নারায়ণপুরের রাজবাড়ী

নারায়ণপুর ? না কি যেন বললে ? ওটা কোথায় ? – এই ছিল বুম্বার প্রথম প্রতিক্রিয়া।

আমি বললাম – বাঁকুড়ায়। মানে ধরে নে , আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার পথ। একশো পনেরো কিলোমিটার মতো।

আরে জায়গাটার পুরো নামটা বলো , ম্যাপে দেখতে হবে তো – বুম্বা বললো।

কি আছে ওখানে ? – বুম্বা কৌতূহলী হয়ে উঠলো। বললাম – টেরাকোটা মন্দির , জমিদারবাড়ি, আর একটা জায়গায় আমি যেতে চাই , জঙ্গল পাঁচমাথা।

আমি , বুম্বা , বুম্বার সাধের মারুতি গাড়ি আর তার সাথে যদি গুগল ম্যাপ থাকে , তাহলে সে এক সাংঘাতিক কম্বিনেশন তৈরী করে। কত পথ যে আমরা ভুল করেছি , কত জায়গায় গিয়ে যে হারিয়ে গিয়েছি , সেসব অভিজ্ঞতার গল্প করলে একটা বই লেখা হয়ে যাবে। পরে কোনো পোস্টে সেসব গল্প করা যাবে। আপাতত আমরা দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম।  কবে , কখন আর কারা যাবে নারায়ণপুর। পুরো নাম হাদাল নারায়ণপুর। এইটি যে জায়গাটার নাম সেটি আমি জানতাম। আমার ধারণা পাল্টালো যখন ওখানে গিয়ে পৌঁছলাম।

সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পৌঁছলাম শক্তিগড়। লুচি তরকারি আর বিখ্যাত ল্যাংচা সহযোগে প্রাতরাশ সেরে যখন আবার গাড়িতে চেপে বসলাম , তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজে। এপ্রিল মাসের গরমে , বাইরের আবহাওয়া দেখলে মনে হবে যেন বেলা গড়িয়ে এগারোটা বেজে গেছে। তাই গাড়ির ভেতরে এসি চালাতেই হলো।  এই যাত্রায় আমার সঙ্গী আমার স্ত্রী , ছেলে আর আমার বন্ধু সুব্রত। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বুম্বা। বুম্বার বাঁপাশে বুম্বার বিখ্যাত স্যামসুং ফোন , আর তাতে ছাই রঙের ওলিতেগলিতে নীল দাগের পথ দেখাচ্ছে গুগল ম্যাপ।

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা এলাম বর্ধমান , সেখান থেকে দামোদরের ব্রীজ পেরিয়ে আমরা এলাম বাঁকুড়া রোডে। ম্যাপ অনুযায়ী , বাঁকুড়ার এক জনপ্রিয় টাউন সোনামুখীর দিকে যেতে হবে। সেই পথে এগোতে লাগলাম। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম ম্যাপ আমাদের সড়ক ছেড়ে ডানদিকের রাস্তায় যেতে বলছে।

ধগড়িয়া স্টেশন

এই উপলক্ষ্যে বুম্বার ফোনের এক বিশেষ বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করতে চাই। এটি ফোনটিকে, অন্যান্য সাধারণ তুচ্ছ ফোনেদের ভীড়ে অসাধারণ করে তোলে। ধরুন এই ফোনে ফোন এলেই তৎক্ষণাৎ রিং হতে থাকে, কিন্তু যিনি ফোন করেছেন, তাঁর নাম বা ফোন নম্বর দেখা যায় মিনিটখানেক পরে। আবার ধরা যাক , আপনি ফোনটিতে গুগল ম্যাপ চালিয়ে যাচ্ছেন , আপনার সামনে দুটো রাস্তা রয়েছে। ফোন আপনাকে ডানদিকে যেতে বলছে , আপনি ডানদিকের রাস্তা ধরে এক কিলোমিটার চলে গেলেন। তারপর হঠাৎ ফোন আপনাকে বলে বসলো যে নাহ বামদিকে যেতে হতো। আবার ইউ টার্ন নিয়ে যেতে হলো বামদিকে। এটি হলো ফোনটির ধীর স্থির ব্যক্তিত্বের একটি দিকমাত্র। উনি , সবদিক বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন , যেমন ধরুন ইন্টারনেট আছে কিনা , ম্যাপ আপডেট হয়েছে নাকি ইত্যাদি। মুশকিল হচ্ছে , এই বিচার বিবেচনা করে পথ দেখাতে ওনার একটু সময় লাগে। কখন পনেরো মিনিট , আবার কখনো আধ ঘন্টা। আমরাই গাড়ি চালাতে গিয়ে ওনাকে অযথা তাড়া দিই।

এবারো তার অন্যথা হলো না। ডানদিকের রাস্তা ধরে আমরা পৌঁছলাম ধগড়িয়া স্টেশন। এবার আমি ফোন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে খুঁজতে লাগলাম যদি কোনো মানুষের দেখা পাওয়া যায়। ঘড়িতে বেলা এগারোটা। খাঁ খাঁ রোদে চারিদিক জনমানবহীন। কিন্তু প্রকৃতি এখানে বেশ উদার। অনবরত বসন্তের মৃদু বাতাস বয়ে চলেছে , যা এই আবহাওয়াতেও আরামদায়ক। বাংলার গ্রামে গ্রামে যখনি গেছি , এরম রূপেই প্রকৃতিকে আমি দেখেছি। কিছুদূর থেকে একজন লোককে সাইকেলে চেপে আসতে দেখলাম। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – দাদা, নারায়ণপুর যাবো , কোন রাস্তা ধরতে হবে ?

উনি বললেন – ও , হদল নারায়ণপুর ? আমি বললাম – হ্যাঁ।

তা এই রাস্তায় কেন ? আরেকটু পিছনে গিয়েই তো ভালো রাস্তা ছিল। এতো এগিয়ে এসেছেন।

দূরে রেলগেটের দিকে ইশারা করে বললেন – ওই যে রাস্তা দেখা যাচ্ছে , ওই রাস্তা ধরেও যেতে পারেন পাঁচ কিলোমিটারের পথ।

ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা আবার গাড়িতে চাপলাম। জায়গাটার নামের উচ্চারণ এবার আমার কাছে পরিষ্কার হলো। হদল নারায়ণপুর। একযোগে সব্বাইকে জানিয়ে দিলাম।  এরপর ভদ্রলোকের কথামতো এগিয়ে চললাম। বুম্বার ফোনকে কিছুক্ষণ রেস্ট দেয়া হলো। অনেকটা পরিশ্রম গেছে তো ! উনি একটু বিশ্রাম নিক।

ব্রহ্মাণী মন্দির

কিলোমিটার খানেক চলার পর পৌঁছে গেলাম নারায়ণপুর। নারায়ণপুর জায়গাটা বাঁকুড়ার পাত্রসায়ের ব্লকের অন্তর্গত। নারায়ণপুরের যেই জায়গায় এসে আমরা পৌঁছলাম , সেই জায়গাতেই রয়েছে ব্রহ্মাণী মন্দির। মন্দিরের সামনেটায় রয়েছে নাটমন্দিরের মতো নির্মিত একটি মণ্ডপ। মণ্ডপের চালে টিন ব্যবহার করা হয়েছে। বাহ্যিক গঠনশৈলী বাংলার অন্যান্য প্রাচীন মন্দিরের থেকে আলাদা। মণ্ডপ পেরিয়ে মন্দিরের মূল গর্ভগৃহ। ব্রহ্মাণী মায়ের মূর্তির গঠন অবাক করার মতো। কষ্টি পাথরের তৈরি এই মূর্তি যে কতটা প্ৰাচীন তার সঠিক ধারণা আমার নেই । অন্ধকারে পুরোপুরি বোঝা না গেলেও, দেবীর চারহাত এবং একটি হাতে ত্রিশূল লক্ষ্য করা যায় । অনেকের মতে এটি দেবী পার্বতীর মূর্তি। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মূর্তি স্থাপনের কাহিনী জনমুখে প্রচলিত। তবে স্থানীয় লোকেদের কাছে এই মন্দিরের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে মায়ের মূর্তির গঠনশৈলী আমাকে অবাক করলো । মূর্তির বয়স কম করে হলেও হাজার বছর হতে পারে। এ ধরণের মূর্তি পাল ও সেনযুগের বিভিন্ন মন্দিরের ছবিতে দেখেছি। ব্রহ্মাণী মন্দিরের গঠনশৈলী সাদামাঠা , প্রাচীন মন্দির বলতে আমরা যা বুঝি , এ মন্দিরে সেটি দেখতে পেলাম না।

ব্রহ্মাণী মায়ের মূর্তি

এই সময় দেখা হলো গ্রামের এক যুবক বিকাশবাবুর সাথে। তাঁর সাথে কথা বলে এই গ্রাম সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারলাম। যেমন হদল আর নারায়ণপুর দুটো আলাদা জনপদ। নারায়ণপুরের পোস্ট অফিস হদল। দুই জনপদের মাঝে রয়েছে বোদাই নদী। উনি আরো জানালেন , যে নদী পেরিয়ে আমরা এখানে এসেছি, সেটি শালী নদী। জানতে পারলাম, নারায়ণপুরের জমিদার বাড়ি তিনটি তরফে বিভক্ত। ছোট, বড় এবং মেজো। তিন তরফেই দেবী মহামায়ার আরাধনা করা হয়, আবার তিন তরফেই কুলদেবতা দামোদর মন্দির রয়েছে। জমিদার পরিবার মন্ডল উপাধি প্রাপ্ত। কৌতূহলের বসে জিজ্ঞেস করলাম , এখানে কোনো জঙ্গল পাঁচমাথা বলে জায়গা আছে নাকি ? উনি জানালেন – ওনার জানা নেই। এরম কোনো নাম উনি শোনেননি। একটু হতাশ হলাম।

ছোট তরফ এর দুর্গামন্দির

এরপর সবাই মিলে হেঁটে এগিয়ে চললাম  এখানকার জমিদার মন্ডল পরিবারের তৈরী পুরাকীর্তি গুলিকে প্রত্যক্ষ্য করতে। ইতিহাসবিদদের মতে জনৈক মুচিরাম ঘোষ মল্ল রাজাদের আমলে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। নিজের কৃতিত্বে প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করেন। তার কাজের পুরস্কারস্বরূপ তিনি প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং মন্ডল উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তাদের পরিবারের তরফ থেকে  তৈরী হয় এই পুরাকীর্তিগুলো । আমাদের যাওয়ার পথে সবার প্রথমে দেখতে পেলাম ছোট তরফের বাড়ির প্রকান্ড প্রবেশ দ্বার ।

দামোদর মন্দির ছোট তরফ

প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায় সুবিশাল নাটমন্দির । বাড়ির প্রাঙ্গনেই তিনশো বছর পুরোনো রাধা দামোদর মন্দির অবস্থিত । ছোট তরফের এই মন্দির টেরাকোটা সজ্জিত।  টেরাকোটা অলংকরণের কাজ দেখার মতো। নবরত্ন শৈলীর এই মন্দিরের ভিত্তিবেদী অনেকটাই উঁচু। সম্প্রতি মন্দিরের সংস্কার হয়েছে, নতুন করে রং করা হয়েছে । মন্দিরের টেরাকোটার কাজে মৃত্যুলতা ও অন্যান্য মূর্তি দেখতে অসাধারণ লাগছিলো। তবে যে কাজটা আমার নজর কাড়লো, সেটা হলো ত্রিখিলানের উপরে মাঝের দিকে অর্জুনের লক্ষ্যভেদের চিত্রায়ন। কি নিপুণ কাজ !!

অর্জুনের লক্ষ্যভেদ

ছোট তরফ থেকে সোজা রাস্তা ধরে গেলে পৌঁছনো যায় বড়ো তরফে। তার আগেই রাস্তার ডানদিকে চোখে পড়লো আরো কিছু পুরোনো মন্দির। মন্দিরগুলির অনেকটাই ধ্বংসাবশেষে রূপান্তরিত। তবুও একটা পঞ্চরত্ন মন্দিরে টেরাকোটার কাজ অবশিষ্ট রয়েছে। সেই টেরাকোটার কাজে রাম রাবনের যুদ্ধ , অনন্তশায়ী বিষ্ণুর চিত্রায়ন দেখার মতো।

ভাঙাচোরা মন্দিরে টেরাকোটার কাজ

এগিয়ে গেলাম বড়ো তরফের দিকে। বড়ো তরফে প্রবেশ করতে প্রথমেই চোখে পড়লো এক বিশাল রাসমঞ্চ। ১৭ চূড়াবিশিষ্ট , অষ্টকোণ এই রাসমঞ্চের স্থাপনকাল সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা মুশকিল । তবে এটিও যে প্রাচীন পুরাকীর্তির মধ্যে পড়ে , এবিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এরম রাসমঞ্চ বাংলার ইতিহাসে বিরল।

রাসমঞ্চ

রাসমঞ্চের পাশেই মূল জমিদার বাড়ি। ইতিহাসবিদদের মতে এই অট্টালিকার গঠনশৈলীতে একটি ইউরোপীয় ছাপ রয়েছে। জানালা গুলির ওপরে বানানো মুখগুলি , একটি সিংহের মূর্তি এইগুলো প্রত্যক্ষ করার অনুভুতিই আলাদা। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে চোখে পড়ে দুর্গাদালান এবং তার সামনের নাটমন্দির। উঁচু স্তম্ভগুলি সেকালের জমিদারবাড়ির আভিজাত্যের প্রতীকের মতো দাঁড়িয়ে।

বড় তরফ

এরপর আমাদের সাথে আলাপ হলো জমিদার বাড়ির এক সদস্য গোপাল মন্ডলের সাথে। তিনিই আমাদের বড়ো তরফের দামোদর মন্দির ঘুরিয়ে দেখালেন। বাড়ির অন্দরমহলে অবস্থিত বড়ো তরফের দামোদর মন্দির। পঞ্চরত্ন এই মন্দিরের স্থাপনকালে ১৭২৮ শকাব্দ। ত্রিখিলান বিশিষ্ট এই মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখা যায়। 

মন্ডলবাবুর থেকে দিকনির্দেশ নিয়ে সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম মেজো তরফের দামোদর মন্দির দেখতে। বাকি দুই তরফের থেকে একটু ভেতরদিকে অবস্থিত এই মন্দির। নবরত্ন শৈলীর এই মন্দির টেরাকোটার কাজে সমৃদ্ধ। মন্দিরের এই দেয়ালেও রাম  রাবনের যুদ্ধ আর অনন্তশায়ী বিষ্ণুর চিত্রায়ন বিদ্যমান। এরপর মন্ডলবাবুর থেকে বিদায় নিয়ে দামোদর ক্যানাল এর দিকে চললাম।

মেজো তরফের দামোদর মন্দির

আশেপাশের কিছু পথচলতি মানুষের থেকে জানতে পারলাম , নারায়ণপুর থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দামোদর ক্যানাল লাগোয়া সেতু , যার অন্য পারে রণডিহা ব্যারেজ আছে । রণডিহা ব্যারেজ থেকে খুব কাছেই অবস্থিত পানাগড় টাউন। এই পথে কিছুদূর গাড়ি নিয়ে গিয়ে দেখলাম, রাস্তা প্রায় নেই বললেই চলে। সাইকেল বা বাইক নিয়ে যাওয়া যাবে , তবে গাড়ি নিয়ে যাওয়া মুশকিল। অগত্যা ফিরে আসতে হলো। তবে রাস্তার ধারে দেখা মিললো বোদাই নদীর। নদীবুকে ভাসমান কচুরিপানা। নদী আজ শীর্ণকায় , সভ্যতার চাপে আজ খালে রূপান্তরিত। শুধু বোদাই নয়, একই অবস্থা আজ বাংলার অন্যান্য নদীরও । 

ফিরে এলাম সেই ব্রহ্মাণী মন্দিরের কাছে , কোনো ঝুঁকি না নিয়েই যে পথে এসেছিলাম , সেই পথেই ফিরে চললাম। ঘড়িতে তখন দুপুর দুটো। এদিকে সবারই প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। সড়কের ধারে এক ভাতের হোটেল পেলাম , হোটেল চালান এক বয়স্ক মহিলা এবং তাঁর ছেলে। ওনারাই জানালেন শুধুমাত্র ডিম্ ভাত রয়েছে। তাই অর্ডার দিয়ে মহিলার ছেলের সাথে গল্প করতে লাগলাম। কোথা থেকে এসেছি জানালাম , কি করতে এসেছিলাম জানাতে , উনি আমাদের এক জঙ্গলের সন্ধান দিলেন। খাওয়াদাওয়া সেরে , কৌতূহলী হয়ে ওনার কাছে পথনির্দেশ চাইলাম। ওনার কাছেও জানতে চাইলাম জঙ্গল পাঁচমাথার নাম শুনেছেন নাকি , উনি বললেন – এতদিন এখানে ব্যবসা করছি , এরম জায়গার নাম শুনিনি।

বোদাই নদী

আমি ম্যাপে যে ছবিটা দেখেছিলাম সেটা একজনের আপলোড করা , একজনের রিভিউ দেয়া জায়গা। তাই বিশেষ সহযোগিতা আশা করা যায়না। হয়তো ভুল পয়েন্ট করা থাকতে পারে। তাই আশা ছাড়লাম। জঙ্গল পাঁচমাথা থেকে পাঁচমাথা কে বাদ দিয়ে শুধু জঙ্গলের খোঁজে চললাম।

জায়গাটির নাম বীরসিং এর জঙ্গল। ভদ্রলোক জানালেন , জাতীয় সড়ক থেকে বর্ধমানের দিকে যেতে , রাস্তার ডানদিকের রাঙামাটির রাস্তা ধরতে , সে রাস্তাই আবার গোল হয়ে ঘুরে জাতীয় সড়কেই উঠবে। কিন্তু আমাদের জঙ্গল ঘোরা হয়ে যাবে। সবাই মিলে সাহস করে এগিয়ে গেলাম। ওই যে প্রথমেই বললাম , আমরা চারজন একসাথে বেরোলেই একটা সাংঘাতিক কিছু হওয়ার আশঙ্কা থাকে , সেই ভয়টাই এবারও হচ্ছিলো। তবে আমার নয় , আমার সহযাত্রীদের। ভরসা বলতে সেই বুম্বার ফোন। এতক্ষন উনি রেস্টে ছিলেন। আমার মনে হচ্ছিলো রাস্তা হারিয়ে গেলেও, আমি কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবো। ব্যাক আপ এর জন্যে সবাই নিজের নিজের ফোনে গুগল ম্যাপ অন করলাম।

গাড়ি রাঙামাটির পথ ধরলো বটে , তবে এতটা চড়াই , উৎরাই আমরা কেউই আশা করিনি। রাস্তাজুড়ে শুধুই লাল ধুলো। ধীরে ধীরে আমরা এক আদিবাসী গ্রামে এসে পড়লাম। গ্রামের ঘরবাড়ি সেটাই জানান দিতে লাগলো। আমাদের মাথায় ছিল , রাস্তা গোল হয়ে ঘুরবে। তাই টার্নগুলোতে আমাদের ডানদিকে যেতে হবে। কিন্তু সববারের মতোই এবারেও থিওরি কিছুক্ষনের মধ্যেই ভুল প্রমাণিত হলো। অনেক জায়গায় দেখতে পেলাম ডানদিকে যাওয়ার রাস্তা নেই , বা খারাপ রাস্তা। অগত্যা বামদিকে যেতে হলো। জানিয়ে রাখি , আমাদের কারো ফোনেই টাওয়ার নেই। শুধুমাত্র বুম্বার ফোন ম্যাপ দেখিয়ে চলেছে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আমি রাস্তা ঠাহর করতে লাগলাম। বুঝলাম বৃত্তের পরিধি বেড়ে গেছে। আমরা জঙ্গল কিছুই পাইনি , শুধু গ্রামের ভেতর দিয়েই চলেছি। অনেককে জিজ্ঞেস করেছি , তারা জাতীয় সড়কের কথা শুনতেই সোনামুখীর রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। অনেকক্ষন এভাবে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘোরার পর, একসময় আমি বললাম , বুম্বা গাড়ি থামা তো। আমি দেখছি। বুম্বা গাড়ি দাঁড় করালো। আমি গাড়ি থেকে নেমে সামনে কয়েকটি বাড়ি দেখতে পেলাম। একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম গ্রামের এক অল্পবয়সী গৃহবধূ মাথায় কাঠের বোঝা চাপিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে গেলাম। একবার মনে হলো আমার ভাষা কি যিনি বুঝবেন , বা উনি কি বলবেন সেটা কি আমি বুঝতে পারবো ! পরোয়া না করেই বললাম –  দিদি , আমরা অনেক ক্ষণ থেকেই ঘুরে যাচ্ছি , জঙ্গল পাচ্ছি না। বীরসিংয়ের জঙ্গলটা কোথায় বলতে পারেন ?

গৃহবধূ ঈষৎ হেসে সামনে ইশারা করে বললেন – ” ই তো সামনেই গো ! “

বীরসিং এর জঙ্গল

আমি ওদিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলাম না। গ্রামের যেমন রাস্তা হয় ঠিক সেরম লাগলো। গৃহবধূর ওপর ভরসা করে বুম্বাকে বললাম , গাড়ি নিয়ে এগোতে। গাড়ি নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার এগোতেই দেখলাম গ্রামীণ রাঙামাটির রাস্তা ছেড়ে আমরা ঝকঝকে পিচের রাস্তায় উঠতে পড়েছি। বুঝলাম , বীরসিং এর জঙ্গল এসে গেছে। পথের দুধারে ঘন শালবন। এপ্রিল মাসের নতুন পাতা গজানো গাছের সবুজ রং, মাঝের কালো সড়ক আর চারিদিক নিস্তব্ধ। এরম পরিবেশ কি আর বারবার পাওয়া যায় ! গাড়ি থেকে নেমে অনেকগুলো ছবি তুললাম। এতক্ষনে আমার বন্ধু সুব্রত বললো – আকাশের দিকে দেখ ! আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম চারিদিক ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসছে। বুঝলাম বৃষ্টি এলো বলে। তাড়াতাড়ি সব্বাই গাড়িতে এসে বসলাম। বুম্বা গাড়ি নিয়ে একটু এগোতেই দেখতে পেলাম , রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। বামদিকের রাস্তা ঝকঝকে , ডানদিকের রাস্তা ভাঙাচোরা। বুম্বার ফোন দেখাচ্ছে ডানদিকে। বললাম ফোনের ওপর ভরসা করলে হবে না , আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ম্যাপে কি দেখাচ্ছে ? টাওয়ার নেই , উত্তর এলো। এমন সময় দেখি , একজন লোক সাইকেল নিয়ে আসছে। গাড়ি থেকে হাত দেখিয়ে ওনাকে থামতে বললাম। জিজ্ঞেস করলাম , দাদা বর্ধমানের দিকে যাবো। সড়ক কোনপথে পড়বে ? ভদ্রলোক ওই ঝকঝকে রাস্তার দিকে ইশারা করে বললেন , এই রাস্তা ধরে সোজা চলে যান সোনামুখী। ওখান থেকে বর্ধমানের সড়ক পেয়ে যাবেন।

আমি বুম্বাকে বললাম , হোটেলের ভদ্রলোক এতটা ঘোরার কথা তো বলেননি ? তাহলে উপায় ?

একটাই উপায় – বুম্বার ফোনকে বিশ্বাস করে ডানদিকে যাওয়া। সব্বাই একমত হলো। চললাম ডানদিকে।

দুমিনিট হয়েছে কি , প্রচন্ড বৃষ্টি নামলো। চারিদিক অন্ধকার। গভীর জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলেছে , আশেপাশে কোনো জনপ্রাণীর দেখা নেই। হোটেলের ভদ্রলোক বলেছিলেন , এইপথে হাতির ভয় আছে। এতকিছু ভাবছি , আর এদিকে খারাপ রাস্তা দিয়ে গাড়ি হেলতেদুলতে এগিয়ে চললো। কয়েক কিলোমিটার এভাবেই চলার পর রাস্তার বামদিকে ফরেস্ট অফিস দেখতে পেলাম। ঘন জঙ্গলের ভেতরে ভুতুড়ে বাড়ির মতো একটি একতলা কটেজ। বাড়ির রং সাদা। বাড়ির সামনের বারান্দায় দেখলাম এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আমাদের গাড়ির দিকেই তাকিয়ে আছেন।  বৃষ্টির তীব্রতা তখন একটু কমেছিল, সামনে থেকে এক মোটর আরোহীকে আসতে দেখলাম। বাইক রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ফরেস্ট অফিসের দিকে ছুটে গেলো। আমরাও গাড়ি দাঁড় করালাম। লক্ষ্য করলাম ফরেস্ট অফিসের পাশে একটা ওয়াচ টাওয়ার ও রয়েছে।

জঙ্গল পাঁচমাথা

এতক্ষন রাস্তার শুধু বামদিক দেখছিলাম। ডানদিকে চোখ পড়তেই , আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠলাম। বৃষ্টি তখনও থামেনি , গাড়ি থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ছুটে গেলাম। আবিষ্কারের আনন্দ ঠিক যেমন হয় , আমার মনের অবস্থাও তখন সেইরকম। ডানদিকে যে জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি , সেটি একটি মোড় , পাঁচমাথার মোড়। যেদিক থেকে এলাম আর যেদিকে যাচ্ছি ঐদুটি বাদ দিলে জঙ্গলের ভেতর ৩টি রাস্তা চলে গেছে। রাস্তা তিনটি কাঁচা লালমাটির। ছবি তুললাম। তারপর গাড়িতে এসে বসলাম। স্ত্রী বলে উঠলো – কি পাগলামি করো ? অন্ধকার হয়ে এসেছে , তার মধ্যে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছ ? বাড়ির দিকে চলো এবার, অনেক হয়েছে । অগত্যা নিজের আনন্দ নিজের মনেই চেপে রেখে রওনা দিলাম।

দামোদর ক্যানাল

কিছুদূর এগিয়ে দামোদর ক্যানাল পেরিয়ে সড়ক পথে এসে পড়লাম। ধন্য বুম্বার ফোন , সঠিক সময়ে সঠিক পথ দেখাবার জন্য। সড়কপথে এসে যেন ফোনও একটু মৃদু হাসি দিলো , তারপর বন্ধ। বুম্বা বললো – এমা , ব্যাটারি শেষ। চার্জে বসাতে হবে। সুব্রত বললো – আর চিন্তা নেই , সোজা গেলেই বর্ধমান , তারপর ডানদিকের সড়ক ধরলেই বাড়ি পৌঁছে যাবো।

বাংলার গ্রামে ঘোরার যে বিশেষ অভিজ্ঞতাগুলি আমার হয়েছে, তার মধ্যে এটিও যোগ হলো। বীরসিং এর জঙ্গল , সেই আদিবাসী গৃহবধূ ,  জমিদারবাড়ির মন্ডলবাবু  ,কাউকেই আমি ভুলতে পারবো না। ভুলতে পারবো না , মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা। আমাদের মধ্যে যতই বৈষম্য থাকুক না কেন , আন্তরিকতা যেন ওনাদের সহজাত অধিকার। জানিয়ে রাখি , জমিদারবাড়ির মন্ডলবাবুর কথা যে বলেছিলাম , উনি আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ওনার বাড়িতে এসে মধ্যাহ্নভোজ করার। যদিও এতজন মিলে যাওয়াটা ঠিক দেখায় না , তাই সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। তবুও ওনার এই আন্তরিকতা আমি ভুলিনি। সম্পূর্ণ অজানা অচেনা মানুষকে আপন করে নেয়ার। দুর্গাপুজোয় নিমন্ত্রণ করলেন। সপরিবারে আসতে বলেছিলেন।

এই ব্যবহার আমি বাংলায় বারবার খুঁজে পেয়েছি। সে চুপি গ্রাম হোক, বা মেদিনীপুর কিংবা বৈদ্যপুর , সর্বত্রই মানুষের এই আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কখনো টোটোচালক , কখন মন্ডলবাবুর মতো জমিদার পরিবারের সদস্য , আন্তরিকতা জাতি, ধর্ম, পেশা নির্বিশেষে আমি পেয়েছি। তাই তো পেশাগত কারণে বাংলা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও , কখনই যেতে পারিনি , জানিনা ভবিষ্যতেও পারবো কিনা !

বিষ্ণুপুর এর মন্দিরগুলি

টেরাকোটা – এটি একটি ল্যাটিন শব্দ। টেরা মানে মাটি আর কোটা মানে ড্ৰাই কোটিং। টেরাকোটাকে একসঙ্গে বলা হয় বেক্ড ক্লে ওয়ার্ক বা পোড়ামাটির  ফলক। এই নদীমাতৃক বাংলায় আমরা কোনোদিনই মাটির অভাব বোধ করিনি। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে , আমাদের পুরোনো মন্দিরগুলোতে এই পোড়ামাটির অসাধারণ সব কাজ রয়েছে। বাংলার টেরাকোটার এক অন্যতম পীঠস্থান বিষ্ণুপুর। এখানে টেরাকোটা শুধু মন্দিরেই সীমাবদ্ধ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আর উপহার সামগ্রীর মধ্যেও টেরাকোটার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। আরো গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, টেরাকোটা বিষ্ণুপুরের এক জনপ্রিয় শিল্প। ইতিহাস সেখানে এই শিল্পকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে, তাইতো প্রচুর মানুষের জীবন জড়িয়ে পড়েছে এই টেরাকোটার সাথে। শতাব্দীপ্রাচীন এই ইতিহাস আর শিল্পকে সাথে নিয়ে আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বিষ্ণুপুর।

এই বিষ্ণুপুরের গল্প শুরু হয় খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষ থেকে। সেই সময় আদিমল্ল রঘুনাথের হাত ধরে মল্লরাজ শুরু হয়। আদিমল্ল এর রাজধানী ছিল প্রদ্যুম্নপুর যা অধুনা জয়পুরের নিকটে অবস্থিত। বিষ্ণুপুরে অনেক পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। তবে বিষ্ণুপুরের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় প্রবল পরাক্রমী মল্লরাজা বীরহান্বিরের আমলে। যুদ্ধ ছেড়ে যখন তিনি শ্রীনিবাস আচার্য্যর কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন তখন থেকে সারা মল্লরাজত্ব জুড়ে তৈরি হয় বিষ্ণুর মন্দির, রাসমঞ্চ ইত্যাদি। সেই থেকেই এই জায়গার নামকরণ হয় বিষ্ণুপুর।

বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি বৈচিত্র্যময়। এই মন্দিরগুলির স্থাপত্যে অনেকরকম পাথরের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিছুক্ষেত্রে ঝামা বা মাকড়া পাথর এবং কিছু ক্ষেত্রে ল্যাটেরাইট পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। মন্দিরগুলির গঠনশৈলীতেও বৈচিত্র রয়েছে। অনেক একরত্ন মন্দিরের মাঝেও জোড় বাংলা শৈলীর মন্দির দেখা যায়। কোথাও পঞ্চরত্ন গঠনশৈলীও দেখা যায় ।

মুগ্ধ করার মতো টেরাকোটার অলংকরণ দেখা যায় মূলত তিনটি মন্দিরে। শ্যাম রাই মন্দির , মদনমোহন মন্দির এবং জোড় বাংলা মন্দির। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী , রামায়ণ এবং মহাভারতের ঘটনা বিশেষ , বিষ্ণুর দশাবতার , যুদ্ধ ইত্যাদির চিত্রায়ন দেখা যায় এই টেরাকোটার অলংকরণে। আবার কিছু মন্দিরের অলংকরণে পঙ্খ এবং পাথরের কাজ দেখা যায়।

বিষ্ণুপুরের বড়ো মন্দিরগুলিকে ঘিরে ভোগকক্ষ , তুলসীমঞ্চ ও নাটমন্দির নির্মাণ এর রীতি রয়েছে । এটি সবথেকে ভালো বোঝা যায় রাধামাধব এবং কালাচাঁদ মন্দির চত্বরে। পরিষ্কার এই মন্দির চত্বর, ভারতীয় প্রত্নতত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত। মদনমোহন মন্দির প্রাঙ্গণেও চারচালা ভোগকক্ষ দেখা যায়।  

বিষ্ণুপুরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হলো রাসমঞ্চ। এই স্থাপত্যটির নির্মাণশৈলীতে মিশ্র সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে। সৌধটির উপরের দিকটি পিরামিডাকৃতি , মাঝের দিকটি বাংলা চালার ন্যায় আবার নিচের খিলানগুলি ইসলামিক স্থাপত্যের মতো। আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে এই মঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেন মল্লরাজ বীরহাম্বির। এর নীচের বেদী মাকড়া পাথরের তৈরী আর উপরের স্থাপত্য ইঁটের।

মল্লরাজত্বের রাজধানী থাকার কারণে বিষ্ণুপুরের আশেপাশে মোট সাতটি বাঁধ রয়েছে। শহরে জল সরবরাহের জন্য নির্মিত এই বাঁধগুলির মধ্যে অন্যতম হলো লালবাঁধ। কথিত আছে লালবাইয়ের সাথে প্রেম চলাকালীন রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ , প্রেমিকার সাথে এই দীঘিতে নৌকাবিহার করতেন।

লালবাঁধ

স্থাপত্য ছাড়াও মল্লরাজদের প্রবল পরাক্রমের একটি প্রতীক দলমাদল কামান। প্রায় ৬৩টি লোহার আংটা পেটাই করে তৈরী করা হয় এই কামান। বর্গী আক্রমণ থেকে বাঁচতে এই কামান গর্জে ওঠে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে। দলমর্দ্দন  থেকে কামানের নামকরণ হয় দলমাদল। কামানের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে বারো ফুট।  

দলমাদল কামান

মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরী বিষ্ণুপুরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হলো একটি তোরণদ্বার। এটি বড় পাথর দরজা নামে পরিচিত। এটিই বিষ্ণুপুরের প্রাচীন দুর্গের উত্তরদিকের প্রবেশপথ। সপ্তদশ শতকে এটি নির্মাণ করেছিলেন মল্লরাজ বীরসিংহ। এখানে তীরন্দাজ এবং বন্দুকধারী সৈন্যদের অস্ত্র চালাবার জন্যে ক্ষুদ্র গর্ত ছিল। এই দ্বিতল দালান থেকেই রক্ষা করা হতো বিষ্ণুপুরের মল্লসাম্রাজ্যকে। এর অদূরেই একটি ছোট পাথর দরজাও দেখা যায়।

দেবতা আরাধনা ছাড়াও এই বিষ্ণুপুর জুড়ে রয়েছে কিছু দেবীমন্দির। এরমধ্যে সবথেকে প্রাচীন মন্দিরটি হলো মা মৃন্ময়ী মন্দির। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মল্লরাজ জগৎমল্ল এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন আনুমানিক ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে। গঙ্গামাটির তৈরী মা মৃন্ময়ীর অপরূপ মূর্তি, মুগ্ধ করে।

দলমাদল কামানের পাশের রাস্তায় রয়েছে মা ছিন্নমস্তা মন্দির। বাংলা ১৩৮০ সালে মেদিনীপুর নিবাসী স্বর্গীয় কৃষ্ণচন্দ্র গুঁই এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। অপূর্ব এই মায়ের মূর্তিটি একটি গোটা শ্বেত পাথর কেটে তৈরী করা।

মন্দির ছাড়াও বিষ্ণুপুর, বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থান ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেরাকোটা শিল্প। যার কিছু ঝলক পাওয়া যায় মন্দির সংলগ্ন দোকানগুলিতে এবং বিশেষ করে পোড়ামাটির হাটে। প্রতি সপ্তাহান্তে এই হাটে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী নৃত্য।

কিভাবে ঘুরবেন – গাড়ি নিয়ে আমাদের বিষ্ণুপুর পৌঁছতে বেলা হয়ে গেছিলো। দুপুরে লাঞ্চের পর আমরা টোটো রিজার্ভ করে আগে গিয়েছিলাম রাসমঞ্চ। গাইড ভাড়া নিয়ে রাসমঞ্চ ঘুরে দেখেছিলাম। সেখান থেকে শ্যামরাই মন্দির। তারপর গিয়েছিলাম জোড় বাংলা, রাধাশ্যাম এবং লালজি মন্দির দেখতে। ওই চত্বরের পাশেই দুটি তোরণদ্বার অবস্থিত, সেগুলো দেখে গিয়েছিলাম মা মৃন্ময়ী মন্দির দেখতে। সেখানেই সন্ধে হয়ে যায়। বিষ্ণুপুর মিউজিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, বিষ্ণুপুর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। সেখানে ফটোগ্রাফি নিষেধ। মিউজিয়াম ঘুরে শেষে পৌঁছেছিলাম পোড়ামাটির হাটে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে প্রায় সন্ধে সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছিলো। পরদিন সকালে আটটার সময় বেরিয়ে পড়েছিলাম বাকি জায়গাগুলো দেখতে। দলমাদল কামান আর তার পাশেই অবস্থিত ছিন্নমস্তা মন্দির দেখে শুরু করেছিলাম। সেখান থেকে একে একে রাধাগোবিন্দ মন্দির , জোড় শ্রেণীর মন্দিররাজি , রাধামাধব মন্দির , কালাচাঁদ মন্দির ঘুরে নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিলাম লালবাঁধ দেখতে। লালবাঁধ দেখে গিয়েছিলাম মদনমোহন মন্দির দেখতে। তারপর বেলা দশটায় হোটেলে পৌঁছে ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে চেকআউট করেছিলাম।

খরচা – দুদিন মিলিয়ে টোটো প্রায় ৭৫০/- টাকা নিয়েছিল। গাইড চার্জ ৩৫০/- টাকা। এছাড়া মাত্র ২৫/- টাকা জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য দিয়ে আপনি রাসমঞ্চ, শ্যামরাই এবং জোড়বাংলা মন্দির ঘুরে নিতে পারেন। মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য ১০/- টাকা।

কোথায় থাকবেন – পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা বিষ্ণুপুরে অনেক রয়েছে। তবে আমার ঠিকানা ছিল নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত কাঠুরিয়া গ্রিন নেস্ট। আন্তরিকতায় ভরা ওনাদের আতিথেয়তা মন কেড়ে নেয়। মনে হয় বারবার আসি। সৌজন্যে শ্রী সজল এবং সৌমাল্য কাইটি। থাকার জন্যে রয়েছে দুটি ঘর যেখানে ২ জনের জন্য থাকার ব্যবস্থা। ২২০০/- টাকা থাকার খরচ। পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন এই ঘরে বসার চেয়ার, লেখার বা পড়ার টেবিলও রয়েছে। থাকা এবং খাওয়া বাবদ আমাদের মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০০০/- টাকার মতো। আমরা খেয়েওছিলাম অনেক কিছু, তার মধ্যে বাঁকুড়ার বিখ্যাত মেচা সন্দেশও ছিল। বিদায় নেবার সময় সজলবাবুরা উপহার স্বরূপ একটি গাছের চারা দিয়েছিলেন। এই ছোট্ট আন্তরিকতা খুব ভালো লেগেছিলো। কাঠুরিয়াতে থেকে শুধুমাত্র বিষ্ণুপুরের মন্দির ছাড়াও প্রকৃতিকেও উপভোগ করতে পারেন। পাখি দেখার শখ থাকলে, অনেক পাখিও দেখতে পাবেন। তবে সঠিক সময়ে যেতে হবে। বুকিং এর জন্যে ওনাদের কল করতে পারেন এই নাম্বারে ৯৪৩৩১-৩৮৩৫২।

কখন যাবেন – গ্রীষ্ম ও বর্ষা বাদ দিয়ে বিষ্ণুপুর এসে ঘুরে নেয়া যায়। দেড়দিনেই ঘুরে ফেলা যায় দর্শনীয় স্থান গুলি। এছাড়াও রাস উৎসবের (নভেম্বরে ) সময় এবং বিষ্ণুপুর মেলার (ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে) সময়ও বিষ্ণুপুর ঘুরে আসতে পারেন।

কিভাবে যাবেন – বিষ্ণুপুরে অনেকভাবে পৌঁছনো যায়। সাঁতরাগাছি স্টেশন থেকে সকাল সাড়ে ছোট নাগাদ ছাড়ে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস। সকাল সাড়ে নয়টায় বিষ্ণুপুর পৌঁছয়। এছাড়া হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে আসতে পারেন আরামবাগ। সেখান থেকে বাসে বিষ্ণুপুর পৌঁছতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। নিজের গাড়ি থাকলে লং ড্রাইভে জয়পুর ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে পৌঁছতে পারেন বিষ্ণুপুর। ভালো লাগবে।

অনন্তগিরি হিলসে রোমাঞ্চকর ট্রেকিং

“অনন্তগিরি” এই নাম শুনলেই মাথায় আসে আরাকু ভ্যালি বেড়াতে গিয়ে সেই কফি প্ল্যান্টেশন দেখার কথা। আমার মতো আপনারা যারা ঘুরতে ভালোবাসেন তাদের কাছে এই নাম আরাকু ভ্রমণের সাথেই জড়িত। প্রথমবার যখন শুনলাম হায়দরাবাদের কাছে অনন্তগিরি হিলস, অবাক হলাম, ভূগোলের জ্ঞানে ভাটা পড়লো। ইন্টারনেটের দৌলতে জানতে পারলাম অনন্তগিরি হিলসের ব্যাপারে।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনন্তগিরি হিলস এ জঙ্গল ভিউ

হায়দরাবাদ শহর থেকে প্রায় ৮০ কিমি দূরে অবস্থিত এই অনন্তগিরি হিলস। অনন্তগিরি হিলসের নিকটবর্তী টাউন ভিকরাবাদ। হায়দরাবাদ শহরে জলের সমস্যা আছে সেটা অনেকেরই জানা। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি যে হায়দরাবাদ শহরের জলের দুটি প্রধান রিসার্ভার ওসমান সাগর এবং হিমায়েত সাগর। এই দুটি লেকের এর জলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্স এই অনন্তগিরি হিলস। অনন্তগিরি হিলস থেকেই উৎপত্তি হয়েছে হায়দরাবাদ শহরের বিখ্যাত নদী মুসি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনন্তগিরি হিলসের উচ্চতা আনুমানিক ৫১০ মিটারের মতো।

শ্বশুরবাড়ি থাকার সুবাদে হায়দরাবাদ শহরে আমার যাতায়াত রয়েছে। থাকার বা খাবার জায়গা নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই। গত বছরে যখন গিয়েছিলাম, তখন পরিবারের সবাই মিলে অনন্তগিরি যাওয়ার প্ল্যান হলো। তখনই অনন্তগিরির ব্যাপারে আরেকটা জিনিস জানতে পারলাম। এই হিলটির প্রায় সিংহভাগ এলাকায় রয়েছে বনাঞ্চল। 

অনন্তগিরি জঙ্গলের মধ্যে

জঙ্গল শুনেই এডভেঞ্চার করার ইচ্ছে জাগলো। সেইমতো একদিন সক্কাল সক্কাল সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম অনন্তগিরি।  পথে ব্রেকফাস্ট করতে দাঁড়িয়েছিলাম। দক্ষিণ ভারতের সেই বরা, সাম্ভার আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট করে পৌঁছতে আমাদের প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছিল। হিল এলাকায় প্রবেশ করার সময় সাইনবোর্ড ফলো করে জানতে পারলাম এই জঙ্গলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, হরিণ, শেয়াল এইগুলি দেখতে পাওয়া যায়। 

দেবাদিদেব মহাদেব

গাড়ির পার্কিং এরিয়া হিলস থেকে একটু দূরে। তবে গাড়ি থেকে নামতেই অবস্থা খারাপ হওয়ার জোগাড়। ডিসেম্বর মাসেও কাঠফাটা গরম। অগত্যা টুপি পড়তে হলো। জ্যাকেট ও খুলে গাড়িতে রেখে এগোতে লাগলাম। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে হেঁটে চলে একটু কঠিন। একটু এগোতে দেখতে পেলাম হিলের ওপরে একটা ওয়াচ টাওয়ার। লক্ষ্যস্থির করা গেলো। কিন্তু যাওয়ার রাস্তা পাহাড়ে ওঠার মতো আঁকা বাঁকা, চড়াই উতরাই। দেখতে পেলাম অনেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের গ্রুপ, কিছু পরিবারও ওই রাস্তায় ট্রেক করে চলেছে টাওয়ার এর দিকে। সাহস পেয়ে আমিও এগিয়ে চললাম। আমার এই ট্রেকিং এর সাথী হিসেবে পেলাম ছোট্ট তিতলিকে। তিতলি আমার স্ত্রীর ভাইঝি।

প্রথমে চড়াই রাস্তায় হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে হাঁপাতে লাগলাম। পাহাড়ের চড়াই আরো বাড়তে লাগলো। জঙ্গল আরো ঘন হতে লাগলো। তার ওপর আমার সাথে তিতলি। এইসব ক্ষেত্রে অন্যের দায়িত্ব নেয়াও একটু ঝুঁকিপূর্ণ। হয়তো টাওয়ারে ওঠার আগেই থেমে যেতে হতে পারে। কিন্তু তা হলো না। এগিয়ে যেতে যেতে পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারের সামনে। মন জয় করলো তিতলির এডভেঞ্চার করার ইচ্ছে এবং সর্বোপরি তাতে টিকে থাকা। পুরো ট্রেকিং এর সেই অভিজ্ঞতা নিচের ভিডিও লিংকে উপভোগ করতে পারবেন।

ওয়াচ টাওয়ারে উঠতে প্রবেশ মূল্য দিতে হয় ১০ টাকা। সেইমতো টিকিট নিয়ে উঠলাম টাওয়ারে।এরই মাঝে তিতলির অভিভাবকরা আমায় ফোন করে ফেলেছেন। কোথায় কি করছে সমস্ত তাদের জানিয়েছি। সব কিছুর পরে টাওয়ারের টপ ফ্লোরে উঠলাম। নীল আকাশের নীচে অনন্তগিরির পাহাড়ের ভিউ অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। পুরো জঙ্গল এলাকার ভিউ দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। এতটা সবুজ তো দৈনন্দিন জীবনে দেখতে পাওয়া মুশকিল। টাওয়ারে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে, অনেক ছবি তুলে নীচে নেমে এলাম।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনন্তগিরি হিল ভিউ

পাহাড়ের চড়াই রাস্তায় ওঠা যতটা সোজা, ওই রাস্তায় নেমে আসা ততটাই কঠিন। পা হড়কে গেলেই দুর্ঘটনা। তার ওপর রয়েছে বাঁদরের উৎপাত। ক্যামেরা নিয়ে থাকলে একটু ভয় তো লাগবেই। সবকিছু পেরিয়ে সাবধানে তিতলিকে নিয়ে নীচে নেমে এলাম। গাড়ি পার্কিং এলাকার পাশে একটা শিবমন্দির রয়েছে। মন্দিরের পাশে রয়েছে একটা প্রকান্ড নন্দী মূর্তি। কিছু ছবি তুললাম, আর কিছু স্থানীয় ছেলের অনুরোধে তাদের ছবি তুলেও দিলাম। গোটা ট্রেকিং রুটে দেখা মিললো পেট সাদা ফিঙে, বনমুরগি আর অরেঞ্জ বা রেড ব্রেস্টেড ফ্লাই ক্যাচারের। ইচ্ছে ছিল ইন্ডিয়ান রোলার দেখার। ইন্ডিয়ান রোলার তেলেঙ্গানার স্টেট বার্ড। কিন্তু দেখা পেলাম না। এরপর রওনা হলাম অনন্তগিরির আরেক আকর্ষণ পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের দিকে।

নন্দী মূর্তি

অনন্তগিরি হিলসের এক প্রাচীন মন্দির পদ্মনাভ স্বামী মন্দির। জনমত অনুযায়ী এই মন্দির দ্বাপর যুগে নির্মাণ করেছিলেন ঋষি মার্কন্ড। মন্দিরের গঠনশৈলী চিরাচরিত দাক্ষিণাত্য রীতি মেনে তৈরী।

পদ্মনাভ স্বামী মন্দির

যখন মন্দিরে পৌছেছিলাম তখন প্রায় একটা বাজে। ভয় ছিল বন্ধ না হয়ে যায়। ভাগ্য ভালো ছিলো বলে ভগবানের দর্শন পেয়ে গেলাম। এক স্থানীয় লোকের কাছে শুনলাম মন্দিরের পেছনে যে জঙ্গল এলাকা রয়েছে, সেইখানে প্রচুর পাখির দেখা মেলে। কিন্তু সেই এলাকায় ফেন্সিং পেরিয়ে যেতে হবে এবং প্রচুর গরম ছিল বলে আর গেলাম না। এসব ক্ষেত্রে সকাল সকাল এলে ভালো হয়। বাচ্চারা সঙ্গে ছিল বলে লাঞ্চ করার তোড়জোড় শুরু করতে হলো। সেইমতো পৌঁছলাম হরিথা রিসোর্টে। সেইখানের রেস্তোরাঁয় লাঞ্চের অর্ডার দেয়া হলো। অনেক সকালে উঠতে হয়েছিল বলে সবাই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই লাঞ্চ সেরে ফিরে চললাম।

কিভাবে যাবেন: হাওড়া স্টেশন থেকে ফলকনামা এক্সপ্রেস যাচ্ছে সেকেন্দ্রাবাদ। সকাল সাড়ে আটটায় ছেড়ে পৌঁছচ্ছে পরদিন সকাল সাড়ে দশটায়। হায়দরাবাদ থেকে গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন অনন্তগিরি। আমরা ইনোভা বুক করে গিয়েছিলাম, খরচ হয়েছিল ৬৫০০ টাকা।

হরিথা রিসোর্টের রেস্তোরাঁ

কোথায় থাকবেন: হায়দরাবাদ ভ্রমণে এলে থাকার জায়গার অভাব হবে না। গোআইবিবো থেকে পেয়ে যেতে পারেন প্রচুর হোটেলের সন্ধান। তবে সবথেকে ভালো তেলেঙ্গানা সরকারের হরিথা হোটেল। প্রতিটি জায়গাতেই হরিথা হোটেল রয়েছে। টাকা এবং ফেসিলিটিস এর দিক থেকে এটি ভালো অপশন। নীচের লিংক থেকে বুকিং করতে পারেন।

https://tourism.telangana.gov.in/hotels/AnathagiriHillsResort

অনন্তগিরি তে থাকতে হলে হরিথা রিসোর্ট বুক করতে পারেন।

https://tourism.telangana.gov.in/hotels/ThePlazaHotel

দেবীদের স্থান সিঙ্গুর

আজ আপনাদের বলবো সিঙ্গুরের কথা। রাজনৈতিক কারণে জনপ্রিয় হলেও সিঙ্গুরের একটি প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছোট করে সে ইতিহাস জেনে রাখা ভালো। খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে কলিঙ্গের রাজকুমারীর পুত্র সিংহবাহু, যিনি এই নাম একটি সিংহকে হত্যা করে অর্জন করেছিলেন, তিনি সরস্বতী নদীর তীরে নিজের রাজধানী তৈরী করেন যার নাম দেন সিংহপুর

সিঙ্গুরের ভ্রমণ ভিডিও

সিংহবাহুর পুত্র বিজয় সিংহ নিজের মন্দ কাজের জন্য রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। সাতশো অনুচর নিয়ে তিনি পাড়ি দেন এক দ্বীপে, সে দ্বীপ জয় করে নিজের রাজ্য সেখানেই স্থাপন করেন ও রাজ্যের নাম দেন সিংহল। যা এখন শ্রীলংকা নাম পরিচিত। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিক সিংহপুরকে ভারতের নানা জায়গায় চিহ্নিত করেন। কেউ সিংহপুরকে অন্ধ্রপ্রদেশে চিহ্নিত করেন তো কেউ রাজস্থানে। কিন্তু ইতিহাসবিদ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে সিংহপুর হলো বর্তমানের সিঙ্গুর।

সিঙ্গুর

সিঙ্গুর স্টেশন থেকে রেলগেট ক্রস করে পৌঁছে গেলাম সিঙ্গুর বাজার। সেখান থেকে টোটো করে প্রথমে এলাম ডাকাত কালী মন্দির। অনেক আগে এই এলাকা ডাকাতির জন্যে প্রসিদ্ধ ছিল। কথিত আছে একবার মা সারদা অসুস্থ রামকৃষ্ণদেব কে দেখতে কামারপুকুর থেকে দক্ষিনেশ্বর যাচ্ছিলেন। এই এলাকাতেই তার পথ আটকায় একদল ডাকাত। পরে তার মুখে মা কালির অবয়ব দেখতে পাওয়ায়, ডাকাতরা তাঁকে সেই রাত্রে এখানে আশ্রয় দ্যায় এবং খেতে দ্যায় চাল ও কড়াইভাজা। সেই থেকে ডাকাতরাই এখানে কালীপুজোর সূচনা করে, পরে এখানে মন্দির নির্মিত হয়।

ডাকাত কালী মন্দির

আজও মা কালীকে ভোগ স্বরূপ চাল ও কড়াইভাজা দেয়ার প্রথা প্রচলিত। মা কালী এখানে নিত্যপূজিত, আর আপনি চাইলে দিনের যে কোনো সময় এখানে এসে মা কালির দর্শনলাভ করতে পারেন। আমরা এখানে দুপুরবেলায় পৌঁছেছিলাম। কালীমন্দিরের সামনেই একটি নাটমন্দির আছে। প্রতিবছর কালীপুজোর সময় এখানে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। ত্রিখিলান প্রবেশদ্বারের এই মন্দিরের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষন করা হয়। শ্রাবন মাসে জলযাত্রীরা তারকেশ্বর যাবার পথে এই মন্দিরে মা কালির দর্শনের জন্য ভীড় জমান।

Map Location: https://goo.gl/maps/kBTsMyLWEXhGgCZ88

ডাকাত কালী প্রতিমা

রাস্তার পাশেই একটি আটচালা শিবমন্দির আছে, তা দেখে একটু এগিয়ে পৌঁছলাম বৈদ্যবাটী তারকেশ্বর রোডে। এই রোড ধরে পুরুষোত্তমপুরের দিকে কিছুটা হাঁটলেই রাস্তার বামদিকে আছে বন বিশালাক্ষি মন্দির। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই মন্দিরে একটি প্রতিষ্ঠা ফলক রয়েছে, যদিও ঠিকঠাক পড়তে পারিনি তবুও এই মন্দির থেকে ১১৩৫ বঙ্গাব্দের মধ্যে স্থাপিত। মন্দিরের টেরাকোটার কাজ কিছুটা নষ্ট হয়ে গেলেও, যা আছে তার গুরুত্ব অপরিসীম।

বন বিশালাক্ষী মন্দির
মন্দিরের টেরাকোটার কাজ

এই মন্দিরে কয়েকটি পাথরকে পূজা করা হয়, কোনো মূর্তি নেই। মন্দিরে দুবার পুজো হয় একটি সকালে, আরেকবার মন্দির বিকেল ৫ টার পর খোলে। বন্ধ মন্দিরের দরজায় দুটো ছোট জানালা করা রয়েছে, তা দিয়েই দর্শন করা যায়। কথা বলেছিলাম কয়েকজন স্থানীয়দের সঙ্গে, তারা জানালেন এই মন্দির অনেকবার সংস্কারের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু যেই উদ্যোগ নিয়েছে তার ক্ষতি হয়েছে। মন্দিরের পাথরের মূর্তি পাশের পুকুরের জলে ডুবে রয়েছে।

Map Location: https://goo.gl/maps/5THHyVaG6F5i18159

মন্দিরের বিগ্রহ

এই মন্দির থেকে নসিবপুরের দিকে একটু যেতেই দেখলাম বিশালাক্ষি তলা। এখানেও মা বিশালাক্ষির পুজো হয়। মন্দিরের দেবী দর্শন করে চলে এলাম নসিবপুর – চন্দননগর রোডের ক্রসিংয়ে।

বিশালাক্ষী মা

এখান থেকে টোটো করে পৌঁছে গেলাম নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা। এই যে মন্দিরটি নীচে দেখছেন, এটি মা ব্রহ্মময়ী মন্দির। প্রায় ৮০-১০০ বছরের এই মন্দিরের দেবী স্থানীয় লোকেদের কাছে খুবই জাগ্রত। মন্দিরটি একটি আশ্রমের ন্যায় পরিচালিত।

নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা

মন্দির চত্বরের পিছনে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী, যা সংস্কারের অভাবে একটি খালে পরিণত হয়েছে। মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে,ডানদিকের রাস্তা চলে গেছে চন্দননগর আর বামদিকের রাস্তা চলে গেছে নসিবপুর। এই মন্দির আস্তে গেলে নসিবপুর স্টেশনে নেমে চন্দননগরের অটো ধরে নামতে হবে নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা তে।

মা ব্রহ্মময়ী

Map Location: https://goo.gl/maps/LD3WNg5GoXL9sJmB9

সিঙ্গুর হাওড়া – তারকেশ্বর রেল শাখার দ্বাদশতম স্টেশন। হাওড়া থেকে তারকেশ্বর , সিঙ্গুর বা আরামবাগ লোকাল ধরে পৌঁছতে পারেন সিঙ্গুর ও তার ঠিক আগের স্টেশন নসিবপুর। সেখান থেকে ঘুরে নিতে পারেন এই জায়গাগুলি।

দুর্গাপুজোয় চকদিঘি

চকদিঘী বর্ধমান জেলার জামালপুর ব্লকের অন্তর্গত একটি গ্রাম। হ্যাঁ জায়গাটিকে গ্রামই বলা চলে। কিন্তু এই গ্রামের এক ঐতিহাসিক দিক আছে যা প্রচারের আলো থেকে কিছুটা হলেও দূরে। এই গ্রামে প্রায় ৩০০ বছর পুরোনো এক জমিদারির নিদর্শন হিসেবে একটি এস্টেট রয়েছে। বাংলায় জমিদারি প্রথা অবলুপ্ত হয়ে গেলেও , এই এস্টেট গুলো দেখতে পেলে ইতিহাসের সম্মুখীন হওয়া যায়। আমিও সেরকমই একটা শখ পালন করি। প্রায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি পুরোনো ইতিহাসের খোঁজে। কখনও মন্দির , কখনো স্থাপত্য, এই সোনার বাংলা আমাকে কোনোদিন হতাশ করেনি।

সিংহ রায় এস্টেট

এরোমি একদিন প্ল্যান করে বেরিয়ে পড়লাম চকদিঘি রাজবাড়ির পুজো দেখতে। হুগলি জেলায় ধনিয়াখালী বলে একটি জনপ্রিয় জায়গা রয়েছে , সেই ধনিয়াখালী রোড ধরে যে রাস্তা সোজা মেমারির দিকে গেছে সেদিক দিয়েই গাড়ি নিয়ে পৌঁছলাম চকদিঘি। চকদিঘির এই সিংহ রায় এস্টেট চিনতে খুব অসুবিধা হয়নি।

তুলসীমঞ্চ

এস্টেটের গেট দিয়ে ১০০ মিটার মতো গেলেই পরে এই জমিদারবাড়ির বিশাল বৈঠকখানা। বৈঠকখানার সামনেই তুলসীমঞ্চ। কয়েকটি ছবি তুলতেই দেখা হলো এই এস্টেটের ম্যানেজারের সাথে। ওনার থেকে জানতে পারলাম এই জমিদার বাড়ির পুরোনো ইতিহাসের কথা।

অষ্টাদশ শতকে জমিদার ললিত মোহন সিংহ রায় এই এস্টেট বানিয়েছিলেন। কিন্তু এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নাল সিংহ। নাল সিংহের প্রপৌত্র এবং ললিত মোহনের পুত্র শ্রীসারদা প্রসাদ সিংহ রায়ের আমলেই এই জমিদারি সমৃদ্ধি লাভ করে।

জমিদার বাড়ির অন্দরমহল

বয়সে ১৪ বছরের ছোট এই সারদা প্রসাদের সঙ্গে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের সখ্যতা ছিল। ঈশ্বর চন্দ্র প্রায়ই চকদিঘিতে আসতেন বলে , সারদা প্রসাদ এই এস্টেটে তার জন্য ঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। পুকুরের পারে এই ঘরের নাম জল মহল ছিল। সংস্কারের অভাবে এই ঘরের অবস্থা ভগ্নপ্রায়।

জল মহল

এই পরিবারের অনেক কচিকাঁচার বিদ্যাসাগরের থেকে শিক্ষাগ্রহন করার সৌভাগ্য মেলে। সিংহ রায় পরিবারের সম্ভবতঃ সপ্তম প্রজন্মের সদস্য শ্রীঅম্বরিশ সিংহ রায় এখন কলকাতা নিবাসী। স্থানীয় কর্মচারীরা এই এস্টেটের রক্ষণাবেক্ষন করেন।

সারদা প্রসাদ ও বিদ্যাসাগর

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনাদের জানিয়ে রাখি যে স্বনামধন্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় এই এস্টেটে এসেছিলেন একটি বাংলা ছবির শুটিং করতে। জানেন কি ছবিটির নাম ? ঘরে বাইরে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সহ অন্নান্য কলাকূশলীরাও এখানে এসেছেন। মনোজ মিত্রের একটি ইন্টারভিউ থেকে জানা যায়, তখন এই বাড়িতে শুধু শুটিং হতো। চকদিঘিতে কোনো থাকার জায়গা ছিল না , তাই বর্ধমানে সবার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রোজ সেখান থেকে গাড়ি করে এসে এই বাড়িতে শুটিং করতে হতো।

ঘরে বাইরের সিন্

সাত পুরুষ ধরে চলে আসা এই পরিবারের দুর্গাপুজোর বয়সও প্রায় ৩০০ হতে চললো। প্রাচীন এই একচালা প্রতিমার দর্শনার্থীর অভাব নেই। অনেকেই আসেন মা দুর্গার দর্শন করতে ও এস্টেটের ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে। তবে খুব কম লোকেরাই খোঁজ নেন এই জমিদারির ইতিহাসের।

দূর্গা মণ্ডপ

কথা বলেছিলাম এ পরিবারের কুলপুরোহিত শ্রী ভোলানাথ চতুর্বেদীর সঙ্গে। তিনি জানান , তাঁরা প্রায় ৭ পুরুষ ধরে এই পরিবারের পুজোর সাথে যুক্ত। এই বছরের দুর্গাপুজো তিনিই করেছেন। বনেদি বাড়ির এই পুজো দেখতে পারাটাই এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

আজ চকদিঘির অদূরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া স্বীকৃত খাজাঞ্চি বাটি (৯৮৩০৬-৯৫৮২৪) রয়েছে , যেখানে থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থাও রয়েছে। ফোন করে খোঁজ নিতে পারেন। শুধু দুর্গাপুজো দেখতে এলে খাজাঞ্চি বাটিতে মধ্যাহ্নভোজ করতে পারেন। থাকার দরকার হবে না। তবে একবার এই জমিদারবাড়ি ঘুরেই আসতে পারেন , পুজোর সময় হলে আরো ভালো লাগবে।

কিভাবে পৌঁছবেন : কলকাতা থেকে গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে চলে আসতে পারেন চকদিঘি। এছাড়া ট্রেনে আস্তে চাইলে আসুন তারকেশ্বর। সেখান থেকে বর্দ্ধমানগামী বাসে করে পৌঁছতে পারেন চকদিঘি। জমিদার বাড়ির ম্যাপ লোকেশন দিয়ে রাখলাম , আপনাদের কাজে লাগতে পারে।

https://goo.gl/maps/XNgqLz8V8HpC1h3DA

বলে রাখা ভালো : ভিডিও তোলার অনুমতি নেই , স্টিল ফটো তুলতে পারেন।

আগাহ খানের প্রাসাদ

ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, এই প্রাসাদেই মহাত্মা গান্ধী জীবনের প্রায় ২ বছর গৃহবন্দী ছিলেন। সেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ের কথা। ২০১৫ তে একবার এই প্রাসাদ দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম,আজ গান্ধীজির জন্মদিনে আপনাদের সাথে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই।

বছর পাঁচেক আগে সম্ভবতঃ অক্টোবর মাসের এক পড়ন্ত বিকেলে, হঠাৎ করে বৌদির উদ্যোগে পৌঁছলাম আগাহ খানের প্রাসাদে। তখনও অবধি কোনো ধারণা ছিল না এই প্রাসাদের ব্যাপারে। শুধু বৌদির থেকে শুনেছিলাম এখানে গান্ধীজি ব্রিটিশ আমলে নজরবন্দি ছিলেন। সত্যি কথা বলতে আমার খুব একটা যে আগ্রহ ছিল না প্রাসাদ দেখার। তবুও বিকেলে একটু ঘুরতে বেরোনোর নামে স্থির করলাম দেখেই আসি। বলতে ভুলে গেছি, এই প্রাসাদ পুনে শহরে অবস্থিত। কিভাবে যাবেন বলাই বাহুল্য , আগাহ খান প্যালেস বললে পুনে স্টেশন বা এয়ারপোর্ট থেকে যেকোনো অটো, ওলা বা উবের আপনাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবে। তাছাড়া গুগল ম্যাপ তো আছেই।

আগাহ খানের প্রাসাদ

প্রাসাদে ঢুকলাম টিকিট কেটে। কোনো ভীড় ছিল না, আমরাই ছিলাম শুধু। প্রাসাদ প্রাঙ্গনে ঢুকতেই চোখে পরে সেই বিশাল বড়ো প্রাসাদ যা প্রায় ৭ একর জায়গার ওপরে বানানো। প্রাসাদের ভেতরে অনেককটি হল ঘর ছিল। সবগুলিতে ঢোকার অনুমতিও মেলেনি। মোট প্রাঙ্গনের জায়গা ১৯ একর, যার ৭ একরের ওপরে তৈরী এই প্রাসাদ। মনে মনে ভাবছিলাম, গান্ধীজি তো বেশ ভালোই ছিলেন। এতো বড়ো প্রাসাদে নজরবন্দি থাকাও ভাগ্যের ব্যাপার। ধীরে ধীরে সব ঘর দেখে পৌঁছলাম সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘরে। গান্ধীজির শয়নকক্ষ।

বিশাল প্রাসাদের সামনেটা

ওনার ব্যবহৃত সব জিনিস সেরোমি সাজিয়ে রাখা। এই একটি ঘরেই নিজে বন্দি হয়ে থেকেছেন প্রায় ২ বছর। পাশের ঘরে গান্ধীজির স্ত্রী কস্তুরবা দেবী থাকতেন। আর ছিল তাদের ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জাম। একটি বেশ বড়ো বাথরুমও ওই ঘরের সাথে লাগোয়া ছিল। একটু ইতিহাসের তথ্য ঘাঁটলে জানা যাবে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজিকে এই বাড়িতে গৃহবন্দী করে। তারিখ ছিল ৯ই অগাস্ট ১৯৪২। গান্ধীজি বন্দি থাকেন ৬ই মে ১৯৪৪ অবধি। এই বাড়িতেই তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা দেবী ২২ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৪ সালে দেহত্যাগ করেন। গান্ধীজির তৎকালীন সেক্রেটারি মহাদেব দেশাইও এই বাড়িতেই মারা যান। ওই গৃহবন্দীর সময় গান্ধীজির সাথে সরোজিনী নাইডুও ছিলেন। ২০০৩ সালে কেন্দ্র সরকার এই প্রাসাদকে জাতীয় গুরুত্ব হিসেবে স্বীকার করেছে। তারপর থেকে সাধারণ মানুষের জন্যে টিকিট কেটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব জায়গার ছবি তোলার অনুমতি ছিল না, যেকটি তুলতে পেরেছিলাম সেগুলো দিয়ে দিলাম।

ওনার ব্যবহৃত কিছু জিনিস

আজ এই অতিমারীর সময়ে যখন নিজে ২ দিনও বাড়ি বসে থাকতে পারছি না, তখন ভাবছি কি করে একটা লোক ১০০ কোটি দেশবাসীর কথা ভেবে নিজে ২ বছর একটামাত্র ঘরে লেখাপড়া করে কাটিয়ে দিলেন। তার আদর্শবাদ ছিল সেই ভিত যা দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সফলভাবে স্থাপিত হয়েছিল। ভাবতে পারেন এক অহিংসাবাদিকে কেন ভয় পেতো ব্রিটিশ সরকার ? এর কারণ তার এই অহিংসাবাদকে মেনে নিয়ে চলা এতো সহজ কাজ নয়, যেখানে ধর্মের কারণে এক মানুষ অন্য মানুষকে মেরে ফেলতে চাইছে। এই মতবাদ নিয়ে বিপুল পরিমান জনসমর্থন জোগাড় করাও সহজ কাজ ছিল না। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তার এই কৃতিত্বের কথা স্বীকার না করলেও, অনুরোধ রইলো তাঁর কাজকে যেন কালিমালিপ্ত না করা হয়।

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী

আজ এই ২রা অক্টোবরে জাল খবরে মাথা না গলিয়ে, একবার গান্ধীজির ইতিহাসটা পড়েই দেখুন না। অন্তত উইকিপিডিয়া পেজটি পরে নিন। সঠিক তথ্যগুলি জেনে নিন।

ত্রিনাথ মাকালী ও রাবড়ি

লেখাটার নামটা একটু অদ্ভুৎ , তাই না ? এটাই ভাবছেন তো? আপনাকে বলে রাখি, এটিও আমার এক আদ্যোপান্ত ভ্রমণ কাহিনী। হুগলি জেলারই তিনটি জায়গা কয়েক ঘন্টার মধ্যে ঘুরে ফেলবো, ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম একদিন দুপুর ২টোর সময়। সঙ্গে এক গাড়ি ও গুগল ম্যাপ। ব্যাস শুরুতেই চললাম বনমালীপুর , ত্রিনাথ দর্শনে।

ত্রিনাথ মন্দির

প্রথমেই বলি , আপনি এরম কি কখনো শুনেছেন যে সারা ভারতে মোট ৪ টি মন্দিরের একটি এই হুগলি জেলায়? একটু অস্বাভাবিক হলেও, এটি সত্যি। সদ্গুরু শ্রী নারায়ণ মহারাজ এর শিষ্যরা সারা ভারতে চার ব্রহ্মদত্ত ধাম বানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথম ধাম জলকোটি, মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত। দ্বিতীয়টি কন্যাকুমারীতে আর তৃতীয় মন্দিরটি এই বনমালিপুরে তৈরী হয়েছে। চতুর্থ মন্দিরটি সম্ভবতঃ হিমাচল প্রদেশে তৈরী হবে।

মন্দিরের সামনে

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন মন্দির ঘুরে বেড়ানোর সখ রাখি না; যদি না, সেই মন্দিরের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট থাকে। বুঝতেই পারছেন, সারা ভারতে কত মন্দির আছে! এরম অবস্থায় আমি একদিন ইন্টারনেটে এই মন্দিরের ছবি দেখি, কিছু স্থানীয় লোকেদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এ মন্দির বিশাল বড়ো। কত্তোবড় , এই কৌতুহলবশতঃ পৌঁছলাম ব্রহ্ম দত্ত ধাম। হ্যাঁ এই নামেই মন্দিরগুলো পরিচিত।

মন্দিরের প্রবেশদ্বার

এতো বড় মন্দির আমি আমার জীবতাবস্থায় দেখিনি। কাশি বিশ্বনাথ দর্শন করেছি , ভীমাশঙ্কর এ গেছি, আরও অনেক জায়গাতে গিয়েছি, কিন্তু এতো বড় মন্দির দেখিনি। এ মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন ত্রিনাথ, মানে ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং মহেশ্বর। মন্দির অনেকটাই তৈরী হওয়া বাকি রয়েছে, তবে পুরো তৈরী হলে একসাথে অন্তত হাজার হাজার লোকেরা মন্দিরে প্রবেশ করে পুজো দেখতে পারবে।

মন্দিরের ভেতরে

মন্দিরের চারিপাশে থাকার ব্যবস্থাও হচ্ছে, সম্ভবতঃ মন্দিরের পূজারী ও অন্যান্যদের জন্যে। মন্দিরে ঢুকতেই একটি বড়ো মিনার আছে, মাঝামাঝি রয়েছে বিশাল বড়ো মন্দির ও চারপাশে থাকার জায়গার মতো তৈরী হচ্ছে। ছবিগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন। যাই হোক মন্দির দর্শন করে রওনা দিলাম পরের গন্তব্যের দিকে।

রামপাড়া কালীবাড়ি

১ ঘন্টার মধ্যেই এসে পৌঁছলাম, রামপাড়া কালীবাড়ি। এটি হুগলি জেলার প্রাচীন কালিবাড়িগুলির মধ্যে একটা। প্রায় ৩০০ বছর ধরে মাকালী সিদ্ধেশ্বরী রূপে এখানে পূজিত হচ্ছেন। তখনকার দিনের নন্দীবাড়ির পুজো এটি। তারা সেখানকার জমিদার ছিলেন। ঠাকুরদালানের পুজো দেখবার সুযোগ সামনে থেকে কালিবাড়িটিকে দেখে অনুভব করলাম।

ঠাকুরদালান

কালীবাড়ির পিছনে এখনো সেই জমিদার বাড়ি রয়েছে। বাড়ির গঠনশৈলী দেখেই বোঝা যায় সেকেলের আভিজাত জমিদার পরিবার, কেমন ভাবে দিন কাটিয়েছেন। সেই বাড়িতে এখনো লোকেরা থাকেন।

বিশেষ কারো সাথে কথা বলিনি ইতিহাস সম্পর্কে , তবে ভালোভাবে জানতে রামপাড়া কালীবাড়ির উইকিপিডিয়া পেজটি পরে দেখতে পারেন। কালীবাড়ির পাশেই এক জগন্নাথ মন্দির রয়েছে , সেটিও দর্শন করলাম। এরপর বেরোলাম পরের গন্তব্যের দিকে।

জমিদার বাড়ির সামনেটা

গ্রামের নাম রাবড়ি

রাবড়ি আমরা প্রত্যেকেই খেয়েছি, কিন্তু একদিন ফেসবুকে জানতে পারি যে আমার বাড়ির কাছেই এক এমন গ্রাম রয়েছে, যেখানে প্রতি বাড়িতেই তৈরী হয় রাবড়ি। বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার , ঠিক করলাম একদিন গিয়েই দেখবো ব্যাপারটা কি! আমার এক ভাই অতনুর বাড়ির খুব কাছেই এই গ্রাম। বারুইপাড়া থেকে যাওয়া যায়। যখন ওর সাথে এইটা শেয়ার করলাম, ও বললো দেখে জানাবে। তারপর হটাৎ করে একদিন অতনু আমাকে জানালো, ও গিয়ে দেখেছে এবং খেয়েওছে। যা বললো তাতে মনে হলো, সে রাবড়ি খাওয়া মানে এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। ব্যাস আর দেরি করিনি। এই ছোট্ট ভ্রমণেই প্ল্যান করে ফেললাম রাবড়ি গ্রাম যাওয়ার।

রামপাড়া থেকে যখন রাবড়ি গ্রাম পৌঁছোই , তখন প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। তাই ছবি বিশেষ তোলা হয়নি। যা ছবি দেখছেন সবই অতনুর তোলা। এই গ্রামে কখনো গেলে অবশ্যই হেমা মুক্ত ভবনে যাবেন। ওঁনাদেরি বাড়ির রাবড়ি বিখ্যাত। রাবড়ির সাথে সরভাজাও পাওয়া যায়। আমরা ১ কেজি মতো কিনলাম, আর তার সাথে নিলাম খান কুড়ি সরভাজা। রাবড়ি এনারা কলকাতা ও শহরতলির অনেক মিষ্টির দোকানেই সাপ্লাই দেন। আমরা নিয়েছিলাম ২৮০ টাকা কেজিদরে। রাবড়ি গ্রাম থেকে বাড়ি ফিরেই আর তর সইতে পারলাম না। রাবড়ি খেয়ে দেখলাম, সত্যি বলছি খুবই ভালো খেতে। তবে সরভাজাটা মোটামুটি , কারণ ওর থেকেও ভালো সরভাজা আমি খেয়েছি।

হেমামুক্ত ভবন (ছবি – অতনু মারিক)

কিভাবে যাবেন

ব্রহ্মদত্ত ধাম : হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে বারুইপাড়া লোকালে আগে বারুইপাড়া আসুন। বারুইপাড়া স্টেশন থেকে অটো পাবেন বনমালিপুর মন্দির যাওয়ার।

রামপাড়া কালীবাড়ি ও রাবড়ি গ্রাম : এই দুই জায়গাতে পৌঁছতে গেলে আপনাকে বারুইপাড়া বা ডানকুনি এসে বাস বা অটো ধরে পৌঁছতে হবে আইঁয়া। এখান থেকে দুটি গ্রামেই পৌঁছনো খুবই সহজ। টোটো বা রিক্সা পেয়ে যাবেন।

চৈতন্যময় পানিহাটি

গৌড়ের রাজা বল্লাল সেনের আমল থেকেই পানিহাটির নাম ইতিহাসের পাতায় রয়েছে। তখন “পণ্যহাটি” বলেই সবাই চিনতো। গঙ্গানদীর তীরে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ হাট বসতো এইখানে। পণ্যহাটি থেকেই ধীরে ধীরে আজকের পানিহাটি বলেই সবাই চেনে। পানিহাটির ইতিহাস কিন্তু এখানেই থমকে নেই আজ থেকে হাজার বছর আগেও বিভিন্ন পুস্তকে পানিহাটির নাম পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় পানিহাটির হাটে তখনকার দিনে শিংয়ের চিরুনি পাওয়া যেত। তা খুব বিখ্যাতও ছিল। নদীপথে ও স্থলপথে বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে বণিকরা আসতেন মালপত্র কেনাবেচা করার জন্যে।

এই পানিহাটি চৈতন্যময় হয়ে উঠলো যখন শ্রীচৈতন্যদেব এখানে প্রথমবার পদার্পন করলেন। তিনি পুরী যাবার পথে একবার পানিহাটিতে আসেন। দ্বিতীয়বার বৃন্দাবন যাবার পথে পানিহাটিতে আসেন। পানিহাটির এক ব্রাহ্মণ পন্ডিত শ্রীগঙ্গানারায়ণ নিজের বাড়িতে প্রথম মদনমোহন জিউ এর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে শ্রীগঙ্গানারায়ণের পৌত্র শ্রীরাঘব পন্ডিতের সাথে স্বয়ং চৈতন্যদেব ওই বিগ্রহের পূজা করেন। রাঘব পন্ডিতের বাড়িতে ঠাকুরের আগমন হয় যখন তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে পানিহাটিতে আসেন। এই রাঘব পন্ডিতের বাড়ির তৈরি ঝালি আজও পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাঘব পন্ডিতের গৃহ আজ রাঘব পাঠভবন নামে পরিচিত। ভেতরে মদনমোহন জিউয়ের পুজো নিয়মিত হয়।

চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দির , পানিহাটি

শ্রীচৈতন্যদেব প্রথমবার যে ঘাটে পদার্পন করেন তা চৈতন্যঘাট নামে পরিচিত হলেও সেই ঘাট আজ আর নেই। মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত পুরোনো ঘাটটিকে হয়েছে পৌরসভা থেকে একটি নতুন ঘাট বানিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রবীণ মানুষেরা অনেকেই বলেন সেই অক্ষয় বটগাছের কথা , যা ওই ঘাটে আজও বিদ্যমান। এই গাছের নিচেই মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যনন্দ কীর্তন করেছিলেন। পানিহাটিতে মহাপ্রভুর আগমন উৎসব বাংলার কার্তিক মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে পালন করা হয়।

দই চিড়ে , দণ্ড মহোৎসব

ই শ্রীরঘুনাথ, যিনি সপ্তগ্রামের জমিদার গোবর্ধন দাসের ছেলে ছিলেন, অল্প বয়স থেকেই বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আকর্ষিত হন। শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সাক্ষাতের জন্যে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে করতে এসে পৌঁছন পানিহাটি। তার উদ্দেশ্য ছিল ঠাকুরের দেখা পাওয়া ও দীক্ষালাভ করা। তিনি পানিহাটিতে যখন শ্রীনিত্যানন্দর দেখা পেলেন , নিত্যানন্দ ঠাকুর দীক্ষা তো দিলেন কিন্তু এক অভূতপূর্ব দন্ডে দণ্ডিত করলেন। কারণ কি ছিল ? রঘুনাথ তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী এবং সংসার ত্যাগ করে এসেছিলেন তাই। দণ্ড ছিল সমস্ত সংকীর্তনরত ভক্তমণ্ডলীকে চিড়ে দই সহযোগে ফলার বিতরণ। এই উৎসবই দণ্ড মহোৎসব নামে পরিচিত। এই উৎসব প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। অনেকে এঁকে চিড়ে দই উৎসবও বলে থাকেন। এ বছরও এই উৎসব পালিত হয়েছে কিন্তু পুরো উৎসবই ছিল জাকঁজমকহীন। শ্রীচৈতন্য কথামৃততে এই ঘটনাগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়।

পানিহাটি রাঘব পাটভবন
মদনমোহন জিউয়ের মন্দির , রাঘব ভবন
বিখ্যাত রাঘবের ঝালি

শ্রীচৈতন্যদেব ছাড়াও পানিহাটিতে আরো অনেক নামী ও গুণী ব্যক্তির সমাগম হয়েছে। যেমন শ্রীরামকৃষ্ণদেব। পানিহাটিতে তিনিও এসেছিলেন ও কীর্তনে অংশও নিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃততেও এর কথা লেখা আছে। এছাড়াও এসেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ

ছাতুবাবুর বাগানবাড়ি

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পদধূলি এখানে ৩ বার পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকবারই এসেছেন ছাতুবাবুর বাগানবাড়ি। হ্যাঁ ইনিই সেই বিখ্যাত ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর একজন। এই বাগানবাড়ি রবীন্দ্রনাথের খুবই প্রিয় ছিল। খুব ছোটবেলায় একবার এসেছিলেন। এখানে বাড়ির প্রায় প্রতিটি অংশ থেকেই দেখতে পাওয়া গঙ্গানদীর সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে তিনি এখানে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে আসেন। সেই সময়ই জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের জন্যে ব্রিটিশদের দেয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। হ্যাঁ তখন তিনি এই বাগানবাড়িতেই ছিলেন। প্রায় ১৫ বছর পর তিনি শেষবার এই বাড়িতে আসেন। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত এই বাগানবাড়ি আজ গোবিন্দ হোম নামে পরিচিত। এটি এখন অনাথ মেয়েদের আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর রবিঠাকুরের জন্মদিনে এখানে অনুষ্ঠান হয়। মেয়েরা রবীন্দ্রসংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করে।

ছাতুবাবুর বাগানবাড়ির ঘাটের দিকটা

পানিহাটিতে কখনও ঘুরতে এলে এগুলো ছাড়াও অবশ্যই গঙ্গাতীরের বারোশিব মন্দির ,ইস্কন মন্দির , অনুকূল ঠাকুরের সৎসঙ্গ এবং তার পাশেই ত্রাণনাথ কালীমন্দির দেখবেন।

কিভাবে আসবেন: শিয়ালদা থেকে যেকোনো সোদপুরগামী ট্রেনে সোদপুর , সেখান থেকে টোটো করে পানিহাটি ঘাট। বাসেও সোদপুর এসে পানিহাটি আসা যায়। হাওড়া দিয়েও আসা যায় , সেক্ষেত্রে ব্যান্ডেল / তারকেশ্বর গামী যেকোনো ট্রেনে চেপে কোন্নগর নামবেন। তারপর কোন্নগর ঘাটে আসবেন। কোন্নগর ঘাট পেরোলেই পানিহাটি। এখন সবই বন্ধ আছে ,হ্যাঁ লকডাউনের পরে আসাই ভালো।

তথ্যসংগ্রহ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার – শ্রী অজিত কুমার ঘোষের “ধন্য পানিহাটি” রচনা।

ছবিগুলি সংগৃহিত পানিহাটি ফেসবুক পেজ , পানিহাটি চিড়া উৎসব এবং শ্রী চৈতন্যমন্দির পানিহাটি ওয়েব পেজ থেকে।

বসন্তের পুরুলিয়া – ২য় পর্ব

সকালে উঠে আগে বড়ন্তি পাহাড় আর ড্যাম ভালো করে ঘুরে নিলাম। বলতে পারেন মর্নিং ওয়াক ও হয়ে গেলো আবার সান রাইজ দেখাও হয়ে গেলো। যেখানে থাকলাম সেটিকেই যদি ঠিক করে না দেখি তাহলে তো ঘোরার মানেই থাকে না। এরপর ব্যাগ গোছানো হলো। তারপর লুচি তরকারি দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম গড় সার্কিটের উদ্দেশ্যে। আমাদের প্ল্যান ছিল গড় সার্কিট দেখে আসানসোল স্টেশন এ ফেরা। সেখান থেকে বিকেলের ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেসে বাড়ি। সেইমতো হোটেল চেক আউট করলাম সকাল সাড়ে ৯ টা। ড্রাইভার দাদা বলেইছেন এই গড় সার্কিট দেখতে বেশি সময় লাগবে না।

মুরাডি ড্যাম

শুরুতেই চললাম গড়পঞ্চকোট। সেখানকার পুরোনো গড়ের ধ্বংসাবশেষ ও রাধা কৃষ্ণ মন্দির দেখলাম। পাশের পাঞ্চেত পাহাড়টি এই জায়গাটিকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছে। এখানে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে চললাম পাঞ্চেত ড্যাম এর দিকে। পথে গড়পঞ্চকোটের আশেপাশের জঙ্গল মন কাড়লো , দেখে নিলাম সরকারি রিসোর্ট প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র এবং পাঞ্চেত রেসিডেন্সি।

গড়পঞ্চকোট মন্দির
পাঞ্চেত পাহাড়

পাঞ্চেত ড্যাম এই অঞ্চলের সবথেকে বড়ো ড্যাম। পাঞ্চেত ড্যাম দেখতে দেখতে ফারাক্কা ব্রিজের কথা মনে পড়ছিলো। দুটি জায়গার অনেকটাই মিল আছে কিনা। ড্যামের সৌন্দর্য উপভোগ করার পরে রওনা দিলাম মাইথন ড্যামের দিকে।

পাঞ্চেত ড্যাম

মাইথন ড্যাম ঝাড়খণ্ডে পরে , ফেসবুকে এক লেখা পড়েছিলাম সেখানে একজন মাইথনকে গরিবের গোয়া বলে সম্বোধন করেছিলেন। গোয়ার মতো না হলেও আপনার খারাপ লাগবে না। বিস্তৃত জলরাশির মাঝে মাঝে ছোট ছোট সবুজ পাহাড় , এককথায় বললে দারুন। আমরা এখানে স্পিড বোটে রাইড নিলাম। জনপ্রতি ১০০ টাকা। মোট ১৫ থেকে ২০ মিনিটের রাইড। টিকিট কেটে উঠে পড়লাম। পাহাড়ের চারপাশে বোট ঘুরিয়ে জলরাশির বুক চিরে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। দারুণভাবে উপভোগ করলাম। এবার গড় সার্কিট মোটামুটি শেষ। ফিরতে হবে আসানসোল।

স্পীডবোটে মাইথন

এই সময় ড্রাইভার দা বলে কিনা এন আর সির জন্যে আসানসোলে ঝামেলা হতে পারে তাই তাড়াতাড়ি চলুন। আমরাও এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম পরের গন্তব্য কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের দিকে। মন্দিরের ভীড় দেখে আর পুজো দেব কি , কোনোমতে মাকে প্রণাম জানিয়ে ফেরারপথে নিলাম বিখ্যাত প্যাড়া। স্বাদে এটি অতুলনীয়। কখনো এখানে এলে প্যাড়া অবশ্যই খাবেন আর নিয়ে যাবেন। প্যাড়া এখানে ঘরে বানানো হয়। ৩০০ টাকা কেজি দরে এখানে প্যাড়া বিক্রি হচ্ছে। লাঞ্চ মন্দিরের পাশেই এক নিরামিষ হোটেলে সেরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। সময় হয়ে গেছে বাড়ি ফেরার।মনে মনে পুরুলিয়াকে বিদায় জানালাম। আবার আসার প্রতিশ্রুতিও দিলাম। ওমা জয়চন্ডী পাহাড় , বিহারীনাথ এগুলো বাকি রইলো যে। ফিরে এলাম আসানসোল স্টেশনে। ব্ল্যাক ডায়মন্ড সঠিক সময়ে এসেছিলো বলে রাত সাড়ে ৯টায় বাড়ি।

কিভাবে যাবেন : সকালের ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ছাড়ছে ৬.১৫ মিনিটে হাওড়া থেকে , আসানসোল পৌচচ্ছে সকাল ১০ টায়। এছাড়াও হাওড়া থেকে আরো অনেক ট্রেন যাচ্ছে আসানসোল। আসানসোল থেকে ৩০ কিমি দূরে বড়ন্তি। গাড়ি ভাড়া এখানেই পেয়ে যাবেন। হোটেলে বলা থাকলে আরও ভালো।

কোথায় থাকবেন : আমরা ছিলাম Allure De Baranti তে। হোটেলটি বড়ন্তি লেকের ধারেই। একপাশে পাহাড় ও আরেকপাশে লেক। দৃশ্য অতুলনীয়। ফ্যামিলি রুম , তাঁবু ও ডাবল বেডরুম পেয়ে যাবেন। সর্বোপরি ম্যানেজার মহাশয়ের ব্যবহার খুবই ভালো। নাম সুরজিৎ রায়। চিন্তা করবেন না , এই https://baranti.in/ ওয়েবসাইটে ক্লিক করে সব তথ্য জানতে পারবেন।

বসন্তের পুরুলিয়া – ১ম পর্ব

প্রথম যখন প্ল্যান করছি পুরুলিয়া যাবো পরিবারের সবাই মিলে, কি মনে করে শীতকালটা ছেড়ে ফেব্রূয়ারি মাসে যাবো ঠিক করলাম। সেইমতো টিকিট ও হোটেল বুক করে ফেললাম। বসন্তের পুরুলিয়া যে এক কথায় অনবদ্য সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার বলি কিভাবে ট্যুর টা প্ল্যান করেছিলাম , আপনারাও সেভাবে করলে অনেক কিছুই কম সময়ে দেখে নিতে পারবেন। পুরুলিয়ায় ২ রকমের ভ্রমণ সার্কিট রয়েছে। একটি হলো গড় সার্কিট আর অন্যটা অযোধ্যা সার্কিট। গড় সার্কিট দেখতে গেলে আসানসোল থেকে পুরুলিয়া ঢোকা সুবিধে আবার অযোধ্যা সার্কিট দেখতে গেলে পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ঢুকতে হবে। আমাদের কাছে ২ দিন সময় ছিল আর আমরা দুদিনেই এই ২ সার্কিটের অধিকাংশ জায়গা ঘুরেছি।

অযোধ্যা পাহাড়ে চড়ার সময়

প্রথমদিন আমাদের গন্তব্য ছিল অযোধ্যা সার্কিট। অযোধ্যা সার্কিটে অনেকগুলো ঘোরার জায়গা রয়েছে , তবে যেহেতু আমরা বড়ন্তি থেকে গিয়েছি আমাদের সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টার মতো। দূরত্ব ছিল প্রায় ১৩০ কিমি। সুতরাং এই পথে যদি আসেন বুঝতেই পারছেন অনেক সকালে উঠে বেরিয়ে পড়তে হবে। আমরাও তাই করেছিলাম। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল মার্বেল লেক। পাহাড়ের কোলে এই স্বচ্ছ জলের লেক দেখে আপনি অভিভূত হবেনই। চারপাশের উঁচু পাহাড়গুলি থেকেও অনেকভাবে এই লেকের ছবিও তুলতে পারবেন।

মার্বেল লেক

মার্বেল লেক দেখে আমরা রওনা দিলাম আমাদের পরের গন্তব্য বামনী ফলস। প্রথমেই বলি সিঁড়ি দিয়ে অনেকটাই নিচে নামতে হয় এই ফলস ভালোভাবে দেখতে। আমাদের গ্রূপের বয়স্করা তো নামেনি , আমি নেবেছিলাম। হ্যাঁ এই নিচের ছবি তারই ফল।

বামনী ফলস

বামনী ফলস দেখতেই আমাদের দুপুর দেড়টা বেজে গেলো আর তাই পেট বাবাজিও খাবার কথা বলতে লাগলো। তাই আমরা অযোধ্যা পাহাড় থেকে নেমে আসলাম নিচে। পাহাড়ের ওপর খাবারের দাম অনেক , তাই আমাদের ড্রাইভার দাদাটি আমাদের নিচে নিয়ে এলেন। এই প্রথম খাবারের জন্য অনেকটা নিচে নামতে হলো। যাই হোক রাস্তার ধারের এক হোটেলে মাছ ভাত পরিপাটি করে খেয়ে রওনা দিলাম পরের গন্তব্য চড়িদা গ্রাম। খাবারের হোটেল থেকে চড়িদা গ্রাম যেতে ৫ মিনিট লাগলো। চড়িদার ব্যাপারে কিছু বলার আগে বলি , রাস্তায় কিছু অপূর্ব পলাশের দেখা পেলাম। বসন্ত কালে পুরুলিয়া আসা আমাদের সার্থক হলো। চোখ জুড়োল পলাশের রূপ দেখে , তাই ঝটপট ক্যামেরাবন্দি করলাম।

পলাশ ফুল

চড়িদা গ্রাম বিখ্যাত এর মুখোশ শিল্পের জন্য। এ গ্রামের সব বাড়িতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ। সে রকমারি মুখোশের একটি সংগ্রহশালাও রয়েছে। সেখানে গিয়ে এই শিল্পকে কুর্নিশ জানাতে ইচ্ছে হলো। আমাদের এই বাংলাতে কত কিইনা আছে , কতটাই বা আর আমরা জানি বা দেখেছি। সংগ্রহশালা থেকে বেরিয়ে একটি দোকান থেকে ৩ তে মুখোশ কিনলাম , রইলো পুরুলিয়ার স্মৃতি হিসেবে।

শিল্পীর হাতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ

চড়িদা থেকে পাখি পাহাড় যাওয়া যায় , তবে সময়ের অভাবে আমরা যাইনি। আমরা আবার পাহাড়ের দিকে চললাম। আমাদের পরের গন্তব্য ছিল তুর্গা ড্যাম। তুর্গা ড্যাম এ দেখার সেরম কিছু নেই। ড্যামের জল অনেক নোংরা , একঝলক দেখে নিয়েই চললাম পরের গন্তব্যে। লোয়ার ও আপার ড্যাম।

তুর্গা ড্যাম

লোয়ার ও আপার ড্যাম আমাদের আজকের শেষ দুটি গন্তব্য ছিল। লোয়ার ও আপার ড্যাম বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ড্যামের জল পুরো নীল এবং পরিষ্কার। আপনারা আর যাই দেখুন আর না দেখুন , কখনো অযোধ্যা পাহাড়ে এলে এই দুটি ড্যাম অবশ্যই দেখবেন। এরম নৈসর্গিক দৃশ্য অনেকদিন স্মৃতিতে থেকে যাবে।

লোয়ার ড্যাম
আপার ড্যাম

এই ড্যাম দুটি দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। সন্ধে ৭ টায় পৌঁছে গেলাম। রাতের মটন আর রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম , কাল সকালে উঠে ঘুরতে যেতে হবে তো। আবার কালকেই ফেরার ট্রেন। কালকের ঘোরা পরের পর্বে দেয়া রইলো