চকদিঘী বর্ধমান জেলার জামালপুর ব্লকের অন্তর্গত একটি গ্রাম। হ্যাঁ জায়গাটিকে গ্রামই বলা চলে। কিন্তু এই গ্রামের এক ঐতিহাসিক দিক আছে যা প্রচারের আলো থেকে কিছুটা হলেও দূরে। এই গ্রামে প্রায় ৩০০ বছর পুরোনো এক জমিদারির নিদর্শন হিসেবে একটি এস্টেট রয়েছে। বাংলায় জমিদারি প্রথা অবলুপ্ত হয়ে গেলেও , এই এস্টেট গুলো দেখতে পেলে ইতিহাসের সম্মুখীন হওয়া যায়। আমিও সেরকমই একটা শখ পালন করি। প্রায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি পুরোনো ইতিহাসের খোঁজে। কখনও মন্দির , কখনো স্থাপত্য, এই সোনার বাংলা আমাকে কোনোদিন হতাশ করেনি।

এরোমি একদিন প্ল্যান করে বেরিয়ে পড়লাম চকদিঘি রাজবাড়ির পুজো দেখতে। হুগলি জেলায় ধনিয়াখালী বলে একটি জনপ্রিয় জায়গা রয়েছে , সেই ধনিয়াখালী রোড ধরে যে রাস্তা সোজা মেমারির দিকে গেছে সেদিক দিয়েই গাড়ি নিয়ে পৌঁছলাম চকদিঘি। চকদিঘির এই সিংহ রায় এস্টেট চিনতে খুব অসুবিধা হয়নি।

এস্টেটের গেট দিয়ে ১০০ মিটার মতো গেলেই পরে এই জমিদারবাড়ির বিশাল বৈঠকখানা। বৈঠকখানার সামনেই তুলসীমঞ্চ। কয়েকটি ছবি তুলতেই দেখা হলো এই এস্টেটের ম্যানেজারের সাথে। ওনার থেকে জানতে পারলাম এই জমিদার বাড়ির পুরোনো ইতিহাসের কথা।

অষ্টাদশ শতকে জমিদার ললিত মোহন সিংহ রায় এই এস্টেট বানিয়েছিলেন। কিন্তু এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নাল সিংহ। নাল সিংহের প্রপৌত্র এবং ললিত মোহনের পুত্র শ্রীসারদা প্রসাদ সিংহ রায়ের আমলেই এই জমিদারি সমৃদ্ধি লাভ করে।

বয়সে ১৪ বছরের ছোট এই সারদা প্রসাদের সঙ্গে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের সখ্যতা ছিল। ঈশ্বর চন্দ্র প্রায়ই চকদিঘিতে আসতেন বলে , সারদা প্রসাদ এই এস্টেটে তার জন্য ঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। পুকুরের পারে এই ঘরের নাম জল মহল ছিল। সংস্কারের অভাবে এই ঘরের অবস্থা ভগ্নপ্রায়।

এই পরিবারের অনেক কচিকাঁচার বিদ্যাসাগরের থেকে শিক্ষাগ্রহন করার সৌভাগ্য মেলে। সিংহ রায় পরিবারের সম্ভবতঃ সপ্তম প্রজন্মের সদস্য শ্রীঅম্বরিশ সিংহ রায় এখন কলকাতা নিবাসী। স্থানীয় কর্মচারীরা এই এস্টেটের রক্ষণাবেক্ষন করেন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনাদের জানিয়ে রাখি যে স্বনামধন্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় এই এস্টেটে এসেছিলেন একটি বাংলা ছবির শুটিং করতে। জানেন কি ছবিটির নাম ? ঘরে বাইরে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সহ অন্নান্য কলাকূশলীরাও এখানে এসেছেন। মনোজ মিত্রের একটি ইন্টারভিউ থেকে জানা যায়, তখন এই বাড়িতে শুধু শুটিং হতো। চকদিঘিতে কোনো থাকার জায়গা ছিল না , তাই বর্ধমানে সবার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রোজ সেখান থেকে গাড়ি করে এসে এই বাড়িতে শুটিং করতে হতো।

সাত পুরুষ ধরে চলে আসা এই পরিবারের দুর্গাপুজোর বয়সও প্রায় ৩০০ হতে চললো। প্রাচীন এই একচালা প্রতিমার দর্শনার্থীর অভাব নেই। অনেকেই আসেন মা দুর্গার দর্শন করতে ও এস্টেটের ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে। তবে খুব কম লোকেরাই খোঁজ নেন এই জমিদারির ইতিহাসের।

কথা বলেছিলাম এ পরিবারের কুলপুরোহিত শ্রী ভোলানাথ চতুর্বেদীর সঙ্গে। তিনি জানান , তাঁরা প্রায় ৭ পুরুষ ধরে এই পরিবারের পুজোর সাথে যুক্ত। এই বছরের দুর্গাপুজো তিনিই করেছেন। বনেদি বাড়ির এই পুজো দেখতে পারাটাই এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

আজ চকদিঘির অদূরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া স্বীকৃত খাজাঞ্চি বাটি (৯৮৩০৬-৯৫৮২৪) রয়েছে , যেখানে থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থাও রয়েছে। ফোন করে খোঁজ নিতে পারেন। শুধু দুর্গাপুজো দেখতে এলে খাজাঞ্চি বাটিতে মধ্যাহ্নভোজ করতে পারেন। থাকার দরকার হবে না। তবে একবার এই জমিদারবাড়ি ঘুরেই আসতে পারেন , পুজোর সময় হলে আরো ভালো লাগবে।
কিভাবে পৌঁছবেন : কলকাতা থেকে গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে চলে আসতে পারেন চকদিঘি। এছাড়া ট্রেনে আস্তে চাইলে আসুন তারকেশ্বর। সেখান থেকে বর্দ্ধমানগামী বাসে করে পৌঁছতে পারেন চকদিঘি। জমিদার বাড়ির ম্যাপ লোকেশন দিয়ে রাখলাম , আপনাদের কাজে লাগতে পারে।
https://goo.gl/maps/XNgqLz8V8HpC1h3DA
বলে রাখা ভালো : ভিডিও তোলার অনুমতি নেই , স্টিল ফটো তুলতে পারেন।