দুর্গাপুজোয় চকদিঘি

চকদিঘী বর্ধমান জেলার জামালপুর ব্লকের অন্তর্গত একটি গ্রাম। হ্যাঁ জায়গাটিকে গ্রামই বলা চলে। কিন্তু এই গ্রামের এক ঐতিহাসিক দিক আছে যা প্রচারের আলো থেকে কিছুটা হলেও দূরে। এই গ্রামে প্রায় ৩০০ বছর পুরোনো এক জমিদারির নিদর্শন হিসেবে একটি এস্টেট রয়েছে। বাংলায় জমিদারি প্রথা অবলুপ্ত হয়ে গেলেও , এই এস্টেট গুলো দেখতে পেলে ইতিহাসের সম্মুখীন হওয়া যায়। আমিও সেরকমই একটা শখ পালন করি। প্রায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি পুরোনো ইতিহাসের খোঁজে। কখনও মন্দির , কখনো স্থাপত্য, এই সোনার বাংলা আমাকে কোনোদিন হতাশ করেনি।

সিংহ রায় এস্টেট

এরোমি একদিন প্ল্যান করে বেরিয়ে পড়লাম চকদিঘি রাজবাড়ির পুজো দেখতে। হুগলি জেলায় ধনিয়াখালী বলে একটি জনপ্রিয় জায়গা রয়েছে , সেই ধনিয়াখালী রোড ধরে যে রাস্তা সোজা মেমারির দিকে গেছে সেদিক দিয়েই গাড়ি নিয়ে পৌঁছলাম চকদিঘি। চকদিঘির এই সিংহ রায় এস্টেট চিনতে খুব অসুবিধা হয়নি।

তুলসীমঞ্চ

এস্টেটের গেট দিয়ে ১০০ মিটার মতো গেলেই পরে এই জমিদারবাড়ির বিশাল বৈঠকখানা। বৈঠকখানার সামনেই তুলসীমঞ্চ। কয়েকটি ছবি তুলতেই দেখা হলো এই এস্টেটের ম্যানেজারের সাথে। ওনার থেকে জানতে পারলাম এই জমিদার বাড়ির পুরোনো ইতিহাসের কথা।

অষ্টাদশ শতকে জমিদার ললিত মোহন সিংহ রায় এই এস্টেট বানিয়েছিলেন। কিন্তু এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নাল সিংহ। নাল সিংহের প্রপৌত্র এবং ললিত মোহনের পুত্র শ্রীসারদা প্রসাদ সিংহ রায়ের আমলেই এই জমিদারি সমৃদ্ধি লাভ করে।

জমিদার বাড়ির অন্দরমহল

বয়সে ১৪ বছরের ছোট এই সারদা প্রসাদের সঙ্গে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের সখ্যতা ছিল। ঈশ্বর চন্দ্র প্রায়ই চকদিঘিতে আসতেন বলে , সারদা প্রসাদ এই এস্টেটে তার জন্য ঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। পুকুরের পারে এই ঘরের নাম জল মহল ছিল। সংস্কারের অভাবে এই ঘরের অবস্থা ভগ্নপ্রায়।

জল মহল

এই পরিবারের অনেক কচিকাঁচার বিদ্যাসাগরের থেকে শিক্ষাগ্রহন করার সৌভাগ্য মেলে। সিংহ রায় পরিবারের সম্ভবতঃ সপ্তম প্রজন্মের সদস্য শ্রীঅম্বরিশ সিংহ রায় এখন কলকাতা নিবাসী। স্থানীয় কর্মচারীরা এই এস্টেটের রক্ষণাবেক্ষন করেন।

সারদা প্রসাদ ও বিদ্যাসাগর

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনাদের জানিয়ে রাখি যে স্বনামধন্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় এই এস্টেটে এসেছিলেন একটি বাংলা ছবির শুটিং করতে। জানেন কি ছবিটির নাম ? ঘরে বাইরে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সহ অন্নান্য কলাকূশলীরাও এখানে এসেছেন। মনোজ মিত্রের একটি ইন্টারভিউ থেকে জানা যায়, তখন এই বাড়িতে শুধু শুটিং হতো। চকদিঘিতে কোনো থাকার জায়গা ছিল না , তাই বর্ধমানে সবার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রোজ সেখান থেকে গাড়ি করে এসে এই বাড়িতে শুটিং করতে হতো।

ঘরে বাইরের সিন্

সাত পুরুষ ধরে চলে আসা এই পরিবারের দুর্গাপুজোর বয়সও প্রায় ৩০০ হতে চললো। প্রাচীন এই একচালা প্রতিমার দর্শনার্থীর অভাব নেই। অনেকেই আসেন মা দুর্গার দর্শন করতে ও এস্টেটের ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে। তবে খুব কম লোকেরাই খোঁজ নেন এই জমিদারির ইতিহাসের।

দূর্গা মণ্ডপ

কথা বলেছিলাম এ পরিবারের কুলপুরোহিত শ্রী ভোলানাথ চতুর্বেদীর সঙ্গে। তিনি জানান , তাঁরা প্রায় ৭ পুরুষ ধরে এই পরিবারের পুজোর সাথে যুক্ত। এই বছরের দুর্গাপুজো তিনিই করেছেন। বনেদি বাড়ির এই পুজো দেখতে পারাটাই এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

আজ চকদিঘির অদূরে ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া স্বীকৃত খাজাঞ্চি বাটি (৯৮৩০৬-৯৫৮২৪) রয়েছে , যেখানে থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থাও রয়েছে। ফোন করে খোঁজ নিতে পারেন। শুধু দুর্গাপুজো দেখতে এলে খাজাঞ্চি বাটিতে মধ্যাহ্নভোজ করতে পারেন। থাকার দরকার হবে না। তবে একবার এই জমিদারবাড়ি ঘুরেই আসতে পারেন , পুজোর সময় হলে আরো ভালো লাগবে।

কিভাবে পৌঁছবেন : কলকাতা থেকে গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে চলে আসতে পারেন চকদিঘি। এছাড়া ট্রেনে আস্তে চাইলে আসুন তারকেশ্বর। সেখান থেকে বর্দ্ধমানগামী বাসে করে পৌঁছতে পারেন চকদিঘি। জমিদার বাড়ির ম্যাপ লোকেশন দিয়ে রাখলাম , আপনাদের কাজে লাগতে পারে।

https://goo.gl/maps/XNgqLz8V8HpC1h3DA

বলে রাখা ভালো : ভিডিও তোলার অনুমতি নেই , স্টিল ফটো তুলতে পারেন।

আগাহ খানের প্রাসাদ

ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, এই প্রাসাদেই মহাত্মা গান্ধী জীবনের প্রায় ২ বছর গৃহবন্দী ছিলেন। সেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ের কথা। ২০১৫ তে একবার এই প্রাসাদ দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম,আজ গান্ধীজির জন্মদিনে আপনাদের সাথে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চাই।

বছর পাঁচেক আগে সম্ভবতঃ অক্টোবর মাসের এক পড়ন্ত বিকেলে, হঠাৎ করে বৌদির উদ্যোগে পৌঁছলাম আগাহ খানের প্রাসাদে। তখনও অবধি কোনো ধারণা ছিল না এই প্রাসাদের ব্যাপারে। শুধু বৌদির থেকে শুনেছিলাম এখানে গান্ধীজি ব্রিটিশ আমলে নজরবন্দি ছিলেন। সত্যি কথা বলতে আমার খুব একটা যে আগ্রহ ছিল না প্রাসাদ দেখার। তবুও বিকেলে একটু ঘুরতে বেরোনোর নামে স্থির করলাম দেখেই আসি। বলতে ভুলে গেছি, এই প্রাসাদ পুনে শহরে অবস্থিত। কিভাবে যাবেন বলাই বাহুল্য , আগাহ খান প্যালেস বললে পুনে স্টেশন বা এয়ারপোর্ট থেকে যেকোনো অটো, ওলা বা উবের আপনাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবে। তাছাড়া গুগল ম্যাপ তো আছেই।

আগাহ খানের প্রাসাদ

প্রাসাদে ঢুকলাম টিকিট কেটে। কোনো ভীড় ছিল না, আমরাই ছিলাম শুধু। প্রাসাদ প্রাঙ্গনে ঢুকতেই চোখে পরে সেই বিশাল বড়ো প্রাসাদ যা প্রায় ৭ একর জায়গার ওপরে বানানো। প্রাসাদের ভেতরে অনেককটি হল ঘর ছিল। সবগুলিতে ঢোকার অনুমতিও মেলেনি। মোট প্রাঙ্গনের জায়গা ১৯ একর, যার ৭ একরের ওপরে তৈরী এই প্রাসাদ। মনে মনে ভাবছিলাম, গান্ধীজি তো বেশ ভালোই ছিলেন। এতো বড়ো প্রাসাদে নজরবন্দি থাকাও ভাগ্যের ব্যাপার। ধীরে ধীরে সব ঘর দেখে পৌঁছলাম সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘরে। গান্ধীজির শয়নকক্ষ।

বিশাল প্রাসাদের সামনেটা

ওনার ব্যবহৃত সব জিনিস সেরোমি সাজিয়ে রাখা। এই একটি ঘরেই নিজে বন্দি হয়ে থেকেছেন প্রায় ২ বছর। পাশের ঘরে গান্ধীজির স্ত্রী কস্তুরবা দেবী থাকতেন। আর ছিল তাদের ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জাম। একটি বেশ বড়ো বাথরুমও ওই ঘরের সাথে লাগোয়া ছিল। একটু ইতিহাসের তথ্য ঘাঁটলে জানা যাবে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজিকে এই বাড়িতে গৃহবন্দী করে। তারিখ ছিল ৯ই অগাস্ট ১৯৪২। গান্ধীজি বন্দি থাকেন ৬ই মে ১৯৪৪ অবধি। এই বাড়িতেই তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা দেবী ২২ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৪ সালে দেহত্যাগ করেন। গান্ধীজির তৎকালীন সেক্রেটারি মহাদেব দেশাইও এই বাড়িতেই মারা যান। ওই গৃহবন্দীর সময় গান্ধীজির সাথে সরোজিনী নাইডুও ছিলেন। ২০০৩ সালে কেন্দ্র সরকার এই প্রাসাদকে জাতীয় গুরুত্ব হিসেবে স্বীকার করেছে। তারপর থেকে সাধারণ মানুষের জন্যে টিকিট কেটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব জায়গার ছবি তোলার অনুমতি ছিল না, যেকটি তুলতে পেরেছিলাম সেগুলো দিয়ে দিলাম।

ওনার ব্যবহৃত কিছু জিনিস

আজ এই অতিমারীর সময়ে যখন নিজে ২ দিনও বাড়ি বসে থাকতে পারছি না, তখন ভাবছি কি করে একটা লোক ১০০ কোটি দেশবাসীর কথা ভেবে নিজে ২ বছর একটামাত্র ঘরে লেখাপড়া করে কাটিয়ে দিলেন। তার আদর্শবাদ ছিল সেই ভিত যা দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সফলভাবে স্থাপিত হয়েছিল। ভাবতে পারেন এক অহিংসাবাদিকে কেন ভয় পেতো ব্রিটিশ সরকার ? এর কারণ তার এই অহিংসাবাদকে মেনে নিয়ে চলা এতো সহজ কাজ নয়, যেখানে ধর্মের কারণে এক মানুষ অন্য মানুষকে মেরে ফেলতে চাইছে। এই মতবাদ নিয়ে বিপুল পরিমান জনসমর্থন জোগাড় করাও সহজ কাজ ছিল না। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তার এই কৃতিত্বের কথা স্বীকার না করলেও, অনুরোধ রইলো তাঁর কাজকে যেন কালিমালিপ্ত না করা হয়।

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী

আজ এই ২রা অক্টোবরে জাল খবরে মাথা না গলিয়ে, একবার গান্ধীজির ইতিহাসটা পড়েই দেখুন না। অন্তত উইকিপিডিয়া পেজটি পরে নিন। সঠিক তথ্যগুলি জেনে নিন।

ত্রিনাথ মাকালী ও রাবড়ি

লেখাটার নামটা একটু অদ্ভুৎ , তাই না ? এটাই ভাবছেন তো? আপনাকে বলে রাখি, এটিও আমার এক আদ্যোপান্ত ভ্রমণ কাহিনী। হুগলি জেলারই তিনটি জায়গা কয়েক ঘন্টার মধ্যে ঘুরে ফেলবো, ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম একদিন দুপুর ২টোর সময়। সঙ্গে এক গাড়ি ও গুগল ম্যাপ। ব্যাস শুরুতেই চললাম বনমালীপুর , ত্রিনাথ দর্শনে।

ত্রিনাথ মন্দির

প্রথমেই বলি , আপনি এরম কি কখনো শুনেছেন যে সারা ভারতে মোট ৪ টি মন্দিরের একটি এই হুগলি জেলায়? একটু অস্বাভাবিক হলেও, এটি সত্যি। সদ্গুরু শ্রী নারায়ণ মহারাজ এর শিষ্যরা সারা ভারতে চার ব্রহ্মদত্ত ধাম বানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথম ধাম জলকোটি, মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত। দ্বিতীয়টি কন্যাকুমারীতে আর তৃতীয় মন্দিরটি এই বনমালিপুরে তৈরী হয়েছে। চতুর্থ মন্দিরটি সম্ভবতঃ হিমাচল প্রদেশে তৈরী হবে।

মন্দিরের সামনে

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন মন্দির ঘুরে বেড়ানোর সখ রাখি না; যদি না, সেই মন্দিরের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট থাকে। বুঝতেই পারছেন, সারা ভারতে কত মন্দির আছে! এরম অবস্থায় আমি একদিন ইন্টারনেটে এই মন্দিরের ছবি দেখি, কিছু স্থানীয় লোকেদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এ মন্দির বিশাল বড়ো। কত্তোবড় , এই কৌতুহলবশতঃ পৌঁছলাম ব্রহ্ম দত্ত ধাম। হ্যাঁ এই নামেই মন্দিরগুলো পরিচিত।

মন্দিরের প্রবেশদ্বার

এতো বড় মন্দির আমি আমার জীবতাবস্থায় দেখিনি। কাশি বিশ্বনাথ দর্শন করেছি , ভীমাশঙ্কর এ গেছি, আরও অনেক জায়গাতে গিয়েছি, কিন্তু এতো বড় মন্দির দেখিনি। এ মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন ত্রিনাথ, মানে ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং মহেশ্বর। মন্দির অনেকটাই তৈরী হওয়া বাকি রয়েছে, তবে পুরো তৈরী হলে একসাথে অন্তত হাজার হাজার লোকেরা মন্দিরে প্রবেশ করে পুজো দেখতে পারবে।

মন্দিরের ভেতরে

মন্দিরের চারিপাশে থাকার ব্যবস্থাও হচ্ছে, সম্ভবতঃ মন্দিরের পূজারী ও অন্যান্যদের জন্যে। মন্দিরে ঢুকতেই একটি বড়ো মিনার আছে, মাঝামাঝি রয়েছে বিশাল বড়ো মন্দির ও চারপাশে থাকার জায়গার মতো তৈরী হচ্ছে। ছবিগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন। যাই হোক মন্দির দর্শন করে রওনা দিলাম পরের গন্তব্যের দিকে।

রামপাড়া কালীবাড়ি

১ ঘন্টার মধ্যেই এসে পৌঁছলাম, রামপাড়া কালীবাড়ি। এটি হুগলি জেলার প্রাচীন কালিবাড়িগুলির মধ্যে একটা। প্রায় ৩০০ বছর ধরে মাকালী সিদ্ধেশ্বরী রূপে এখানে পূজিত হচ্ছেন। তখনকার দিনের নন্দীবাড়ির পুজো এটি। তারা সেখানকার জমিদার ছিলেন। ঠাকুরদালানের পুজো দেখবার সুযোগ সামনে থেকে কালিবাড়িটিকে দেখে অনুভব করলাম।

ঠাকুরদালান

কালীবাড়ির পিছনে এখনো সেই জমিদার বাড়ি রয়েছে। বাড়ির গঠনশৈলী দেখেই বোঝা যায় সেকেলের আভিজাত জমিদার পরিবার, কেমন ভাবে দিন কাটিয়েছেন। সেই বাড়িতে এখনো লোকেরা থাকেন।

বিশেষ কারো সাথে কথা বলিনি ইতিহাস সম্পর্কে , তবে ভালোভাবে জানতে রামপাড়া কালীবাড়ির উইকিপিডিয়া পেজটি পরে দেখতে পারেন। কালীবাড়ির পাশেই এক জগন্নাথ মন্দির রয়েছে , সেটিও দর্শন করলাম। এরপর বেরোলাম পরের গন্তব্যের দিকে।

জমিদার বাড়ির সামনেটা

গ্রামের নাম রাবড়ি

রাবড়ি আমরা প্রত্যেকেই খেয়েছি, কিন্তু একদিন ফেসবুকে জানতে পারি যে আমার বাড়ির কাছেই এক এমন গ্রাম রয়েছে, যেখানে প্রতি বাড়িতেই তৈরী হয় রাবড়ি। বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার , ঠিক করলাম একদিন গিয়েই দেখবো ব্যাপারটা কি! আমার এক ভাই অতনুর বাড়ির খুব কাছেই এই গ্রাম। বারুইপাড়া থেকে যাওয়া যায়। যখন ওর সাথে এইটা শেয়ার করলাম, ও বললো দেখে জানাবে। তারপর হটাৎ করে একদিন অতনু আমাকে জানালো, ও গিয়ে দেখেছে এবং খেয়েওছে। যা বললো তাতে মনে হলো, সে রাবড়ি খাওয়া মানে এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। ব্যাস আর দেরি করিনি। এই ছোট্ট ভ্রমণেই প্ল্যান করে ফেললাম রাবড়ি গ্রাম যাওয়ার।

রামপাড়া থেকে যখন রাবড়ি গ্রাম পৌঁছোই , তখন প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। তাই ছবি বিশেষ তোলা হয়নি। যা ছবি দেখছেন সবই অতনুর তোলা। এই গ্রামে কখনো গেলে অবশ্যই হেমা মুক্ত ভবনে যাবেন। ওঁনাদেরি বাড়ির রাবড়ি বিখ্যাত। রাবড়ির সাথে সরভাজাও পাওয়া যায়। আমরা ১ কেজি মতো কিনলাম, আর তার সাথে নিলাম খান কুড়ি সরভাজা। রাবড়ি এনারা কলকাতা ও শহরতলির অনেক মিষ্টির দোকানেই সাপ্লাই দেন। আমরা নিয়েছিলাম ২৮০ টাকা কেজিদরে। রাবড়ি গ্রাম থেকে বাড়ি ফিরেই আর তর সইতে পারলাম না। রাবড়ি খেয়ে দেখলাম, সত্যি বলছি খুবই ভালো খেতে। তবে সরভাজাটা মোটামুটি , কারণ ওর থেকেও ভালো সরভাজা আমি খেয়েছি।

হেমামুক্ত ভবন (ছবি – অতনু মারিক)

কিভাবে যাবেন

ব্রহ্মদত্ত ধাম : হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে বারুইপাড়া লোকালে আগে বারুইপাড়া আসুন। বারুইপাড়া স্টেশন থেকে অটো পাবেন বনমালিপুর মন্দির যাওয়ার।

রামপাড়া কালীবাড়ি ও রাবড়ি গ্রাম : এই দুই জায়গাতে পৌঁছতে গেলে আপনাকে বারুইপাড়া বা ডানকুনি এসে বাস বা অটো ধরে পৌঁছতে হবে আইঁয়া। এখান থেকে দুটি গ্রামেই পৌঁছনো খুবই সহজ। টোটো বা রিক্সা পেয়ে যাবেন।

চৈতন্যময় পানিহাটি

গৌড়ের রাজা বল্লাল সেনের আমল থেকেই পানিহাটির নাম ইতিহাসের পাতায় রয়েছে। তখন “পণ্যহাটি” বলেই সবাই চিনতো। গঙ্গানদীর তীরে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ হাট বসতো এইখানে। পণ্যহাটি থেকেই ধীরে ধীরে আজকের পানিহাটি বলেই সবাই চেনে। পানিহাটির ইতিহাস কিন্তু এখানেই থমকে নেই আজ থেকে হাজার বছর আগেও বিভিন্ন পুস্তকে পানিহাটির নাম পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় পানিহাটির হাটে তখনকার দিনে শিংয়ের চিরুনি পাওয়া যেত। তা খুব বিখ্যাতও ছিল। নদীপথে ও স্থলপথে বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে বণিকরা আসতেন মালপত্র কেনাবেচা করার জন্যে।

এই পানিহাটি চৈতন্যময় হয়ে উঠলো যখন শ্রীচৈতন্যদেব এখানে প্রথমবার পদার্পন করলেন। তিনি পুরী যাবার পথে একবার পানিহাটিতে আসেন। দ্বিতীয়বার বৃন্দাবন যাবার পথে পানিহাটিতে আসেন। পানিহাটির এক ব্রাহ্মণ পন্ডিত শ্রীগঙ্গানারায়ণ নিজের বাড়িতে প্রথম মদনমোহন জিউ এর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে শ্রীগঙ্গানারায়ণের পৌত্র শ্রীরাঘব পন্ডিতের সাথে স্বয়ং চৈতন্যদেব ওই বিগ্রহের পূজা করেন। রাঘব পন্ডিতের বাড়িতে ঠাকুরের আগমন হয় যখন তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে পানিহাটিতে আসেন। এই রাঘব পন্ডিতের বাড়ির তৈরি ঝালি আজও পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাঘব পন্ডিতের গৃহ আজ রাঘব পাঠভবন নামে পরিচিত। ভেতরে মদনমোহন জিউয়ের পুজো নিয়মিত হয়।

চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দির , পানিহাটি

শ্রীচৈতন্যদেব প্রথমবার যে ঘাটে পদার্পন করেন তা চৈতন্যঘাট নামে পরিচিত হলেও সেই ঘাট আজ আর নেই। মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত পুরোনো ঘাটটিকে হয়েছে পৌরসভা থেকে একটি নতুন ঘাট বানিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রবীণ মানুষেরা অনেকেই বলেন সেই অক্ষয় বটগাছের কথা , যা ওই ঘাটে আজও বিদ্যমান। এই গাছের নিচেই মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যনন্দ কীর্তন করেছিলেন। পানিহাটিতে মহাপ্রভুর আগমন উৎসব বাংলার কার্তিক মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে পালন করা হয়।

দই চিড়ে , দণ্ড মহোৎসব

ই শ্রীরঘুনাথ, যিনি সপ্তগ্রামের জমিদার গোবর্ধন দাসের ছেলে ছিলেন, অল্প বয়স থেকেই বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আকর্ষিত হন। শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সাক্ষাতের জন্যে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে করতে এসে পৌঁছন পানিহাটি। তার উদ্দেশ্য ছিল ঠাকুরের দেখা পাওয়া ও দীক্ষালাভ করা। তিনি পানিহাটিতে যখন শ্রীনিত্যানন্দর দেখা পেলেন , নিত্যানন্দ ঠাকুর দীক্ষা তো দিলেন কিন্তু এক অভূতপূর্ব দন্ডে দণ্ডিত করলেন। কারণ কি ছিল ? রঘুনাথ তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী এবং সংসার ত্যাগ করে এসেছিলেন তাই। দণ্ড ছিল সমস্ত সংকীর্তনরত ভক্তমণ্ডলীকে চিড়ে দই সহযোগে ফলার বিতরণ। এই উৎসবই দণ্ড মহোৎসব নামে পরিচিত। এই উৎসব প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। অনেকে এঁকে চিড়ে দই উৎসবও বলে থাকেন। এ বছরও এই উৎসব পালিত হয়েছে কিন্তু পুরো উৎসবই ছিল জাকঁজমকহীন। শ্রীচৈতন্য কথামৃততে এই ঘটনাগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়।

পানিহাটি রাঘব পাটভবন
মদনমোহন জিউয়ের মন্দির , রাঘব ভবন
বিখ্যাত রাঘবের ঝালি

শ্রীচৈতন্যদেব ছাড়াও পানিহাটিতে আরো অনেক নামী ও গুণী ব্যক্তির সমাগম হয়েছে। যেমন শ্রীরামকৃষ্ণদেব। পানিহাটিতে তিনিও এসেছিলেন ও কীর্তনে অংশও নিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃততেও এর কথা লেখা আছে। এছাড়াও এসেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ

ছাতুবাবুর বাগানবাড়ি

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পদধূলি এখানে ৩ বার পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকবারই এসেছেন ছাতুবাবুর বাগানবাড়ি। হ্যাঁ ইনিই সেই বিখ্যাত ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর একজন। এই বাগানবাড়ি রবীন্দ্রনাথের খুবই প্রিয় ছিল। খুব ছোটবেলায় একবার এসেছিলেন। এখানে বাড়ির প্রায় প্রতিটি অংশ থেকেই দেখতে পাওয়া গঙ্গানদীর সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে তিনি এখানে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে আসেন। সেই সময়ই জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের জন্যে ব্রিটিশদের দেয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। হ্যাঁ তখন তিনি এই বাগানবাড়িতেই ছিলেন। প্রায় ১৫ বছর পর তিনি শেষবার এই বাড়িতে আসেন। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত এই বাগানবাড়ি আজ গোবিন্দ হোম নামে পরিচিত। এটি এখন অনাথ মেয়েদের আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর রবিঠাকুরের জন্মদিনে এখানে অনুষ্ঠান হয়। মেয়েরা রবীন্দ্রসংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করে।

ছাতুবাবুর বাগানবাড়ির ঘাটের দিকটা

পানিহাটিতে কখনও ঘুরতে এলে এগুলো ছাড়াও অবশ্যই গঙ্গাতীরের বারোশিব মন্দির ,ইস্কন মন্দির , অনুকূল ঠাকুরের সৎসঙ্গ এবং তার পাশেই ত্রাণনাথ কালীমন্দির দেখবেন।

কিভাবে আসবেন: শিয়ালদা থেকে যেকোনো সোদপুরগামী ট্রেনে সোদপুর , সেখান থেকে টোটো করে পানিহাটি ঘাট। বাসেও সোদপুর এসে পানিহাটি আসা যায়। হাওড়া দিয়েও আসা যায় , সেক্ষেত্রে ব্যান্ডেল / তারকেশ্বর গামী যেকোনো ট্রেনে চেপে কোন্নগর নামবেন। তারপর কোন্নগর ঘাটে আসবেন। কোন্নগর ঘাট পেরোলেই পানিহাটি। এখন সবই বন্ধ আছে ,হ্যাঁ লকডাউনের পরে আসাই ভালো।

তথ্যসংগ্রহ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার – শ্রী অজিত কুমার ঘোষের “ধন্য পানিহাটি” রচনা।

ছবিগুলি সংগৃহিত পানিহাটি ফেসবুক পেজ , পানিহাটি চিড়া উৎসব এবং শ্রী চৈতন্যমন্দির পানিহাটি ওয়েব পেজ থেকে।

বসন্তের পুরুলিয়া – ২য় পর্ব

সকালে উঠে আগে বড়ন্তি পাহাড় আর ড্যাম ভালো করে ঘুরে নিলাম। বলতে পারেন মর্নিং ওয়াক ও হয়ে গেলো আবার সান রাইজ দেখাও হয়ে গেলো। যেখানে থাকলাম সেটিকেই যদি ঠিক করে না দেখি তাহলে তো ঘোরার মানেই থাকে না। এরপর ব্যাগ গোছানো হলো। তারপর লুচি তরকারি দিয়ে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম গড় সার্কিটের উদ্দেশ্যে। আমাদের প্ল্যান ছিল গড় সার্কিট দেখে আসানসোল স্টেশন এ ফেরা। সেখান থেকে বিকেলের ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেসে বাড়ি। সেইমতো হোটেল চেক আউট করলাম সকাল সাড়ে ৯ টা। ড্রাইভার দাদা বলেইছেন এই গড় সার্কিট দেখতে বেশি সময় লাগবে না।

মুরাডি ড্যাম

শুরুতেই চললাম গড়পঞ্চকোট। সেখানকার পুরোনো গড়ের ধ্বংসাবশেষ ও রাধা কৃষ্ণ মন্দির দেখলাম। পাশের পাঞ্চেত পাহাড়টি এই জায়গাটিকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছে। এখানে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে চললাম পাঞ্চেত ড্যাম এর দিকে। পথে গড়পঞ্চকোটের আশেপাশের জঙ্গল মন কাড়লো , দেখে নিলাম সরকারি রিসোর্ট প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র এবং পাঞ্চেত রেসিডেন্সি।

গড়পঞ্চকোট মন্দির
পাঞ্চেত পাহাড়

পাঞ্চেত ড্যাম এই অঞ্চলের সবথেকে বড়ো ড্যাম। পাঞ্চেত ড্যাম দেখতে দেখতে ফারাক্কা ব্রিজের কথা মনে পড়ছিলো। দুটি জায়গার অনেকটাই মিল আছে কিনা। ড্যামের সৌন্দর্য উপভোগ করার পরে রওনা দিলাম মাইথন ড্যামের দিকে।

পাঞ্চেত ড্যাম

মাইথন ড্যাম ঝাড়খণ্ডে পরে , ফেসবুকে এক লেখা পড়েছিলাম সেখানে একজন মাইথনকে গরিবের গোয়া বলে সম্বোধন করেছিলেন। গোয়ার মতো না হলেও আপনার খারাপ লাগবে না। বিস্তৃত জলরাশির মাঝে মাঝে ছোট ছোট সবুজ পাহাড় , এককথায় বললে দারুন। আমরা এখানে স্পিড বোটে রাইড নিলাম। জনপ্রতি ১০০ টাকা। মোট ১৫ থেকে ২০ মিনিটের রাইড। টিকিট কেটে উঠে পড়লাম। পাহাড়ের চারপাশে বোট ঘুরিয়ে জলরাশির বুক চিরে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। দারুণভাবে উপভোগ করলাম। এবার গড় সার্কিট মোটামুটি শেষ। ফিরতে হবে আসানসোল।

স্পীডবোটে মাইথন

এই সময় ড্রাইভার দা বলে কিনা এন আর সির জন্যে আসানসোলে ঝামেলা হতে পারে তাই তাড়াতাড়ি চলুন। আমরাও এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম পরের গন্তব্য কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের দিকে। মন্দিরের ভীড় দেখে আর পুজো দেব কি , কোনোমতে মাকে প্রণাম জানিয়ে ফেরারপথে নিলাম বিখ্যাত প্যাড়া। স্বাদে এটি অতুলনীয়। কখনো এখানে এলে প্যাড়া অবশ্যই খাবেন আর নিয়ে যাবেন। প্যাড়া এখানে ঘরে বানানো হয়। ৩০০ টাকা কেজি দরে এখানে প্যাড়া বিক্রি হচ্ছে। লাঞ্চ মন্দিরের পাশেই এক নিরামিষ হোটেলে সেরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। সময় হয়ে গেছে বাড়ি ফেরার।মনে মনে পুরুলিয়াকে বিদায় জানালাম। আবার আসার প্রতিশ্রুতিও দিলাম। ওমা জয়চন্ডী পাহাড় , বিহারীনাথ এগুলো বাকি রইলো যে। ফিরে এলাম আসানসোল স্টেশনে। ব্ল্যাক ডায়মন্ড সঠিক সময়ে এসেছিলো বলে রাত সাড়ে ৯টায় বাড়ি।

কিভাবে যাবেন : সকালের ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ছাড়ছে ৬.১৫ মিনিটে হাওড়া থেকে , আসানসোল পৌচচ্ছে সকাল ১০ টায়। এছাড়াও হাওড়া থেকে আরো অনেক ট্রেন যাচ্ছে আসানসোল। আসানসোল থেকে ৩০ কিমি দূরে বড়ন্তি। গাড়ি ভাড়া এখানেই পেয়ে যাবেন। হোটেলে বলা থাকলে আরও ভালো।

কোথায় থাকবেন : আমরা ছিলাম Allure De Baranti তে। হোটেলটি বড়ন্তি লেকের ধারেই। একপাশে পাহাড় ও আরেকপাশে লেক। দৃশ্য অতুলনীয়। ফ্যামিলি রুম , তাঁবু ও ডাবল বেডরুম পেয়ে যাবেন। সর্বোপরি ম্যানেজার মহাশয়ের ব্যবহার খুবই ভালো। নাম সুরজিৎ রায়। চিন্তা করবেন না , এই https://baranti.in/ ওয়েবসাইটে ক্লিক করে সব তথ্য জানতে পারবেন।

বসন্তের পুরুলিয়া – ১ম পর্ব

প্রথম যখন প্ল্যান করছি পুরুলিয়া যাবো পরিবারের সবাই মিলে, কি মনে করে শীতকালটা ছেড়ে ফেব্রূয়ারি মাসে যাবো ঠিক করলাম। সেইমতো টিকিট ও হোটেল বুক করে ফেললাম। বসন্তের পুরুলিয়া যে এক কথায় অনবদ্য সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার বলি কিভাবে ট্যুর টা প্ল্যান করেছিলাম , আপনারাও সেভাবে করলে অনেক কিছুই কম সময়ে দেখে নিতে পারবেন। পুরুলিয়ায় ২ রকমের ভ্রমণ সার্কিট রয়েছে। একটি হলো গড় সার্কিট আর অন্যটা অযোধ্যা সার্কিট। গড় সার্কিট দেখতে গেলে আসানসোল থেকে পুরুলিয়া ঢোকা সুবিধে আবার অযোধ্যা সার্কিট দেখতে গেলে পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ঢুকতে হবে। আমাদের কাছে ২ দিন সময় ছিল আর আমরা দুদিনেই এই ২ সার্কিটের অধিকাংশ জায়গা ঘুরেছি।

অযোধ্যা পাহাড়ে চড়ার সময়

প্রথমদিন আমাদের গন্তব্য ছিল অযোধ্যা সার্কিট। অযোধ্যা সার্কিটে অনেকগুলো ঘোরার জায়গা রয়েছে , তবে যেহেতু আমরা বড়ন্তি থেকে গিয়েছি আমাদের সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টার মতো। দূরত্ব ছিল প্রায় ১৩০ কিমি। সুতরাং এই পথে যদি আসেন বুঝতেই পারছেন অনেক সকালে উঠে বেরিয়ে পড়তে হবে। আমরাও তাই করেছিলাম। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল মার্বেল লেক। পাহাড়ের কোলে এই স্বচ্ছ জলের লেক দেখে আপনি অভিভূত হবেনই। চারপাশের উঁচু পাহাড়গুলি থেকেও অনেকভাবে এই লেকের ছবিও তুলতে পারবেন।

মার্বেল লেক

মার্বেল লেক দেখে আমরা রওনা দিলাম আমাদের পরের গন্তব্য বামনী ফলস। প্রথমেই বলি সিঁড়ি দিয়ে অনেকটাই নিচে নামতে হয় এই ফলস ভালোভাবে দেখতে। আমাদের গ্রূপের বয়স্করা তো নামেনি , আমি নেবেছিলাম। হ্যাঁ এই নিচের ছবি তারই ফল।

বামনী ফলস

বামনী ফলস দেখতেই আমাদের দুপুর দেড়টা বেজে গেলো আর তাই পেট বাবাজিও খাবার কথা বলতে লাগলো। তাই আমরা অযোধ্যা পাহাড় থেকে নেমে আসলাম নিচে। পাহাড়ের ওপর খাবারের দাম অনেক , তাই আমাদের ড্রাইভার দাদাটি আমাদের নিচে নিয়ে এলেন। এই প্রথম খাবারের জন্য অনেকটা নিচে নামতে হলো। যাই হোক রাস্তার ধারের এক হোটেলে মাছ ভাত পরিপাটি করে খেয়ে রওনা দিলাম পরের গন্তব্য চড়িদা গ্রাম। খাবারের হোটেল থেকে চড়িদা গ্রাম যেতে ৫ মিনিট লাগলো। চড়িদার ব্যাপারে কিছু বলার আগে বলি , রাস্তায় কিছু অপূর্ব পলাশের দেখা পেলাম। বসন্ত কালে পুরুলিয়া আসা আমাদের সার্থক হলো। চোখ জুড়োল পলাশের রূপ দেখে , তাই ঝটপট ক্যামেরাবন্দি করলাম।

পলাশ ফুল

চড়িদা গ্রাম বিখ্যাত এর মুখোশ শিল্পের জন্য। এ গ্রামের সব বাড়িতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ। সে রকমারি মুখোশের একটি সংগ্রহশালাও রয়েছে। সেখানে গিয়ে এই শিল্পকে কুর্নিশ জানাতে ইচ্ছে হলো। আমাদের এই বাংলাতে কত কিইনা আছে , কতটাই বা আর আমরা জানি বা দেখেছি। সংগ্রহশালা থেকে বেরিয়ে একটি দোকান থেকে ৩ তে মুখোশ কিনলাম , রইলো পুরুলিয়ার স্মৃতি হিসেবে।

শিল্পীর হাতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ

চড়িদা থেকে পাখি পাহাড় যাওয়া যায় , তবে সময়ের অভাবে আমরা যাইনি। আমরা আবার পাহাড়ের দিকে চললাম। আমাদের পরের গন্তব্য ছিল তুর্গা ড্যাম। তুর্গা ড্যাম এ দেখার সেরম কিছু নেই। ড্যামের জল অনেক নোংরা , একঝলক দেখে নিয়েই চললাম পরের গন্তব্যে। লোয়ার ও আপার ড্যাম।

তুর্গা ড্যাম

লোয়ার ও আপার ড্যাম আমাদের আজকের শেষ দুটি গন্তব্য ছিল। লোয়ার ও আপার ড্যাম বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ড্যামের জল পুরো নীল এবং পরিষ্কার। আপনারা আর যাই দেখুন আর না দেখুন , কখনো অযোধ্যা পাহাড়ে এলে এই দুটি ড্যাম অবশ্যই দেখবেন। এরম নৈসর্গিক দৃশ্য অনেকদিন স্মৃতিতে থেকে যাবে।

লোয়ার ড্যাম
আপার ড্যাম

এই ড্যাম দুটি দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। সন্ধে ৭ টায় পৌঁছে গেলাম। রাতের মটন আর রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লাম , কাল সকালে উঠে ঘুরতে যেতে হবে তো। আবার কালকেই ফেরার ট্রেন। কালকের ঘোরা পরের পর্বে দেয়া রইলো

সুধাকরের গাড়ির বাগান

mayurpankh car sudha car museum

গাড়ি তো আপনারা অনেকেই দেখেছেন কিন্তু কখনো কি রকমারি গাড়ি দেখেছেন ? যেমন ধরুন পেন্সিল গাড়ি , রবার গাড়ি কিংবা সুটকেস গাড়ি। না আমি খেলনা গাড়ির কথা বলছি না। আমি এমন গাড়ির কথা বলছি যা রীতিমতো চালানো যায়। এরম গাড়ি চাইলেই যে পাবেন সেরম নয় , গোটা ভারতবর্ষে এরম একজনই লোক আছেন যিনি এই অদ্ভুত শখ রাখেন। কি সেই অদ্ভুত শখ ? রকমারি গাড়ি বানানো।

এই ভদ্রলোকের নাম হলো কে সুধাকর। ইনি থাকেন হায়দ্রাবাদে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই এই ধরণের শখ ছিল তার। ব্যাস বড়ো হয়ে বানিয়ে ফেললেন পৃথিবীর সবথেকে বড়ো “ট্রাইসাইকেল” . আপনি হয়তো ভাবছেন এ আর এমন কি , তাহলে আপনাকে বলি এই “ট্রাইসাইকেল” টির চাকার ব্যাস হলো ১৭ ফুট আর সাইকেলটির দৈর্ঘ্য হলো প্রায় ৩৭ ফুট। এই জিনিস বানানোর পর সে খবর কি আর চেপে রাখা যায় ! গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ওনার নাম উঠলো। যখন উনি এটা পেলেন তখন সালটা হলো ২০০৫।

এই ঘটনাটির প্রভাব ওনার আত্মবিশ্বাসে পড়েছিল। ব্যাস তারপর আর উনি পিছনে না তাকিয়ে মাত্র ৫ বছরের মধ্যে বানিয়ে ফেললেন নিজস্ব গাড়ি সংগ্রহশালা। হ্যাঁ ২০১০ থেকে উনি নিজের বানানো এই সংগ্রশালা চালাচ্ছেন , যেখানে দেশ বিদেশের বহু পুরোনো গাড়ির সাথে সাথে তার নিজের ডিজাইন করা গাড়িও আছে। এই গাড়ি গুলি চালানো হয় কোনো দিনবিশেষে , যখন প্রচুর লোক ভীড় জমান শুধু গাড়িগুলো কিভাবে চালানো হচ্ছে তা দেখতে। নাম দিয়েছেন “সুধা কার মিউজিয়াম” . বিশেষ উৎসবের দিনগুলির জন্যে ইনি গাড়ি ডিজাইন করে রেখেছেন যেমন চিলড্রেন্স ডের জন্যে পেন্সিল গাড়ি, এইডস ডের জন্যে কন্ডোম গাড়ি , উইমেন্স ডের জন্যে মহিলা জুতো গাড়ি কিংবা প্রযুক্তি দিবসের জন্যে কম্পিউটার গাড়ি।

এই গল্পে আমি কী করে এলাম ভাবছেন তো ? ওই যে হায়দ্রাবাদে একটি কাজে গিয়েছিলাম। সেখানে সেখানকার সরকারের পর্যটন ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারলাম অনেক জিনিসের সাথে এটিও একটি দেখার বিষয়। বেশি দূর ছিল না তাই , একদিন পরিকল্পনা করে চললাম গাড়ি দেখতে। যা দেখলাম , তাতে আমার মন জুড়োলো। সত্যি একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে আমাকে এটা স্বীকার করতে হবে যে ইনি অমানুষিক পরিশ্রম করে নিজের ট্যালেন্টকে কাজে লাগিয়ে যা বানিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসা পাবার যোগ্য। এখানে ঢুকতে গেলে ৫০ বা ৬০ টাকার একটি টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। মোবাইল ফোন এরও আলাদা করে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হয়। আমি জায়গাটির গুগল ম্যাপ লিংক দিলাম (নামের ওপর ক্লিক করতে হবে ), কখনও হায়দ্রাবাদ গেলে অবশ্যই দেখে আসবেন এই “সুধা কার মিউজিয়াম”.

শরৎ চন্দ্র কুঠি

Sarath Kuthi

আমার মনে আছে সেই ছোটবেলায় বাবা একটা বই কিনে দিয়েছিলো , যেটাতে সব বাংলার মনীষীদের জীবনী লেখা ছিল। সেখানে তাদের জন্ম থেকে শুরু করে তাদের কাজ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখা ছিল। আজ বাবা নেই সেই বইও খুঁজে পাইনি। যেটা পেয়েছি সেটা হলো উইকিপিডিয়া। এখানে সবকিছুরই বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। সেই ছেলেবেলায় আমরা বেশি উপহার পেতাম বইপত্র এবং অনেক লেখকেরই বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি। যদিও বাংলা মাধ্যমে পড়েছি বলে অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখা পাঠ্যক্রমেই ছিল। সেরোমি এক লেখক ছিলেন শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যার লেখা মহেশ থেকে শুরু করে রামের সুমতি অনেক কিছুই আমরা পড়েছি। আমার বাড়ির কাছেই দেবানন্দপুরে শরৎ চন্দ্রের জন্মস্থান। যদিও ওই জীবনী বইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম ,তিনি ভাগলপুরে বড়ো হয়েছেন। জীবনের খুব বেশি সময় দেবানন্দপুরে কাটাননি। তারপর কাজের সূত্রে রেঙ্গুনে চলে যান। কিন্তু জীবনের শেষ ১২ বছর উনি হাওড়া জেলার সামতাবের গ্রামে ওনার বাড়িতে কাটিয়েছেন। সাল ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ অবধি। ওনার এই বাড়িতেই উনি লিখেছেন কিছু যুগান্তকারী লেখা যা নিয়ে পরবর্তী কালে অনেক ছায়াছবিও তৈরী হয়েছে যেমন দেবদাস , রামের সুমতি , দেনা পাওনা , বৈকুন্ঠের উইল , নিষ্কৃতি ও আরো কিছু বিখ্যাত উপন্যাস। এই বাড়ি রাজ্য সরকার থেকে নবীকরণ করা হয়েছে এবং নাম দেওয়া হয়েছে শরৎ চন্দ্র কুঠি।

শরৎ কুঠির সামনে

বহু লোকই ভীড় জমান ছুটির দিনে এই বাড়ি দেখার জন্যে। আমিও এই সুযোগ ছাড়তে পারিনি , সাখ্যাৎ ইতিহাস দর্শন করা কি ছাড়া যায়। আমার বাড়ি থেকে এই জায়গা ৫০ বা ৬০ কিলোমিটার হবে , তাই একদিনেই ঘুরে আসা যায়। যদি আপনি কলকাতা এবং তার পার্শবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা না হন , তাহলে অবশ্যই আমার পথনির্দেশ টা দেখে নেবেন। নিচে দেয়া আছে।

এবার ফেরা যাক গিয়ে কি দেখলাম। আমি পুরো পরিবার সমেত রওনা দিয়েছিলাম দুপুর ১২টায়। পৌঁছে গিয়েছিলাম ১.৩০ টার সময়। অবশ্যই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম তাই। সকালে এই বাড়ি ১০ টা থেকে দুপুরে ১ টা অবধি খোলা থাকে আর বিকেলে ৩ টে থেকে ৫ টা। একটু অপেক্ষা করতে হয়েছে কিন্তু তাতে খুব অসুবিধা হবেনা কারণ পাশেই আপনি পাবেন রূপনারায়ণ নদকে। রূপনারায়ণের পারে কিছুক্ষন কাটিয়ে দুপুর ৩ টের পর দেখলাম একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বাড়ি খুললেন। তিনিই এই ছোট্ট ১৫ মিনিটের গাইড। এই ১৫ মিনিটে আমরা দেখলাম শরৎ চন্দ্রের বসার ঘর , ওনার ব্যবহৃত সেকালের দম দেওয়া ঘড়ি , আলমারি। এর সাথে বাড়ির সামনের বাগান যেখানে রামের সুমতির বিখ্যাত পেয়ারা গাছ এখনো রয়েছে যদিও সেটার অবস্থা খুব ভালো নয়। অনেক পুরোনো তো। বাড়ির সামনে সেই পুকুর যেখানে কার্তিক ও গনেশ নামের রুই ও কাতলা মাছের উল্লেখ রয়েছে রামের সুমতি গল্পে।

এরপর আমরা ঘুরে দেখলাম বাড়ির দোতলাটা , যেখানে লেখক নিজে থাকতেন তার সেই খাট , ব্যবহৃত বালিশ পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে। ওনার ব্যবহৃত জুতোও রয়েছে। এরপর বাড়ির পেছনের উঠোনে রয়েছে শৌচালয় ও তখনকার দিনে গ্রামের বাড়িতে যেসব ধানের গোলা থাকতো সেসব। এই ১৫ মিনিট আমাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আপনি গেলেও আপনার জন্যেও যথেষ্টই থাকবে। একটা কথা বলে রাখি এই বাড়িতে অনেক স্বনামধন্য লোকের পদধূলিও পড়েছে , যেমন নেতাজি। শরৎ চন্দ্র স্বাধীনতা সংগ্রাম কে পরোক্ষভাবে সমর্থন করতেন। সেই জন্যেই অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই নিরিবিলি পরিবেশে এসে তখনকার দিনে বৈঠকও করে গেছেন। আপাতত বাড়ি ঘুরে দেখতে কোনো টাকা লাগে না , তবে মন চাইলে খুশিমনে সেই বৃদ্ধ গাইডকে আপনার সাধ্যমতো কিছু দিয়ে আসতে পারেন। আমরাও দিয়েছিলাম , আর ওনার থেকেই শুনেছি লেখকের পরের প্রজন্মের লোকেরা দক্ষিণ কলকাতায় থাকে , তারা মাঝে মাঝে আসে। ওনারাই এই বৃদ্ধ মানুষটিকে কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।

কাছের রূপনারায়ণ নদের পাড়

পথনির্দেশ : হাওড়া স্টেশন থেকে পাঁশকুড়াগামী যেকোনো ট্রেন ধরে দেউলটি স্টেশন নামবেন। সেখান থেকে টোটো করে শরৎ কুঠি। খুব বেশি হলে ১০ বা ১৫ টাকা নিতে পারে। মূলসড়কের কাছে নিরালা নামের একটি রিসোর্ট আছে সেখানে থাকা ও খাবার ব্যবস্থা আছে।

বড়দিনে ফ্রেডরিকস নগর

স্ত্রী বললো – “কোথায় যাবে? “
“ফ্রেডরিকস নগর চলো “, আমি বললাম।
“সেটা আবার কোথায় ?” স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন।
আমি বললাম “কাছেই , বেশিদূর নয়। আমাকে বিশ্বাস করো ,ঘুরতে যাবে যখন একটু বিশ্বাস করো। “
প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু হলো। তবে এতো স্বামী স্ত্রীর গল্প নয় , তাই সমস্যা হলেও রাজি করলাম।
বললাম “চলো , কথা দিচ্ছি ঠকবে না। “

এবার দুপুর ২টোর ট্রেনে আমরা মানে আমি ,আমার স্ত্রী ও আমার ছেলে রওনা দিলাম। চললাম ফ্রেডরিকস নগর।
কোন্নগর থেকে পৌঁছতে পুরো ১০ মিনিট লাগলো।
ট্রেন থেকে নেমেই স্ত্রী আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে “আরে এতো শ্রীরামপুর , কি উলটোপালটা নাম বলছিলে ,ফ্রেডরিকস নগর, ইয়ার্কি হচ্ছে। ” আমি বললাম “এত বিরক্ত হওয়ার কি আছে , এতো এখনকার শ্রীরামপুর। এতো আগে ফ্রেডরিকস নগরই ছিল।”
ইতিহাসের কাহিনী বলতে হবে ভেবেই আনন্দিত হয়ে প্ল্যাটফর্মেই শুরু করলাম “আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে.. , “, মাঝপথেই স্ত্রী আমাকে থামিয়ে দিয়ে , “তোমার এই ইতিহাস শুনিও নাতো ! কোথায় নিয়ে যাবে চলো। “
অগত্যা বাধ্য স্বামীর মতো টোটো স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে চললাম।
“ফ্রেডরিকস নগর ঘাট যাবে ?” এক টোটোওয়ালা কে জিজ্ঞেস করলাম।
সে শুধু ঘাট কথাটাই শুনতে পেয়ে বললো “বসুন বসুন , যাবো। “
যাক আপাতত টোটোয় বসলাম। টোটো ছেড়েও দিলো।
যেতে যেতে টোটোওয়ালা জিজ্ঞেস করলো “দাদা ,ঘাটের আগে কি যেন বললেন , ফ্রেডরিক কি যেন?”
আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম “ও ফ্রেডরিকস নগর। “
টোটোওয়ালা – “সে আবার কোথায় ?”
এবার আমি আবার শুরু করলাম, মনে হলো টোটোওয়ালা কেই শোনাব। যেই না বলতে যাবো “আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে “, স্ত্রী আমার জামা টেনে ধরে ফিসফিস করে বলছে “তোমার এই টোটোতে উঠে জ্ঞানের ভান্ডার নিয়ে না বসলেই নয় ! চুপ করো তো ! “
এবার আর কি করি। উপেক্ষিত ভান্ডার নিয়ে মনে মনে ভাবলাম , এই টোটোওয়ালা খুবই দুর্ভাগা , জ্ঞান টা পেলো না। স্ত্রী কে শোনাবার আমি আবার সাহস পেলাম না। ইতিহাসকে পেছনে ফেলে যেতে যেতে ঘাট চলে এলো। স্ত্রী আবার জিজ্ঞেস করলো “হেঁয়ালি না করে বলোতো কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ?” “ব্যারাকপুরে। ” আমি বললাম।
“প্ল্যানটা শোনো , আগে ব্যারাকপুরে যাবো। তারপর এসে তোমাকে শ্রীরামপুরের সব দেখাচ্ছি । “

চার্চের ভেতরে
সেন্ট বার্থেলমেউ চার্চ

নৌকো ধরে চললাম ভারতবর্ষের সবথেকে পুরোনো ক্যান্টনমেন্টে , ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট। ধুবিঘাটে (এই নামেই সবাই চেনে ) নেমেই দেখলাম অনেক ফাঁকা টোটো। একটাতে উঠে চেপে বসলাম। কথা প্রসঙ্গে বলে রাখি যে ছোটবেলা মায়েরা বলতো টোটো করে না ঘুরে পড়াশুনো করতে। কিন্তু দিনকাল যা পড়েছে পড়াশুনো করেও টোটো করেই ঘুরতে হচ্ছে। টোটোচালক ভাইটিকে বললাম চল চার্চে। পৌঁছতে ১০ মিনিট লাগলো। পৌঁছলাম সেন্ট বার্থেলমেউ চার্চ। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের পাশেই এই চার্চ।
স্ত্রীকে বললাম , এই চার্চ কিছুদিন আগেই সরকার থেকে হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে। আনুমানিক ১৮৩১ সালে স্থাপিত এই চার্চ। প্রত্যেকদিনই বিকেল ৪.৩০ মিনিট অবধি খোলা থাকে। আজ ২৫ তারিখ বলে একটু বেশি ভীড়। অন্যান্য দিন এই চার্চের গুরুত্ব একটু কমই থাকে। ভেতরে ঢুকলাম , চার্চের ভেতরটা যথেষ্ট বড়ো , বাইরে থেকে তা ঠাহর করা মুশকিল। আজকের দিনে চার্চকে খুব ভালোভাবেই সাজানো হয়েছে। চার্চের পাশেই একটি মাঠ রয়েছে , সেখানে আর যাবো কি করে। সেখানে তো সেলফি শিকারীদের ভীড়। ১৫ মিনিট মতো কাটিয়ে ব্যারাকপুরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে চললাম শ্রীরামপুরের দিকে। ফেরার পথে খেয়াল করলাম আমার স্ত্রী একটু নরম হয়েছে। নিজেই জানতে চাইলো ফ্রেডরিকস নগর এর ব্যাপারটা। আমিও সুযোগের সদব্যবহার করে শুরু করলাম।
আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রচুর বিদেশী ব্যবসায়ীরা নদীপথে বাংলায় প্রবেশ করে আর হুগলী নদীর পার্শবর্তী অঞ্চলগুলিতে বসবাস শুরু করে। এরমভাবেই ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যান্ডেলে পর্তুগিজ , চুঁচুড়ায় ডাচ , চন্দননগরে ফরাসি এবং শ্রীরামপুরে ড্যানিশ উপনিবেশ তৈরী হয়। সেইজন্যে হুগলি নদীর এই অঞ্চলগুলিকে ছোট ইউরোপ ও বলা হয়। ড্যানিশরা এখানে ১৭৫৫ থেকে ১৮৪৫ অবধি থাকে, তারপর এই শহর ব্রিটিশদের হাতে হস্তান্তর হয়। শ্রীরামপুরে এখনো সেই ড্যানিশ সংস্কৃতির ছাপ বিভিন্ন স্থাপত্যের মধ্যে পাওয়া যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ড্যানিশ কোর্ট যা এখন শ্রীরামপুর কোর্ট হয়েছে। প্রথমে আমরা গেলাম ড্যানিশ কোর্টে। ছুটির দিনে দেখার বলতে কোর্টের ফাটক ও কোর্টের প্রধান বিল্ডিংয়ের স্থাপত্য, যেটা সেই ড্যানিশ সময়কার ।

শ্রীরামপুর কোর্ট

কোর্টের সামনেই রয়েছে সেন্ট ওলাভ চার্চ। এটি ১৮০৬ সালের একটি স্থাপত্য যা ড্যানিশদের বানানো। এটি একটি ক্যাথলিক চার্চ। সমস্যা হলো আমরা যখন পৌঁছেছি (বিকেল সাড়ে ৩টের দিকে )তখন চার্চ বন্ধ। চার্চ আবার খুলবে সাড়ে ৪টের সময়।

সেন্ট ওলাভ চার্চ

সময়ের অভাব ছিলই তাই সময় নষ্ট না করে আমরা এগিয়ে গেলাম ডেনমার্ক ট্যাভার্নের দিকে। এটি তখনকার সময়ের একটি হোটেল যা ড্যানিশ ব্যবসায়ীদের জন্যে বানানো হয়েছিল। এই হোটেল তাদের জন্যে ছিল একটি রাত্রিবাসের ঠিকানা। গঙ্গার ধারের এই হোটেল সেকালে অনেক জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ ২৫০ বছর পর ২০১৮ তে আবার নতুন করে সেজেছে ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে একটি ভারতীয় সংস্থা। খাবার তো পাওয়া যায়ই আবার রাতও কাটানো যায়। খাবারের দাম বেশি হলেও , এখানকার পরিবেশ আপনাকে দেবে সেই আমলের অনুভূতি। প্রচুর লোক এখানে সেই অনুভূতিই নিতে আসেন। যদিও আমরা ভেতরে ঢুকিনি , তাও বাইরে থেকে দেখাটাও একরকম অনুভূতি দেয়।

ডেনমার্ক ট্যাভার্নের সামনে
ডেনমার্ক ট্যাভার্ন


এরপর আমরা গেলাম এম্যাকুলেট কন্সেপশন চার্চে। এটিও ডেনমার্ক ট্যাভার্নের বেশ কাছে। এটিও বেশ পুরোনো চার্চ তবে সত্যি বলতে সালটা আমার জানা নেই। ২৫ তারিখ বলে এই চার্চও সেজে উঠেছে। এর ভেতরে মিশনারি হাসপাতালও রয়েছে , যেখানে দুঃস্থদের সেবা শুশ্রূষা করা হয়। এতক্ষন তো স্ত্রী চুপচাপ ঘুরেছে , এবার আমি বললাম “চলো আজকের শেষ জায়গাতে নিয়ে যাই , খুব ভালো লাগবে “.

এম্মাকুলেট কন্সেপশন চার্চ
চার্চের ভেতরে

একটু দূরে , তাই টোটো করে চললাম আমাদের শেষ গন্তব্য শ্রীরামপুর কলেজের দিকে। ২ বছর এই কলেজে পড়ার সৌভাগ্য তো আমার রয়েইছে , তাও আবার নিজের ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার টা আজ হয়ে গেলো। যদিও তার ছোট্ট মাথায় নস্টালজিয়ার কিছুই ঢোকে না, তাও তাকে কোলে নিয়ে কলেজে ঘোরার মজাই আলাদা। কখনো চেষ্টা করে দেখবেন , খুব ভালো লাগবে। স্ত্রীকে নিয়ে দেখালাম কলেজের প্রতিটি জায়গা যেখানে কোনো না কোনো স্মৃতি রয়েছে , সত্যি বলতে অনেকই স্মৃতি মাথাচাড়া দিলো। স্মৃতির অনুভূতি নিয়েই সবাইকে নিয়ে গেলাম কলেজের প্রধান বিল্ডিংয়ের দিকে। এইটা দেখিয়ে স্ত্রীকে বললাম “১৮১৮ সালের তৈরী , দেখো ১ বছর আগেই ২০০ বছর সম্পূর্ণ হয়েছে। ভাবতে পারছো , এরম একটা জায়গাতে দাঁড়িয়ে রয়েছো “. স্ত্রী আর কি বলবে, বললো “এরম জায়গায় তুমি আগে কেন নিয়ে আসোনি। “

মেইন বিল্ডিং
কলেজের ভেতরের রাস্তা
কেরী সংগ্রহশালা

যাই হোক সহধর্মিণীটির মুখের হাসি দেখে বুঝতে বাকি রইলো না , যে আজকের দিনটি তার ভালোই কেটেছে। ছুটির দিনে না গেলে কেরী সাহেবের সংগ্রহশালাটা দেখা যেত। তাই ঘোরার পর্ব চুকিয়ে প্রথমে কলেজের বাইরে ভেলমুড়ি খেলাম তারপর টোটো করে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। টোটোয় বসেই মনে পড়লো , স্ত্রীকে বললাম “এই যাহ ! তোমাদের ভারতবর্ষের প্রথম ছাপাখানাটা তো দেখানোই হলো না। কলেজের কাছেই ছিল “.

সহধর্মিনী বললো “আজ ছেড়ে দাও। ছাপাখানটা না হয় ফ্রেডরিকস নগর দ্বিতীয় পর্বের জন্যে তোলা থাক “.

জেলেদের জেটিতে রাতের খাওয়া

ফিশেরম্যান হোয়ার্ফ – এই কথাটির পুরোদস্তুর বাংলা অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো জেলেদের জেটি। এই জেলেদের জেটি সেখানেই থাকে যেখানে মাছ ধরবার একটা আয়োজন হয়। আপনারা বলতে পারেন হায়দ্রাবাদে কোথায় এরম হয় ? সেখানে তো সমুদ্র নেই। জেলেদের যেটি আসলে হলো একটি রেস্তোরাঁ যেটি গোয়াতে প্রথম খোলে তারপর ধীরে ধীরে ভারতের অন্যান্য শহর গুলোতেও পসার জমাতে থাকে। এই রেস্তোরাঁ আপনাকে শুধু খাবার পরিবেশন করে না এটি খাবার সাথে সাথে একটু গোয়ার বাতাবরণের অনুভূতি জাগায়। হায়দ্রাবাদের ফাইনান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টে এই রেস্তোরাঁটি রাস্তার ধারেই রয়েছে। ফাইনান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টকে যদি বাংলায় বলতাম তাহলে কাউকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো সে বলতেই পারতো না হায়দ্রাবাদের কোন অঞ্চলকে বোঝানো হচ্ছে। মাইক্রোসফ্টের নাম তো শুনেইছেন , এই সংস্থার এক বড়ো অফিস এই অঞ্চলেই আছে। শুধু তাই নয় আছে উইপ্রো , ইনফোসিস এবং এরম আরো তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা।

ফিশেরম্যান হোয়ার্ফের সামনেটা
ভেতরের পরিবেশ

যাই হোক এবার রেস্তোরাঁর কথায় আসি। আলাদা আলাদা ছাউনি দেয়া খাবার জায়গা আর তার ঠিক মধ্যিখানে গিটার বাজিয়ে পশ্চিমী সংগীত পরিবেশন চলছে এবং তারই মাঝে খাওয়া দাওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। গান শুনতে শুনতে পছন্দসই খাবারের মেনু কার্ড হাতে পেলাম। অর্ডার করলাম মিক্সড সীফুড স্যুপ। অসাধারণ খেতে এই মাখন মিশ্রিত এই পানীয়। আমার দারুন লেগেছিলো এই স্যুপ দিয়ে খাবার শুরু করতে। গোয়ার পরিবেশে এসেছি সীফুড না চেখে দেখলে হয়। যারা পরিবেশন করছিলেন তাদের মধ্যে ১-২ জন বাঙালি পাওয়া গেলো তাদের জিজ্ঞেস করতেই তারা এই রেস্তোরাঁর সবথেকে ভালো খাবার গুলোর নাম বললো। তাদের কথামতোই নিলাম চিলি ফিশ , ভুনা গোস্ত , গলৌটি কাবাব আর রুটি। এগুলোর মধ্যে চিলি ফিশ টা আমার খিদে খিদে যেন আরো বাড়িয়ে দিলো। এতো ভালো চিলি ফিশ আমি আগে কখনোই খাইনি। গোলমরিচ আর লঙ্কার এক অদ্ভুত মিশেল এই আইটেম। যেই বানিয়ে থাকুক তাকে মনে মনে শতকোটি শুভেচ্ছা জানিয়ে দিয়েছিলাম। ভুনা গোস্ত একটা মটনের রেসিপি। এটিও বেশ ভালোই খেতে , রুটির সাথে খেতে দারুন লাগবে। বাকি খাবার গুলো আমার খুব ভালো লাগেনি।

চিলি ফিশ আরেকটা প্লেটে গলৌটি কাবাব
মিক্সড সীফুড স্যুপ

যদি এখানে কখনো আসেন অবশ্যই সীফুড স্যুপ আর চিলি ফিশ খেয়ে দেখবেন। কথা দিতে পারি একবার খেলে ভুলবেন না। রেস্তোরাঁয় প্রবেশের মুখে অনেক মাছ রাখা থাকে তাদের মধ্যে বড়ো পমফ্রেট , বড়ো গলদা চিংড়ি এবং বড়ো কাঁকড়া গুলি দেখবার মতো। এগুলিকে হাতে নিয়ে ছবিও তুলতে পারেন। শনিবার বা রবিবার এলে আগে থেকে টেবিল বুক করে আসবেন নইলে এতো ভীড় থাকে যে জায়গা নাও পেতে পারেন। নিচে গুগল ম্যাপের লিংক দেয়া রইলো , দেখে নিতে পারেন।

https://goo.gl/maps/WpbiidntMeB5eT4U9