেশ করেছেন। গায়ের রং কালো, পরনে একটা সাদা গেঞ্জি আরেকটা ময়লা হয়ে যাওয়া লুঙ্গি। পাশে চলছে আরো খাবারের আয়োজন। হয়তো ব্রেকফাস্টের আয়োজন করছেন। এখানে যারা থাকেন, তারা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিতে সক্ষম। তার মধ্যেও যে আমার আর আমার পরিবারের জন্য চা বানিয়ে দিচ্ছেন এটা অন্তত আমার কাছে এক উপরি পাওয়া। কৌতূহল জাগে এই ভেবে যে এই শ্বাপদ সংকুল অরণ্যে, এরা দীর্ঘদিন কিভাবে জীবন কাটান? এঁদের বাড়ি কোথায়? পরিবারকে ছেড়ে কিভাবে থাকেন এই জনবিহীন অরণ্যে?

এসব ভাবতে ভাবতেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। এটি ফেন্সিং দেয়া একটা দোতলা বাড়ি । দেখলাম দোতলাতে থাকার জায়গা, বসার জায়গা ও টয়লেট রয়েছে। নীচে রান্নার জায়গা এবং একটি খাবার জায়গা রয়েছে। এই খাবার জায়গাতেই আমাদের আগের গাড়ির পরিবার বসে রয়েছে। দোতলার বারান্দা থেকে চিতল হরিণের দলকে দেখা যাচ্ছে, তার সাথে একঝাঁক টিয়া আর ময়ূর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিছু ছবি তুলে আবার নীচে নেমে এলাম। চা রেডি। ভদ্রলোক আমাকে, আমাদের গাইডকে হাসিমুখে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিলেন। খুশি না হয়ে পারা যায়! পকেট থেকে একশো টাকা বার করে দিতে গিয়েও লজ্জা বোধ করলাম। গাইডের হাতে দিয়ে বললাম দিয়ে দিতে। দেখলাম ভদ্রলোক টাকাটা নিয়ে গাইডকে নমস্কার করে আবার রান্নার কাজে মন দিলেন। ভাবলাম, সবাই হয়তো এখানে এসে টাকা হাতে দিয়েই চলে যায়, আমরাও সবাই হতে চাইলাম। খারাপ লাগলো। তাই আমি ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম।

বললাম – কাকু, চা টা খুব ভালো হয়েছিলো।

আমার দেখাদেখি আমার মা ও স্ত্রীও আমার সাথে গলা মেলালো।

ভদ্রলোক বললেন – আপনাদের ভালো লাগসে?

মাথা নাড়লাম আর বললাম – খুউউব।

ভদ্রলোক বললেন – খুশি হইলাম।

আমি আর ওনার নাম জিজ্ঞেস করিনি। এরম নাম না জানা কত মানুষ হয়তো নিজেদের কাজের প্রশংসা পেলে খুশি হন, যে খুশি টাকার মূল্যের ওপর কোনোভাবেই নির্ভর করে না। এই খুশি আসে মানুষের সাথে মানুষের সহমর্মিতা বোধ থেকে, পেশাগত শ্রেণীবিভাগ থেকে নয়।

পঁচিশ মাইল থেকে, গাড়ি এবার আমাদের নিয়ে চললো ছাব্বিশ মাইলের দিকে। প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট গভীর জঙ্গলে চলার পর, দেখতে পেলাম, এক ওয়াচটাওয়ার। এটিকে ছাব্বিশ মাইল বলে। এই টাওয়ারে ফরেস্ট গার্ডরা থাকেন। টাওয়ারের কাছে পৌঁছতে দেখতে পেলাম, এক গার্ড চা হাতে নীচে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে। আমাদের দেখেই স্থানীয় ভাষায় চেঁচিয়ে কি যেন বলে উঠলো। গাইডকে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো, এইখানে কিছুক্ষন আগে একটা হাতির দল এসেছিলো। ওয়াচটাওয়ার এর পশ্চিমদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে গাইড বললো ঐদিকে গেছে। গাড়ি থামতেই, চটজলদি ওয়াচটাওয়ারের তিনতলায় উঠতে লাগলাম। দোতলায় গার্ডরা থাকে। তিনতলায় উঠে চারপাশে দেখতে লাগলাম যদি হাতির দলের দেখা পাওয়া যায়। অনেক দূরে আওয়াজ পাওয়া গেলেও, হাতির দলের দেখা মিলল না। কিছুক্ষন ধরে খুঁজলাম, অপেক্ষা করলাম, তারপর নেমে এলাম।

চিতল হরিণের দল

আমাদের সাফারি এখানেই শেষ হলো। এই সাফারিতে উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণের দেখা না মিললেও, উপভোগ করলাম গহীন অরণ্যের পরিবেশকে। গাড়িতে চেপে বসতেই, গাড়ি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে চললো জয়ন্তীতে। গাইড জানালো, এরপর আমাদের পোখরি লেক যেতে হবে। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রিভারবেডে পড়লাম। এখানে আবার সেই চিতল হরিণের দলকে দেখতে পেলাম। আবার জঙ্গলের রাস্তা ধরে আধঘন্টা যাওয়ার পর পৌঁছে গেলাম জয়ন্তী। সফর এখানে শেষ হলো না। এবার নতুন গাইড পেলাম। বাদলবাবু নিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাজারে। আমাদের বিস্কুট আর মুড়ি কিনে দিলেন। বিস্কুট আমাদের খাওয়ার জন্য, আর বললেন, মুড়ি আপনাদের পোখরি লেকে লাগবে। হোমস্টে তে না ফিরেই, আবার গাড়ি চললো পোখরি লেকের দিকে।

পোখরি লেকের পথে

পোখরি লেক যাওয়ার রাস্তাটি ভারী সুন্দর। রাস্তার দুধারের গাছের সারি প্রথমেই আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। গাইড বললেন , এখানে মোবাইলে ভিডিও তুলতে পারেন , দারুন লাগবে। পকেটে থাকা যন্ত্রটিকে পকেটেই সুখে শান্তিতে থাকতে দিলাম। বরং চোখ রাখলাম দুপাশের জঙ্গলের দিকে।  রহস্যময়ী জঙ্গলে কখন যে কিছুর দেখা মিলবে , কেই বা বলতে পারে। রাস্তার ধারেই একদল ময়ূরকে ছুটে পালিয়ে যেতে দেখলাম। এক দুজন গ্রামবাসীকেও দেখতে পেলাম বোঝাই করা শুকনো কাঠ মাথায় নিয়ে যেতে। গাড়ি যত এগোতে লাগলো , বুঝতে পারলাম আমরা সমতল ভূমি ছেড়ে উপরে উঠছি। জঙ্গল কোথাও ঘন আবার কোথাও কৃশ। মিনিট কুড়ি চলার পরে এক জায়গায় একটু সমতল ভূমি দেখা গেলো। গাড়ি এইজায়গায় এসে দাঁড়ালো। দেখলাম, একদিকে পাহাড় বেয়ে রাস্তা ওপরের দিকে উঠে গিয়েছে আর অন্যদিকে পাহাড়ের ঢাল নীচে  নেমে গিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে এবার আমাদের উপরে উঠতে হবে।

” কতটা পথ ?” – জিজ্ঞেস করলাম।

গাইড হেসে জানালো – ওই ধরুন আটশো মিটার মতো । তবে চাপ নেবেন না , সময় আছে, ধীরে সুস্থে, চলুন ।

সহধর্মিণীকে সাহস জুগিয়ে বললাম – চলোই না। দেখা যাক পারি কিনা ।

এতক্ষনে গাইড ভদ্রলোক দুটো গাছের ডাল ভেঙে এনে আমাদের দিয়েছেন। এই লাঠিগুলোতে ভর দিয়ে উঠতে হবে। মা আর আমার ছেলেকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে আমরা দুজন গাইডের পেছন পেছন পাহাড়ে ওঠার পথ ধরলাম।

এতক্ষন গাইডের নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি। নাম জিজ্ঞেস করাতে  উনি বললেন – শুভঙ্কর, শুভঙ্কর দত্ত । গায়ের রং শ্যামবর্ণ , বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। ছিপছিপে গড়ন , পরনে বক্সার গাইডদের মতো ফরেস্ট গ্রিন জামা এবং কালো প্যান্ট। পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছিলেন।

জিজ্ঞেস করলাম – উপরে দেখার কি আছে , বলুন তো ? যার জন্যে আমরা মুড়ি নিয়ে যাচ্ছি  ?

মুচকি হেসে শুভঙ্কর উত্তর দিলো  – উপরে এক দেবীমন্দির আছে , তার পাশেই রয়েছে একটা ছোট্ট জলাশয়। মুড়ি কেন নিয়ে যাচ্ছেন , সেটা উপরে গেলেই দেখতে পাবেন।

পোখরি লেক

কিছুটা করে উঠছি , আরেকটু রেস্ট নিচ্ছি। আমরা দুজনেই শুভঙ্করের কথা মন দিয়ে শুনছি। শুভঙ্কর আমাদের এই এলাকা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে চলেছে। কিছুটা ওঠার পর , শুভঙ্কর বললো –  স্যার এই দেখুন !

দেখলাম এক বিশাল গাছ মাঝখান থেকে ফাঁপা হয়ে রয়েছে। মরে যাওয়া গাছটির অবশিষ্ট উচ্চতা প্রায় দশ ফুট হবে । অবশিষ্ট এই কান্ডটি ফাঁপা হয়ে একটা অর্ধচন্দ্র আকার ধারণ করেছে। শুভঙ্করের কথায় গাছটিতে প্রবল বজ্রাঘাত হওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে। এই অবস্থাতেও গাছটির সৌন্দর্য্য দেখে, মোহিত না হয়ে পারলাম না। মরে  গিয়েও যারা এতো সুন্দর আকার ধারণ করতে পারে , তারা বেঁচে থাকলে কত সুন্দর আকার ধারণ করতে পারে , এটা কোনো প্রকৃত বৃক্ষপ্রেমীর থেকে জেনে নেয়া উচিত। প্রকৃতিই এখানে সৃষ্টি এবং সংহারকর্তা , দুটি ভূমিকাই পালন করেছে।

কিছুটা এগোতেই একটা মরে যাওয়া গাছের কাণ্ডতে চোখ পড়লো। একফুট উচ্চতার এই অবশিষ্ট কাণ্ডটাকে নিজের আঁকার ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেছে এক ধরণের পোকা। অসংখ্য বক্ররেখা এঁকে দিয়ে , গাছটার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে। প্রত্যেকটি বক্ররেখার মধ্যে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য রয়েছে , দেখলে মনে হয় যেন অসামান্য হাতের বুটিকের কাজ। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোন বের করে ছবি তুলে নিলাম। শুভঙ্করকে ধন্যবাদ জানালাম , এতো সুন্দর প্রাকৃতিক কাজ, ও না থাকলে চাক্ষুস করতে পারতাম না।

উপরে উঠতে উঠতে একটি গাছের গুঁড়ির  পাশে আমার স্ত্রীকে দাঁড়াতে দেখে , আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিছুটা এগিয়ে গিয়েও শুভঙ্করও দাঁড়িয়ে পড়লো।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মৌমিতা বললো – একটু দাঁড়াও , হাঁপিয়ে উঠেছি।

কি হলো স্যার ? – জিজ্ঞেস করলো শুভঙ্কর ।

আমি – ওই একটু জিরিয়ে নিচ্ছি আর কি ! 

ঠিক আছে , আর খানিকটা পথই বাকি – শুভঙ্কর বললো।

এতক্ষণে একটা জিনিস অনুভব করলাম। আমাদের আগেও কিছুজনকে আমরা যেতে দেখেছি , তবুও এই জঙ্গলে তাঁদের কোনো আওয়াজ শুনতে পেলাম না। যেন আমরাই কথা বলছি মনে হচ্ছে। সমস্ত কোলাহলকে যেন নীরবে গিলে ফেলেছে এই অরণ্য। উঁচু গাছগুলোকে দেখে বলতে ইচ্ছে হলো , তোমরা কে ? মানুষের সৃষ্টি করা সমস্ত ধরণের দূষণকে কিভাবে ধ্বংস করো তোমরা ? সে মানুষেরা যখন উন্নয়নের মোড়কে তোমাকেও কেটে ফেলে , তাও কি করে নীরবে তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও ? কেন শুষে নাও এ দূষণ ? তোমার মধ্যে কি প্রতিহিংসা জন্মায় না ? মাঝে মাঝে মনে হয় তোমরাই দেবতা। তোমরাই ধরে রেখেছো এই পৃথিবীকে। আমরা মূর্খ , তাই  দেবতাকে মন্দিরে খুঁজি , যেখানে এ জগতের স্রষ্টা তোমাদের পাঠিয়েছেন আমাদের পালনকর্তা হিসেবে।

প্রকৃতির ক্যানভাসে

এবার চলুন স্যার , নয়তো দেরি হয়ে যাবে  – শুভঙ্করের কথায় , ইহজগতে ফিরে এলাম।

স্ত্রীকে বললাম –  চলো , আরেকটু পথ বাকি।

আর পঞ্চাশ মিটার উপরে উঠতে হলো , তারপর আবার একশো মিটার মতো নিচে নেমে পৌঁছে গেলাম পোখরি লেক।  পাহাড়ের ঢালে অদ্ভুত ভাবে তৈরী এই জলাশয়। দেখলাম আমাদের আগে যাঁরা  এসেছিলেন, তারা ফিরে যেতে লাগলেন। লেকের একধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে জলাশয় টিকে দেখতে লাগলাম , মনে হলো একরাশ রহস্য যেন এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে।

মুড়ির প্যাকেটটা খুলুন এবার  – শুভঙ্কর বলে উঠলো।

আমার স্ত্রী মুড়ির প্যাকেট খুলে নিলো , শুভঙ্করের কথামতো সেই মুড়ি, যেইনা জলাশয়ের দিকে ছড়িয়ে দিলো , সেই মুহূর্তে ওই শান্ত জলাশয়ে এক বিশাল আলোড়নের সৃষ্টি হলো। দেখলাম শয়ে শয়ে কানমাগুরের দল হাঁ করে মুড়ি খেতে আসছে। গোলাপী রঙের সেই হাঁ মুখ নিয়ে,একে  অন্যের ঘাড়ে অবধি উঠে পড়ছে। এইভাবেই পুরো মুড়ির প্যাকেট খালি করা হলো। জলাশয়ের পাড় ঘেঁষে একটা বড় কাঠ পড়ে  ছিল। সেই কাঠে দেখলাম দুটি কচ্ছপ আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমাদের ছেটানো মুড়ির কিছু অংশ তাদের কাছেও পৌঁছেছিল। অবাক হলাম কচ্ছপগুলিকেও মুড়ি খেতে দেখে।

মাগুরের দল

এই জল থেকে কেউ মাছ ধরে খেলে , তার নির্ঘাত মৃত্যু ঘটে  – সাবধানবাণীর মতো করে শুভঙ্কর বলে উঠলো। এরম প্রশ্ন আসতে পারে জেনেই হয়তো বললো।

এখানে একটা পুজো হয় বলছিলেন , সেটা কোথায় ?  – আমি জিজ্ঞেস করলাম। শুভঙ্কর হাতের ইশারায় দেখালো – ঐদিকে।

আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম এক ভীষণদর্শনা দেবী মূর্তি। দেবীর গায়ের রং নীল। বাঘের ছালের আসনে উপবিষ্ট তিনি এবং তাঁকে  বহন করছে এক হরিণ। এরম ঘন অরণ্যে এরম দেবীমূর্তি থাকার একটাই কারণ হতে পারে , এ দেবী নির্ঘাত বনদেবী। এই বিপুল অরণ্যে বসবাসকারী সমস্ত পশু, পাখি , পোকা মাকড় এবং তরুকূলের দেবী উনিই।

বনদেবী

ফেরার পথ ধরলাম। আগে আগে শুভঙ্কর , তারপরে আমি আর আমার ছায়াসঙ্গী হিসেবে আমার স্ত্রী মৌমিতা।

যাই বলুন , আপনারা স্বর্গের খুব কাছেই থাকেন। আপনারা সৌভাগ্যবান। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আছেন – শুভঙ্করের উদ্দেশ্যে বললাম।

সবই মানলাম স্যার। তবে এখানে থাকার অন্যরকম সংগ্রাম আছে – শুভঙ্কর উত্তরে বললো।

কিরকম – আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

এখানে আমাদের রোজগার সংক্রান্ত বিস্তর সমস্যা আছে। কেউ আমরা স্থায়ী চাকরি করি না , আপনাদের মতো। ট্যুরিস্ট এলে তবে কিছু রোজগার হয় , তাও আপনি ভালোই জানেন যে এর মধ্যেও রোটেশন হয়। তাতে করে কতই  বা রোজগার হয় ! – শুভঙ্কর বলতে লাগলো।

এছাড়াও জঙ্গলের জানোয়ারদের সাথে থাকার একটা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম। কখনো হাতি আসে , কখনো চিতাবাঘ। দুক্ষেত্রেই আমাদের কিছু না কিছু ক্ষতিই হয়। তবে আমরা এই জীবনের সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আপনারা দুদিনের জন্যে এসেছেন , আপনাদের সবই ভালো লাগবে ” – এবার কিছুটা ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গীতে বলে উঠলো শুভঙ্কর।

তুমি ঠিকই বলেছো। আমরা কজনই বা আর তোমাদের কথা শুনি বা ভাবি ! তবুও তোমার মুখে তোমাদের সংগ্রামের কথা খুবই শুনতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে তোমাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রামের কথা  – আমি উত্তর দিলাম।

এবার শুভঙ্কর বললো – ধন্যবাদ স্যার। অন্তত এইটুকু সহমর্মিতা দেখানোর জন্যে। জানেন স্যার , শুনছি এই জঙ্গল , এই এলাকা সরকারের , মানে বন  দফতরের অধীনে চলে যাবে। পরের বার এলে আর এইভাবে ঘোরাতে পারবো কিনা জানি না।

সেকি, কেন ? – আমি চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

এটাতো বক্সা টাইগার রিজার্ভ , অথচ টাইগার নেই। টাইগার রিজার্ভ দেখাতে পারলে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড পায় বন দফতর। শুনছি এই এলাকা খালি করা হবে। আমরা যারা এখানে থাকি , তাদের পুনর্বাসন দেয়া হবে। তার বদলে এখানে বাঘ ছাড়া হবে। বাঘের বাসস্থান হিসেবে দেখানো গেলে , অনেকদিন অবধি ফান্ড পেতে থাকবে সরকার। তবে একটা মুশকিল আছে !

কি  ! – এবার আমি আরো উৎসুক হয়ে উঠলাম।

এখানে সেই ডলোমাইট কারখানার আমল থেকে পুরোনো লোকেদের বসবাস। আমাদের আগের পুরুষদের জন্ম, বিয়ে, সব এইখানেই। আমরাও এই জয়ন্তী স্কুলেই পড়েছি। আমরা এই পুরোনো ভিটে ছাড়বো কেন বলতে পারেন ? এখানে আগে আমরা ছিলাম , বন দফতর পরে এসেছে। ১৯৮৬ সালেরও  পরে এই এলাকা ন্যাশনাল পার্ক হয়েছে।  – এই বলে শুভঙ্কর একটু থামলো। আঙুলের ইশারায় কি যেন দেখাতে লাগলো।

আমি খেয়াল করে দেখলাম , পাহাড়ের এক অসামান্য দৃশ্য। এক পাহাড় থেকে দাঁড়িয়ে অন্যদিকের পাহাড় আর তার মাঝে জয়ন্তী নদীর অবর্ণনীয় রূপ। এককথায় অসাধারণ দৃশ্য। লক্ষ্য করলাম কথা বলতে বলতে আমরা অনেকটাই গাড়ির কাছে এসে পড়েছি। পিছনে তাকিয়ে স্ত্রী কে জিজ্ঞেস করলাম – এরপর কোথায় যাবে ? ফুন্টশোলিং না বক্সা ফোর্ট ?

এবার শুভঙ্কর বললো – ফুন্টশোলিং যেতে পারেন স্যার। বক্সা ফোর্টে গিয়ে লেপচাখা তে যদি না থাকেন তবে পুরো লস !

তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। গাড়ির কাছে পৌঁছে মাকে বললাম – আমরা ব্রেকফাস্ট করেই রওনা দেবো । 

মা জিজ্ঞেস করলো – কোথায় যাচ্ছি ?

আমি বললাম – ভুটান, আধার কার্ড রেডি রেখো।   

গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো হোমস্টে। যাওয়ার পথে ভাবতে লাগলাম শুভঙ্করের কথা। এ এক এমন পরিস্থিতি যেখানে কারোরই কিছু করার নেই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে যেমন বন্যপ্রাণেরও দরকার, তেমনই এই জঙ্গল এলাকার, আদি বাসিন্দাদের কথাও ভাবা দরকার। এরম যদি ভাবি যে, সরকার বা বন দফতরের আরো কোনো সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিলো , তাহলেও ভুল করা হবে। পুনর্বাসন আর ক্ষতিপূরণ দুটোই সরকারের থেকে আসছে। প্রকৃতির কাছেই প্রার্থনা করা উচিত, যাতে সবাই ন্যায় বিচার পায়। 

হোমস্টে তে পৌঁছে দেখি , স্বপনবাবু রেডি হয়ে গাড়ি নিয়ে হাজির।

বললাম – দেরি হয়ে গেছে অনেক, একটু ওয়েট করতে হবে। আমরা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসছি।

স্বপনবাবু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হেসে, ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। আমাদের ব্রেকফাস্ট করে রেডি হতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগলো। বয়স্ক মানুষটি দাঁড়িয়ে রয়েছেন ভেবে খারাপ লাগছিলো। ঘড়িতে তখন সোয়া দশটা মতো বাজে। আমরা গাড়ি চেপে রওনা হলাম জয়গাঁও বর্ডার।

এবার স্বপনবাবু গাইড আর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে করতে আমাদের নিয়ে চললেন জয়গাঁও। আমার কৌতূহলী মনকে, বক্সার ভৌগোলিক তথ্য দিয়ে, প্রশমিত করতে লাগলেন। আমরা প্রথমে রাজাভাতখাওয়া এসে সেখান থেকে আরেকটি পথ দিয়ে সোজা চললাম হাসিমারার দিকে। স্বপনবাবুও দেখাতে লাগলেন রাস্তার দুধারের সবুজ চা বাগান , মাঝে মাঝে রাস্তার ওপরের ব্রীজ , ট্রেনলাইন এবং আলিপুরদুয়ার জেলার প্রকৃতি। ভুটানের নম্বর প্লেট দেখে কিভাবে চিনবো , এসব সবই বললেন।

কথায় কথায় জানা গেলো, স্বপনবাবু হেভি ভেহিকল চালাতেন। দীর্ঘদিন কলকাতার ডানলপে থেকেছেন। বড় বড় ট্রাকে ভর্তি মাল নিয়ে খিদিরপুর , বেহালা চত্বরে যাতায়াতও করেছেন। তার পরিবার, বরাবরই জয়ন্তীর বাসিন্দা। তাঁর দুটি সন্তান। এক ছেলে এবং আরেক মেয়ে। মেয়ের অলরেডি বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন এক আর্মি অফিসারের সাথে। সে এখন অরুণাচলে তার স্বামীর সাথে থাকে। স্বপনবাবুর ছেলে বক্সার ফরেস্ট গাইড। ছেলেরও বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে তার স্ত্রী , ছেলে আর ছেলের বৌ নিয়ে থাকেন।

আলিপুরদুয়ারের শেষ মাথায় যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সাড়ে এগারোটার মতো বাজে। দেড় ঘন্টার কাছাকাছি লাগলো এই চল্লিশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আসতে। স্বপনবাবু গাড়ি পার্ক করে দেখালেন ভুটান ইমিগ্রেশন অফিস। অফিস লাগোয়া বিশাল বড় পাঁচিল। পাঁচিলের ঐপারে ভুটানের ফুন্টশোলিং শহর। আধার কার্ড দেখিয়ে প্রবেশ করতে হয় ভুটানে । ফুন্টশোলিং এ ঘোরার জন্য প্রচুর গাইড ট্যাক্সি নিয়ে, এপার আর ওপারে দাঁড়িয়েই রয়েছে। যেখান থেকে খুশি , টাকা পয়সার দরদাম করে বেছে নেওয়া যায়। আমরা এপারেই এক গাইডের সাথে কথা বলে নিলাম , ঠিক হলো সেই ১৩০০ টাকা নিয়ে ফুন্টশোলিং এর ৪টে জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে। 

ভুটানে প্রবেশ করতে গেলে আধার কার্ড লাগে। দিনের দিনেই ফেরত আসলে , কোনো চার্জেস লাগে না। আমরা ভুটানে প্রবেশ করার পরে ঘড়িতে দেখলাম প্রায় ১২ টা বাজে। শুরু হলো আমাদের ফুন্টশোলিংএ ঝটিকা সফর। আমাছু ব্রিজ দিয়ে শুরু করে আরো তিনটে মনাস্ট্রি আর বুদ্ধ গুম্ফা দেখে নিলাম। ফুন্টশলিং ও এখন ধীরে ধীরে নগরায়নের কবলে। তৈরী হচ্ছে কংক্রিটের জঙ্গল। সব জায়গা ঘুরে, আমরা ভুটানের প্রবেশ দ্বারের কাছে নেমে গেলাম। এক ভুটানি রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া সেরে জয়গাঁওতে ফিরে এলাম প্রায় চারটের দিকে। স্বপনবাবুকে ফোন করতেই উনি চলে এলেন, তারপর সবাই মিলে রওনা দিলাম জয়ন্তীর দিকে।

কথায় আছে জঙ্গলে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে নামে। দেখতে পেলাম। সূর্য যেন তাড়াতড়ি ঢলে যেতে লাগলো। বর্ডার এর কাছের এলাকা বেশ জমজমাট হলেও , যত এগোতে লাগলাম , কমতে লাগলো জনবসতি। আমরা, আবার সেই চা বাগানের শোভা দেখতে দেখতে হাসিমারা পৌঁছে গেলাম। স্বপনবাবু গাড়ি থামালেন। বললেন – জলদাপাড়া যেতে হলে হাসিমারা দিয়ে যেতে হয়।

দেখলাম স্বপনবাবু গাড়ি থেকে নেমে এক পাঁঠার মাংসের দোকানে ঢুকলেন। হঠাৎ মনে পড়লো , আজ রবিবার। বাঙালির এক চিরকালীন আচার এর মধ্যে পড়ে এই রবিবারে মাংস খাওয়া। সেটা আরো জমে যায় যখন দুপুরের দিকে হয়। আজ আমাদের জন্যে স্বপনবাবু বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ করতে পারেননি। নৈশভোজ টা অন্ততঃ ভালো ভাবে হোক। ভাবলাম , আমরা ঘুরতে কেন যাই ? কোথাও ঘুরতে গেলে আমরা যা খরচ করি, সেই খরচে আরো কয়েকটা পরিবারের স্বচ্ছন্দে কয়েকটা দিন চলে। যদিও বেশি বুঝি না, তবে মনে হয় এইভাবেই ইকোনোমি চলে। আমাদের কেউ টাকা দ্যায়, আমরা অন্য কাউকে সেই টাকা দিই। এইভাবেই চলতে থাকে অর্থনীতি। ঠিক যেমনটা চলে জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রে। আর এভাবেই পরিবেশ নিজের ভারসাম্য বজায় রাখে। বক্সার জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। এই জঙ্গল যেন ধীরে ধীরে আমার মধ্যে এক অদ্ভুত প্রভাব বিস্তার করেছে। এক একটা দিন কাটাচ্ছি , আর এই অরণ্যের স্থিরতা ধীরে ধীরে আমার মধ্যেও প্রবেশ করছে।

গাড়ি থামলো। স্বপনবাবুর ডাকে ভাবজগৎ থেকে ফিরে এলাম। দেখলাম পৌঁছে গেছি হোমস্টে। হঠাৎ টকটক করে এক তীব্র আওয়াজ শুনলাম।

স্বপনবাবু হেসে বললেন – ওটা তক্ষকের আওয়াজ। টিকটিকির মতো, কিন্তু বিকট দেখতে। এখানে অনেক পাওয়া যায়।

আমার মাও বলে উঠলেন – হ্যাঁ, আমি দেখেছি এর আগে।

এবার স্বপনবাবু ফিসফিস করে বললেন – কিছু মানুষ এগুলো ধরে পাচার করে। সুদূর চীনে এর চাহিদা আছে। এই পাচারের ব্যবসা করে সেই লোকেরা লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিয়েছে।

পরের পর্ব – অনন্তকথা