গাড়ি তো আপনারা অনেকেই দেখেছেন কিন্তু কখনো কি রকমারি গাড়ি দেখেছেন ? যেমন ধরুন পেন্সিল গাড়ি , রবার গাড়ি কিংবা সুটকেস গাড়ি। না আমি খেলনা গাড়ির কথা বলছি না। আমি এমন গাড়ির কথা বলছি যা রীতিমতো চালানো যায়। এরম গাড়ি চাইলেই যে পাবেন সেরম নয় , গোটা ভারতবর্ষে এরম একজনই লোক আছেন যিনি এই অদ্ভুত শখ রাখেন। কি সেই অদ্ভুত শখ ? রকমারি গাড়ি বানানো।
রোলস রয়েস ১৯১১
প্রথম মারুতি ৮০০
হিন্দুস্তান কার ১৯৪৭
পুরোনো মডেলের এম্ব্যাসেডার
পুরোনো গাড়ির কালেকশন
এই ভদ্রলোকের নাম হলো কে সুধাকর। ইনি থাকেন হায়দ্রাবাদে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই এই ধরণের শখ ছিল তার। ব্যাস বড়ো হয়ে বানিয়ে ফেললেন পৃথিবীর সবথেকে বড়ো “ট্রাইসাইকেল” . আপনি হয়তো ভাবছেন এ আর এমন কি , তাহলে আপনাকে বলি এই “ট্রাইসাইকেল” টির চাকার ব্যাস হলো ১৭ ফুট আর সাইকেলটির দৈর্ঘ্য হলো প্রায় ৩৭ ফুট। এই জিনিস বানানোর পর সে খবর কি আর চেপে রাখা যায় ! গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ওনার নাম উঠলো। যখন উনি এটা পেলেন তখন সালটা হলো ২০০৫।
পেন্সিল শার্পনার গাড়ি
কম্পিউটার গাড়ি
জুতো আর লিপস্টিক গাড়ি
সাইকেল
সুটকেস গাড়ি
রকমারি গাড়ির মেলা
এই ঘটনাটির প্রভাব ওনার আত্মবিশ্বাসে পড়েছিল। ব্যাস তারপর আর উনি পিছনে না তাকিয়ে মাত্র ৫ বছরের মধ্যে বানিয়ে ফেললেন নিজস্ব গাড়ি সংগ্রহশালা। হ্যাঁ ২০১০ থেকে উনি নিজের বানানো এই সংগ্রশালা চালাচ্ছেন , যেখানে দেশ বিদেশের বহু পুরোনো গাড়ির সাথে সাথে তার নিজের ডিজাইন করা গাড়িও আছে। এই গাড়ি গুলি চালানো হয় কোনো দিনবিশেষে , যখন প্রচুর লোক ভীড় জমান শুধু গাড়িগুলো কিভাবে চালানো হচ্ছে তা দেখতে। নাম দিয়েছেন “সুধা কার মিউজিয়াম” . বিশেষ উৎসবের দিনগুলির জন্যে ইনি গাড়ি ডিজাইন করে রেখেছেন যেমন চিলড্রেন্স ডের জন্যে পেন্সিল গাড়ি, এইডস ডের জন্যে কন্ডোম গাড়ি , উইমেন্স ডের জন্যে মহিলা জুতো গাড়ি কিংবা প্রযুক্তি দিবসের জন্যে কম্পিউটার গাড়ি।
ফুটবল গাড়ি
রংবেরঙের স্কুটি
কাপ প্লেট গাড়ি
হেলমেট,কমোড এবং দাবা গাড়ি
ইনি কে সুধাকর
আরো কিছু গাড়ির ছবি
এই গল্পে আমি কী করে এলাম ভাবছেন তো ? ওই যে হায়দ্রাবাদে একটি কাজে গিয়েছিলাম। সেখানে সেখানকার সরকারের পর্যটন ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারলাম অনেক জিনিসের সাথে এটিও একটি দেখার বিষয়। বেশি দূর ছিল না তাই , একদিন পরিকল্পনা করে চললাম গাড়ি দেখতে। যা দেখলাম , তাতে আমার মন জুড়োলো। সত্যি একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে আমাকে এটা স্বীকার করতে হবে যে ইনি অমানুষিক পরিশ্রম করে নিজের ট্যালেন্টকে কাজে লাগিয়ে যা বানিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসা পাবার যোগ্য। এখানে ঢুকতে গেলে ৫০ বা ৬০ টাকার একটি টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। মোবাইল ফোন এরও আলাদা করে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হয়। আমি জায়গাটির গুগল ম্যাপ লিংক দিলাম (নামের ওপর ক্লিক করতে হবে ), কখনও হায়দ্রাবাদ গেলে অবশ্যই দেখে আসবেন এই “সুধা কার মিউজিয়াম”.
আমার মনে আছে সেই ছোটবেলায় বাবা একটা বই কিনে দিয়েছিলো , যেটাতে সব বাংলার মনীষীদের জীবনী লেখা ছিল। সেখানে তাদের জন্ম থেকে শুরু করে তাদের কাজ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখা ছিল। আজ বাবা নেই সেই বইও খুঁজে পাইনি। যেটা পেয়েছি সেটা হলো উইকিপিডিয়া। এখানে সবকিছুরই বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। সেই ছেলেবেলায় আমরা বেশি উপহার পেতাম বইপত্র এবং অনেক লেখকেরই বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি। যদিও বাংলা মাধ্যমে পড়েছি বলে অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখা পাঠ্যক্রমেই ছিল। সেরোমি এক লেখক ছিলেন শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যার লেখা মহেশ থেকে শুরু করে রামের সুমতি অনেক কিছুই আমরা পড়েছি। আমার বাড়ির কাছেই দেবানন্দপুরে শরৎ চন্দ্রের জন্মস্থান। যদিও ওই জীবনী বইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম ,তিনি ভাগলপুরে বড়ো হয়েছেন। জীবনের খুব বেশি সময় দেবানন্দপুরে কাটাননি। তারপর কাজের সূত্রে রেঙ্গুনে চলে যান। কিন্তু জীবনের শেষ ১২ বছর উনি হাওড়া জেলার সামতাবের গ্রামে ওনার বাড়িতে কাটিয়েছেন। সাল ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ অবধি। ওনার এই বাড়িতেই উনি লিখেছেন কিছু যুগান্তকারী লেখা যা নিয়ে পরবর্তী কালে অনেক ছায়াছবিও তৈরী হয়েছে যেমন দেবদাস , রামের সুমতি , দেনা পাওনা , বৈকুন্ঠের উইল , নিষ্কৃতি ও আরো কিছু বিখ্যাত উপন্যাস। এই বাড়ি রাজ্য সরকার থেকে নবীকরণ করা হয়েছে এবং নাম দেওয়া হয়েছে শরৎ চন্দ্র কুঠি।
শরৎ কুঠির সামনে
বহু লোকই ভীড় জমান ছুটির দিনে এই বাড়ি দেখার জন্যে। আমিও এই সুযোগ ছাড়তে পারিনি , সাখ্যাৎ ইতিহাস দর্শন করা কি ছাড়া যায়। আমার বাড়ি থেকে এই জায়গা ৫০ বা ৬০ কিলোমিটার হবে , তাই একদিনেই ঘুরে আসা যায়। যদি আপনি কলকাতা এবং তার পার্শবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা না হন , তাহলে অবশ্যই আমার পথনির্দেশ টা দেখে নেবেন। নিচে দেয়া আছে।
সেই পেয়ারা গাছ
ওনার ব্যবহৃত হুঁকো
কোট টাঙাবার হ্যাঙ্গার
লেখকের লেখার টেবিল
দম দেওয়া ঘড়ি
লেখকের কেদারা
লেখকের স্মৃতি বিজড়িত জিনিসগুলি
এবার ফেরা যাক গিয়ে কি দেখলাম। আমি পুরো পরিবার সমেত রওনা দিয়েছিলাম দুপুর ১২টায়। পৌঁছে গিয়েছিলাম ১.৩০ টার সময়। অবশ্যই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম তাই। সকালে এই বাড়ি ১০ টা থেকে দুপুরে ১ টা অবধি খোলা থাকে আর বিকেলে ৩ টে থেকে ৫ টা। একটু অপেক্ষা করতে হয়েছে কিন্তু তাতে খুব অসুবিধা হবেনা কারণ পাশেই আপনি পাবেন রূপনারায়ণ নদকে। রূপনারায়ণের পারে কিছুক্ষন কাটিয়ে দুপুর ৩ টের পর দেখলাম একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বাড়ি খুললেন। তিনিই এই ছোট্ট ১৫ মিনিটের গাইড। এই ১৫ মিনিটে আমরা দেখলাম শরৎ চন্দ্রের বসার ঘর , ওনার ব্যবহৃত সেকালের দম দেওয়া ঘড়ি , আলমারি। এর সাথে বাড়ির সামনের বাগান যেখানে রামের সুমতির বিখ্যাত পেয়ারা গাছ এখনো রয়েছে যদিও সেটার অবস্থা খুব ভালো নয়। অনেক পুরোনো তো। বাড়ির সামনে সেই পুকুর যেখানে কার্তিক ও গনেশ নামের রুই ও কাতলা মাছের উল্লেখ রয়েছে রামের সুমতি গল্পে।
লেখকের শোবার ঘর
বাড়ির পিছনের ধানের গোলা
দোতলার আরেকটি ঘর
বাড়ির দোতলা
লেখক ও তাঁর স্ত্রীর সমাধি
বাড়ির ডানপাশে
এরপর আমরা ঘুরে দেখলাম বাড়ির দোতলাটা , যেখানে লেখক নিজে থাকতেন তার সেই খাট , ব্যবহৃত বালিশ পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে। ওনার ব্যবহৃত জুতোও রয়েছে। এরপর বাড়ির পেছনের উঠোনে রয়েছে শৌচালয় ও তখনকার দিনে গ্রামের বাড়িতে যেসব ধানের গোলা থাকতো সেসব। এই ১৫ মিনিট আমাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আপনি গেলেও আপনার জন্যেও যথেষ্টই থাকবে। একটা কথা বলে রাখি এই বাড়িতে অনেক স্বনামধন্য লোকের পদধূলিও পড়েছে , যেমন নেতাজি। শরৎ চন্দ্র স্বাধীনতা সংগ্রাম কে পরোক্ষভাবে সমর্থন করতেন। সেই জন্যেই অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই নিরিবিলি পরিবেশে এসে তখনকার দিনে বৈঠকও করে গেছেন। আপাতত বাড়ি ঘুরে দেখতে কোনো টাকা লাগে না , তবে মন চাইলে খুশিমনে সেই বৃদ্ধ গাইডকে আপনার সাধ্যমতো কিছু দিয়ে আসতে পারেন। আমরাও দিয়েছিলাম , আর ওনার থেকেই শুনেছি লেখকের পরের প্রজন্মের লোকেরা দক্ষিণ কলকাতায় থাকে , তারা মাঝে মাঝে আসে। ওনারাই এই বৃদ্ধ মানুষটিকে কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।
কাছের রূপনারায়ণ নদের পাড়
পথনির্দেশ : হাওড়া স্টেশন থেকে পাঁশকুড়াগামী যেকোনো ট্রেন ধরে দেউলটি স্টেশন নামবেন। সেখান থেকে টোটো করে শরৎ কুঠি। খুব বেশি হলে ১০ বা ১৫ টাকা নিতে পারে। মূলসড়কের কাছে নিরালা নামের একটি রিসোর্ট আছে সেখানে থাকা ও খাবার ব্যবস্থা আছে।
স্ত্রী বললো – “কোথায় যাবে? “ “ফ্রেডরিকস নগর চলো “, আমি বললাম। “সেটা আবার কোথায় ?” স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন। আমি বললাম “কাছেই , বেশিদূর নয়। আমাকে বিশ্বাস করো ,ঘুরতে যাবে যখন একটু বিশ্বাস করো। “ প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু হলো। তবে এতো স্বামী স্ত্রীর গল্প নয় , তাই সমস্যা হলেও রাজি করলাম। বললাম “চলো , কথা দিচ্ছি ঠকবে না। “
এবার দুপুর ২টোর ট্রেনে আমরা মানে আমি ,আমার স্ত্রী ও আমার ছেলে রওনা দিলাম। চললাম ফ্রেডরিকস নগর। কোন্নগর থেকে পৌঁছতে পুরো ১০ মিনিট লাগলো। ট্রেন থেকে নেমেই স্ত্রী আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে “আরে এতো শ্রীরামপুর , কি উলটোপালটা নাম বলছিলে ,ফ্রেডরিকস নগর, ইয়ার্কি হচ্ছে। ” আমি বললাম “এত বিরক্ত হওয়ার কি আছে , এতো এখনকার শ্রীরামপুর। এতো আগে ফ্রেডরিকস নগরই ছিল।” ইতিহাসের কাহিনী বলতে হবে ভেবেই আনন্দিত হয়ে প্ল্যাটফর্মেই শুরু করলাম “আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে.. , “, মাঝপথেই স্ত্রী আমাকে থামিয়ে দিয়ে , “তোমার এই ইতিহাস শুনিও নাতো ! কোথায় নিয়ে যাবে চলো। “ অগত্যা বাধ্য স্বামীর মতো টোটো স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে চললাম। “ফ্রেডরিকস নগর ঘাট যাবে ?” এক টোটোওয়ালা কে জিজ্ঞেস করলাম। সে শুধু ঘাট কথাটাই শুনতে পেয়ে বললো “বসুন বসুন , যাবো। “ যাক আপাতত টোটোয় বসলাম। টোটো ছেড়েও দিলো। যেতে যেতে টোটোওয়ালা জিজ্ঞেস করলো “দাদা ,ঘাটের আগে কি যেন বললেন , ফ্রেডরিক কি যেন?” আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম “ও ফ্রেডরিকস নগর। “ টোটোওয়ালা – “সে আবার কোথায় ?” এবার আমি আবার শুরু করলাম, মনে হলো টোটোওয়ালা কেই শোনাব। যেই না বলতে যাবো “আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে “, স্ত্রী আমার জামা টেনে ধরে ফিসফিস করে বলছে “তোমার এই টোটোতে উঠে জ্ঞানের ভান্ডার নিয়ে না বসলেই নয় ! চুপ করো তো ! “ এবার আর কি করি। উপেক্ষিত ভান্ডার নিয়ে মনে মনে ভাবলাম , এই টোটোওয়ালা খুবই দুর্ভাগা , জ্ঞান টা পেলো না। স্ত্রী কে শোনাবার আমি আবার সাহস পেলাম না। ইতিহাসকে পেছনে ফেলে যেতে যেতে ঘাট চলে এলো। স্ত্রী আবার জিজ্ঞেস করলো “হেঁয়ালি না করে বলোতো কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ?” “ব্যারাকপুরে। ” আমি বললাম। “প্ল্যানটা শোনো , আগে ব্যারাকপুরে যাবো। তারপর এসে তোমাকে শ্রীরামপুরের সব দেখাচ্ছি । “
চার্চের ভেতরে সেন্ট বার্থেলমেউ চার্চ
নৌকো ধরে চললাম ভারতবর্ষের সবথেকে পুরোনো ক্যান্টনমেন্টে , ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট। ধুবিঘাটে (এই নামেই সবাই চেনে ) নেমেই দেখলাম অনেক ফাঁকা টোটো। একটাতে উঠে চেপে বসলাম। কথা প্রসঙ্গে বলে রাখি যে ছোটবেলা মায়েরা বলতো টোটো করে না ঘুরে পড়াশুনো করতে। কিন্তু দিনকাল যা পড়েছে পড়াশুনো করেও টোটো করেই ঘুরতে হচ্ছে। টোটোচালক ভাইটিকে বললাম চল চার্চে। পৌঁছতে ১০ মিনিট লাগলো। পৌঁছলাম সেন্ট বার্থেলমেউ চার্চ। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের পাশেই এই চার্চ। স্ত্রীকে বললাম , এই চার্চ কিছুদিন আগেই সরকার থেকে হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে। আনুমানিক ১৮৩১ সালে স্থাপিত এই চার্চ। প্রত্যেকদিনই বিকেল ৪.৩০ মিনিট অবধি খোলা থাকে। আজ ২৫ তারিখ বলে একটু বেশি ভীড়। অন্যান্য দিন এই চার্চের গুরুত্ব একটু কমই থাকে। ভেতরে ঢুকলাম , চার্চের ভেতরটা যথেষ্ট বড়ো , বাইরে থেকে তা ঠাহর করা মুশকিল। আজকের দিনে চার্চকে খুব ভালোভাবেই সাজানো হয়েছে। চার্চের পাশেই একটি মাঠ রয়েছে , সেখানে আর যাবো কি করে। সেখানে তো সেলফি শিকারীদের ভীড়। ১৫ মিনিট মতো কাটিয়ে ব্যারাকপুরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে চললাম শ্রীরামপুরের দিকে। ফেরার পথে খেয়াল করলাম আমার স্ত্রী একটু নরম হয়েছে। নিজেই জানতে চাইলো ফ্রেডরিকস নগর এর ব্যাপারটা। আমিও সুযোগের সদব্যবহার করে শুরু করলাম। আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রচুর বিদেশী ব্যবসায়ীরা নদীপথে বাংলায় প্রবেশ করে আর হুগলী নদীর পার্শবর্তী অঞ্চলগুলিতে বসবাস শুরু করে। এরমভাবেই ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যান্ডেলে পর্তুগিজ , চুঁচুড়ায় ডাচ , চন্দননগরে ফরাসি এবং শ্রীরামপুরে ড্যানিশ উপনিবেশ তৈরী হয়। সেইজন্যে হুগলি নদীর এই অঞ্চলগুলিকে ছোট ইউরোপ ও বলা হয়। ড্যানিশরা এখানে ১৭৫৫ থেকে ১৮৪৫ অবধি থাকে, তারপর এই শহর ব্রিটিশদের হাতে হস্তান্তর হয়। শ্রীরামপুরে এখনো সেই ড্যানিশ সংস্কৃতির ছাপ বিভিন্ন স্থাপত্যের মধ্যে পাওয়া যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ড্যানিশ কোর্ট যা এখন শ্রীরামপুর কোর্ট হয়েছে। প্রথমে আমরা গেলাম ড্যানিশ কোর্টে। ছুটির দিনে দেখার বলতে কোর্টের ফাটক ও কোর্টের প্রধান বিল্ডিংয়ের স্থাপত্য, যেটা সেই ড্যানিশ সময়কার ।
শ্রীরামপুর কোর্ট
কোর্টের সামনেই রয়েছে সেন্ট ওলাভ চার্চ। এটি ১৮০৬ সালের একটি স্থাপত্য যা ড্যানিশদের বানানো। এটি একটি ক্যাথলিক চার্চ। সমস্যা হলো আমরা যখন পৌঁছেছি (বিকেল সাড়ে ৩টের দিকে )তখন চার্চ বন্ধ। চার্চ আবার খুলবে সাড়ে ৪টের সময়।
সেন্ট ওলাভ চার্চ
সময়ের অভাব ছিলই তাই সময় নষ্ট না করে আমরা এগিয়ে গেলাম ডেনমার্ক ট্যাভার্নের দিকে। এটি তখনকার সময়ের একটি হোটেল যা ড্যানিশ ব্যবসায়ীদের জন্যে বানানো হয়েছিল। এই হোটেল তাদের জন্যে ছিল একটি রাত্রিবাসের ঠিকানা। গঙ্গার ধারের এই হোটেল সেকালে অনেক জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ ২৫০ বছর পর ২০১৮ তে আবার নতুন করে সেজেছে ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে একটি ভারতীয় সংস্থা। খাবার তো পাওয়া যায়ই আবার রাতও কাটানো যায়। খাবারের দাম বেশি হলেও , এখানকার পরিবেশ আপনাকে দেবে সেই আমলের অনুভূতি। প্রচুর লোক এখানে সেই অনুভূতিই নিতে আসেন। যদিও আমরা ভেতরে ঢুকিনি , তাও বাইরে থেকে দেখাটাও একরকম অনুভূতি দেয়।
ডেনমার্ক ট্যাভার্নের সামনে ডেনমার্ক ট্যাভার্ন
এরপর আমরা গেলাম এম্যাকুলেট কন্সেপশন চার্চে। এটিও ডেনমার্ক ট্যাভার্নের বেশ কাছে। এটিও বেশ পুরোনো চার্চ তবে সত্যি বলতে সালটা আমার জানা নেই। ২৫ তারিখ বলে এই চার্চও সেজে উঠেছে। এর ভেতরে মিশনারি হাসপাতালও রয়েছে , যেখানে দুঃস্থদের সেবা শুশ্রূষা করা হয়। এতক্ষন তো স্ত্রী চুপচাপ ঘুরেছে , এবার আমি বললাম “চলো আজকের শেষ জায়গাতে নিয়ে যাই , খুব ভালো লাগবে “.
এম্মাকুলেট কন্সেপশন চার্চ চার্চের ভেতরে
একটু দূরে , তাই টোটো করে চললাম আমাদের শেষ গন্তব্য শ্রীরামপুর কলেজের দিকে। ২ বছর এই কলেজে পড়ার সৌভাগ্য তো আমার রয়েইছে , তাও আবার নিজের ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার টা আজ হয়ে গেলো। যদিও তার ছোট্ট মাথায় নস্টালজিয়ার কিছুই ঢোকে না, তাও তাকে কোলে নিয়ে কলেজে ঘোরার মজাই আলাদা। কখনো চেষ্টা করে দেখবেন , খুব ভালো লাগবে। স্ত্রীকে নিয়ে দেখালাম কলেজের প্রতিটি জায়গা যেখানে কোনো না কোনো স্মৃতি রয়েছে , সত্যি বলতে অনেকই স্মৃতি মাথাচাড়া দিলো। স্মৃতির অনুভূতি নিয়েই সবাইকে নিয়ে গেলাম কলেজের প্রধান বিল্ডিংয়ের দিকে। এইটা দেখিয়ে স্ত্রীকে বললাম “১৮১৮ সালের তৈরী , দেখো ১ বছর আগেই ২০০ বছর সম্পূর্ণ হয়েছে। ভাবতে পারছো , এরম একটা জায়গাতে দাঁড়িয়ে রয়েছো “. স্ত্রী আর কি বলবে, বললো “এরম জায়গায় তুমি আগে কেন নিয়ে আসোনি। “
মেইন বিল্ডিং কলেজের ভেতরের রাস্তা কেরী সংগ্রহশালা
যাই হোক সহধর্মিণীটির মুখের হাসি দেখে বুঝতে বাকি রইলো না , যে আজকের দিনটি তার ভালোই কেটেছে। ছুটির দিনে না গেলে কেরী সাহেবের সংগ্রহশালাটা দেখা যেত। তাই ঘোরার পর্ব চুকিয়ে প্রথমে কলেজের বাইরে ভেলমুড়ি খেলাম তারপর টোটো করে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। টোটোয় বসেই মনে পড়লো , স্ত্রীকে বললাম “এই যাহ ! তোমাদের ভারতবর্ষের প্রথম ছাপাখানাটা তো দেখানোই হলো না। কলেজের কাছেই ছিল “.
সহধর্মিনী বললো “আজ ছেড়ে দাও। ছাপাখানটা না হয় ফ্রেডরিকস নগর দ্বিতীয় পর্বের জন্যে তোলা থাক “.