বসন্তের পুরুলিয়া – ২য় পর্ব

সকালে উঠে আগে বড়ন্তি পাহাড় আর ড্যাম ভালো করে ঘুরে নিলাম। বলতে পারেন মর্নিং ওয়াক ও হয়ে গেলো আবার সান রাইজ দেখাও হয়ে গেলো। যেখানে থাকলাম সেটিকেই যদি ঠিক করে না দেখি তাহলে তো ঘোরার মানেই থাকে না। এরপর ব্যাগ গোছানো হলো। তারপর লুচি তরকারি দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম গড় সার্কিটের উদ্দেশ্যে। আমাদের প্ল্যান ছিল গড় সার্কিট দেখে আসানসোল স্টেশন এ ফেরা। সেখান থেকে বিকেলের ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেসে বাড়ি। সেইমতো হোটেল চেক আউট করলাম সকাল সাড়ে ৯ টা। ড্রাইভার দাদা বলেইছেন এই গড় সার্কিট দেখতে বেশি সময় লাগবে না।

মুরাডি ড্যাম

শুরুতেই চললাম গড়পঞ্চকোট। সেখানকার পুরোনো গড়ের ধ্বংসাবশেষ ও রাধা কৃষ্ণ মন্দির দেখলাম। পাশের পাঞ্চেত পাহাড়টি এই জায়গাটিকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছে। এখানে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে চললাম পাঞ্চেত ড্যাম এর দিকে। পথে গড়পঞ্চকোটের আশেপাশের জঙ্গল মন কাড়লো , দেখে নিলাম সরকারি রিসোর্ট প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র এবং পাঞ্চেত রেসিডেন্সি।

গড়পঞ্চকোট মন্দির
পাঞ্চেত পাহাড়

পাঞ্চেত ড্যাম এই অঞ্চলের সবথেকে বড়ো ড্যাম। পাঞ্চেত ড্যাম দেখতে দেখতে ফারাক্কা ব্রিজের কথা মনে পড়ছিলো। দুটি জায়গার অনেকটাই মিল আছে কিনা। ড্যামের সৌন্দর্য উপভোগ করার পরে রওনা দিলাম মাইথন ড্যামের দিকে।

পাঞ্চেত ড্যাম

মাইথন ড্যাম ঝাড়খণ্ডে পরে , ফেসবুকে এক লেখা পড়েছিলাম সেখানে একজন মাইথনকে গরিবের গোয়া বলে সম্বোধন করেছিলেন। গোয়ার মতো না হলেও আপনার খারাপ লাগবে না। বিস্তৃত জলরাশির মাঝে মাঝে ছোট ছোট সবুজ পাহাড় , এককথায় বললে দারুন। আমরা এখানে স্পিড বোটে রাইড নিলাম। জনপ্রতি ১০০ টাকা। মোট ১৫ থেকে ২০ মিনিটের রাইড। টিকিট কেটে উঠে পড়লাম। পাহাড়ের চারপাশে বোট ঘুরিয়ে জলরাশির বুক চিরে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। দারুণভাবে উপভোগ করলাম। এবার গড় সার্কিট মোটামুটি শেষ। ফিরতে হবে আসানসোল।

স্পীডবোটে মাইথন

এই সময় ড্রাইভার দা বলে কিনা এন আর সির জন্যে আসানসোলে ঝামেলা হতে পারে তাই তাড়াতাড়ি চলুন। আমরাও এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম পরের গন্তব্য কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের দিকে। মন্দিরের ভীড় দেখে আর পুজো দেব কি , কোনোমতে মাকে প্রণাম জানিয়ে ফেরারপথে নিলাম বিখ্যাত প্যাড়া। স্বাদে এটি অতুলনীয়। কখনো এখানে এলে প্যাড়া অবশ্যই খাবেন আর নিয়ে যাবেন। প্যাড়া এখানে ঘরে বানানো হয়। ৩০০ টাকা কেজি দরে এখানে প্যাড়া বিক্রি হচ্ছে। লাঞ্চ মন্দিরের পাশেই এক নিরামিষ হোটেলে সেরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। সময় হয়ে গেছে বাড়ি ফেরার।মনে মনে পুরুলিয়াকে বিদায় জানালাম। আবার আসার প্রতিশ্রুতিও দিলাম। ওমা জয়চন্ডী পাহাড় , বিহারীনাথ এগুলো বাকি রইলো যে। ফিরে এলাম আসানসোল স্টেশনে। ব্ল্যাক ডায়মন্ড সঠিক সময়ে এসেছিলো বলে রাত সাড়ে ৯টায় বাড়ি।

কিভাবে যাবেন : সকালের ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ছাড়ছে ৬.১৫ মিনিটে হাওড়া থেকে , আসানসোল পৌচচ্ছে সকাল ১০ টায়। এছাড়াও হাওড়া থেকে আরো অনেক ট্রেন যাচ্ছে আসানসোল। আসানসোল থেকে ৩০ কিমি দূরে বড়ন্তি। গাড়ি ভাড়া এখানেই পেয়ে যাবেন। হোটেলে বলা থাকলে আরও ভালো।

কোথায় থাকবেন : আমরা ছিলাম Allure De Baranti তে। হোটেলটি বড়ন্তি লেকের ধারেই। একপাশে পাহাড় ও আরেকপাশে লেক। দৃশ্য অতুলনীয়। ফ্যামিলি রুম , তাঁবু ও ডাবল বেডরুম পেয়ে যাবেন। সর্বোপরি ম্যানেজার মহাশয়ের ব্যবহার খুবই ভালো। নাম সুরজিৎ রায়। চিন্তা করবেন না , এই https://baranti.in/ ওয়েবসাইটে ক্লিক করে সব তথ্য জানতে পারবেন।

বসন্তের পুরুলিয়া – ১ম পর্ব

প্রথম যখন প্ল্যান করছি পুরুলিয়া যাবো পরিবারের সবাই মিলে, কি মনে করে শীতকালটা ছেড়ে ফেব্রূয়ারি মাসে যাবো ঠিক করলাম। সেইমতো টিকিট ও হোটেল বুক করে ফেললাম। বসন্তের পুরুলিয়া যে এক কথায় অনবদ্য সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার বলি কিভাবে ট্যুর টা প্ল্যান করেছিলাম , আপনারাও সেভাবে করলে অনেক কিছুই কম সময়ে দেখে নিতে পারবেন। পুরুলিয়ায় ২ রকমের ভ্রমণ সার্কিট রয়েছে। একটি হলো গড় সার্কিট আর অন্যটা অযোধ্যা সার্কিট। গড় সার্কিট দেখতে গেলে আসানসোল থেকে পুরুলিয়া ঢোকা সুবিধে আবার অযোধ্যা সার্কিট দেখতে গেলে পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ঢুকতে হবে। আমাদের কাছে ২ দিন সময় ছিল আর আমরা দুদিনেই এই ২ সার্কিটের অধিকাংশ জায়গা ঘুরেছি।

অযোধ্যা পাহাড়ে চড়ার সময়

প্রথমদিন আমাদের গন্তব্য ছিল অযোধ্যা সার্কিট। অযোধ্যা সার্কিটে অনেকগুলো ঘোরার জায়গা রয়েছে , তবে যেহেতু আমরা বড়ন্তি থেকে গিয়েছি আমাদের সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টার মতো। দূরত্ব ছিল প্রায় ১৩০ কিমি। সুতরাং এই পথে যদি আসেন বুঝতেই পারছেন অনেক সকালে উঠে বেরিয়ে পড়তে হবে। আমরাও তাই করেছিলাম। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল মার্বেল লেক। পাহাড়ের কোলে এই স্বচ্ছ জলের লেক দেখে আপনি অভিভূত হবেনই। চারপাশের উঁচু পাহাড়গুলি থেকেও অনেকভাবে এই লেকের ছবিও তুলতে পারবেন।

মার্বেল লেক

মার্বেল লেক দেখে আমরা রওনা দিলাম আমাদের পরের গন্তব্য বামনী ফলস। প্রথমেই বলি সিঁড়ি দিয়ে অনেকটাই নিচে নামতে হয় এই ফলস ভালোভাবে দেখতে। আমাদের গ্রূপের বয়স্করা তো নামেনি , আমি নেবেছিলাম। হ্যাঁ এই নিচের ছবি তারই ফল।

বামনী ফলস

বামনী ফলস দেখতেই আমাদের দুপুর দেড়টা বেজে গেলো আর তাই পেট বাবাজিও খাবার কথা বলতে লাগলো। তাই আমরা অযোধ্যা পাহাড় থেকে নেমে আসলাম নিচে। পাহাড়ের ওপর খাবারের দাম অনেক , তাই আমাদের ড্রাইভার দাদাটি আমাদের নিচে নিয়ে এলেন। এই প্রথম খাবারের জন্য অনেকটা নিচে নামতে হলো। যাই হোক রাস্তার ধারের এক হোটেলে মাছ ভাত পরিপাটি করে খেয়ে রওনা দিলাম পরের গন্তব্য চড়িদা গ্রাম। খাবারের হোটেল থেকে চড়িদা গ্রাম যেতে ৫ মিনিট লাগলো। চড়িদার ব্যাপারে কিছু বলার আগে বলি , রাস্তায় কিছু অপূর্ব পলাশের দেখা পেলাম। বসন্ত কালে পুরুলিয়া আসা আমাদের সার্থক হলো। চোখ জুড়োল পলাশের রূপ দেখে , তাই ঝটপট ক্যামেরাবন্দি করলাম।

পলাশ ফুল

চড়িদা গ্রাম বিখ্যাত এর মুখোশ শিল্পের জন্য। এ গ্রামের সব বাড়িতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ। সে রকমারি মুখোশের একটি সংগ্রহশালাও রয়েছে। সেখানে গিয়ে এই শিল্পকে কুর্নিশ জানাতে ইচ্ছে হলো। আমাদের এই বাংলাতে কত কিইনা আছে , কতটাই বা আর আমরা জানি বা দেখেছি। সংগ্রহশালা থেকে বেরিয়ে একটি দোকান থেকে ৩ তে মুখোশ কিনলাম , রইলো পুরুলিয়ার স্মৃতি হিসেবে।

শিল্পীর হাতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ

চড়িদা থেকে পাখি পাহাড় যাওয়া যায় , তবে সময়ের অভাবে আমরা যাইনি। আমরা আবার পাহাড়ের দিকে চললাম। আমাদের পরের গন্তব্য ছিল তুর্গা ড্যাম। তুর্গা ড্যাম এ দেখার সেরম কিছু নেই। ড্যামের জল অনেক নোংরা , একঝলক দেখে নিয়েই চললাম পরের গন্তব্যে। লোয়ার ও আপার ড্যাম।

তুর্গা ড্যাম

লোয়ার ও আপার ড্যাম আমাদের আজকের শেষ দুটি গন্তব্য ছিল। লোয়ার ও আপার ড্যাম বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ড্যামের জল পুরো নীল এবং পরিষ্কার। আপনারা আর যাই দেখুন আর না দেখুন , কখনো অযোধ্যা পাহাড়ে এলে এই দুটি ড্যাম অবশ্যই দেখবেন। এরম নৈসর্গিক দৃশ্য অনেকদিন স্মৃতিতে থেকে যাবে।

লোয়ার ড্যাম
আপার ড্যাম

এই ড্যাম দুটি দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। সন্ধে ৭ টায় পৌঁছে গেলাম। রাতের মটন আর রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম , কাল সকালে উঠে ঘুরতে যেতে হবে তো। আবার কালকেই ফেরার ট্রেন। কালকের ঘোরা পরের পর্বে দেয়া রইলো