অনন্তগিরি হিলসে রোমাঞ্চকর ট্রেকিং

“অনন্তগিরি” এই নাম শুনলেই মাথায় আসে আরাকু ভ্যালি বেড়াতে গিয়ে সেই কফি প্ল্যান্টেশন দেখার কথা। আমার মতো আপনারা যারা ঘুরতে ভালোবাসেন তাদের কাছে এই নাম আরাকু ভ্রমণের সাথেই জড়িত। প্রথমবার যখন শুনলাম হায়দরাবাদের কাছে অনন্তগিরি হিলস, অবাক হলাম, ভূগোলের জ্ঞানে ভাটা পড়লো। ইন্টারনেটের দৌলতে জানতে পারলাম অনন্তগিরি হিলসের ব্যাপারে।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনন্তগিরি হিলস এ জঙ্গল ভিউ

হায়দরাবাদ শহর থেকে প্রায় ৮০ কিমি দূরে অবস্থিত এই অনন্তগিরি হিলস। অনন্তগিরি হিলসের নিকটবর্তী টাউন ভিকরাবাদ। হায়দরাবাদ শহরে জলের সমস্যা আছে সেটা অনেকেরই জানা। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি যে হায়দরাবাদ শহরের জলের দুটি প্রধান রিসার্ভার ওসমান সাগর এবং হিমায়েত সাগর। এই দুটি লেকের এর জলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্স এই অনন্তগিরি হিলস। অনন্তগিরি হিলস থেকেই উৎপত্তি হয়েছে হায়দরাবাদ শহরের বিখ্যাত নদী মুসি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনন্তগিরি হিলসের উচ্চতা আনুমানিক ৫১০ মিটারের মতো।

শ্বশুরবাড়ি থাকার সুবাদে হায়দরাবাদ শহরে আমার যাতায়াত রয়েছে। থাকার বা খাবার জায়গা নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই। গত বছরে যখন গিয়েছিলাম, তখন পরিবারের সবাই মিলে অনন্তগিরি যাওয়ার প্ল্যান হলো। তখনই অনন্তগিরির ব্যাপারে আরেকটা জিনিস জানতে পারলাম। এই হিলটির প্রায় সিংহভাগ এলাকায় রয়েছে বনাঞ্চল। 

অনন্তগিরি জঙ্গলের মধ্যে

জঙ্গল শুনেই এডভেঞ্চার করার ইচ্ছে জাগলো। সেইমতো একদিন সক্কাল সক্কাল সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম অনন্তগিরি।  পথে ব্রেকফাস্ট করতে দাঁড়িয়েছিলাম। দক্ষিণ ভারতের সেই বরা, সাম্ভার আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট করে পৌঁছতে আমাদের প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছিল। হিল এলাকায় প্রবেশ করার সময় সাইনবোর্ড ফলো করে জানতে পারলাম এই জঙ্গলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, হরিণ, শেয়াল এইগুলি দেখতে পাওয়া যায়। 

দেবাদিদেব মহাদেব

গাড়ির পার্কিং এরিয়া হিলস থেকে একটু দূরে। তবে গাড়ি থেকে নামতেই অবস্থা খারাপ হওয়ার জোগাড়। ডিসেম্বর মাসেও কাঠফাটা গরম। অগত্যা টুপি পড়তে হলো। জ্যাকেট ও খুলে গাড়িতে রেখে এগোতে লাগলাম। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে হেঁটে চলে একটু কঠিন। একটু এগোতে দেখতে পেলাম হিলের ওপরে একটা ওয়াচ টাওয়ার। লক্ষ্যস্থির করা গেলো। কিন্তু যাওয়ার রাস্তা পাহাড়ে ওঠার মতো আঁকা বাঁকা, চড়াই উতরাই। দেখতে পেলাম অনেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের গ্রুপ, কিছু পরিবারও ওই রাস্তায় ট্রেক করে চলেছে টাওয়ার এর দিকে। সাহস পেয়ে আমিও এগিয়ে চললাম। আমার এই ট্রেকিং এর সাথী হিসেবে পেলাম ছোট্ট তিতলিকে। তিতলি আমার স্ত্রীর ভাইঝি।

প্রথমে চড়াই রাস্তায় হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে হাঁপাতে লাগলাম। পাহাড়ের চড়াই আরো বাড়তে লাগলো। জঙ্গল আরো ঘন হতে লাগলো। তার ওপর আমার সাথে তিতলি। এইসব ক্ষেত্রে অন্যের দায়িত্ব নেয়াও একটু ঝুঁকিপূর্ণ। হয়তো টাওয়ারে ওঠার আগেই থেমে যেতে হতে পারে। কিন্তু তা হলো না। এগিয়ে যেতে যেতে পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারের সামনে। মন জয় করলো তিতলির এডভেঞ্চার করার ইচ্ছে এবং সর্বোপরি তাতে টিকে থাকা। পুরো ট্রেকিং এর সেই অভিজ্ঞতা নিচের ভিডিও লিংকে উপভোগ করতে পারবেন।

ওয়াচ টাওয়ারে উঠতে প্রবেশ মূল্য দিতে হয় ১০ টাকা। সেইমতো টিকিট নিয়ে উঠলাম টাওয়ারে।এরই মাঝে তিতলির অভিভাবকরা আমায় ফোন করে ফেলেছেন। কোথায় কি করছে সমস্ত তাদের জানিয়েছি। সব কিছুর পরে টাওয়ারের টপ ফ্লোরে উঠলাম। নীল আকাশের নীচে অনন্তগিরির পাহাড়ের ভিউ অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। পুরো জঙ্গল এলাকার ভিউ দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। এতটা সবুজ তো দৈনন্দিন জীবনে দেখতে পাওয়া মুশকিল। টাওয়ারে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে, অনেক ছবি তুলে নীচে নেমে এলাম।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনন্তগিরি হিল ভিউ

পাহাড়ের চড়াই রাস্তায় ওঠা যতটা সোজা, ওই রাস্তায় নেমে আসা ততটাই কঠিন। পা হড়কে গেলেই দুর্ঘটনা। তার ওপর রয়েছে বাঁদরের উৎপাত। ক্যামেরা নিয়ে থাকলে একটু ভয় তো লাগবেই। সবকিছু পেরিয়ে সাবধানে তিতলিকে নিয়ে নীচে নেমে এলাম। গাড়ি পার্কিং এলাকার পাশে একটা শিবমন্দির রয়েছে। মন্দিরের পাশে রয়েছে একটা প্রকান্ড নন্দী মূর্তি। কিছু ছবি তুললাম, আর কিছু স্থানীয় ছেলের অনুরোধে তাদের ছবি তুলেও দিলাম। গোটা ট্রেকিং রুটে দেখা মিললো পেট সাদা ফিঙে, বনমুরগি আর অরেঞ্জ বা রেড ব্রেস্টেড ফ্লাই ক্যাচারের। ইচ্ছে ছিল ইন্ডিয়ান রোলার দেখার। ইন্ডিয়ান রোলার তেলেঙ্গানার স্টেট বার্ড। কিন্তু দেখা পেলাম না। এরপর রওনা হলাম অনন্তগিরির আরেক আকর্ষণ পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের দিকে।

নন্দী মূর্তি

অনন্তগিরি হিলসের এক প্রাচীন মন্দির পদ্মনাভ স্বামী মন্দির। জনমত অনুযায়ী এই মন্দির দ্বাপর যুগে নির্মাণ করেছিলেন ঋষি মার্কন্ড। মন্দিরের গঠনশৈলী চিরাচরিত দাক্ষিণাত্য রীতি মেনে তৈরী।

পদ্মনাভ স্বামী মন্দির

যখন মন্দিরে পৌছেছিলাম তখন প্রায় একটা বাজে। ভয় ছিল বন্ধ না হয়ে যায়। ভাগ্য ভালো ছিলো বলে ভগবানের দর্শন পেয়ে গেলাম। এক স্থানীয় লোকের কাছে শুনলাম মন্দিরের পেছনে যে জঙ্গল এলাকা রয়েছে, সেইখানে প্রচুর পাখির দেখা মেলে। কিন্তু সেই এলাকায় ফেন্সিং পেরিয়ে যেতে হবে এবং প্রচুর গরম ছিল বলে আর গেলাম না। এসব ক্ষেত্রে সকাল সকাল এলে ভালো হয়। বাচ্চারা সঙ্গে ছিল বলে লাঞ্চ করার তোড়জোড় শুরু করতে হলো। সেইমতো পৌঁছলাম হরিথা রিসোর্টে। সেইখানের রেস্তোরাঁয় লাঞ্চের অর্ডার দেয়া হলো। অনেক সকালে উঠতে হয়েছিল বলে সবাই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই লাঞ্চ সেরে ফিরে চললাম।

কিভাবে যাবেন: হাওড়া স্টেশন থেকে ফলকনামা এক্সপ্রেস যাচ্ছে সেকেন্দ্রাবাদ। সকাল সাড়ে আটটায় ছেড়ে পৌঁছচ্ছে পরদিন সকাল সাড়ে দশটায়। হায়দরাবাদ থেকে গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন অনন্তগিরি। আমরা ইনোভা বুক করে গিয়েছিলাম, খরচ হয়েছিল ৬৫০০ টাকা।

হরিথা রিসোর্টের রেস্তোরাঁ

কোথায় থাকবেন: হায়দরাবাদ ভ্রমণে এলে থাকার জায়গার অভাব হবে না। গোআইবিবো থেকে পেয়ে যেতে পারেন প্রচুর হোটেলের সন্ধান। তবে সবথেকে ভালো তেলেঙ্গানা সরকারের হরিথা হোটেল। প্রতিটি জায়গাতেই হরিথা হোটেল রয়েছে। টাকা এবং ফেসিলিটিস এর দিক থেকে এটি ভালো অপশন। নীচের লিংক থেকে বুকিং করতে পারেন।

https://tourism.telangana.gov.in/hotels/AnathagiriHillsResort

অনন্তগিরি তে থাকতে হলে হরিথা রিসোর্ট বুক করতে পারেন।

https://tourism.telangana.gov.in/hotels/ThePlazaHotel