আগাহ খানের প্রাসাদ

ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, এই প্রাসাদেই মহাত্মা গান্ধী জীবনের প্রায় ২ বছর গৃহবন্দী ছিলেন। সেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ের কথা। ২০১৫ তে একবার এই প্রাসাদ দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম,আজ গান্ধীজির জন্মদিনে আপনাদের সাথে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই।

বছর পাঁচেক আগে সম্ভবতঃ অক্টোবর মাসের এক পড়ন্ত বিকেলে, হঠাৎ করে বৌদির উদ্যোগে পৌঁছলাম আগাহ খানের প্রাসাদে। তখনও অবধি কোনো ধারণা ছিল না এই প্রাসাদের ব্যাপারে। শুধু বৌদির থেকে শুনেছিলাম এখানে গান্ধীজি ব্রিটিশ আমলে নজরবন্দি ছিলেন। সত্যি কথা বলতে আমার খুব একটা যে আগ্রহ ছিল না প্রাসাদ দেখার। তবুও বিকেলে একটু ঘুরতে বেরোনোর নামে স্থির করলাম দেখেই আসি। বলতে ভুলে গেছি, এই প্রাসাদ পুনে শহরে অবস্থিত। কিভাবে যাবেন বলাই বাহুল্য , আগাহ খান প্যালেস বললে পুনে স্টেশন বা এয়ারপোর্ট থেকে যেকোনো অটো, ওলা বা উবের আপনাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবে। তাছাড়া গুগল ম্যাপ তো আছেই।

আগাহ খানের প্রাসাদ

প্রাসাদে ঢুকলাম টিকিট কেটে। কোনো ভীড় ছিল না, আমরাই ছিলাম শুধু। প্রাসাদ প্রাঙ্গনে ঢুকতেই চোখে পরে সেই বিশাল বড়ো প্রাসাদ যা প্রায় ৭ একর জায়গার ওপরে বানানো। প্রাসাদের ভেতরে অনেককটি হল ঘর ছিল। সবগুলিতে ঢোকার অনুমতিও মেলেনি। মোট প্রাঙ্গনের জায়গা ১৯ একর, যার ৭ একরের ওপরে তৈরী এই প্রাসাদ। মনে মনে ভাবছিলাম, গান্ধীজি তো বেশ ভালোই ছিলেন। এতো বড়ো প্রাসাদে নজরবন্দি থাকাও ভাগ্যের ব্যাপার। ধীরে ধীরে সব ঘর দেখে পৌঁছলাম সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘরে। গান্ধীজির শয়নকক্ষ।

বিশাল প্রাসাদের সামনেটা

ওনার ব্যবহৃত সব জিনিস সেরোমি সাজিয়ে রাখা। এই একটি ঘরেই নিজে বন্দি হয়ে থেকেছেন প্রায় ২ বছর। পাশের ঘরে গান্ধীজির স্ত্রী কস্তুরবা দেবী থাকতেন। আর ছিল তাদের ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জাম। একটি বেশ বড়ো বাথরুমও ওই ঘরের সাথে লাগোয়া ছিল। একটু ইতিহাসের তথ্য ঘাঁটলে জানা যাবে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজিকে এই বাড়িতে গৃহবন্দী করে। তারিখ ছিল ৯ই অগাস্ট ১৯৪২। গান্ধীজি বন্দি থাকেন ৬ই মে ১৯৪৪ অবধি। এই বাড়িতেই তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা দেবী ২২ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৪ সালে দেহত্যাগ করেন। গান্ধীজির তৎকালীন সেক্রেটারি মহাদেব দেশাইও এই বাড়িতেই মারা যান। ওই গৃহবন্দীর সময় গান্ধীজির সাথে সরোজিনী নাইডুও ছিলেন। ২০০৩ সালে কেন্দ্র সরকার এই প্রাসাদকে জাতীয় গুরুত্ব হিসেবে স্বীকার করেছে। তারপর থেকে সাধারণ মানুষের জন্যে টিকিট কেটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব জায়গার ছবি তোলার অনুমতি ছিল না, যেকটি তুলতে পেরেছিলাম সেগুলো দিয়ে দিলাম।

ওনার ব্যবহৃত কিছু জিনিস

আজ এই অতিমারীর সময়ে যখন নিজে ২ দিনও বাড়ি বসে থাকতে পারছি না, তখন ভাবছি কি করে একটা লোক ১০০ কোটি দেশবাসীর কথা ভেবে নিজে ২ বছর একটামাত্র ঘরে লেখাপড়া করে কাটিয়ে দিলেন। তার আদর্শবাদ ছিল সেই ভিত যা দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সফলভাবে স্থাপিত হয়েছিল। ভাবতে পারেন এক অহিংসাবাদিকে কেন ভয় পেতো ব্রিটিশ সরকার ? এর কারণ তার এই অহিংসাবাদকে মেনে নিয়ে চলা এতো সহজ কাজ নয়, যেখানে ধর্মের কারণে এক মানুষ অন্য মানুষকে মেরে ফেলতে চাইছে। এই মতবাদ নিয়ে বিপুল পরিমান জনসমর্থন জোগাড় করাও সহজ কাজ ছিল না। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তার এই কৃতিত্বের কথা স্বীকার না করলেও, অনুরোধ রইলো তাঁর কাজকে যেন কালিমালিপ্ত না করা হয়।

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী

আজ এই ২রা অক্টোবরে জাল খবরে মাথা না গলিয়ে, একবার গান্ধীজির ইতিহাসটা পড়েই দেখুন না। অন্তত উইকিপিডিয়া পেজটি পরে নিন। সঠিক তথ্যগুলি জেনে নিন।

সুধাকরের গাড়ির বাগান

mayurpankh car sudha car museum

গাড়ি তো আপনারা অনেকেই দেখেছেন কিন্তু কখনো কি রকমারি গাড়ি দেখেছেন ? যেমন ধরুন পেন্সিল গাড়ি , রবার গাড়ি কিংবা সুটকেস গাড়ি। না আমি খেলনা গাড়ির কথা বলছি না। আমি এমন গাড়ির কথা বলছি যা রীতিমতো চালানো যায়। এরম গাড়ি চাইলেই যে পাবেন সেরম নয় , গোটা ভারতবর্ষে এরম একজনই লোক আছেন যিনি এই অদ্ভুত শখ রাখেন। কি সেই অদ্ভুত শখ ? রকমারি গাড়ি বানানো।

এই ভদ্রলোকের নাম হলো কে সুধাকর। ইনি থাকেন হায়দ্রাবাদে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই এই ধরণের শখ ছিল তার। ব্যাস বড়ো হয়ে বানিয়ে ফেললেন পৃথিবীর সবথেকে বড়ো “ট্রাইসাইকেল” . আপনি হয়তো ভাবছেন এ আর এমন কি , তাহলে আপনাকে বলি এই “ট্রাইসাইকেল” টির চাকার ব্যাস হলো ১৭ ফুট আর সাইকেলটির দৈর্ঘ্য হলো প্রায় ৩৭ ফুট। এই জিনিস বানানোর পর সে খবর কি আর চেপে রাখা যায় ! গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ওনার নাম উঠলো। যখন উনি এটা পেলেন তখন সালটা হলো ২০০৫।

এই ঘটনাটির প্রভাব ওনার আত্মবিশ্বাসে পড়েছিল। ব্যাস তারপর আর উনি পিছনে না তাকিয়ে মাত্র ৫ বছরের মধ্যে বানিয়ে ফেললেন নিজস্ব গাড়ি সংগ্রহশালা। হ্যাঁ ২০১০ থেকে উনি নিজের বানানো এই সংগ্রশালা চালাচ্ছেন , যেখানে দেশ বিদেশের বহু পুরোনো গাড়ির সাথে সাথে তার নিজের ডিজাইন করা গাড়িও আছে। এই গাড়ি গুলি চালানো হয় কোনো দিনবিশেষে , যখন প্রচুর লোক ভীড় জমান শুধু গাড়িগুলো কিভাবে চালানো হচ্ছে তা দেখতে। নাম দিয়েছেন “সুধা কার মিউজিয়াম” . বিশেষ উৎসবের দিনগুলির জন্যে ইনি গাড়ি ডিজাইন করে রেখেছেন যেমন চিলড্রেন্স ডের জন্যে পেন্সিল গাড়ি, এইডস ডের জন্যে কন্ডোম গাড়ি , উইমেন্স ডের জন্যে মহিলা জুতো গাড়ি কিংবা প্রযুক্তি দিবসের জন্যে কম্পিউটার গাড়ি।

এই গল্পে আমি কী করে এলাম ভাবছেন তো ? ওই যে হায়দ্রাবাদে একটি কাজে গিয়েছিলাম। সেখানে সেখানকার সরকারের পর্যটন ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারলাম অনেক জিনিসের সাথে এটিও একটি দেখার বিষয়। বেশি দূর ছিল না তাই , একদিন পরিকল্পনা করে চললাম গাড়ি দেখতে। যা দেখলাম , তাতে আমার মন জুড়োলো। সত্যি একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে আমাকে এটা স্বীকার করতে হবে যে ইনি অমানুষিক পরিশ্রম করে নিজের ট্যালেন্টকে কাজে লাগিয়ে যা বানিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসা পাবার যোগ্য। এখানে ঢুকতে গেলে ৫০ বা ৬০ টাকার একটি টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। মোবাইল ফোন এরও আলাদা করে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হয়। আমি জায়গাটির গুগল ম্যাপ লিংক দিলাম (নামের ওপর ক্লিক করতে হবে ), কখনও হায়দ্রাবাদ গেলে অবশ্যই দেখে আসবেন এই “সুধা কার মিউজিয়াম”.