নারায়ণপুরের রাজবাড়ী

নারায়ণপুর ? না কি যেন বললে ? ওটা কোথায় ? – এই ছিল বুম্বার প্রথম প্রতিক্রিয়া।

আমি বললাম – বাঁকুড়ায়। মানে ধরে নে , আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার পথ। একশো পনেরো কিলোমিটার মতো।

আরে জায়গাটার পুরো নামটা বলো , ম্যাপে দেখতে হবে তো – বুম্বা বললো।

কি আছে ওখানে ? – বুম্বা কৌতূহলী হয়ে উঠলো। বললাম – টেরাকোটা মন্দির , জমিদারবাড়ি, আর একটা জায়গায় আমি যেতে চাই , জঙ্গল পাঁচমাথা।

আমি , বুম্বা , বুম্বার সাধের মারুতি গাড়ি আর তার সাথে যদি গুগল ম্যাপ থাকে , তাহলে সে এক সাংঘাতিক কম্বিনেশন তৈরী করে। কত পথ যে আমরা ভুল করেছি , কত জায়গায় গিয়ে যে হারিয়ে গিয়েছি , সেসব অভিজ্ঞতার গল্প করলে একটা বই লেখা হয়ে যাবে। পরে কোনো পোস্টে সেসব গল্প করা যাবে। আপাতত আমরা দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম।  কবে , কখন আর কারা যাবে নারায়ণপুর। পুরো নাম হাদাল নারায়ণপুর। এইটি যে জায়গাটার নাম সেটি আমি জানতাম। আমার ধারণা পাল্টালো যখন ওখানে গিয়ে পৌঁছলাম।

সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পৌঁছলাম শক্তিগড়। লুচি তরকারি আর বিখ্যাত ল্যাংচা সহযোগে প্রাতরাশ সেরে যখন আবার গাড়িতে চেপে বসলাম , তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজে। এপ্রিল মাসের গরমে , বাইরের আবহাওয়া দেখলে মনে হবে যেন বেলা গড়িয়ে এগারোটা বেজে গেছে। তাই গাড়ির ভেতরে এসি চালাতেই হলো।  এই যাত্রায় আমার সঙ্গী আমার স্ত্রী , ছেলে আর আমার বন্ধু সুব্রত। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বুম্বা। বুম্বার বাঁপাশে বুম্বার বিখ্যাত স্যামসুং ফোন , আর তাতে ছাই রঙের ওলিতেগলিতে নীল দাগের পথ দেখাচ্ছে গুগল ম্যাপ।

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা এলাম বর্ধমান , সেখান থেকে দামোদরের ব্রীজ পেরিয়ে আমরা এলাম বাঁকুড়া রোডে। ম্যাপ অনুযায়ী , বাঁকুড়ার এক জনপ্রিয় টাউন সোনামুখীর দিকে যেতে হবে। সেই পথে এগোতে লাগলাম। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম ম্যাপ আমাদের সড়ক ছেড়ে ডানদিকের রাস্তায় যেতে বলছে।

ধগড়িয়া স্টেশন

এই উপলক্ষ্যে বুম্বার ফোনের এক বিশেষ বৈশিষ্টের কথা উল্লেখ করতে চাই। এটি ফোনটিকে, অন্যান্য সাধারণ তুচ্ছ ফোনেদের ভীড়ে অসাধারণ করে তোলে। ধরুন এই ফোনে ফোন এলেই তৎক্ষণাৎ রিং হতে থাকে, কিন্তু যিনি ফোন করেছেন, তাঁর নাম বা ফোন নম্বর দেখা যায় মিনিটখানেক পরে। আবার ধরা যাক , আপনি ফোনটিতে গুগল ম্যাপ চালিয়ে যাচ্ছেন , আপনার সামনে দুটো রাস্তা রয়েছে। ফোন আপনাকে ডানদিকে যেতে বলছে , আপনি ডানদিকের রাস্তা ধরে এক কিলোমিটার চলে গেলেন। তারপর হঠাৎ ফোন আপনাকে বলে বসলো যে নাহ বামদিকে যেতে হতো। আবার ইউ টার্ন নিয়ে যেতে হলো বামদিকে। এটি হলো ফোনটির ধীর স্থির ব্যক্তিত্বের একটি দিকমাত্র। উনি , সবদিক বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন , যেমন ধরুন ইন্টারনেট আছে কিনা , ম্যাপ আপডেট হয়েছে নাকি ইত্যাদি। মুশকিল হচ্ছে , এই বিচার বিবেচনা করে পথ দেখাতে ওনার একটু সময় লাগে। কখন পনেরো মিনিট , আবার কখনো আধ ঘন্টা। আমরাই গাড়ি চালাতে গিয়ে ওনাকে অযথা তাড়া দিই।

এবারো তার অন্যথা হলো না। ডানদিকের রাস্তা ধরে আমরা পৌঁছলাম ধগড়িয়া স্টেশন। এবার আমি ফোন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে খুঁজতে লাগলাম যদি কোনো মানুষের দেখা পাওয়া যায়। ঘড়িতে বেলা এগারোটা। খাঁ খাঁ রোদে চারিদিক জনমানবহীন। কিন্তু প্রকৃতি এখানে বেশ উদার। অনবরত বসন্তের মৃদু বাতাস বয়ে চলেছে , যা এই আবহাওয়াতেও আরামদায়ক। বাংলার গ্রামে গ্রামে যখনি গেছি , এরম রূপেই প্রকৃতিকে আমি দেখেছি। কিছুদূর থেকে একজন লোককে সাইকেলে চেপে আসতে দেখলাম। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – দাদা, নারায়ণপুর যাবো , কোন রাস্তা ধরতে হবে ?

উনি বললেন – ও , হদল নারায়ণপুর ? আমি বললাম – হ্যাঁ।

তা এই রাস্তায় কেন ? আরেকটু পিছনে গিয়েই তো ভালো রাস্তা ছিল। এতো এগিয়ে এসেছেন।

দূরে রেলগেটের দিকে ইশারা করে বললেন – ওই যে রাস্তা দেখা যাচ্ছে , ওই রাস্তা ধরেও যেতে পারেন পাঁচ কিলোমিটারের পথ।

ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা আবার গাড়িতে চাপলাম। জায়গাটার নামের উচ্চারণ এবার আমার কাছে পরিষ্কার হলো। হদল নারায়ণপুর। একযোগে সব্বাইকে জানিয়ে দিলাম।  এরপর ভদ্রলোকের কথামতো এগিয়ে চললাম। বুম্বার ফোনকে কিছুক্ষণ রেস্ট দেয়া হলো। অনেকটা পরিশ্রম গেছে তো ! উনি একটু বিশ্রাম নিক।

ব্রহ্মাণী মন্দির

কিলোমিটার খানেক চলার পর পৌঁছে গেলাম নারায়ণপুর। নারায়ণপুর জায়গাটা বাঁকুড়ার পাত্রসায়ের ব্লকের অন্তর্গত। নারায়ণপুরের যেই জায়গায় এসে আমরা পৌঁছলাম , সেই জায়গাতেই রয়েছে ব্রহ্মাণী মন্দির। মন্দিরের সামনেটায় রয়েছে নাটমন্দিরের মতো নির্মিত একটি মণ্ডপ। মণ্ডপের চালে টিন ব্যবহার করা হয়েছে। বাহ্যিক গঠনশৈলী বাংলার অন্যান্য প্রাচীন মন্দিরের থেকে আলাদা। মণ্ডপ পেরিয়ে মন্দিরের মূল গর্ভগৃহ। ব্রহ্মাণী মায়ের মূর্তির গঠন অবাক করার মতো। কষ্টি পাথরের তৈরি এই মূর্তি যে কতটা প্ৰাচীন তার সঠিক ধারণা আমার নেই । অন্ধকারে পুরোপুরি বোঝা না গেলেও, দেবীর চারহাত এবং একটি হাতে ত্রিশূল লক্ষ্য করা যায় । অনেকের মতে এটি দেবী পার্বতীর মূর্তি। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মূর্তি স্থাপনের কাহিনী জনমুখে প্রচলিত। তবে স্থানীয় লোকেদের কাছে এই মন্দিরের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে মায়ের মূর্তির গঠনশৈলী আমাকে অবাক করলো । মূর্তির বয়স কম করে হলেও হাজার বছর হতে পারে। এ ধরণের মূর্তি পাল ও সেনযুগের বিভিন্ন মন্দিরের ছবিতে দেখেছি। ব্রহ্মাণী মন্দিরের গঠনশৈলী সাদামাঠা , প্রাচীন মন্দির বলতে আমরা যা বুঝি , এ মন্দিরে সেটি দেখতে পেলাম না।

ব্রহ্মাণী মায়ের মূর্তি

এই সময় দেখা হলো গ্রামের এক যুবক বিকাশবাবুর সাথে। তাঁর সাথে কথা বলে এই গ্রাম সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারলাম। যেমন হদল আর নারায়ণপুর দুটো আলাদা জনপদ। নারায়ণপুরের পোস্ট অফিস হদল। দুই জনপদের মাঝে রয়েছে বোদাই নদী। উনি আরো জানালেন , যে নদী পেরিয়ে আমরা এখানে এসেছি, সেটি শালী নদী। জানতে পারলাম, নারায়ণপুরের জমিদার বাড়ি তিনটি তরফে বিভক্ত। ছোট, বড় এবং মেজো। তিন তরফেই দেবী মহামায়ার আরাধনা করা হয়, আবার তিন তরফেই কুলদেবতা দামোদর মন্দির রয়েছে। জমিদার পরিবার মন্ডল উপাধি প্রাপ্ত। কৌতূহলের বসে জিজ্ঞেস করলাম , এখানে কোনো জঙ্গল পাঁচমাথা বলে জায়গা আছে নাকি ? উনি জানালেন – ওনার জানা নেই। এরম কোনো নাম উনি শোনেননি। একটু হতাশ হলাম।

ছোট তরফ এর দুর্গামন্দির

এরপর সবাই মিলে হেঁটে এগিয়ে চললাম  এখানকার জমিদার মন্ডল পরিবারের তৈরী পুরাকীর্তি গুলিকে প্রত্যক্ষ্য করতে। ইতিহাসবিদদের মতে জনৈক মুচিরাম ঘোষ মল্ল রাজাদের আমলে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। নিজের কৃতিত্বে প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করেন। তার কাজের পুরস্কারস্বরূপ তিনি প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং মন্ডল উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীকালে তাদের পরিবারের তরফ থেকে  তৈরী হয় এই পুরাকীর্তিগুলো । আমাদের যাওয়ার পথে সবার প্রথমে দেখতে পেলাম ছোট তরফের বাড়ির প্রকান্ড প্রবেশ দ্বার ।

দামোদর মন্দির ছোট তরফ

প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায় সুবিশাল নাটমন্দির । বাড়ির প্রাঙ্গনেই তিনশো বছর পুরোনো রাধা দামোদর মন্দির অবস্থিত । ছোট তরফের এই মন্দির টেরাকোটা সজ্জিত।  টেরাকোটা অলংকরণের কাজ দেখার মতো। নবরত্ন শৈলীর এই মন্দিরের ভিত্তিবেদী অনেকটাই উঁচু। সম্প্রতি মন্দিরের সংস্কার হয়েছে, নতুন করে রং করা হয়েছে । মন্দিরের টেরাকোটার কাজে মৃত্যুলতা ও অন্যান্য মূর্তি দেখতে অসাধারণ লাগছিলো। তবে যে কাজটা আমার নজর কাড়লো, সেটা হলো ত্রিখিলানের উপরে মাঝের দিকে অর্জুনের লক্ষ্যভেদের চিত্রায়ন। কি নিপুণ কাজ !!

অর্জুনের লক্ষ্যভেদ

ছোট তরফ থেকে সোজা রাস্তা ধরে গেলে পৌঁছনো যায় বড়ো তরফে। তার আগেই রাস্তার ডানদিকে চোখে পড়লো আরো কিছু পুরোনো মন্দির। মন্দিরগুলির অনেকটাই ধ্বংসাবশেষে রূপান্তরিত। তবুও একটা পঞ্চরত্ন মন্দিরে টেরাকোটার কাজ অবশিষ্ট রয়েছে। সেই টেরাকোটার কাজে রাম রাবনের যুদ্ধ , অনন্তশায়ী বিষ্ণুর চিত্রায়ন দেখার মতো।

ভাঙাচোরা মন্দিরে টেরাকোটার কাজ

এগিয়ে গেলাম বড়ো তরফের দিকে। বড়ো তরফে প্রবেশ করতে প্রথমেই চোখে পড়লো এক বিশাল রাসমঞ্চ। ১৭ চূড়াবিশিষ্ট , অষ্টকোণ এই রাসমঞ্চের স্থাপনকাল সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা মুশকিল । তবে এটিও যে প্রাচীন পুরাকীর্তির মধ্যে পড়ে , এবিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এরম রাসমঞ্চ বাংলার ইতিহাসে বিরল।

রাসমঞ্চ

রাসমঞ্চের পাশেই মূল জমিদার বাড়ি। ইতিহাসবিদদের মতে এই অট্টালিকার গঠনশৈলীতে একটি ইউরোপীয় ছাপ রয়েছে। জানালা গুলির ওপরে বানানো মুখগুলি , একটি সিংহের মূর্তি এইগুলো প্রত্যক্ষ করার অনুভুতিই আলাদা। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে চোখে পড়ে দুর্গাদালান এবং তার সামনের নাটমন্দির। উঁচু স্তম্ভগুলি সেকালের জমিদারবাড়ির আভিজাত্যের প্রতীকের মতো দাঁড়িয়ে।

বড় তরফ

এরপর আমাদের সাথে আলাপ হলো জমিদার বাড়ির এক সদস্য গোপাল মন্ডলের সাথে। তিনিই আমাদের বড়ো তরফের দামোদর মন্দির ঘুরিয়ে দেখালেন। বাড়ির অন্দরমহলে অবস্থিত বড়ো তরফের দামোদর মন্দির। পঞ্চরত্ন এই মন্দিরের স্থাপনকালে ১৭২৮ শকাব্দ। ত্রিখিলান বিশিষ্ট এই মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখা যায়। 

মন্ডলবাবুর থেকে দিকনির্দেশ নিয়ে সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম মেজো তরফের দামোদর মন্দির দেখতে। বাকি দুই তরফের থেকে একটু ভেতরদিকে অবস্থিত এই মন্দির। নবরত্ন শৈলীর এই মন্দির টেরাকোটার কাজে সমৃদ্ধ। মন্দিরের এই দেয়ালেও রাম  রাবনের যুদ্ধ আর অনন্তশায়ী বিষ্ণুর চিত্রায়ন বিদ্যমান। এরপর মন্ডলবাবুর থেকে বিদায় নিয়ে দামোদর ক্যানাল এর দিকে চললাম।

মেজো তরফের দামোদর মন্দির

আশেপাশের কিছু পথচলতি মানুষের থেকে জানতে পারলাম , নারায়ণপুর থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দামোদর ক্যানাল লাগোয়া সেতু , যার অন্য পারে রণডিহা ব্যারেজ আছে । রণডিহা ব্যারেজ থেকে খুব কাছেই অবস্থিত পানাগড় টাউন। এই পথে কিছুদূর গাড়ি নিয়ে গিয়ে দেখলাম, রাস্তা প্রায় নেই বললেই চলে। সাইকেল বা বাইক নিয়ে যাওয়া যাবে , তবে গাড়ি নিয়ে যাওয়া মুশকিল। অগত্যা ফিরে আসতে হলো। তবে রাস্তার ধারে দেখা মিললো বোদাই নদীর। নদীবুকে ভাসমান কচুরিপানা। নদী আজ শীর্ণকায় , সভ্যতার চাপে আজ খালে রূপান্তরিত। শুধু বোদাই নয়, একই অবস্থা আজ বাংলার অন্যান্য নদীরও । 

ফিরে এলাম সেই ব্রহ্মাণী মন্দিরের কাছে , কোনো ঝুঁকি না নিয়েই যে পথে এসেছিলাম , সেই পথেই ফিরে চললাম। ঘড়িতে তখন দুপুর দুটো। এদিকে সবারই প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। সড়কের ধারে এক ভাতের হোটেল পেলাম , হোটেল চালান এক বয়স্ক মহিলা এবং তাঁর ছেলে। ওনারাই জানালেন শুধুমাত্র ডিম্ ভাত রয়েছে। তাই অর্ডার দিয়ে মহিলার ছেলের সাথে গল্প করতে লাগলাম। কোথা থেকে এসেছি জানালাম , কি করতে এসেছিলাম জানাতে , উনি আমাদের এক জঙ্গলের সন্ধান দিলেন। খাওয়াদাওয়া সেরে , কৌতূহলী হয়ে ওনার কাছে পথনির্দেশ চাইলাম। ওনার কাছেও জানতে চাইলাম জঙ্গল পাঁচমাথার নাম শুনেছেন নাকি , উনি বললেন – এতদিন এখানে ব্যবসা করছি , এরম জায়গার নাম শুনিনি।

বোদাই নদী

আমি ম্যাপে যে ছবিটা দেখেছিলাম সেটা একজনের আপলোড করা , একজনের রিভিউ দেয়া জায়গা। তাই বিশেষ সহযোগিতা আশা করা যায়না। হয়তো ভুল পয়েন্ট করা থাকতে পারে। তাই আশা ছাড়লাম। জঙ্গল পাঁচমাথা থেকে পাঁচমাথা কে বাদ দিয়ে শুধু জঙ্গলের খোঁজে চললাম।

জায়গাটির নাম বীরসিং এর জঙ্গল। ভদ্রলোক জানালেন , জাতীয় সড়ক থেকে বর্ধমানের দিকে যেতে , রাস্তার ডানদিকের রাঙামাটির রাস্তা ধরতে , সে রাস্তাই আবার গোল হয়ে ঘুরে জাতীয় সড়কেই উঠবে। কিন্তু আমাদের জঙ্গল ঘোরা হয়ে যাবে। সবাই মিলে সাহস করে এগিয়ে গেলাম। ওই যে প্রথমেই বললাম , আমরা চারজন একসাথে বেরোলেই একটা সাংঘাতিক কিছু হওয়ার আশঙ্কা থাকে , সেই ভয়টাই এবারও হচ্ছিলো। তবে আমার নয় , আমার সহযাত্রীদের। ভরসা বলতে সেই বুম্বার ফোন। এতক্ষন উনি রেস্টে ছিলেন। আমার মনে হচ্ছিলো রাস্তা হারিয়ে গেলেও, আমি কাউকে জিজ্ঞেস করে নেবো। ব্যাক আপ এর জন্যে সবাই নিজের নিজের ফোনে গুগল ম্যাপ অন করলাম।

গাড়ি রাঙামাটির পথ ধরলো বটে , তবে এতটা চড়াই , উৎরাই আমরা কেউই আশা করিনি। রাস্তাজুড়ে শুধুই লাল ধুলো। ধীরে ধীরে আমরা এক আদিবাসী গ্রামে এসে পড়লাম। গ্রামের ঘরবাড়ি সেটাই জানান দিতে লাগলো। আমাদের মাথায় ছিল , রাস্তা গোল হয়ে ঘুরবে। তাই টার্নগুলোতে আমাদের ডানদিকে যেতে হবে। কিন্তু সববারের মতোই এবারেও থিওরি কিছুক্ষনের মধ্যেই ভুল প্রমাণিত হলো। অনেক জায়গায় দেখতে পেলাম ডানদিকে যাওয়ার রাস্তা নেই , বা খারাপ রাস্তা। অগত্যা বামদিকে যেতে হলো। জানিয়ে রাখি , আমাদের কারো ফোনেই টাওয়ার নেই। শুধুমাত্র বুম্বার ফোন ম্যাপ দেখিয়ে চলেছে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আমি রাস্তা ঠাহর করতে লাগলাম। বুঝলাম বৃত্তের পরিধি বেড়ে গেছে। আমরা জঙ্গল কিছুই পাইনি , শুধু গ্রামের ভেতর দিয়েই চলেছি। অনেককে জিজ্ঞেস করেছি , তারা জাতীয় সড়কের কথা শুনতেই সোনামুখীর রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। অনেকক্ষন এভাবে দিকভ্রান্ত হয়ে ঘোরার পর, একসময় আমি বললাম , বুম্বা গাড়ি থামা তো। আমি দেখছি। বুম্বা গাড়ি দাঁড় করালো। আমি গাড়ি থেকে নেমে সামনে কয়েকটি বাড়ি দেখতে পেলাম। একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম গ্রামের এক অল্পবয়সী গৃহবধূ মাথায় কাঠের বোঝা চাপিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে গেলাম। একবার মনে হলো আমার ভাষা কি যিনি বুঝবেন , বা উনি কি বলবেন সেটা কি আমি বুঝতে পারবো ! পরোয়া না করেই বললাম –  দিদি , আমরা অনেক ক্ষণ থেকেই ঘুরে যাচ্ছি , জঙ্গল পাচ্ছি না। বীরসিংয়ের জঙ্গলটা কোথায় বলতে পারেন ?

গৃহবধূ ঈষৎ হেসে সামনে ইশারা করে বললেন – ” ই তো সামনেই গো ! “

বীরসিং এর জঙ্গল

আমি ওদিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারলাম না। গ্রামের যেমন রাস্তা হয় ঠিক সেরম লাগলো। গৃহবধূর ওপর ভরসা করে বুম্বাকে বললাম , গাড়ি নিয়ে এগোতে। গাড়ি নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার এগোতেই দেখলাম গ্রামীণ রাঙামাটির রাস্তা ছেড়ে আমরা ঝকঝকে পিচের রাস্তায় উঠতে পড়েছি। বুঝলাম , বীরসিং এর জঙ্গল এসে গেছে। পথের দুধারে ঘন শালবন। এপ্রিল মাসের নতুন পাতা গজানো গাছের সবুজ রং, মাঝের কালো সড়ক আর চারিদিক নিস্তব্ধ। এরম পরিবেশ কি আর বারবার পাওয়া যায় ! গাড়ি থেকে নেমে অনেকগুলো ছবি তুললাম। এতক্ষনে আমার বন্ধু সুব্রত বললো – আকাশের দিকে দেখ ! আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম চারিদিক ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসছে। বুঝলাম বৃষ্টি এলো বলে। তাড়াতাড়ি সব্বাই গাড়িতে এসে বসলাম। বুম্বা গাড়ি নিয়ে একটু এগোতেই দেখতে পেলাম , রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। বামদিকের রাস্তা ঝকঝকে , ডানদিকের রাস্তা ভাঙাচোরা। বুম্বার ফোন দেখাচ্ছে ডানদিকে। বললাম ফোনের ওপর ভরসা করলে হবে না , আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ম্যাপে কি দেখাচ্ছে ? টাওয়ার নেই , উত্তর এলো। এমন সময় দেখি , একজন লোক সাইকেল নিয়ে আসছে। গাড়ি থেকে হাত দেখিয়ে ওনাকে থামতে বললাম। জিজ্ঞেস করলাম , দাদা বর্ধমানের দিকে যাবো। সড়ক কোনপথে পড়বে ? ভদ্রলোক ওই ঝকঝকে রাস্তার দিকে ইশারা করে বললেন , এই রাস্তা ধরে সোজা চলে যান সোনামুখী। ওখান থেকে বর্ধমানের সড়ক পেয়ে যাবেন।

আমি বুম্বাকে বললাম , হোটেলের ভদ্রলোক এতটা ঘোরার কথা তো বলেননি ? তাহলে উপায় ?

একটাই উপায় – বুম্বার ফোনকে বিশ্বাস করে ডানদিকে যাওয়া। সব্বাই একমত হলো। চললাম ডানদিকে।

দুমিনিট হয়েছে কি , প্রচন্ড বৃষ্টি নামলো। চারিদিক অন্ধকার। গভীর জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলেছে , আশেপাশে কোনো জনপ্রাণীর দেখা নেই। হোটেলের ভদ্রলোক বলেছিলেন , এইপথে হাতির ভয় আছে। এতকিছু ভাবছি , আর এদিকে খারাপ রাস্তা দিয়ে গাড়ি হেলতেদুলতে এগিয়ে চললো। কয়েক কিলোমিটার এভাবেই চলার পর রাস্তার বামদিকে ফরেস্ট অফিস দেখতে পেলাম। ঘন জঙ্গলের ভেতরে ভুতুড়ে বাড়ির মতো একটি একতলা কটেজ। বাড়ির রং সাদা। বাড়ির সামনের বারান্দায় দেখলাম এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আমাদের গাড়ির দিকেই তাকিয়ে আছেন।  বৃষ্টির তীব্রতা তখন একটু কমেছিল, সামনে থেকে এক মোটর আরোহীকে আসতে দেখলাম। বাইক রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ফরেস্ট অফিসের দিকে ছুটে গেলো। আমরাও গাড়ি দাঁড় করালাম। লক্ষ্য করলাম ফরেস্ট অফিসের পাশে একটা ওয়াচ টাওয়ার ও রয়েছে।

জঙ্গল পাঁচমাথা

এতক্ষন রাস্তার শুধু বামদিক দেখছিলাম। ডানদিকে চোখ পড়তেই , আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠলাম। বৃষ্টি তখনও থামেনি , গাড়ি থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ছুটে গেলাম। আবিষ্কারের আনন্দ ঠিক যেমন হয় , আমার মনের অবস্থাও তখন সেইরকম। ডানদিকে যে জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি , সেটি একটি মোড় , পাঁচমাথার মোড়। যেদিক থেকে এলাম আর যেদিকে যাচ্ছি ঐদুটি বাদ দিলে জঙ্গলের ভেতর ৩টি রাস্তা চলে গেছে। রাস্তা তিনটি কাঁচা লালমাটির। ছবি তুললাম। তারপর গাড়িতে এসে বসলাম। স্ত্রী বলে উঠলো – কি পাগলামি করো ? অন্ধকার হয়ে এসেছে , তার মধ্যে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছ ? বাড়ির দিকে চলো এবার, অনেক হয়েছে । অগত্যা নিজের আনন্দ নিজের মনেই চেপে রেখে রওনা দিলাম।

দামোদর ক্যানাল

কিছুদূর এগিয়ে দামোদর ক্যানাল পেরিয়ে সড়ক পথে এসে পড়লাম। ধন্য বুম্বার ফোন , সঠিক সময়ে সঠিক পথ দেখাবার জন্য। সড়কপথে এসে যেন ফোনও একটু মৃদু হাসি দিলো , তারপর বন্ধ। বুম্বা বললো – এমা , ব্যাটারি শেষ। চার্জে বসাতে হবে। সুব্রত বললো – আর চিন্তা নেই , সোজা গেলেই বর্ধমান , তারপর ডানদিকের সড়ক ধরলেই বাড়ি পৌঁছে যাবো।

বাংলার গ্রামে ঘোরার যে বিশেষ অভিজ্ঞতাগুলি আমার হয়েছে, তার মধ্যে এটিও যোগ হলো। বীরসিং এর জঙ্গল , সেই আদিবাসী গৃহবধূ ,  জমিদারবাড়ির মন্ডলবাবু  ,কাউকেই আমি ভুলতে পারবো না। ভুলতে পারবো না , মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা। আমাদের মধ্যে যতই বৈষম্য থাকুক না কেন , আন্তরিকতা যেন ওনাদের সহজাত অধিকার। জানিয়ে রাখি , জমিদারবাড়ির মন্ডলবাবুর কথা যে বলেছিলাম , উনি আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ওনার বাড়িতে এসে মধ্যাহ্নভোজ করার। যদিও এতজন মিলে যাওয়াটা ঠিক দেখায় না , তাই সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। তবুও ওনার এই আন্তরিকতা আমি ভুলিনি। সম্পূর্ণ অজানা অচেনা মানুষকে আপন করে নেয়ার। দুর্গাপুজোয় নিমন্ত্রণ করলেন। সপরিবারে আসতে বলেছিলেন।

এই ব্যবহার আমি বাংলায় বারবার খুঁজে পেয়েছি। সে চুপি গ্রাম হোক, বা মেদিনীপুর কিংবা বৈদ্যপুর , সর্বত্রই মানুষের এই আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কখনো টোটোচালক , কখন মন্ডলবাবুর মতো জমিদার পরিবারের সদস্য , আন্তরিকতা জাতি, ধর্ম, পেশা নির্বিশেষে আমি পেয়েছি। তাই তো পেশাগত কারণে বাংলা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও , কখনই যেতে পারিনি , জানিনা ভবিষ্যতেও পারবো কিনা !

৫ – অনন্তকথা

সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম। আজকের ভোরবেলার কোনোরকম পরিকল্পনা আমাদের নেই। সকালবেলায় হোমস্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম একজোড়া বসন্তবাউড়ি কে। এগুলো আকারে একটু বড়ো এবং গলার কাছটা নীল রঙের। প্রকৃতি অনেকরকম রং ছড়িয়ে দিয়েছে পাখিটির গায়ে। অনেকক্ষন ধরে পর্যবেক্ষণ করার পর বুঝলাম , মৃত এক গাছের কাণ্ডের অবশিষ্ট এক কুঠুরিতে এই পাখিজোড়া তাদের সাধের বাসা বানিয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে খাবার জোগাড় করে বারে বারে ওই মৃত গাছের কাছেই ফিরে আসছে। বৃক্ষের কান্ড থেকে পাওয়া কাঠের বাড়িতে আমরাও কয়েকদিনের জন্যে আশ্রয় নিয়েছি আবার ওই পাখিগুলোও তো তাই করেছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বিহঙ্গরা মরে যাওয়া এক বৃক্ষের কাণ্ডে  আশ্রয় নিয়েছে , আর আমরা অনেক সময় আশ্রয় পেতে, বৃক্ষের কান্ড কেটে তাদের হত্যা করছি।

ঘড়িতে তখন আটটা বাজে। দরজায় মৃদু আঘাতের শব্দ এলো , খুলে দেখি বড়কাদা দাঁড়িয়ে। বললেন – “স্যার ব্রেকফাস্ট রেডি হচ্ছে , আপনারা রেডি হয়ে নিন। “

আমার মা আর ছেলে ততক্ষনে রেডি। বাকি শুধু আমি আর আমার স্ত্রী। একে একে আমরাও রেডি হয়ে নিলাম। আজ বক্সায় আমাদের শেষদিন। বকেয়া বিল মিটিয়ে বাদলবাবুর হোমস্টে ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে হবে আজকে। বিকেলের দিকে আলিপুরদুয়ার থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে ফেরার টিকিট কাটা রয়েছে। আজকের দিনে আমাদের জন্যে স্বপনবাবুই কিছু পরিকল্পনা করেছেন। তিনি কয়েকটা জায়গায় নিয়ে যাবেন আমাদের। ব্রেকফাস্ট সেরে , বাদলবাবুর বিল মিটিয়ে দিলাম। সমস্ত মালপত্র আমাদের ওপরের ঘর থেকে বড়কাদা নামিয়ে নিয়ে এসেছেন। সোয়া নয়টার সময় এসে গেলেন স্বপনবাবু। আমরাও মালপত্র গাড়িতে তুলে নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি , এমন সময় বাদলবাবুর স্ত্রী এলেন। আমাদের কেমন লাগলো সব জিজ্ঞেস করলেন। আমাদের ভালো লাগার কথা জেনে খুব খুশি হয়ে আমাদের বিদায় জানালেন। বাদলবাবুকে বিদায় জানিয়ে আমরা ডুয়ার্স প্রকৃতি থেকে রওনা হলাম। ধীরে ধীরে জয়ন্তী জনপদ ছাড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। গাড়ি থেকে দেখলাম , এই দুদিনের আমাদের আশ্রয় ক্রমে ক্রমে দৃষ্টির অগোচরে চলে যাচ্ছে।

আমার মা এমনিতে খুব বেশি কথা বলেন না, কিন্তু এবার স্বপনবাবুকে বললেন – ” এতদিন আপনাদের এখানে ছিলাম , আজকে চলে যাচ্ছি খুব খারাপ লাগছে। “

আমিও বলে উঠলাম – ” হ্যাঁ , কিছু কিছু জায়গা হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে থাকে , যে মনে হয় বারবার যাই। বক্সা আমার কাছে এরম একটা জায়গা হয়ে উঠলো। “

স্বপনবাবু মুচকি হেসে বললেন – ” আসবেন আবার। অন্য কিছু জায়গা দেখাবো। একটু সময় নিয়ে আসবেন , মোটামুটি ৩-৪ দিন। “

আমি বললাম – ” তাহলে এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি ? “

স্বপনবাবু বলতে লাগলেন – ” এই কয়দিন আমরা রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী মোড়ে এসে ডানদিকে আসছিলাম। আজ আপনাদের আমি জয়ন্তীমোড় থেকে ওই সোজা রাস্তাটা যেদিকে গেছে সেদিকে নিয়ে যাবো। “

আমি জিজ্ঞেস করলাম – ” সান্তলাবাড়ি ? “

মনাস্ট্রি

স্বপনবাবু আমার উত্তরে হেসে মাথা নাড়লেন। আমরাও বালা নদীর ব্রীজ পেরিয়ে জয়ন্তী মোড় এর দিকে এগোতে লাগলাম।

জয়ন্তী মোড়ে একটি ছোট্ট মন্দির আছে। সম্ভবত এই মোড়ে, দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্যে করা। রয়েছে একটা পুরোনো ওয়াচটাওয়ার। খুব উঁচু নয় , তবে এটা থেকে এলাকার ওপর নজরদারি করা যায়। আমরা জয়ন্তী মোড় থেকে ডানদিকে বাঁক নিলাম। সেই রাস্তায় কিছুদূর এগোতেই প্রকৃতি নিজের রূপ পাল্টে ফেললো। এতক্ষন যেরকম ঘন বনানীর মধ্যে দিয়ে আসছিলাম , এখন দেখতে পেলাম সে বনানী আর নেই। স্বপনবাবু এখানে শুধুই প্ল্যান্টেশন দেখালেন। পথের দুধারে দেখতে পেলাম বেশ সুন্দর ছোটছোট কাঠের বাড়ি। বাড়িগুলোর বাইরে কাঠের সিঁড়িও রয়েছে। বাড়িগুলো কাঠের তৈরি অসংখ্য স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। এগুলোকেই জঙ্গলে থাকার সেরা ঠিকানা হিসেবে ধরা হয়। অনেকে বলেন ফরেস্ট বাংলো। স্বপনবাবু জানালেন এইগুলি প্রত্যেকটিই হোমস্টে। যারা জয়ন্তীতে থাকেন না , তারা এইজায়গাতে থাকেন। বাগান দিয়ে সাজানো, বাঁশের  তৈরী পাঁচিল দিয়ে ঘেরা হোমস্টে গুলো দেখলে , আমাদের মতো পর্যটকেরা থাকতে চাইবেই।  এই ছোট জনপদ দিয়ে যত এগোতে লাগলাম , সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে পড়তে লাগলো। কিছুদূর এগিয়ে চোখে পড়লো বাচ্চাদের স্কুল , খেলার মাঠ এবং একটি ছোট্ট মনাস্ট্রি। আমি একটুও অবাক হলাম না। এই চত্বরে হয়তো বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মানুষেরা থাকেন। আমার খটকা লাগলো অন্য জায়গায়।

স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম – ” আচ্ছা , এটা তো জঙ্গলের একটা দিক , এখান থেকে জয়ন্তী রেঞ্জ কিছুটা দূরে। তাহলে পর্যটকেরা এখানে থাকতে চাইবেন কেন ? জঙ্গলের মধ্যে থাকতে গেলে তো জয়ন্তী বেস্ট অপশন ? “

স্বপনবাবু নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হাসলেন। আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন – ” আপনি কি কিছু খেয়াল করেছেন ? আমরা যে এই যাচ্ছি সেই রাস্তায় ? “

আমি – ” কই সেরম কিছু নাতো ? “

এবার আমার স্ত্রী মৌমিতা বলে উঠলো – ” আমরা উপরে উঠছি , পাহাড়ে। তাই না স্বপনবাবু ? “

স্বপনবাবু বললেন –  ” ঠিক ধরেছেন ! “

স্বপনবাবু ব্রেক কষে গাড়ি থামালেন। আমাকে বললেন – ” এইবার নামুন , আর ডানদিকটা দেখে আসুন। নিজেই বুঝতে পারবেন। “

আমি গাড়ি থেকে নেমে , ডানদিকে গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম , তাতে আমার সমস্ত ক্লান্তি জুড়িয়ে এলো। কৌতূহল শেষ হলো। মনে প্রচন্ড আনন্দ হতে লাগলো , যেন আমিই প্রথম এই জায়গা আবিষ্কার করেছি। রাস্তার ডানদিকে পাহাড়ের ঢাল নেমেছে। এখানে কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওই দূরে বালা নদী। অনেক নিচে। বুঝলাম রিভারবেড থেকে দূরে যে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিলো , এখন আমরা সেরম এক পাহাড়ে উঠেছি। এই জনপদে বেশ একটা পাহাড়ি ব্যাপার আছে , তার ওপর জঙ্গলও কাছেই। গাড়িতে ফিরে স্বপনবাবুকে বললাম – ” সব উত্তর পেয়ে গেছি ! “

গাড়ি আরো কিছুটা গিয়ে পৌঁছলো সান্তলাবাড়ি। এই মোড়ে এসে আমাদের গাড়ি এক জায়গায় পার্ক করতে হলো। মোড়ের যেদিকে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। তার বাঁদিকের রাস্তা ধরে যাওয়া যায় রাজাভাতখাওয়া। ডানদিকের রাস্তা ধরে যেতে হয় জিরো পয়েন্ট। আমাদের গাড়ি যে রাস্তায় দাঁড়ালো , এই রাস্তার আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে এই জনপদের বাড়ি ঘরগুলি। আমাদের গাড়ির পেছনের দিকে রয়েছে ফরেস্ট বাংলো। আমাদের গাড়ির সামনে দুটো মারুতি ওমনি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। আমার ছেলে ঈশানকে দেখলাম ওই গাড়িগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আমি বললাম – ” এইগুলো কিডন্যাপার্স কার। যারা পড়াশুনা করে না , তাদের ধরে নিয়ে যায় ! “

স্বপনবাবু বললেন – ” চলুন ওই সামনের চায়ের দোকানে একটু চা খাই। এই ওমনি গাড়িগুলো এখান থেকে যায় জিরো পয়েন্ট। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পৌঁছনো যায় বক্সা ফোর্ট। ফোর্ট পেরিয়ে আরো এগিয়ে গেলে পৌঁছনো যায় লেপচাখা গ্রাম। “

এই লেপচাখা গ্রামের ব্যাপারে আমি শুনেছি আমার এক বন্ধুর থেকে । ভুটান বর্ডারের কাছে অবস্থিত এই গ্রামে নিরিবিলিতে কাটানো যায় একদিন। যারা বক্সার ফোর্টে ঘুরতে যায় , তারা একবার এই গ্রামে চাইলে ঘুরতে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ , পুরোটাই ট্রেকিং রুট।

চা খাওয়া শেষ করলাম। বিল মেটাতে গিয়ে দেখি, দোকানী ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করছেন – ” মোমো খাবেন ? “

আমি বললাম – ” না না। আমরা খেয়েই বেড়িয়েছি। তাছাড়াও সকালবেলা মোমো খাওয়ার ইচ্ছেও নেই। “

পাহাড় মানেই মোমো , এই মতবাদের স্রষ্টা বাঙালীরা, এই চাহিদার জেরে আজকাল প্রায় সব দোকানেই মোমো বানানো হয়। 

গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আমার মা আর স্ত্রী মৌমিতাকে দেখলাম ওই দোকানী মহিলার সাথে কথা বলছে। আর ঈশান তখনও ওই ওমনি গাড়িটাকে পরখ করে নিচ্ছে। ভাবছে, হয়তো ভয় পাচ্ছে ওকেও না ধরে নিয়ে যায় ! স্বপনবাবু গাড়ি স্টার্ট করেই বললেন –  ” এবার চলুন রাজাভাতখাওয়া মিউজিয়াম। “

ভাবলাম ঈশানের কথা। মিউজিয়াম দেখে ও না আবার বোর হয়ে যায় !

গাড়ি এবার দ্রুত চলতে লাগলো। কোনো জায়গায় প্রথমবার যাওয়ার সময় যেমন কৌতূহল বা আকর্ষণ থাকে , একবার ঘুরে নিলে আর ততটা থাকে না। তাই ফেরার সময়টা দ্রুত পেরিয়ে যায়। জয়ন্তী মোড় পেরিয়ে আবার চলে এলাম রাজাভাতখাওয়ার জঙ্গলে। মন দিয়ে দেখতে লাগলাম রহস্যময়ী এই বনানীকে। আবার জঙ্গলে এসে যেন অক্সিজেন পেতে লাগলাম। উঁচু উঁচু গাছের সারি যেন জিজ্ঞেস করছে – ” এই প্রকৃতিকে ফেলে চলে যাবি ? “

প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র

এবার রাজাভাতখাবার মূল ফটক পৌঁছনোর আগেই গাড়ি বামদিকে বাঁক নিলো। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখতে পেলাম লেখা আছে নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। মনে মনে ভাবলাম , নাঃ এতো মিউজিয়াম নয় ! নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারের বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র। এখানে কোনো প্রবেশমূল্য লাগে না। ভেতরে প্রবেশ করতেই বামদিকে দেখলাম এক প্রকান্ড হাতির মূর্তি। ডানদিকে বড় এলাকা জুড়ে রয়েছে বাগান। নুড়িপাথরের পথে আর কিছুটা এগোলেই প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র। সচরাচর জঙ্গলে আমরা যেরম সরকারি বাড়িগুলি দেখে থাকি, এটিও সেরকম। প্রবেশ দ্বারের মুখেই লেখা রাজাভাতখাওয়া নামের ইতিহাস।

গল্পটা অনেকটা এরকম।

১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে কোচবিহারের রাজ্ সিংহাসনে বসেন রাজা ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণ রায়। তিনি সিংহাসনে বসার পর থেকে এই বক্সা এলাকা নিয়ে ভুটানের রাজার সাথে মতবিরোধ হতে থাকে। সীমা সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে ঝামেলাও বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে দুই পক্ষের সহমতে অনুষ্ঠিত এক বার্ষিক সভায়, কোচবিহারের রাজাকে বন্দী করেন ভুটানের রাজা। তাকে ভুটানের তৎকালীন রাজধানী পুনাখা তে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এদিকে স্থায়ী রাজা না থাকায় , ওই ঘটনার পর থেকে কোচবিহারের বিভিন্ন এলাকায় ভুটিয়া প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। পরে ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দে , কোচবিহার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে রাজ্য থেকে সমস্ত ভুটিয়া সেনাছাউনি ভেঙে দেয়া হয়, তৎপর কোচবিহারকে ভুটিয়ামুক্ত করা হয়। এই ঘটনার পরে রংপুরের কালেক্টর ভুটানের রাজাকে চিঠি দেন যাতে রাজা ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণ রায়কে ছেড়ে দেয়া হয় , নয়তো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভুটানের রাজধানী দখল করবে। এর ফলে,   তিব্বতী কর্তৃপক্ষ তিশু লামার মধ্যস্থতায় , দুই পক্ষের সন্ধি হয়। সন্ধির তারিখ ২৩শে এপ্রিল , ১৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দ। চুক্তির অন্যতম শর্তানুসারে রাজা বক্সার পথ দিয়ে কোচবিহারের দিকে অগ্রসর হন। তখন সেই খবর পেয়ে কোচবিহারের রাজপুরুষেরা এগিয়ে যান রাজাকে অভ্যর্থনা জানাতে। এই জায়গাতেই রাজার স্বদেশে প্রথম অন্নগ্রহনের ব্যবস্থা করা হয়। সেই থেকে এই জায়গার নাম রাজাভাতখাওয়া।

প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্রে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো একটা রিসেপশন ডেস্ক। ডেস্কের পেছনে দাঁড়িয়ে এক যুবক। সুঠাম চেহারা , দেখলেই বোঝা যায় নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। মুখে চাপদাড়ি , চুল ছোট করে কাটা , যেমনটা আর্মি দের থাকে। আমি এগিয়ে গিয়ে আলাপ করে জানতে পারলাম ওই যুবকের নাম মৃন্ময়। ফরেস্ট গার্ড হিসেবে কাজ করেন। ওনার সাথে এক ভদ্রলোক ছিলেন , তিনি সাততাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলেন। যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে পড়ে গেছে।

জিজ্ঞেস করলাম – ” উনি হুড়োহুড়ি করে কোথায় গেলেন ? “

মৃণ্ময়বাবু জানালেন – ” প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্রকে ভালোভাবে উপভোগ করতে হলে, ভালো লাইটের ব্যবস্থা দরকার। উনি লাইটের ব্যবস্থা করতে গেছেন। “

কথায় কথায় জানতে পারলাম মৃন্ময় বাবুর ছবি তোলার শখ রয়েছে। ফরেস্ট গার্ড হিসেবে তিনি শুধু যে বক্সার ছবি তুলেছেন তা নয় , ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন জঙ্গলে আর ছবিও তুলেছেন বিস্তর। ছবিগুলোর মধ্যে সবরকমের বন্যপ্রাণের দেখা মেলে। মোবাইল খুলে কিছু ছবি দেখালেন।

মৃন্ময় – ” এই ছবিটা দেখুন স্যার। প্রায় সাড়ে সাত মাস অপেক্ষা করার পর এই জন্তুটিকে ক্যামেরাবন্দী করতে পেরেছি ! “

ছবিটা দেখে আমি অবাক হলাম। এতো কালো চিতাবাঘের ছবি। জিজ্ঞেস করলাম , ” এটিরও দেখা মেলে এখানে ? “

মৃন্ময় – ” সচরাচর দেখা মেলে না , হ্যাঁ তবে এই জঙ্গলে আছে। “

হঠাৎ করে চারিদিক আলোয় আলোকিত হয়ে উঠলো। বুঝলাম এতক্ষন কারেন্ট ছিল না। ওই ভদ্রলোক জেনারেটর চালিয়ে এলেন। মৃন্ময় বাবু, এবার আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। স্বপনবাবু ঠিকই বলেছেন, এটি কোনো মিউজিয়ামের থেকে কম নয়। বাঘের ছাল থেকে অজগরের ছাল , ময়ূরের ডিম্ থেকে শুরু করে রংবেরঙের প্রজাপতি, কি নেই এখানে ! তার সাথে রয়েছে রোমহর্ষক কিছু গল্প। এখানে সংরক্ষিত প্রত্যেকটি প্রাণীর সাথে কিছু না কিছু গল্প জুড়ে রয়েছে। মৃণ্ময়বাবু সেই গল্পগুলোই বলছিলেন। আমাদের মতো শ্রোতা পেয়ে তিনি উচ্ছসিতও ছিলেন। লক্ষ্য করলাম ওনার চোখের দিকে। প্রতিটি গল্প বলার সাথে সাথে চোখ জ্বলে উঠছে। ক্রোধে নয় , হিংসায় নয় এ জ্বলা নিজের কাজকে জনসমক্ষে তুলে ধরার আনন্দে। আমাদের শহরে, যেখানে লোকেরা নিজেদের কাজ নিয়ে সবসময়ই নিন্দা করতে ব্যস্ত , সেখানে এই ভদ্রলোক নিজের  কাজকে এতটা ভালোবাসেন যে সেটাতে পুরোপুরি ডুবে রয়েছেন। বুঝলাম, এই গভীর জঙ্গলের মধ্যে না আছে বেশি রোজগারের সুযোগ , না আছে সমস্ত সুবিধা, কিন্তু যেটা আছে সেটা হলো এই বনাঞ্চলের জন্যে কিছু করার মানসিকতা। এই মৃন্ময়ের মতো লোকেরা সেই মানসিকতা নিয়েই প্রতিদিন কাজে যায়। এরাই বনদফতরের সম্পদ ।

বিভিন্ন প্রাণীর ডিম্

বাইরে বেরিয়ে মৃন্ময়কে জিজ্ঞেস করলাম – ” কিছু গুডিস পাওয়া যাবে ? কিনতে চাই।  “

মৃন্ময় টিশার্ট দেখালো একটা। সাইজ দেখে মনে হলো ঈশানের জন্যে ঠিক আছে। ঈশানকে দারুন মানাবে। কেনার পর মৃন্ময় আমাকে, বক্সার এক স্মৃতি হিসেবে দুটি পোস্টার দিলো। পোস্টারগুলোতে বক্সায় বসবাসকারী বিভিন্ন বন্যপ্রাণের ছবি দেয়া। মৃন্ময়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। প্রকৃতিবীক্ষন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে দেখি স্বপনবাবু গাড়িতেই বসে আছেন। অনেক জায়গায় ঘুরেছি , অনেক জায়গায় গাড়ি নিয়েও গেছি , তবে ড্রাইভার হিসেবে এই ভদ্রলোকের ধৈর্য্যের কোনো তুলনা হয়না। আমরা গাড়িতে উঠতেই , স্বপনবাবু বললেন – ” চলুন এবার সিকিয়াঝোরা “।

চিতাবাঘ

সিকিয়াঝোরার দূরত্ব রাজাভাতখাওয়া থেকে প্রায় ষোলো কিলোমিটারের মতো। এপথে স্বপনবাবু দেখালেন, কোন রাস্তা শিলিগুড়ি যায় আর কোন রাস্তাটি চলে যায় আসাম রাজ্যে। আমরা আসাম রোড ধরে এগিয়ে চললাম। পেরোলাম অজস্র ছোট বড় চাবাগান। সড়কপথে ওঠার পর থেকেই বুঝতে পারলাম যে জঙ্গল থেকে আমরা বেরিয়ে চলে এসেছি। এবারের মতো উদ্ভিদদের দেশকে বিদায় জানাতে হবে। আবার কবে এই জঙ্গলে আসতে পারবো জানি না। স্বপনবাবু মন দিয়ে সড়কপথের দিকে তাকিয়ে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি , এনাকেও আজ আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রেনে উঠতে হবে। কবে আবার দেখা পাবো কে জানে ! একই জীবনে, এরম কত প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার কোনো হিসেব নেই। কিছু পূরণ করতে পেরেছি, আর অধিকাংশই পারিনি। তবে এই প্রতিশ্রুতিটা কেন যেন পূরণ করতে বার বার ইচ্ছে হচ্ছে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে সেই জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট জনপদ জয়ন্তীতে।

সড়কপথ থেকে আমাদের গাড়ি এবার বামদিকে বাঁক নিলো। এবার একটি ছোট্ট গ্রামীণ সড়ক ধরে এগিয়ে চললাম। পথের দুধারে ফাঁকা মাঠ , চাষের জমি আর মাঝে মাঝে কয়েকটা বাড়ি। এ দৃশ্য আমার খুব পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামের এই একই দৃশ্য , সে বর্ধমান হোক কিংবা মেদিনীপুর। বাংলার প্রকৃতি সব জায়গাতেই নিজের মায়াবী রূপ মেলে ধরেছে। বেশ কিছুটা চলার পর , একটা ছোট্ট রিসোর্টের কাছে চলে এলাম বলে মনে হলো। বাইরে পথের ধারে স্বপনবাবু গাড়ি পার্ক করলেন। আমরাও নেমে এলাম। এই জায়গায় ঢুকতেই বুঝতে পারলাম , এটি একটি সরকারি পার্ক ছাড়া কিছুই না। প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করেই ডানদিকে একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ। অর্ডার দিলে খাবার পাওয়া যাবে। রেস্তোরাঁ লাগোয়া একটি জায়গায় প্লাস্টিকের টেবিল চেয়ারে বসে এক ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন – ” কজন ? “, উত্তরে বললাম ” আমরা চারজন “।

সিকিয়াঝোরার বোটরাইড

চারজনের হিসেবে প্রবেশমূল্য দিয়ে পার্কে ঢুকে পড়লাম। রেস্তোরাঁর দিকটায় পর্যটকদের থাকার জন্যে তৈরী হচ্ছে দোতলা কিছু বাড়ি। তার সামনের পুরো এলাকা জুড়ে সাজানো বাগান। নানান রঙের ফুলে সমৃদ্ধ এই বাগানে বেশ কিছু ছবি তুললাম। এতক্ষন আমার নজর প্রবেশদ্বারের বামদিকটায় পড়েনি। এবার যখন এক ঝলকে দেখলাম , ছুটে গেলাম সেইদিকে। একটি সংকীর্ণ জলস্রোত বয়ে চলেছে এই পার্কের বাঁপাশ দিয়ে। জলস্রোতের অন্যপারে সেই বক্সার জঙ্গল। যে অরণ্যকে মনে মনে বিদায় জানিয়ে ফেলে খারাপ লাগছিলো , সে অরণ্য ভিন্ন রূপে আবার আমার সামনে দাঁড়িয়ে। এই ভালোলাগার অনুভূতি ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। প্রতিটি মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দী করবার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার এই ছুটোছুটি দেখে আমার স্ত্রী মৌমিতা চেঁচিয়ে উঠলো – ” আরে কি করছো ? বোটিং টা ঐদিকে তো ” ! মৌমিতার হাত যেদিকে নির্দেশ করছে সেদিকে তাকিয়ে দেখি একটা ছোট ঘাট। সংকীর্ণ জলধারা ওই ঘাটের কাছটায় অনেকটাই প্রশস্ত। খোঁজ নিয়ে জানলাম , একদল পর্যটক এখন ওই বোটে করে ঘুরছে ,ওরা ফেরত এলে তারপর আমরা যেতে পারবো। আমি ঘাটের চারপাশটা দেখে যা বুঝলাম , তাতে বক্সার জঙ্গলের একপাশে অবস্থিত সিকিয়াঝোরা। এখানে বোটে করে পৌঁছে যাওয়া যায় জঙ্গলের অনেক গভীরে। তখন দেখা যাবে এই জলধারার দুপাশেই জঙ্গল। অনেকটা সুন্দরবনের খাঁড়ির মতো। স্থানীয় গাইডরা এই জায়গাকেই বলে বক্সার আমাজন। কেন বলে সেটা তখনও আমি ঠিক করে বুঝিনি।

কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখতে পেলাম বোট ফিরে আসছে। বোট এলো , হৈহৈ করে কিছু পর্যটকেরা নামলেন। অল্পবয়সী কিছু ছেলে মেয়ে এবং তাদের সাথে কিছু নব্য বিবাহিতা নারী। এদিক ওদিক দৌড়োতে লাগলো ওরা । কেউ ফুলের সামনে দাঁড়ালো।  কেউ বা ফুলকে চুম্বন দেবার ভঙ্গীতে ফুলের কাছে মুখ রাখছে । কিছুক্ষন পর বুঝলাম যে ওদের দলের মধ্যে যে ছেলে দুটি ছিল , তারা ওই মেয়েদের বিভিন্ন চলার ভঙ্গী , দাঁড়ানোর ভঙ্গী সব ক্যামেরাবন্দী করছে। মনে মনে ভাবলাম এগুলো চলতেই থাকবে। এরই নাম রিল। আমরা সবাই বোটে গিয়ে উঠলাম। আমাদের বোটিং এর গাইড ভদ্রলোক, ছোটোখাটো চেহারার , বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব। রোগা চেহারার ওই মুখে গালভর্তি খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি , মাথার চুলের অধিকাংশই সাদা। পরনে একটা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি।

বললেন – ” স্যার একটু বসেন। মাঝিভাই আসতেছে। দশ মিনিটের মধ্যেই ছাড়ে দিবো। “

জিজ্ঞেস করলাম – ” এখন তো দুপুর বারোটা বাজতে যায় , কিছু তো সেরকম দেখতে পাবো বলে মনে হয় না , তাই না ? “

গাইড বললেন – ” ঠিক বলছেন স্যার , সকালবেলায় যদি আসতেন, ভালো হইতো। দুদিন আগেই এখানে চিতাবাঘ দেখা গেসলো। “

আমি অবাক হলাম – ” তাই নাকি ? সেটাও তো ভাগ্যের ব্যাপার ! “

গাইড বললেন – ” হ্যাঁ , ঠিক। কয়েকদিন আগে আমরাই তো হাতি দেখতে পাইছিলাম। তখন বিকাল প্রায় চারটা। “

আমি মাথা নেড়ে বললাম – ” ওটাই তো সময় ! হয় সকালে বা বিকেলে। আমরা তো এই ট্রেন ধরার আগে ঘুরে দেখতে এলাম। খুব একটা প্রত্যাশা নেই, যে অনেক কিছু দেখতে পাবো। “

অল্পবিস্তর যা পাখি চিনি , তাতে দেখলাম একটা স্টর্ক বিলড মাছরাঙা আমাদের থেকে কিছুটা দূর দিয়ে উড়ে গেলো। দেখলাম খানিকটা দূরে একটা ছোট্ট ওয়াচটাওয়ারের মতন রয়েছে , সেইখানে পাখিটা গিয়ে বসলো। তবে সেই টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত , মানুষের চড়ার মতো একদমই নয়। দেখলাম এক ভদ্রলোক এলেন , এনার পরনে টিশার্ট এবং একটি হাফপ্যান্ট। কোমরে গামছা বাঁধা। কোনো কথা না বলেই বাঁশের দাঁড় উঠিয়ে বোট ঠেলা শুরু করলেন। গাইড ভদ্রলোকও যেন এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনিও শুরু করলেন, এই জায়গার ভৌগোলিক অবস্থান , কি কি আছে এইসব সম্পর্কে তথ্য বিতরণ করতে লাগলেন। লক্ষ্য করলাম ভদ্রলোকের পরনে যতই মলিন কাপড় থাকুক না কেন , ওনার মুখের হাসি একেবারেই অমলিন। ভালো লাগলো সেই মুখের হাসি । জিজ্ঞেস করলাম – ” আপনার নাম কি ? ” , উত্তর এলো – ” স্যার , আমার নাম অনন্ত রাভা , কাছাকাছিই আমাদের গ্রাম। “

জিজ্ঞেস করলাম – ” অনন্তবাবু , এই যে জলস্রোত দিয়ে চলেছি , এটা কি এগিয়ে গিয়ে আরো সংকীর্ণ হয়েছে ? কিছুটা খাঁড়ির মতো ? “

অনন্তবাবু – ” হ্যাঁ স্যার “

কথা শেষ না হতেই লক্ষ্য করলাম , একঝাঁক প্রজাপতি নৌকোর চারপাশে উড়ছে। দুপাশের জঙ্গলে কিছু রংবেরঙের ফুলও দেখলাম। খেয়াল করলাম, এই প্রজাপতির উপস্থিতি আমার ছেলে ঈশানকে যারপরনাই বিচলিত করে তুলেছে। তাই ও বেচারা ভয়ে নিজের মার কোলে মুখ গুঁজে শুয়ে রয়েছে। অনন্তবাবু চারপাশটা দেখাতে লাগলেন। কোথায় কবে কি জানোয়ারের দেখা মিলেছে , সেই কাহিনী শোনাতে লাগলেন। আমাদের মাঝি কিন্তু নীরব। তিনি শুধু দুপাশে দেখতে দেখতে নৌকো ঠেলছেন। মোটর নৌকো নয়, তাই কোনো শব্দও হচ্ছে না। প্রায় সাত আট মিনিট হয়েছে , আমরা এবার গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। আবার অরণ্য , আবার আমরা , তবে এবার গাড়িতে নয় , নৌকোতে। দুপাশের বনানী কখন যে কাছে চলে এসেছে বুঝতে পারিনি। যে নৌকোয় আমরা যাচ্ছি , তার দুদিকে দশফুটের মধ্যেই নিবিড় অরণ্য। আর নিরিবিলি অরণ্যের সেই শব্দ , আশেপাশে নেই কোনো জনপদ , নেই কোনো আওয়াজ। এই বক্সার আমাজনে শুধুমাত্র আমরাই। অনন্তবাবুর প্রত্যেকটি কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি , ঈশানের ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শ্বাস নেয়ার শব্দ , মাঝির দাঁড় বাওয়ার শব্দ , সবই যেন আমার কানে স্পষ্ট। ভাবলাম এটা কি হলো ? ইন্দ্রিয় কি করে এতো সজাগ হয়ে গেলো ? পরমুহূর্তেই মনে হলো, আমরা তো সভ্য শহরের বাসিন্দা। প্রকৃতির এই শব্দ শোনার অভ্যেস আমাদের  নেই , আমাদের কান অভ্যস্ত শহুরে কোলাহলে। আমার সেটাকে মনে হলো , আমার ইন্দ্রিয় সজাগ হয়েছে। হাসি পেলো , আমার ইন্দ্রিয়গুলি স্বাভাবিক ভাবেই কাজ করছে। তবে সভ্যতার সঙ্গে যে তার জুড়ে ছিল , সেটা ছিন্ন হয়ে গেলো। প্রবেশ করলাম গহন অরণ্যের ভেতরে।

অনেকগুলো বাঁক নেয়ার পর আমরা যে জায়গায় আছি , এখানে এবার আমার একটু ভয় করতে লাগলো। হঠাৎ মনে হলো , কিছু যেন একটা উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে গেলো , সেদিকে তাকাতেই দেখলাম পাতা একটু নড়ছে। কিছুক্ষণ আগেও কেউ যেন এখানে ছিল। মনে হলো , বন্যপ্রাণেরা আমাদের ওপর নজর রেখেছে।

অনন্তবাবু বললেন – ” চিন্তা নাই বাবু , ওটা বার্কিং ডিয়ার ! ” , বোধ হয় বুঝতে পেরেছেন যে আমি একটু ভয় পেয়েছি। প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছে কিছু যেন একটা দেখা যেতে পারে। মোটের ওপরে এটা তো টাইগার রিজার্ভ , ভয় একটু পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

জিজ্ঞেস করলাম – ” অনন্তবাবু , কখনো এখানে টাইগার দেখেছেন নাকি ? “

অনন্তবাবু বললেন – ” চিতাবাঘ দেখসি , কিন্তু বাঘ দেখিনাই। বাঘ দেখতে পাইলে, আর আমাকে দেখতে পাইতেন না। “

এবার নৌকোর নীচের দিকে হাত ঢুকিয়ে একটা কাটারি বার করে দেখালেন। বললেন – ” আমাদের যাই হোক , পর্যটকরা বিশ্বাস করে আমাদের সাথে আসেন , তাদের কোনো ক্ষতি হইতে দিব না। তবে বাঘ দেখতে পাইলে , ওর চোখের দিকে তাকাবেন , তাকায় থাকবেন। কিছু করবে না। যেই মুহূর্তে চোখ ঘুরাইসেন , মরতে হইবেই। “

অনন্তবাবু বলতে লাগলেন – ” আমরা টুরিস্ট নিয়ে আসি তো , প্রায়ই জংলী শুয়োর , হরিণ , জংলী কুত্তা , হাতি এগুলা দেখতে পাই। একবার তো নৌকায় করে যাচ্ছিলাম , কিছুদূর যায়ে দেখি কালো মতো কি একটা যেন জলের মাঝখানে দেখা যাচ্ছে। আমি তো দেখেই বুঝে গেছি ও হাতির শুঁড়। চান করতেছে। টুরিস্ট গুলা ভয় পায়ে গেছলো। বললাম ভয় পাবেন না , চেঁচাবেন না , শান্ত থাকুন ,ওরা চলে যাবে। হইছিলোও তাই। দশ মিনিট দাঁড়ায় ছিলাম , তারপর একটা বাচ্চা হাতি জল থেকে উঠে দৌড় মারলো। “

এই বলেই জলের ধারে এক জায়গা আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন অনন্তবাবু। দেখলাম কিসের যেন গর্ত। মনে হচ্ছে কেউ ধারালো কিছু দিয়ে ঐজায়গায় গর্ত খুঁড়েছে। অনন্তবাবু বললেন – ” ঐগুলা হাতিতে করছে। ঐভাবে ওরা দাঁত পরিষ্কার করে। “

নৌকো এবার পুরো ইউ টার্ন নিলো। সামনে যাওয়ার রাস্তা আরো সংকীর্ণ। গাছেরডাল গায়ে এসে লাগবে। এই অবধি শুধুমাত্র কৌতূহলের বশে  এসেছিলাম। অনন্তবাবুকে এক্সট্রা টাকা দেব বলেছিলাম। নৌকো যেই না ঘুরেছে অমনি দেখলাম, একটা কমন কিংফিশার উড়ে গেলো জঙ্গলের দিকে। সামান্য আওয়াজও, এখানের বন্যপ্রাণদের কাছে কোলাহলের মতো। একটু এগোতেই দেখতে পেলাম একজোড়া বালিহাঁস জলে ভেসে বেড়াচ্ছিল , কিন্তু আমাদের আসার ক্ষীণ আওয়াজেই উড়ে পালিয়ে গেলো। অনন্তবাবু আজ একটু হলেও খুশি ছিলেন। আমাকে যোগ্য শ্রোতা হিসেবে অনেক গল্প শোনালেন , তার ওপর একটু এক্সট্রা টাকাও পাবেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – ” আপনারা কোথা থেকে আসতেছেন বাবু ? “

বললাম – ” আমরা এমনি তো কলকাতার বাসিন্দা , এখানে এসেছিলাম বক্সায়। আজই বাড়ি ফিরবো। বিকেল তিনটের দিকে ট্রেন। ফেরার আগে ঘুরে গেলাম আর কি ! “

অনন্তবাবু উচ্ছসিত হয়ে বললেন – ” জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে আসবেন। পাখি থাকবে অনেক , জন্তুও দেখতে পাবেন। আমি ঘুরায় দেখাবো। “

বললাম – ” হ্যাঁ , আসবো নিশ্চই। আপনি কি এই কাজই করেন ? “

অনন্তবাবু উত্তর দিলেন – ” না বাবু , এই জুন মাসে ক্ষেতে কাজ কম থাকে। তাই এখানে চইলে আসি , সপ্তায় কখনো তিনদিন আসি। নয়তো চাষের কাজ তো থাকেই । শীতের সময় ভীড় বেশি থাকলে তখন কয়েকদিন এস্ট্রা কাজ কইরে নেই। “

আমি জিজ্ঞেস করলাম – ” এইখানে কি থাকার ব্যবস্থা হচ্ছে ? এতো সুন্দর জায়গায় থাকার ব্যাবস্থা থাকলে অনেকের সুবিধা ! “

অনন্তবাবু বললেন – ” হ্যাঁ , শুনতেছি তো অনেক কিছুই হবে। ঐগুলা আবার লিজে দিবে। যারা লিজ পাবে , তারাই তখন গাইড দিবে, নৌকা দিবে , পুরা প্যাকেজ সিস্টেম। “

আমি – ” তাই নাকি ! এরম তো আজকাল অনেক জায়গাতেই হয়। “

অনন্তবাবু এবার আমার মার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন – ” ছোট ছেলেটা আমার জঙ্গলের ডিএফও হতে চায়। জঙ্গল খুব ভালোবাসে। বলে জঙ্গলের জন্যে কিছু করবে। বন্ধুবান্ধবের সাথে বায়না ধরছিল কলকাতায় যায়ে পড়বে। প্রথমে ভাবলাম টাকা কিভাবে জোগাড় করবো ? তারপর কি মনে করে, পাঠায় দিলাম। জুলজি না কি নিয়ে যেন পড়তেছে। আমি ওগুলা বুঝি না। আমার বড় ছেলে মাঝে মাঝে যায় , ওই বুঝে জিনিসগুলা। এই বছরেই পাশ করে যাবে। ডিএফও হওয়া কি এমনি এমনি ব্যাপার ! পরীক্ষা দিতে হয়, পাশ করতে হয়। ঝামেলা আছে। “

আমি বললাম – ” হ্যাঁ , ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস। কঠিন পরীক্ষা , তাও অনেকেই দেয় , পাশও করে। “

আমার মা অনন্তবাবুকে বললেন – ” দেখুন আশা তো রাখতেই হবে , কে বলতে পারে আপনার ছেলে হয়তো একবারেই পাশ করে যেতে পারে। “

” তাই যেন হয় , ঠাকুরকে বলি , ছেলেটার একটা কিছু করে দাও মা ! ” – এই বলে অনন্তবাবু থামলেন। নৌকোও এবার অনেকটা পথ পেরিয়ে চলে এসেছে পাড়ের কাছে।

অনন্তবাবুকে বললাম – ” এখানে খাবার ব্যবস্থা কি ওই রেস্তোরাঁয় ? “

অনন্তবাবু – ” হ্যাঁ বাবু , কিন্তু আগে থেকে অর্ডার দিতে হতো যে ,ওরা বানায় রাখতো ? “

” আমি একদম ভুলে গেছি ! দেখি গিয়ে কি পাওয়া যায়। ” – এই বলে দেখলাম নৌকো এবার পাড়ে এসে গেছে, ঈশানও কখন যেন ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। অনন্তবাবুর কথা শুনতে শুনতে ঈশানের দিকে তাকাতেই ভুলে গিয়েছিলাম । সবাই মিলে নৌকো থেকে নাবলাম, অনন্তবাবু এবং মাঝি কে প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে বিদায় জানিয়ে রেস্তোরাঁয় এলাম। রেস্তোরাঁয় দেখলাম স্বপনবাবু বসে রয়েছেন । রেস্তোরাঁয় জিজ্ঞেস করতে ওনারা জানালেন শুধু ডিমভাত হবে। মনে মনে ভাবলাম , এটাই আমাদের পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় খাবার। আমরা সবাই ডিমভাত খেলাম , স্বপনবাবু আর আমার মা নিরামিষ খেলেন। খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়ে দেখলাম ঘড়িতে প্রায় দুটো বাজে।

স্বপনবাবু বললেন – ” চিন্তা করবেন না, ঠিক সময়ে পৌঁছে দেব। স্টেশন বেশিদূর নয়। বড়জোর চল্লিশ মিনিট। “

আমরা রেস্তোরাঁর বিল মিটিয়ে, সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে উঠে এসে বসলাম। মন কেড়ে নিলো সিকিয়াঝোরার জঙ্গলে ঘেরা বোটরাইড।

স্বপনবাবুকে বললাম – ” দারুন একটা জায়গায় নিয়ে এলেন। বেশ ভালো লাগলো। জঙ্গলের এরম পরিবেশ আগে কখনো দেখিনি। “

স্বপনবাবু হাসলেন। গাড়ি স্টার্ট দিলেন। জাতীয় সড়কে উঠে দেখতে পেলাম , এক হাতি নিশ্চিন্তে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে , পিঠে মাহুত বসে রয়েছে। জঙ্গলের সেই হাতি আর এই হাতির মধ্যে বিস্তর ফারাক। বুঝলাম ধীরে ধীরে আমরা সভ্যতার কাছাকাছি চলে এসেছি। যে সভ্যতার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে এই দুদিন জঙ্গলকে উপভোগ করলাম , আবার সেই সভ্যতাকেই সঙ্গী করে ফিরতে হবে দৈনন্দিন জীবনে। শুরু হবে ঈশানের স্কুল। আমাকে আর আমার স্ত্রীকেও ফিরতে হবে অফিসে। সবাইকে পেছন থেকে সাপোর্ট করবে আমার মা।

স্বপনবাবু কথা রাখলেন। চল্লিশ মিনিটেই মধ্যেই নামিয়ে দিলেন আলিপুর দুয়ার স্টেশনে। ঘড়িতে তখন পৌনে তিনটে। ট্রেন তিনটে পনেরোর কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। ব্যাগপত্র নামিয়ে একটু সাইড করে রাখলাম। স্বপনবাবু গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি স্বপনবাবুর কাছে এগিয়ে গেলাম। বললাম – ” আপনার চেহারার সাথে আমার স্বর্গীয় কাকুর অনেক মিল রয়েছে। কাকু বেঁচে থাকতে কখনও কাকুকে কিছুই উপহার দিতে পারিনি । আমি আপনার ভাইপোর মতো , তাই এই যে আপনি আমাদের ঘুরিয়ে দেখালেন এতো কিছু , তার জন্যে আমার তরফ থেকে একটা ছোট্ট উপহার ” , এই বলে ওনার হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিলাম। উনি ওই নোট হাতে নিয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমার দিকে তাকালেন। বললাম – ” ভাববেন, এক ভাইপো তার কাকুকে দিয়েছে। “

এবার উনি সেই চেনা হাসিটা হাসলেন। খুশি হলেন কিনা জানি না , তবে আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। ধীরে ধীরে গাড়ি স্টেশন চত্বর পেরিয়ে , বক্সার রাস্তায় উঠে গেলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই দৃষ্টির অগোচরে চলে গেলো। আমরাও মালপত্র নিয়ে সোজা স্টেশনে এসে গাড়িতে চেপে বসলাম। সঠিক সময়ে গাড়ি ছেড়েও দিলো। জানলার ধারে বসে ছিলাম। আলিপুরদুয়ার স্টেশন ছেড়ে ট্রেন বেরিয়ে আবার জঙ্গলে প্রবেশ করলো।

মনে মনে ভাবলাম, এ প্রকৃতির কেমন সৃষ্টি ! একদিকে প্রকৃতি নিজের মোহময়ী রূপে ধরা দেয় , অন্যদিকে এক অনিশ্চয়তার পাহাড় গড়ে তোলে। পর্যটকরা কিছু বন্যপ্রাণ দেখবার আশায় আসে , কিন্তু তাতেও থাকে অনিশ্চয়তা। আবার অনন্তবাবুর মতো জঙ্গলকে ঘিরে বসবাস করা লোকেদের থাকে জীবিকার অনিশ্চয়তা। কিন্তু জঙ্গল কাউকেই নিরাশ করে না। পর্যটকেরা আসেন , ঘুরে বেড়ান , অর্থ খরচ করেন। সেই অর্থে রোজগার হয় স্বপনবাবু কিংবা বাদলবাবুর মতো লোকেদের। ঘুরতে থাকে অর্থনীতি। আমরা এর মধ্যে কি খুঁজছি, সেটাই আসল। আমি জঙ্গলের বিভিন্নরকম রূপ দেখতে চেয়েছি এবং পেয়েছি। অনন্তবাবুকে জঙ্গল আশা দিয়েছে , হয়তো একদিন তার ছোট ছেলে ফিরবে বক্সাতে। ডিএফও হয়ে। ভবিষ্যতে কি হবে, তা আমরা তুচ্ছ মানুষেরা কি বলতে পারি ? তবে বক্সার জঙ্গল, আমার মনের মধ্যে, স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। দিনের শেষে মনে হচ্ছে , এই তো সেদিন এলাম। স্বপনবাবু , বাদল ছেত্রী , শুভঙ্কর , মৃন্ময় , অনন্তবাবুদের কথা খুব মনে পড়ছে। সবথেকে বেশি মিস করছি বক্সার সেই গভীর রহস্যময়ী বনানীকে। এখন ট্রেনও সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছে। এবারের মতো বিদায় জানাতে জঙ্গলও চলেছে আমার সাথে , যতদূর যাওয়া যায়। বিভূতিভূষণের লেখা আরণ্যকের সেই লাইনটা খুব মনে পড়ছে , জঙ্গল সত্যিই আমাকে পেয়ে বসেছে।

৪ – বক্সা টাইগার রিজার্ভ

পরদিন সকাল সকাল সবাই মিলে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম হোম স্টে থেকে। বাদলবাবুর গাড়িতে আজ এক নতুন গাইড, গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ। এই রেঞ্জে দুটো ওয়াচটাওয়ারের কাছে যাওয়ার প্ল্যান রয়েছে। পঁচিশ আর ছাব্বিশ মাইল। বনে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে, ঢুকে পড়লাম রাজাভাতখাওয়ার অন্দরে। গভীর জঙ্গলে তখন দুটো মাত্র গাড়ি। আমাদের সামনের গাড়িতে বসে দুই বন্ধুর পরিবার, সাথে বাচ্চারাও রয়েছে। কিছুদূর এগিয়ে আমি গাইডকে অনুরোধ করাতেই, আমাদের গাড়ি স্লো হয়ে গেলো। সামনের গাড়িটি আমাদের দৃষ্টির অগোচরে চলে যেতেই, আবার আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো।

রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ

সকালের জঙ্গল সবসময়ই এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে রোদের লুকোচুরি খেলা, পাখিদের কলকাকলি, মৃদু বয়ে চলা বাতাস, এইসব উপভোগ করতে করতেই এগিয়ে চললাম পঁচিশ মাইলের দিকে। রাস্তায় বেশ কয়েকটি বার্কিং ডিয়ারের দেখা মিললো। সেগুলো গাড়ির আওয়াজ  শোনামাত্রই, নিমেষের মধ্যে হারিয়ে গেলো অরণ্যের গভীরে। চলার পথেই দেখা মিললো ময়ূর দম্পতির, খাবারের আশায় ঘোরাঘুরি করছে।

এইভাবে চলতে চলতে, এক জায়গায় গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লো। জঙ্গলের এই জায়গাটা বেশ ভালো। আমাদের বামদিকে এক বিশাল ঘাসজমি আর সেখানে ঘাসের উচ্চতা প্রায় পাঁচফুট হবে। সেই জমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু মরে যাওয়া গাছের কঙ্কাল। এই ঘাসজমিটা পুরো ঘেরা, যাতে গজরাজের পদার্পন না ঘটে। দেখলাম কঙ্কালসার এক গাছের মাথায় বসে একটা ঈগল পাখি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নীচের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজে চলেছে।

ময়ূর

আমাদের ডানদিকের পুরো এলাকা ঘন জঙ্গল। এখানে সব গগনভেদী গাছেদের সম্ভার। গাইড বললো – স্যার এইখানেই আমি এর আগে চিতাবাঘ দেখেছি। ওই গাছের ডালে বসে ছিলো।

কৌতূহলী হয়ে সবকটা গাছের ডাল দেখতে লাগলাম।

হঠাৎ গাইড বলে উঠলো – স্যার, ওই দেখুন।

আঙ্গুল দিয়ে আমাদের বামদিকের ঘাসজমির ওপারে একটি ফাঁকা জায়গার দিকে দেখালেন।

ঈগল

আমিও মনোযোগ সহকারে দেখতে গিয়ে দেখলাম, এক প্রকান্ড কালো রঙের প্রাণী। পেশীবহুল ওই প্রাণীর শরীর, মাথার জায়গাটায় একটু সোনালী লোম এবং হালকা নীলচে বাদামী রঙের ধারালো উদ্ধত শিং জোড়া। এটিকেই বলা হয় গাউর। ডুয়ার্সের অধিকাংশ জঙ্গলেই দলবেঁধে ঘোরাঘুরি করে এরা। তবে গাউরকে দেখতে গেলে, যে পাখিটির সাহায্য দরকার সেটি হলো বক। আমি প্রথমে একটি বককেই দেখেছিলাম কালো রঙের একটি পাথরে বসে থাকতে। পরে পাথরটি নড়ে উঠতেই আমার ভুল ভাঙলো। বাইনোকুলার যে কি কাজের জিনিস, তা এবারে ভালোভাবে টের পেলাম। প্রায় একশো মিটার দূরে দাঁড়ানো গাউরকে চোখের সামনে এনে দিলো।

এখান থেকে এগিয়ে চললাম। ঘাসজমির ঘেরা অংশ পেরোতেই দেখতে পেলাম একদল চিতল হরিণ। আমাদের গাড়ির পাশে পাশে ছুটে চলেছে। ক্যামেরা, মানুষ, গাড়ি, এগুলোর কোনটাতেই এরা তেমন বিচলিত হয় না। সবকিছুই এদের কাছে, অদ্ভুত রকমের স্বাভাবিক। এই হরিণের দলে একটি বাচ্চার দিকে আমার নজর গেলো, আমাদের গাড়ির দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রয়েছে। যেন ওদের বাড়িতে এক অদ্ভুত দেখতে প্রাণীর আগমন ঘটেছে। হরিণের বাচ্চাটি আমাদের দেখতে গিয়ে ওর দল থেকে একটু পিছিয়ে পড়েছিল, এরই মধ্যে ওই দলের এক বড়ো হরিণ ওই বাচ্চার দিকে তাকাতেই, বাচ্চাটি ছুট্টে ওই দলে যোগ দিল। হরিণের দল দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পঁচিশ মাইল টাওয়ার।

চিতল হরিণ

 গাড়ি দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে নামলাম। এই জায়গায় জঙ্গল একটু ফাঁকা ফাঁকা। একটি ফরেস্ট বাংলোর মতন বানানো এই টাওয়ারটি। এখানে বসার বেশ ভালো জায়গা রয়েছে। রয়েছে টয়লেট। কিছু লোকজন এখানে থাকে। সেরম একজনকে আমাদের গাইড গিয়ে কি যেন বলতেই, সে মাথা নেড়ে সায় দিলো। বুঝলাম চায়ের অর্ডার হয়েছে।

গাইড – স্যার, এরা তো কোনো দোকান চালায় না। কিন্তু চা বানাতে আপত্তি নেই। খুশি হয়ে যা দেবেন তাই নেবে।

দেখলাম রোগা ভদ্রলোকটি চা বানানোয় মনোনিবেশ করেছেন। গায়ের রং কালো, পরনে একটা সাদা গেঞ্জি আরেকটা ময়লা হয়ে যাওয়া লুঙ্গি। পাশে চলছে আরো খাবারের আয়োজন। হয়তো ব্রেকফাস্টের আয়োজন করছেন। এখানে যারা থাকেন, তারা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিতে সক্ষম। তার মধ্যেও যে আমার আর আমার পরিবারের জন্য চা বানিয়ে দিচ্ছেন এটা অন্তত আমার কাছে এক উপরি পাওয়া। কৌতূহল জাগে এই ভেবে যে এই শ্বাপদ সংকুল অরণ্যে, এরা দীর্ঘদিন কিভাবে জীবন কাটান? এঁদের বাড়ি কোথায়? পরিবারকে ছেড়ে কিভাবে থাকেন এই জনবিহীন অরণ্যে?

এসব ভাবতে ভাবতেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। এটি ফেন্সিং দেয়া একটা দোতলা বাড়ি । দেখলাম দোতলাতে থাকার জায়গা, বসার জায়গা ও টয়লেট রয়েছে। নীচে রান্নার জায়গা এবং একটি খাবার জায়গা রয়েছে। এই খাবার জায়গাতেই আমাদের আগের গাড়ির পরিবার বসে রয়েছে। দোতলার বারান্দা থেকে চিতল হরিণের দলকে দেখা যাচ্ছে, তার সাথে একঝাঁক টিয়া আর ময়ূর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিছু ছবি তুলে আবার নীচে নেমে এলাম। চা রেডি। ভদ্রলোক আমাকে, আমাদের গাইডকে হাসিমুখে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিলেন। খুশি না হয়ে পারা যায়! পকেট থেকে একশো টাকা বার করে দিতে গিয়েও লজ্জা বোধ করলাম। গাইডের হাতে দিয়ে বললাম দিয়ে দিতে। দেখলাম ভদ্রলোক টাকাটা নিয়ে গাইডকে নমস্কার করে আবার রান্নার কাজে মন দিলেন। ভাবলাম, সবাই হয়তো এখানে এসে টাকা হাতে দিয়েই চলে যায়, আমরাও সবাই হতে চাইলাম। খারাপ লাগলো। তাই আমি ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম।

বললাম – কাকু, চা টা খুব ভালো হয়েছিলো।

আমার দেখাদেখি আমার মা ও স্ত্রীও আমার সাথে গলা মেলালো।

ভদ্রলোক বললেন – আপনাদের ভালো লাগসে?

মাথা নাড়লাম আর বললাম – খুউউব।

ভদ্রলোক বললেন – খুশি হইলাম।

আমি আর ওনার নাম জিজ্ঞেস করিনি। এরম নাম না জানা কত মানুষ হয়তো নিজেদের কাজের প্রশংসা পেলে খুশি হন, যে খুশি টাকার মূল্যের ওপর কোনোভাবেই নির্ভর করে না। এই খুশি আসে মানুষের সাথে মানুষের সহমর্মিতা বোধ থেকে, পেশাগত শ্রেণীবিভাগ থেকে নয়।

পঁচিশ মাইল থেকে, গাড়ি এবার আমাদের নিয়ে চললো ছাব্বিশ মাইলের দিকে। প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট গভীর জঙ্গলে চলার পর, দেখতে পেলাম, এক ওয়াচটাওয়ার। এটিকে ছাব্বিশ মাইল বলে। এই টাওয়ারে ফরেস্ট গার্ডরা থাকেন। টাওয়ারের কাছে পৌঁছতে দেখতে পেলাম, এক গার্ড চা হাতে নীচে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে। আমাদের দেখেই স্থানীয় ভাষায় চেঁচিয়ে কি যেন বলে উঠলো। গাইডকে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো, এইখানে কিছুক্ষন আগে একটা হাতির দল এসেছিলো। ওয়াচটাওয়ার এর পশ্চিমদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে গাইড বললো ঐদিকে গেছে। গাড়ি থামতেই, চটজলদি ওয়াচটাওয়ারের তিনতলায় উঠতে লাগলাম। দোতলায় গার্ডরা থাকে। তিনতলায় উঠে চারপাশে দেখতে লাগলাম যদি হাতির দলের দেখা পাওয়া যায়। অনেক দূরে আওয়াজ পাওয়া গেলেও, হাতির দলের দেখা মিলল না। কিছুক্ষন ধরে খুঁজলাম, অপেক্ষা করলাম, তারপর নেমে এলাম।

চিতল হরিণের দল

আমাদের সাফারি এখানেই শেষ হলো। এই সাফারিতে উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণের দেখা না মিললেও, উপভোগ করলাম গহীন অরণ্যের পরিবেশকে। গাড়িতে চেপে বসতেই, গাড়ি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে চললো জয়ন্তীতে। গাইড জানালো, এরপর আমাদের পোখরি লেক যেতে হবে। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রিভারবেডে পড়লাম। এখানে আবার সেই চিতল হরিণের দলকে দেখতে পেলাম। আবার জঙ্গলের রাস্তা ধরে আধঘন্টা যাওয়ার পর পৌঁছে গেলাম জয়ন্তী। সফর এখানে শেষ হলো না। এবার নতুন গাইড পেলাম। বাদলবাবু নিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাজারে। আমাদের বিস্কুট আর মুড়ি কিনে দিলেন। বিস্কুট আমাদের খাওয়ার জন্য, আর বললেন, মুড়ি আপনাদের পোখরি লেকে লাগবে। হোমস্টে তে না ফিরেই, আবার গাড়ি চললো পোখরি লেকের দিকে।

পোখরি লেকের পথে

পোখরি লেক যাওয়ার রাস্তাটি ভারী সুন্দর। রাস্তার দুধারের গাছের সারি প্রথমেই আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। গাইড বললেন , এখানে মোবাইলে ভিডিও তুলতে পারেন , দারুন লাগবে। পকেটে থাকা যন্ত্রটিকে পকেটেই সুখে শান্তিতে থাকতে দিলাম। বরং চোখ রাখলাম দুপাশের জঙ্গলের দিকে।  রহস্যময়ী জঙ্গলে কখন যে কিছুর দেখা মিলবে , কেই বা বলতে পারে। রাস্তার ধারেই একদল ময়ূরকে ছুটে পালিয়ে যেতে দেখলাম। এক দুজন গ্রামবাসীকেও দেখতে পেলাম বোঝাই করা শুকনো কাঠ মাথায় নিয়ে যেতে। গাড়ি যত এগোতে লাগলো , বুঝতে পারলাম আমরা সমতল ভূমি ছেড়ে উপরে উঠছি। জঙ্গল কোথাও ঘন আবার কোথাও কৃশ। মিনিট কুড়ি চলার পরে এক জায়গায় একটু সমতল ভূমি দেখা গেলো। গাড়ি এইজায়গায় এসে দাঁড়ালো। দেখলাম, একদিকে পাহাড় বেয়ে রাস্তা ওপরের দিকে উঠে গিয়েছে আর অন্যদিকে পাহাড়ের ঢাল নীচে  নেমে গিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে এবার আমাদের উপরে উঠতে হবে।

” কতটা পথ ?” – জিজ্ঞেস করলাম।

গাইড হেসে জানালো – ওই ধরুন আটশো মিটার মতো । তবে চাপ নেবেন না , সময় আছে, ধীরে সুস্থে, চলুন ।

সহধর্মিণীকে সাহস জুগিয়ে বললাম – চলোই না। দেখা যাক পারি কিনা ।

এতক্ষনে গাইড ভদ্রলোক দুটো গাছের ডাল ভেঙে এনে আমাদের দিয়েছেন। এই লাঠিগুলোতে ভর দিয়ে উঠতে হবে। মা আর আমার ছেলেকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে আমরা দুজন গাইডের পেছন পেছন পাহাড়ে ওঠার পথ ধরলাম।

এতক্ষন গাইডের নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি। নাম জিজ্ঞেস করাতে  উনি বললেন – শুভঙ্কর, শুভঙ্কর দত্ত । গায়ের রং শ্যামবর্ণ , বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। ছিপছিপে গড়ন , পরনে বক্সার গাইডদের মতো ফরেস্ট গ্রিন জামা এবং কালো প্যান্ট। পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছিলেন।

জিজ্ঞেস করলাম – উপরে দেখার কি আছে , বলুন তো ? যার জন্যে আমরা মুড়ি নিয়ে যাচ্ছি  ?

মুচকি হেসে শুভঙ্কর উত্তর দিলো  – উপরে এক দেবীমন্দির আছে , তার পাশেই রয়েছে একটা ছোট্ট জলাশয়। মুড়ি কেন নিয়ে যাচ্ছেন , সেটা উপরে গেলেই দেখতে পাবেন।

পোখরি লেক

কিছুটা করে উঠছি , আরেকটু রেস্ট নিচ্ছি। আমরা দুজনেই শুভঙ্করের কথা মন দিয়ে শুনছি। শুভঙ্কর আমাদের এই এলাকা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে চলেছে। কিছুটা ওঠার পর , শুভঙ্কর বললো –  স্যার এই দেখুন !

দেখলাম এক বিশাল গাছ মাঝখান থেকে ফাঁপা হয়ে রয়েছে। মরে যাওয়া গাছটির অবশিষ্ট উচ্চতা প্রায় দশ ফুট হবে । অবশিষ্ট এই কান্ডটি ফাঁপা হয়ে একটা অর্ধচন্দ্র আকার ধারণ করেছে। শুভঙ্করের কথায় গাছটিতে প্রবল বজ্রাঘাত হওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে। এই অবস্থাতেও গাছটির সৌন্দর্য্য দেখে, মোহিত না হয়ে পারলাম না। মরে  গিয়েও যারা এতো সুন্দর আকার ধারণ করতে পারে , তারা বেঁচে থাকলে কত সুন্দর আকার ধারণ করতে পারে , এটা কোনো প্রকৃত বৃক্ষপ্রেমীর থেকে জেনে নেয়া উচিত। প্রকৃতিই এখানে সৃষ্টি এবং সংহারকর্তা , দুটি ভূমিকাই পালন করেছে।

কিছুটা এগোতেই একটা মরে যাওয়া গাছের কাণ্ডতে চোখ পড়লো। একফুট উচ্চতার এই অবশিষ্ট কাণ্ডটাকে নিজের আঁকার ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেছে এক ধরণের পোকা। অসংখ্য বক্ররেখা এঁকে দিয়ে , গাছটার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে। প্রত্যেকটি বক্ররেখার মধ্যে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য রয়েছে , দেখলে মনে হয় যেন অসামান্য হাতের বুটিকের কাজ। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোন বের করে ছবি তুলে নিলাম। শুভঙ্করকে ধন্যবাদ জানালাম , এতো সুন্দর প্রাকৃতিক কাজ, ও না থাকলে চাক্ষুস করতে পারতাম না।

উপরে উঠতে উঠতে একটি গাছের গুঁড়ির  পাশে আমার স্ত্রীকে দাঁড়াতে দেখে , আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিছুটা এগিয়ে গিয়েও শুভঙ্করও দাঁড়িয়ে পড়লো।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মৌমিতা বললো – একটু দাঁড়াও , হাঁপিয়ে উঠেছি।

কি হলো স্যার ? – জিজ্ঞেস করলো শুভঙ্কর ।

আমি – ওই একটু জিরিয়ে নিচ্ছি আর কি ! 

ঠিক আছে , আর খানিকটা পথই বাকি – শুভঙ্কর বললো।

এতক্ষণে একটা জিনিস অনুভব করলাম। আমাদের আগেও কিছুজনকে আমরা যেতে দেখেছি , তবুও এই জঙ্গলে তাঁদের কোনো আওয়াজ শুনতে পেলাম না। যেন আমরাই কথা বলছি মনে হচ্ছে। সমস্ত কোলাহলকে যেন নীরবে গিলে ফেলেছে এই অরণ্য। উঁচু গাছগুলোকে দেখে বলতে ইচ্ছে হলো , তোমরা কে ? মানুষের সৃষ্টি করা সমস্ত ধরণের দূষণকে কিভাবে ধ্বংস করো তোমরা ? সে মানুষেরা যখন উন্নয়নের মোড়কে তোমাকেও কেটে ফেলে , তাও কি করে নীরবে তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও ? কেন শুষে নাও এ দূষণ ? তোমার মধ্যে কি প্রতিহিংসা জন্মায় না ? মাঝে মাঝে মনে হয় তোমরাই দেবতা। তোমরাই ধরে রেখেছো এই পৃথিবীকে। আমরা মূর্খ , তাই  দেবতাকে মন্দিরে খুঁজি , যেখানে এ জগতের স্রষ্টা তোমাদের পাঠিয়েছেন আমাদের পালনকর্তা হিসেবে।

প্রকৃতির ক্যানভাসে

এবার চলুন স্যার , নয়তো দেরি হয়ে যাবে  – শুভঙ্করের কথায় , ইহজগতে ফিরে এলাম।

স্ত্রীকে বললাম –  চলো , আরেকটু পথ বাকি।

আর পঞ্চাশ মিটার উপরে উঠতে হলো , তারপর আবার একশো মিটার মতো নিচে নেমে পৌঁছে গেলাম পোখরি লেক।  পাহাড়ের ঢালে অদ্ভুত ভাবে তৈরী এই জলাশয়। দেখলাম আমাদের আগে যাঁরা  এসেছিলেন, তারা ফিরে যেতে লাগলেন। লেকের একধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে জলাশয় টিকে দেখতে লাগলাম , মনে হলো একরাশ রহস্য যেন এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে।

মুড়ির প্যাকেটটা খুলুন এবার  – শুভঙ্কর বলে উঠলো।

আমার স্ত্রী মুড়ির প্যাকেট খুলে নিলো , শুভঙ্করের কথামতো সেই মুড়ি, যেইনা জলাশয়ের দিকে ছড়িয়ে দিলো , সেই মুহূর্তে ওই শান্ত জলাশয়ে এক বিশাল আলোড়নের সৃষ্টি হলো। দেখলাম শয়ে শয়ে কানমাগুরের দল হাঁ করে মুড়ি খেতে আসছে। গোলাপী রঙের সেই হাঁ মুখ নিয়ে,একে  অন্যের ঘাড়ে অবধি উঠে পড়ছে। এইভাবেই পুরো মুড়ির প্যাকেট খালি করা হলো। জলাশয়ের পাড় ঘেঁষে একটা বড় কাঠ পড়ে  ছিল। সেই কাঠে দেখলাম দুটি কচ্ছপ আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমাদের ছেটানো মুড়ির কিছু অংশ তাদের কাছেও পৌঁছেছিল। অবাক হলাম কচ্ছপগুলিকেও মুড়ি খেতে দেখে।

মাগুরের দল

এই জল থেকে কেউ মাছ ধরে খেলে , তার নির্ঘাত মৃত্যু ঘটে  – সাবধানবাণীর মতো করে শুভঙ্কর বলে উঠলো। এরম প্রশ্ন আসতে পারে জেনেই হয়তো বললো।

এখানে একটা পুজো হয় বলছিলেন , সেটা কোথায় ?  – আমি জিজ্ঞেস করলাম। শুভঙ্কর হাতের ইশারায় দেখালো – ঐদিকে।

আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম এক ভীষণদর্শনা দেবী মূর্তি। দেবীর গায়ের রং নীল। বাঘের ছালের আসনে উপবিষ্ট তিনি এবং তাঁকে  বহন করছে এক হরিণ। এরম ঘন অরণ্যে এরম দেবীমূর্তি থাকার একটাই কারণ হতে পারে , এ দেবী নির্ঘাত বনদেবী। এই বিপুল অরণ্যে বসবাসকারী সমস্ত পশু, পাখি , পোকা মাকড় এবং তরুকূলের দেবী উনিই।

বনদেবী

ফেরার পথ ধরলাম। আগে আগে শুভঙ্কর , তারপরে আমি আর আমার ছায়াসঙ্গী হিসেবে আমার স্ত্রী মৌমিতা।

যাই বলুন , আপনারা স্বর্গের খুব কাছেই থাকেন। আপনারা সৌভাগ্যবান। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আছেন – শুভঙ্করের উদ্দেশ্যে বললাম।

সবই মানলাম স্যার। তবে এখানে থাকার অন্যরকম সংগ্রাম আছে – শুভঙ্কর উত্তরে বললো।

কিরকম – আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

এখানে আমাদের রোজগার সংক্রান্ত বিস্তর সমস্যা আছে। কেউ আমরা স্থায়ী চাকরি করি না , আপনাদের মতো। ট্যুরিস্ট এলে তবে কিছু রোজগার হয় , তাও আপনি ভালোই জানেন যে এর মধ্যেও রোটেশন হয়। তাতে করে কতই  বা রোজগার হয় ! – শুভঙ্কর বলতে লাগলো।

এছাড়াও জঙ্গলের জানোয়ারদের সাথে থাকার একটা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম। কখনো হাতি আসে , কখনো চিতাবাঘ। দুক্ষেত্রেই আমাদের কিছু না কিছু ক্ষতিই হয়। তবে আমরা এই জীবনের সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আপনারা দুদিনের জন্যে এসেছেন , আপনাদের সবই ভালো লাগবে ” – এবার কিছুটা ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গীতে বলে উঠলো শুভঙ্কর।

তুমি ঠিকই বলেছো। আমরা কজনই বা আর তোমাদের কথা শুনি বা ভাবি ! তবুও তোমার মুখে তোমাদের সংগ্রামের কথা খুবই শুনতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে তোমাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রামের কথা  – আমি উত্তর দিলাম।

এবার শুভঙ্কর বললো – ধন্যবাদ স্যার। অন্তত এইটুকু সহমর্মিতা দেখানোর জন্যে। জানেন স্যার , শুনছি এই জঙ্গল , এই এলাকা সরকারের , মানে বন  দফতরের অধীনে চলে যাবে। পরের বার এলে আর এইভাবে ঘোরাতে পারবো কিনা জানি না।

সেকি, কেন ? – আমি চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

এটাতো বক্সা টাইগার রিজার্ভ , অথচ টাইগার নেই। টাইগার রিজার্ভ দেখাতে পারলে ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড পায় বন দফতর। শুনছি এই এলাকা খালি করা হবে। আমরা যারা এখানে থাকি , তাদের পুনর্বাসন দেয়া হবে। তার বদলে এখানে বাঘ ছাড়া হবে। বাঘের বাসস্থান হিসেবে দেখানো গেলে , অনেকদিন অবধি ফান্ড পেতে থাকবে সরকার। তবে একটা মুশকিল আছে !

কি  ! – এবার আমি আরো উৎসুক হয়ে উঠলাম।

এখানে সেই ডলোমাইট কারখানার আমল থেকে পুরোনো লোকেদের বসবাস। আমাদের আগের পুরুষদের জন্ম, বিয়ে, সব এইখানেই। আমরাও এই জয়ন্তী স্কুলেই পড়েছি। আমরা এই পুরোনো ভিটে ছাড়বো কেন বলতে পারেন ? এখানে আগে আমরা ছিলাম , বন দফতর পরে এসেছে। ১৯৮৬ সালেরও  পরে এই এলাকা ন্যাশনাল পার্ক হয়েছে।  – এই বলে শুভঙ্কর একটু থামলো। আঙুলের ইশারায় কি যেন দেখাতে লাগলো।

আমি খেয়াল করে দেখলাম , পাহাড়ের এক অসামান্য দৃশ্য। এক পাহাড় থেকে দাঁড়িয়ে অন্যদিকের পাহাড় আর তার মাঝে জয়ন্তী নদীর অবর্ণনীয় রূপ। এককথায় অসাধারণ দৃশ্য। লক্ষ্য করলাম কথা বলতে বলতে আমরা অনেকটাই গাড়ির কাছে এসে পড়েছি। পিছনে তাকিয়ে স্ত্রী কে জিজ্ঞেস করলাম – এরপর কোথায় যাবে ? ফুন্টশোলিং না বক্সা ফোর্ট ?

এবার শুভঙ্কর বললো – ফুন্টশোলিং যেতে পারেন স্যার। বক্সা ফোর্টে গিয়ে লেপচাখা তে যদি না থাকেন তবে পুরো লস !

তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। গাড়ির কাছে পৌঁছে মাকে বললাম – আমরা ব্রেকফাস্ট করেই রওনা দেবো । 

মা জিজ্ঞেস করলো – কোথায় যাচ্ছি ?

আমি বললাম – ভুটান, আধার কার্ড রেডি রেখো।   

গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো হোমস্টে। যাওয়ার পথে ভাবতে লাগলাম শুভঙ্করের কথা। এ এক এমন পরিস্থিতি যেখানে কারোরই কিছু করার নেই। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে যেমন বন্যপ্রাণেরও দরকার, তেমনই এই জঙ্গল এলাকার, আদি বাসিন্দাদের কথাও ভাবা দরকার। এরম যদি ভাবি যে, সরকার বা বন দফতরের আরো কোনো সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিলো , তাহলেও ভুল করা হবে। পুনর্বাসন আর ক্ষতিপূরণ দুটোই সরকারের থেকে আসছে। প্রকৃতির কাছেই প্রার্থনা করা উচিত, যাতে সবাই ন্যায় বিচার পায়। 

হোমস্টে তে পৌঁছে দেখি , স্বপনবাবু রেডি হয়ে গাড়ি নিয়ে হাজির।

বললাম – দেরি হয়ে গেছে অনেক, একটু ওয়েট করতে হবে। আমরা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসছি।

স্বপনবাবু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হেসে, ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। আমাদের ব্রেকফাস্ট করে রেডি হতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগলো। বয়স্ক মানুষটি দাঁড়িয়ে রয়েছেন ভেবে খারাপ লাগছিলো। ঘড়িতে তখন সোয়া দশটা মতো বাজে। আমরা গাড়ি চেপে রওনা হলাম জয়গাঁও বর্ডার।

এবার স্বপনবাবু গাইড আর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে করতে আমাদের নিয়ে চললেন জয়গাঁও। আমার কৌতূহলী মনকে, বক্সার ভৌগোলিক তথ্য দিয়ে, প্রশমিত করতে লাগলেন। আমরা প্রথমে রাজাভাতখাওয়া এসে সেখান থেকে আরেকটি পথ দিয়ে সোজা চললাম হাসিমারার দিকে। স্বপনবাবুও দেখাতে লাগলেন রাস্তার দুধারের সবুজ চা বাগান , মাঝে মাঝে রাস্তার ওপরের ব্রীজ , ট্রেনলাইন এবং আলিপুরদুয়ার জেলার প্রকৃতি। ভুটানের নম্বর প্লেট দেখে কিভাবে চিনবো , এসব সবই বললেন।

কথায় কথায় জানা গেলো, স্বপনবাবু হেভি ভেহিকল চালাতেন। দীর্ঘদিন কলকাতার ডানলপে থেকেছেন। বড় বড় ট্রাকে ভর্তি মাল নিয়ে খিদিরপুর , বেহালা চত্বরে যাতায়াতও করেছেন। তার পরিবার, বরাবরই জয়ন্তীর বাসিন্দা। তাঁর দুটি সন্তান। এক ছেলে এবং আরেক মেয়ে। মেয়ের অলরেডি বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন এক আর্মি অফিসারের সাথে। সে এখন অরুণাচলে তার স্বামীর সাথে থাকে। স্বপনবাবুর ছেলে বক্সার ফরেস্ট গাইড। ছেলেরও বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়িতে তার স্ত্রী , ছেলে আর ছেলের বৌ নিয়ে থাকেন।

আলিপুরদুয়ারের শেষ মাথায় যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সাড়ে এগারোটার মতো বাজে। দেড় ঘন্টার কাছাকাছি লাগলো এই চল্লিশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আসতে। স্বপনবাবু গাড়ি পার্ক করে দেখালেন ভুটান ইমিগ্রেশন অফিস। অফিস লাগোয়া বিশাল বড় পাঁচিল। পাঁচিলের ঐপারে ভুটানের ফুন্টশোলিং শহর। আধার কার্ড দেখিয়ে প্রবেশ করতে হয় ভুটানে । ফুন্টশোলিং এ ঘোরার জন্য প্রচুর গাইড ট্যাক্সি নিয়ে, এপার আর ওপারে দাঁড়িয়েই রয়েছে। যেখান থেকে খুশি , টাকা পয়সার দরদাম করে বেছে নেওয়া যায়। আমরা এপারেই এক গাইডের সাথে কথা বলে নিলাম , ঠিক হলো সেই ১৩০০ টাকা নিয়ে ফুন্টশোলিং এর ৪টে জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে। 

ভুটানে প্রবেশ করতে গেলে আধার কার্ড লাগে। দিনের দিনেই ফেরত আসলে , কোনো চার্জেস লাগে না। আমরা ভুটানে প্রবেশ করার পরে ঘড়িতে দেখলাম প্রায় ১২ টা বাজে। শুরু হলো আমাদের ফুন্টশোলিংএ ঝটিকা সফর। আমাছু ব্রিজ দিয়ে শুরু করে আরো তিনটে মনাস্ট্রি আর বুদ্ধ গুম্ফা দেখে নিলাম। ফুন্টশলিং ও এখন ধীরে ধীরে নগরায়নের কবলে। তৈরী হচ্ছে কংক্রিটের জঙ্গল। সব জায়গা ঘুরে, আমরা ভুটানের প্রবেশ দ্বারের কাছে নেমে গেলাম। এক ভুটানি রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া সেরে জয়গাঁওতে ফিরে এলাম প্রায় চারটের দিকে। স্বপনবাবুকে ফোন করতেই উনি চলে এলেন, তারপর সবাই মিলে রওনা দিলাম জয়ন্তীর দিকে।

কথায় আছে জঙ্গলে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে নামে। দেখতে পেলাম। সূর্য যেন তাড়াতড়ি ঢলে যেতে লাগলো। বর্ডার এর কাছের এলাকা বেশ জমজমাট হলেও , যত এগোতে লাগলাম , কমতে লাগলো জনবসতি। আমরা, আবার সেই চা বাগানের শোভা দেখতে দেখতে হাসিমারা পৌঁছে গেলাম। স্বপনবাবু গাড়ি থামালেন। বললেন – জলদাপাড়া যেতে হলে হাসিমারা দিয়ে যেতে হয়।

দেখলাম স্বপনবাবু গাড়ি থেকে নেমে এক পাঁঠার মাংসের দোকানে ঢুকলেন। হঠাৎ মনে পড়লো , আজ রবিবার। বাঙালির এক চিরকালীন আচার এর মধ্যে পড়ে এই রবিবারে মাংস খাওয়া। সেটা আরো জমে যায় যখন দুপুরের দিকে হয়। আজ আমাদের জন্যে স্বপনবাবু বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ করতে পারেননি। নৈশভোজ টা অন্ততঃ ভালো ভাবে হোক। ভাবলাম , আমরা ঘুরতে কেন যাই ? কোথাও ঘুরতে গেলে আমরা যা খরচ করি, সেই খরচে আরো কয়েকটা পরিবারের স্বচ্ছন্দে কয়েকটা দিন চলে। যদিও বেশি বুঝি না, তবে মনে হয় এইভাবেই ইকোনোমি চলে। আমাদের কেউ টাকা দ্যায়, আমরা অন্য কাউকে সেই টাকা দিই। এইভাবেই চলতে থাকে অর্থনীতি। ঠিক যেমনটা চলে জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রে। আর এভাবেই পরিবেশ নিজের ভারসাম্য বজায় রাখে। বক্সার জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। এই জঙ্গল যেন ধীরে ধীরে আমার মধ্যে এক অদ্ভুত প্রভাব বিস্তার করেছে। এক একটা দিন কাটাচ্ছি , আর এই অরণ্যের স্থিরতা ধীরে ধীরে আমার মধ্যেও প্রবেশ করছে।

গাড়ি থামলো। স্বপনবাবুর ডাকে ভাবজগৎ থেকে ফিরে এলাম। দেখলাম পৌঁছে গেছি হোমস্টে। হঠাৎ টকটক করে এক তীব্র আওয়াজ শুনলাম।

স্বপনবাবু হেসে বললেন – ওটা তক্ষকের আওয়াজ। টিকটিকির মতো, কিন্তু বিকট দেখতে। এখানে অনেক পাওয়া যায়।

আমার মাও বলে উঠলেন – হ্যাঁ, আমি দেখেছি এর আগে।

এবার স্বপনবাবু ফিসফিস করে বললেন – কিছু মানুষ এগুলো ধরে পাচার করে। সুদূর চীনে এর চাহিদা আছে। এই পাচারের ব্যবসা করে সেই লোকেরা লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিয়েছে।

পরের পর্ব – অনন্তকথা

৩ – পরিবেশ বিজ্ঞান

buxa-forest

ডিনার রেডি হতে হতে রাত নটা। ততক্ষণ সন্ধেবেলার এই জয়ন্তী জনপদের বাজারটিকে ঠিক কিরম লাগে, তা দেখতে আগ্রহবশত বেরিয়ে পড়লাম বাজারের দিকে। অনেকসময় গ্রামের বাজারে অনেক রকম জিনিস দেখা যায়, আবার অনেক মানুষের সাথে আলাপও হয়। হোমস্টে থেকে বাজার হাঁটাপথে মিনিট চারেক। সেই জয়ন্তী জনপদের বটগাছ লাগোয়া একটি দোকানে ঢুকলাম। এটি মূলত চায়ের দোকান, কিন্তু তেলেভাজা, মুড়ি, রুটি সবই পাওয়া যায়। গরম চা নিয়ে এক কোনায় বেঞ্চে এসে বসলাম। দেখলাম সামনের আরেকটা বেঞ্চে এক পরিবার সাফারি নিয়ে আলোচনা করছে। এক ফরেস্ট গাইড এবং তার সাথে আরেকজন যুবক রয়েছে। যুবকের বয়স খুব বেশি হলে ছাব্বিশ সাতাশ হবে। উচ্চতা খুব বেশি না। তবে মুখের গঠন আর চেহারা দেখে এই এলাকার নয় বলে মনে হলো। কৌতূহলী হয়ে ওঁদের আলোচনা শুনতে লাগলাম। বুঝলাম, বিকেলের সাফারিতে এই পরিবার জয়ন্তী রেঞ্জে গিয়েছিলেন।

ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক কথায় কথায় বললেন – সন্ধে নামার আগে যখন বালা রিভারবেডে নামলাম, তখন দেখি দূরে একটা ভাঙা ব্রীজের দুটো পিলার দেখা যাচ্ছে। ছবি তুলছি, এমন সময় দেখলাম, কোথা থেকে একটা বেড়াল এসে গেলো। নদীর ওপার থেকে এপারে হেঁটে আসলো। এমনিতেতো কিছুই দেখতে পাইনি, তাই এই বেড়ালটারি ছবি তুলে রাখলাম।

ফরেস্ট গাইডটি হেসে উঠলো। বললো – স্যার, যাই বলুন সাইটিং টা লাকের ব্যাপার। আমরা তো যেটা রুট সেটাই ফলো করি। কোনো সময় কিছু দেখা যায়, আবার অনেক সময় কিছুই দেখা যায় না। ওই তো সুমন্তরা কতবার লেপার্ড দেখেছে, আমি এত ট্যুরিস্ট নিয়ে যাই এখনো একবারও দেখতে পাইনি।

যুবক এতক্ষন মনোযোগ সহকারে সব কথা শুনে কি যেন একটা ভাবলো, তারপর ওই ট্যুরিস্ট ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলো – আচ্ছা, আপনি ওই বেড়ালের ছবিটা দেখাতে পারবেন?

ভদ্রলোক – আরে কেন পারবো না, এই নিন দেখুন। বলে মোবাইলটা যুবকের দিকে এগিয়ে দিলেন।

যুবক অনেকক্ষন ধরে ছবিটা দেখলো, তারপর হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো – আরে এটা বেড়াল তো বটেই, তবে যে সে বেড়াল নয়। এটা মার্বেলড ক্যাট। আপনি এখুনি লাকের কথা বলছিলেন, এটা আপনার একটা রেয়ার সাইটিং হয়েছে। ছবিটা আমাকে পাঠিয়ে দিন। আমি আমার কয়েকজন সিনিয়রের সাথে শেয়ার করবো।

ভদ্রলোক এবার একগাল হেসে বললেন – তাই? যাক কিছু তো একটা দেখা গেলো তার মানে। আমি এখুনি ছবিটা আপনাকে পাঠাচ্ছি। আপনার নম্বরটা দিন। ভদ্রলোকের মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝলাম ব্যাপারটার গুরুত্বটা উনি পুরোপুরি বোঝেননি। তবে আমি এটা বুঝতে পারলাম যে ঐ যুবক আদ্যোপান্ত বাঙালি। দুজনের মধ্যে নম্বর আদানপ্রদান হলো। ভদ্রলোক ছবিটা পরে পাঠাবেন বললেন।

এই ফাঁকে আমিও আর বসে রইলাম না। চা নিয়ে গিয়ে সোজা ওই যুবকের কাছে গিয়ে বললাম – আপনি কি কলকাতা থেকে?

যুবক হাসিমুখেই উত্তর দিলো – টালিগঞ্জ, আপনি?

আমি বললাম – বাড়ি হুগলি, তবে কর্মসূত্রে রাজারহাটে থাকি।

যুবক – বেড়াতে এসেছেন?

আমি – হ্যাঁ। আপনিও কি বেড়াতে?

যুবক – না। আপনি যেমন কর্মসূত্রে রাজারহাট, আমি সেরম কর্মসূত্রে এখানে থাকি।

এবার আমার কৌতুহল আরো বেড়ে গেলো। দেখলাম ওই ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক আর ফরেস্ট গাইড চায়ের দাম মিটিয়ে চলে গেলেন। আমি ঐ যুবককে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, আমার দিকে হ্যান্ডশেক করার ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো অর্কজ্যোতি, আপনি?

তীর্থঙ্কর।

জিজ্ঞেস করলাম – আমার কৌতূহল হচ্ছে যে এরম জঙ্গলে আপনি কি ধরণের কাজ করছেন।

অর্ক – আমি একটা হর্নবিলের ওপর কাজ করছি। ওদের হ্যাবিট্যাট নিয়ে রিসার্চ। আমার মনে হয় এর থেকে ডিটেইলস এ বললে আপনারও বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।

বললাম – হ্যাঁ, আমরা প্রযুক্তির ছাত্র, এইচ এসের পর থেকে স্বেচ্ছায় অঙ্ক বেছে নিয়েছিলাম।

অর্ক – ভালো বললেন তো। এখানে আমি অনেক ডিএফও দেখেছি যারা এই ফিল্ডেরই না, কিন্তু ফরেস্ট অফিসার।

আমি – তাই নাকি?

অর্ক – হ্যাঁ, একজন ডিএফও র সাথে কথা বলেছিলাম, তিনি তো আই আই টি থেকে পাশ করে এসেছিলেন। প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশুনো করে এখন জঙ্গলে।

অবাক হলাম। ভাবলাম এ কেমন প্রতিযোগিতা! দেশের শিক্ষা কাঠামোর বাছাই করা মেধাবী ছাত্ররা যারা নাকি স্বেচ্ছায় প্রযুক্তিকে বেছে নিয়েছে, তাদের তো প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিভাগে ঢোকা উচিত। তারাও যদি ফরেস্টে আসে তবে যারা এতবছর ধরে বোটানি বা জুওলজি নিয়ে পড়লো, তাদের সুযোগ কোথায়!

অর্ক বললো – আমি পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনো করেছি, ইচ্ছে আছে এই বিষয়ের ওপরে ডক্টরেট করা। তারপর যা হয় দেখা যাবে।

আমি – কোনো শিক্ষাই তো ফেলা যায় না। তবে আজকাল এই বিষয় বদলানো ব্যাপারটা আমি ঠিক মেনে নিতে পারি না।

অর্ক – আমি বুঝতে পারছি, আপনি কি বলতে চাইছেন, তবে ব্যাপারটা জটিল। এতটা সোজা নয়। আমার অনেক ক্লাসমেট কিন্তু আইটি লাইনে চাকরি করে।

আমি বললাম – হ্যাঁ, তাতো হবেই। এটা অনেকটা ওই আলো দেখিয়ে পোকামাকড় আকর্ষণ করার মতো।

অর্ক – তবে কি জানেন, এই জঙ্গলটাকে আমি ভালোবাসি। এখানে থাকতে আমার বেশ লাগে। কতকিছুর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার!

আমি – বেশ তো, কিছু শেয়ার করুন না। গল্প শুনতে আমার ভালোই লাগে। ঘড়িতে সাড়ে ছটা বাজে। সময় আছে।

অর্ক – আরেক কাপ চা চলবে?

আমি – নেয়া যেতেই পারে।

অর্ক দোকানদারের কাছে দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে এসে বসলো। শুরু হলো গল্প।

কয়েকমাস আগের কথা। কালবৈশাখীর সময়। একদিন আমার দুজন ফিল্ড এসিস্ট্যান্ট আর আমি প্ল্যান করলাম আলিপুর দুয়ারে যাবো, এক রেস্তোরাঁয় খেয়েদেয়ে তারপর এখানে ফিরবো। প্ল্যান ছিলো ডিনার করবার। সেইমতো একটা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম চারজন। আলিপুরদুয়ার এ ভালোভাবে পৌঁছে খাওয়াদাওয়া করে উঠতে উঠতে রাত নয়টা বেজে গেলো। এবার ফিরছি। রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। আমাদের ধারণাই ছিল না যে বক্সায় বৃষ্টি হয়েছে। ফেরার পথে রাস্তা ভেজা দেখে বুঝলাম বৃষ্টির তো হয়েইছে, তার সাথে ঝড়ও হয়েছে।

রাজাভাতখাওয়া ফরেস্ট গেটে যখন পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। হাসিমুখে গার্ড আমাদের জন্যে দরজা খুলেও দিলো। গার্ড আমাদের চিনতো। জয়ন্তী মোড় পৌঁছনোর প্রায় কয়েকশো মিটার আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম রাস্তায় কিছু যেন একটা দাঁড়িয়ে। কাছাকাছি পৌঁছে যা দেখলাম তাতে আমরা ভীষণ ভয় পেলাম। রাস্তা জুড়ে উপড়ে রয়েছে একটা বিশাল বড় গাছ। তার সাথে জড়িয়ে ইলেকট্রিক তার। এমনভাবে গাছটা রয়েছে, সেটাকে টপকে যাওয়া সম্ভব নয়। এবার উপায়! আবার ফিরে গেলাম গার্ডের কাছে, বললাম, জানালেন না যে এরম একটা গাছ পড়ে রয়েছে! গার্ড বললো সেও জানে না যে, এরম একটা ঘটনা ঘটেছে। এবার আমাদের কাছে একটাই উপায়, জঙ্গলের একটা রাস্তা আছে যেটা রিভারবেড পেরিয়ে জয়ন্তীতে যায়। নয়তো আরেকটা রাস্তা আছে, যেটা দিয়ে ঘুরে যেতে ষাট কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হবে। এদিকে গাড়িতে যা পেট্রোল আছে, তাতে মেরেকেটে পাঁচ -দশ কিলোমিটার যেতে পারে। অতএব জঙ্গলের পথ ধরতে হবে। সবাই মিলেই এই সিদ্ধান্ত নিলাম।

জয়ন্তী যাওয়ার পথে ডানদিকের জঙ্গলের পথ ধরলাম। ঘড়িতে তখন রাত দশটা বেজে গেছে। গাড়িতে করে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্ত প্রতিমূহুর্তেই মনে হচ্ছে জঙ্গল একটা আলাদা দুনিয়া, আমরা এখানে বহিরাগত। নাজানি কত জোড়া চোখ আমাদের দেখছে। আর রাতের জঙ্গলের এক মায়াবি টান আছে, সেই টান যেন জঙ্গলের গভীরে নিয়ে যেতে চায়। যথারীতি কয়েক কিলোমিটার গিয়ে আমাদের গাড়ির চাকা কাদার মধ্যে ফেঁসে গেলো। বাইরে বেরিয়ে কিছু দেখাও যাচ্ছে না। পুরো অন্ধকার। মোবাইলের টাওয়ার নেই। কল করা যাবে না। বিপদ যখন আসে তখন সবদিক থেকেই আসে। মোবাইলের আলোয় বোঝা গেলো, যে চাকা কাদায় আটকেছে। গাড়ি থেকে নামতেও ভয় লাগছে এই শ্বাপদ সংকুল পরিবেশে। গাড়ির ড্রাইভার চেষ্টা করছে যদি কোনোভাবে গাড়িটিকে একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। চারপাশটা পুরো অন্ধকার। এরই মাঝে আমি সামনের সিট থেকে পেছনের দুজনকে কিছু একটা বলতে গেছি, দেখছি আমার গালের কাছে কিছু একটা নরম নরম ঠেকছে। জিনিসটা কি ? মুখ ঘুরিয়েই দেখি, এক প্রকান্ড হাতি তার শুঁড় জানালা দিয়ে ঢুকিয়ে ফেলেছে। জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম। হাতিও একটু ঘাবড়ে গেলো, এরই মাঝে ড্রাইভার প্রানপনে আয়কসিলারেটর দাবিয়ে দিতেই গাড়ি ঝট করে কিছুটা এগিয়ে গেলো। হেডলাইটের যতটা আলো সেই অস্পষ্ট আলোতেই পেছনে ঘুরে দেখলাম হাতিটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে দেখছে। উদ্দীপনা এই হাতির থেকেই পাওয়া, যার জোরে আমরা জঙ্গল পেরিয়ে লোকালয়ে পৌঁছলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, হাতিটা আমাদের তাড়াও করেনি। আমাদের কোনো ক্ষতি করেনি। বন্যপ্রাণ হলে কি হবে, ওদের হৃদয় আছে বুঝলেন। ভাবুন এরম একটা পরিবেশ যদি কোনো অচেনা শহরে হতো ? ছিনতাইবাজদের ভয় থাকতো। অনেক দিক থেকেই ওই দুনিয়ার লোকেরা মানুষের থেকে ভালো।

গল্প শেষ করে অর্ক চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলো। দেখলাম চা শেষ। গল্পেই এমন বুঁদ হয়ে ছিলাম যে কখন চা দিয়েছে, কখন খেয়েছি মনেই নেই।

ঘড়ি দেখলাম, প্রায় সাতটা কুড়ি বাজছে। অর্ককে বললাম – একটু যেতে হবে, কাল আবার সকালে উঠে রাজাভাতখাওয়ায় যাবো।

অর্ক – যান ঘুরে আসুন। ওদিকটায় বাইসন দেখা যেতে পারে। তবে অনেক গল্প তো বাকি থেকে গেলো!!

অর্ক এতক্ষনে ওর গল্পের এক ভালো শ্রোতা পেয়েছিল। আমি গল্পটা হাঁ করে গিলছিলাম। গল্প বলারও একটা কায়দা আছে, সেটি অর্ক বেশ ভালোই রপ্ত করেছে। তাই ওঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়েই আমি বললাম – আপনি দারুন গল্প বলেন তো !  উত্তেজনাটা  শুনতে শুনতেই ফিল করছিলাম।

অর্ক – আরে , এরম আরো অনেক গল্প আছে। আপনি উপকথায় বিশ্বাস করেন ? ফেবল এ ?

আমি – হ্যাঁ করি তো বটেই। তবে তার পেছনে গূঢ় রহস্যটাকেও জানার চেষ্টা করি।

অর্ক – তবে ছোট্ট করে বলি শুনুন। এই জঙ্গলের আশেপাশে স্থানীয় লোকেরা যারা থাকেন , তারা অনেকেই বুড়িমার পুজো করেন। তারা মনে করেন, বুড়িমা এই জঙ্গলকে আর এই জঙ্গলের অধিবাসীদের রক্ষা করেন।

আমি – আচ্ছা , তাই ?

আবার গল্প বলার ভঙ্গীতে অর্ক বলতে লাগলো – অনেকদিন আগে হর্নবিলের খোঁজে আমরা জয়ন্তী থেকে ভুটান বর্ডারের এক গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকটি মাত্র বাড়ি রয়েছে। সেখানে এক স্থানীয় লোককে আমাদের কাজের ব্যাপারে জানাতে সে বলেছিলো , বহুদিন আগে ওই গ্রামের লোকেরা হর্নবিলের শিকার করতেন।

আমি – সেকি ! এরম কেউ করে নাকি ?

অর্ক – হ্যাঁ , তাই বললো। আমি অবাক হয়েছিলাম। তবে গল্প এখনো বাকি আছে। একদিন গ্রামের এক স্থানীয় লোক , হর্নবিল শিকারের জন্যে গাছের মগডালে উঠে একটি পাখিকে তাক করে মারবে বলে বসেছিল। হঠাৎ সে দেখে এক বিশালাকায় কালো রঙের পাখি , তার ডানার ঝাপটায় সেই হর্নবিলটিকে সজাগ করে তোলে। হর্নবিল ওই জায়গা ছেড়ে তৎক্ষণাৎ উড়ে যায়। পরে যখন এই গল্প ওই গ্রামে জানাজানি হয় , তখন ওই গ্রামের এক বয়স্ক লোক জানিয়েছিল যে, ওই পাখিটি গরুড়।

আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম – এটা তো রামায়ণে বর্ণিত পাখি , এখানে কি করে আসবে ?

অর্ক – আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম যে পাখির কথা ওরা বলছে , সেটি ঈগলের একটা স্পিসিস।

আমি – তারপর ?

অর্ক – তারপর আর কি , ওনারা বলেছিলেন ঈগল ওনারা ভালোমতোই চেনেন। এ পাখি ঈগলের থেকেও অনেক বড়। এর ছায়ার দৈর্ঘ্যও নেহাত কম নয়। কোথাও কোনো পাখির বিপদ এলে , গরুড় নাকি আসবেই। তবে ভালো জিনিসটা হলো , এখন ওই গ্রামে আর কেউ পাখি শিকার করে না। উল্টে পাখিদের সংরক্ষণের জন্য ওনারা বদ্ধপরিকর।

আমি – সেই পাখিকে কি দেখা যায় ?

অর্ক – গ্রামের প্রায় কেউই দেখেনি , কিন্তু ওরা মানে যে ওই গরুড় পাখিটি বুড়িমার পোষ্য। কোনো বন্য পাখি বিপদে পড়লেই , বুড়িমা তাদের রক্ষার জন্যে গরুড়কে পাঠিয়ে দেন।

মনে মনে ভাবলাম , এই কাহিনী সত্য কিনা জানি না। এর সত্যতা যাচাই করার কোনোরকম ইচ্ছেও আমার নেই। এই পৃথিবী আমাদের এই প্রকৃতিরই দান , তাই কখন কাকে কিভাবে রক্ষা করতে হবে , সেটা প্রকৃতিই ঠিক করবে। অন্তত এই গল্পের মধ্যে দিয়ে, বিহঙ্গনিধন তো বন্ধ হয়েছে।  এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি। গরুড় আসুক না আসুক , কিন্তু তার আগমনের আশঙ্কায় অনেক পাখির জীবন বেঁচেছে।

ঘড়িতে দেখলাম প্রায় আটটা বাজে। অর্কর কাছে বিদায় চাইলাম। বললাম – আজ উঠি , আমার পরিবার অপেক্ষা করে থাকবে। কাল দোকানে এলে দেখা হবে।

অর্ক – কাল আবার আমাকে ওই ছোটা মহাকালের দিকে যেতে হবে। ঐদিকে কোনো হোম স্টে তে থাকবো। কাল ফিরতে নাও পারি।

আমি – ওহ! তাহলে ফোন নম্বর টা দাও, যোগাযোগ থাকবে। সরি তুমি বলে ফেললাম।

অর্ক – আরে ঠিক আছে দাদা। আপনার নম্বরটা বলুন, আমি মিস কল করে দিচ্ছি।

ফোন নম্বর আদানপ্রদান করে নিয়ে, আমি ফিরে এলাম হোমস্টেতে। একবার ঘরে গিয়ে পরিবারের সাথে দেখা করে, জানান দিয়ে এলাম যে আমি আশেপাশেই আছি।

হোমস্টের যে জায়গায় খাবার ব্যবস্থা, তার থেকে নিচে আসলেই একটা ছোট্ট বাগান আর তার মাঝে বারবিকিউ এর ব্যবস্থা। এই সময়টায় এগুলোর আয়োজন নেই, মূলতঃ শীতকালের জন্যে রাখা রয়েছে। বাগানের মাঝে কিছু বসার ব্যবস্থা করা। এই জায়গার একদিকে, আমাদের থাকার ঘর, একদিকে এই বাড়ির পাঁচিল, একদিকে বাড়ির প্রবেশদ্বার এবং আরেকদিকে ট্রি হাউসের মতো করা দুটি রুম। ট্রি হাউসের নিচেও বাগানের কিছুটা অংশ রয়েছে। তার ঠিক পেছনেই জঙ্গলের সীমানা।  সেইদিকটায় একটু এগিয়ে যেতেই লক্ষ করলাম সেই নিবিড় বনানীর মায়াবী রূপ। অর্কর ভাষায় এই মায়াবী দুনিয়ায় কত চোখ যে আমাদের দেখছে, আর বলছে সহাবস্থানের কথা। যা আমরা মানুষরা বুঝেও বুঝতে চাইনা। এসব ভাবছি, এরই মধ্যে শুনতে পেলাম, ” স্যার কিছু খুঁজছেন নাকি ? “

ঘুরে দেখলাম বড়কাদা।

বললাম – না এই জঙ্গল দেখছি।

বড়কাদা – এদিকটায় জানেন, শীতকালে প্রচুর ধনেশ পাখি আসে, ময়ূর তো প্রায়ই দেখা যায়।

আমি – আর কোনো পশু দেখেছেন এদিকটায়?

বড়কাদা – সত্যি বলতে আমি দেখিনি। তবে চিতাবাঘ আর হাতি লোকালয়ের দিকটায় অনেক সময়ই চলে আসে।

আমি – আপনি কোথায় থাকেন বড়কাদা?

বড়কাদা – আমি এই পাশেই থাকি।

আমি – আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, এখানে লোকের মূল জীবিকা কি?

বড়কাদা – এখানে যেসব ছেলেরা থাকে, তারা অধিকাংশই ফরেস্ট গাইড। রোটেশনাল পদ্ধতিতে ওদের ডেইলি ডিউটি পড়ে।

আমি – তাতে ওদের যথেষ্ট রোজগার হয়?

বড়কাদা – স্যার যথেষ্টটা অনেক জটিল শব্দ, আমি বুঝিনা। সিজনে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসে, তখন ওদের বেশি রোজগার হয়, আবার যখন ট্যুরিস্ট কমে যায় তখন রোজগারও কমে যায়।

বড়কাদার কথা আমাকে ভাবালো। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা উত্তর দিয়েও , বড়কাদা নিরুত্তাপ। সত্যিই আমরা কি জানি , যথেষ্টর পরিমাপ  কতটা ?

বড়কাদা, বলে জোরে হাঁক দিলেন বাদলবাবুর স্ত্রী। বড়কাদাও একরকম ছুট্টে বাড়ির ভেতরে গেলেন।

বড়কাদার মতো মানুষেরাও ফরেস্ট গাইডদের মতো। যখন ট্যুরিস্টরা থাকে, তখন তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব নেন। তার বদলে কিছু রোজগার হয়। আবার যখন ট্যুরিস্ট কমে যায়, তখন ওনাদের ও রোজগার কমে যায়। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, বর্ষাকালে যখন জঙ্গল ট্যুরিস্টদের জন্যে পুরোপুরি বন্ধ তখন রোজগারের কি উপায়? এইসব ভাবছি, হঠাৎ বড়কাদার গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম।

আপনারা রাতে কটা রুটি খাবেন?

আমি বললাম দশটা মতো করে রাখুন, তার মধ্যে আমাদের সবার হয়ে যাবে।

পরের পর্ব – বক্সা টাইগার রিজার্ভ

২ – সাফারি

শুরু হলো সাফারি। সাফারির গাড়ির সামনে একটি কেবিন। সেখানে ড্রাইভার এর পাশে একজনের বসার ব্যবস্থা। স্থানীয় একজন গাড়ি চালাবেন , আর তাঁর পাশে বসলেন বাদলবাবু। গাড়ির পেছনের দিকের নির্মাণ সাফারির  কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে। এই ধরনের গাড়িগুলিকে ক্যান্টর বলা হয়। এখানে দুটি সারিতে তিনটি করে সিট্। প্রত্যেকটি সিট্ থেকেই জঙ্গল ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। পেছনের এই বসার জায়গায় ছাউনি দেয়া রয়েছে। এই ছাউনি খোলাও যায়। ড্রাইভারের কেবিন আর এই বসার জায়গার মাঝে ছোট্ট জায়গা দিয়ে সাফারির মজা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায়। সেখানে একটি লোহার রড রয়েছে , সেটা ধরে দাঁড়ালে গাড়ি নড়লেও , ব্যালেন্স রাখা যায়। ছবি তোলার জন্যে এটি আদর্শ জায়গা। সাফারির গাড়ি আমাদের নিয়ে সেনাছাউনির পাশ দিয়ে জয়ন্তী রেঞ্জে প্রবেশ করলো। মাটির রাস্তা সোজা চলে গেছে গভীর জঙ্গলে। গাড়ির টায়ার রাস্তায় যে পথে এগিয়েছে , রাস্তার সে অংশ ছাড়া বাকি অংশে ঘাসের আবরণ। এই জিনিস শুধুমাত্র জঙ্গল সাফারিতে দেখা যায়। কিছুক্ষন এইপথে চলার পরই অস্পষ্ট হয়ে এলো জনপদের কোলাহল। প্রবেশ করলাম এমন এক জগতে যেখানে মানুষ, একজন আগন্তুক ছাড়া কিছুই না।

জয়ন্তী রেঞ্জ

প্রত্যেক জঙ্গলের একটা নিজস্ব জাদু আছে। প্রত্যেকের নিজস্ব গন্ধ, নিজস্ব আওয়াজ আর অনন্য রূপ। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হলো না। পরতে পরতে উপভোগ করতে লাগলাম বক্সার এই অনুপম সৌন্দর্য্যকে। স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা গাছের সারি যে কত পাখির বাসস্থান হতে পারে , তা তাদের আওয়াজেই টের পেতে লাগলাম। হঠাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে গেলো। বাদলবাবু বললেন – স্যার, ওই যে বার্কিং ডিয়ার।

বার্কিং ডিয়ার

আস্তে করে ক্যামেরায় হাত রাখলাম। ছবি তুলবো কি , সেই সুন্দর দৃশ্য তখন আমার নয়নবন্দী হচ্ছে। দৃশ্যটা অনেকটা এরম , সুগভীর বনের মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গায় একটা গাছের গুঁড়ি পড়ে রয়েছে। বনের রং উপরের দিকে নীলচে সবুজ। গাছের গুঁড়ির  ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে এক বাদামী রঙের হরিণ। হরিণটির গায়ে হালকা রোদ পড়ছে , কিন্তু আমার দিকে সেটির দৃষ্টি স্থির। আগন্তুকের উপস্থিতিতে সে সজাগ। ক্যামেরা তাক করতে যাবো কি , জন্তুটি কিছু একটা বুঝে, নিমেষের মধ্যে বনের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেলো। এটুকু বুঝতে বাকি রইলো না যে, পৃথিবীর সমস্ত পশুকুল এই মানবজাতিকে অতিশয় ভয় পায়। গাড়ি এগিয়ে চললো। মিনিট পাঁচেক হয়েছে কি , আবার বার্কিং ডিয়ার ! এবার আরো কাছে। কিন্তু এবার ঝোপের আড়ালে সে প্রাণীটি ঘাস খেতে ব্যস্ত। আমাদের দিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ করলো না। তাই এবার আর দেরি না করে, ক্যামেরা বন্দী করলাম হরিণটিকে। বাদলবাবুকে বললাম – চলুন, ছবি তুলে নিয়েছি।

জয়ন্তী রেঞ্জের গভীরে

কিছুদূর এগিয়ে একটা ফাঁকা গ্রাসল্যান্ডের কাছে পৌঁছলাম। সেখানে এক কৃত্রিম জলাশয় আর তার ধারে রাখা এক গাছের গুঁড়ি দেখতে পেলাম। বাদলবাবু বলতে লাগলেন – জঙ্গলের তৃণভোজী প্রাণীরা জলতেষ্টা মেটাতে এখানে আসে। ওই গাছের গুঁড়িতে লবণ রাখা থাকে , জল খাওয়ার সাথে সাথে তারা একটু করে লবণও চাটে। খাবার খেতে বসে, নিজের বাবা কাকাদের দেখেছি কাঁচা লবণ নিতে , খাবারে একটা নোনতা স্বাদ পাওয়ার জন্যে। তৃণভোজী প্রাণীরা যারা কিনা শুধুই ঘাস পাতা খেয়ে বাঁচে , তাদের জন্যে এই লবণ শুধুমাত্র স্বাদের জন্যে দেয়া হয় না, লবণের মাধ্যমে কিছুটা সোডিয়ামও তাদের শরীরেও যায়।

জঙ্গলের আরো গভীরে প্রবেশ করতে লাগলাম। মনে হতে লাগলো এই সাফারি যেন শেষ না হয়। ভুলে গেলাম ব্রেকফাস্ট এর কথা। উঁচুনীচু রাস্তা পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম বালানদীর কাছে। আমি তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাফারি উপভোগ করছি। বাদলবাবু বললেন – স্যার, সাবধানে দাঁড়াবেন , নইলে বসে পড়ুন। এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে দুলতে দুলতে গাড়ি নেমে গেলো বালা রিভারবেডে। রিভারবেড এর রং নুড়ি পাথরের কারণে সাদা হয়ে রয়েছে। দুধারে সবুজ বনাঞ্চল। এ এক অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। মাঝে মাঝে বন্যপ্রাণীরা নদীর একধারের জঙ্গল থেকে আরেকধারে যায়। ঘন্টাখানেক আগেই, এই বালা রিভারব্রীজ পেরিয়ে পৌঁছেছিলাম জয়ন্তী। এখন রিভারবেডে দাঁড়িয়ে জঙ্গল দেখতে পাচ্ছি। আশায় আশায় কিছুক্ষন কাটালাম রিভারবেডে। বাদলবাবু দূরের পাহাড়গুলো দেখালেন। দৃশ্যটি ভারী সুন্দর। এই জায়গায় নদীর প্রশস্তি বিশাল। বাদলবাবু এদিক ওদিক চোখ রাখলেন, যদি কোনো বন্যপ্রাণ দেখা যায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, তারপর আবার প্রবেশ করলাম বক্সার অন্দরমহলে। এবার আমরা যাবো জয়ন্তী রিভারবেড।

বালা নদী

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলছে। দাঁড়িয়ে থেকে চতুর্দিকে নজর রাখছি , যদি কিছু দেখা যায়। চলতে চলতে, হঠাৎ নজর পড়লো সামনের এক উঁচু গাছের দিকে। দেখতে পেলাম হর্নবিল। বাদলবাবুকে দেখাতেই উনি বললেন – ওটা গ্রেট হর্নবিল। একটা অনেক উঁচু গাছের ডালে বসে আছে। সেখান থেকে কিছুদূর এগিয়েছি কি , আবার ডানদিকের এক গাছে একজোড়া পায়েড হর্নবিলও দেখতে পেলাম। বক্সার বাস্তুতন্ত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই হর্নবিল। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এদের অবদান অপরিসীম। প্রচুর পক্ষী প্রেমী শুধুমাত্র হর্নবিল দেখতেই এই এলাকায় আসেন। মনের ভেতর এক অদ্ভুত আনন্দ হতে লাগলো। সাফারি আমার সার্থক হলো।

জয়ন্তী রিভারবেড

এতক্ষণে আমরা পৌঁছে গেছি জয়ন্তী নদীর কাছে। গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিলো রিভারবেডে। এই রিভারবেড অনেক প্রশস্ত। দূরে দেখা যায় সারি সারি পাহাড় , সিঁড়ির ধাপের মতো উঠে গেছে। নদীর একদিকে বক্সা  ন্যাশনাল পার্ক , আরেকদিকে সারি সারি পাহাড় ও জঙ্গল । অনবদ্য ভূদৃশ্য। এরম চমৎকারী ছবি শুধুমাত্র প্রকৃতির পক্ষেই তুলি দিয়েই আঁকা সম্ভব। বাদলবাবু বললেন – ওই পাহাড় গুলোর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভারত – ভুটান সীমান্ত। ভাবতে অবাক লাগে , যেখানে প্রকৃতি এই ভূখণ্ডকে সাজিয়ে তুলেছে পাহাড় আর বনাঞ্চল দিয়ে , সেখানে মানুষ হয়ে সীমান্ত টেনে এই ভূখণ্ডকে ভাগ করার অধিকার আমাদের কে দিয়েছে ?

এই রিভারবেডে বেশ কিছুক্ষন সময় কাটালাম। দেখতে পেলাম জঙ্গলের মধ্যে একটা প্রটেকশন টাওয়ার। এটি এক ধরণের ছাউনি, বনদফতরের কর্মীরা এখানে থেকে চোরাশিকারীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন। বন আর বন্যপ্রাণ কে যাতে সুরক্ষা দেয়া যায়, তারই একটা প্রচেষ্টা। জয়ন্তী রিভারবেড থেকে এবার আমাদের গাড়ি ফিরে চললো হোমস্টের দিকে। এই রেঞ্জের সাফারি আমাদের শেষ হলো। তবুও চারিদিকে দেখতে লাগলাম যদি কোনো বন্যপ্রাণের আকস্মিক আগমন ঘটে !

হোম স্টে তে ফিরে যখন ব্রেকফাস্টের কথা বললাম বাদলবাবুকে, তখন উনি বড়কা দা বলে চেঁচিয়ে কাকে যেন ডাক দিলেন। লম্বা, ছিপছিপে চেহারার এক লোক রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বাদলবাবু তাঁর কাছে গিয়ে কি যেন একটা বলতেই ওই লোকটি এসে আমাকে বললো – স্যার আসুন এইদিকে। বুঝলাম এনার নাম বড়কা। তার পেছন পেছন চললাম। সামনের যে বাড়িতে আমরা প্রথমে লাগেজ রেখেছিলাম, এবার সেই বাড়িটির ভেতর দিয়ে গিয়ে পেছনে আরেকটি বাড়িতে ঢুকলাম। এই বাড়িটিকে দেখেই বুঝতে পারলাম, এটিই আমাদের হোম স্টে ডুয়ার্স প্রকৃতি।

যেরম ইন্টারনেটে ছবি দেখেছিলাম , বাড়িটি তার থেকেও বেশি সুন্দর। বাড়িটিতে ঢুকতেই ডানদিকে একটি দোতলা বাড়ি। এখানে নিচের তলায় বাদল ছেত্রী তার পরিবার নিয়ে থাকেন। সেই বাড়িরই উপরের তলাটা কাঠের তৈরী। আমাদের থাকার জায়গা সেখানে। এই দোতলা বাড়ির একপাশে জঙ্গলের দিকে রয়েছে একটি ট্রি হাউস। কাঠের স্তম্ভ দিয়ে দোতলা সমান উঁচু একটি বাড়ি। দুটি ঘর রয়েছে সেখানে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। এটিও হোমস্টেরই একটা অংশ। এই ঘরগুলোতে ২-৩ জন থাকতে পারে। তবে আমাদের ঘরটা একেবারে আলাদা। বড়কা দা আমাদের লাগেজ আগেই ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমাদের ঘর দেখিয়ে দিয়ে বললেন – আপনারা ফ্রেশ হয়ে নিন, আমি জলখাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এই বলে বড়কা দা চলে গেলেন। দেখলাম, ছবি দেখে ঘরটা যতটা বড় ভেবেছিলাম, ঘরটি তার থেকেও অনেক বড়। দুটো ডাবল বেডের খাট, ব্যালকনি, আরেকদিকে মাদুর পেতে খাবার ব্যবস্থা। বাথরুমও বেশ বড়। আমি এর আগে যেসব জায়গায় থেকেছি, অনেক জায়গায় এই বাথরুমের থেকেও ছোট মাপের ঘর ছিল। আমার পরিবার খুব খুশি হলো। পরিবারের সাথে ঘোরার একটা আলাদা মজা আছে। নিজেকে একটু বেশি সুরক্ষিত মনে হয়, যখন পরিবারের সাথে থাকি। এরই মধ্যে বড়কাদা জানালেন – খাবার রেডি।

বাদলবাবুর বাড়িটির একদিকটা পাকা মেঝে দিয়ে সম্প্রসারিত করা। সেদিকেই আমাদের ঘরে যাবার কাঠের সিঁড়ি। এছাড়া ওই ফাঁকা জায়গাতে একটা ওপেন ডাইনিং রয়েছে। সেখানেই অতিথিদের খাবার ব্যবস্থা । আমরা ঘর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমেই এই মুক্ত ভোজনালয় এ এসে বসলাম। বড়কাদা সব সাজিয়ে রেখেছেন। লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে, অতিশয় তৃপ্তি করে প্রাতরাশ সেরে ফেললাম। আমার ছেলে ঈশানের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, এই জিনিসটার জন্যেই ও অপেক্ষা করছিল। খাবার শেষ করবার আগেই বাদলবাবু এসে বললেন – স্যার বৃষ্টি আসার আগেই আপনাদের বেরোতে হবে, নয়তো আপনারা ওই জায়গায় পৌঁছতে পারবেন না। আমি বললাম – কোন জায়গা ?  বাদলবাবু উত্তর দিলেন – ছোটা মহাকাল।

ভরপেট খেয়ে গাড়িতে চেপে বসলাম। এবারে এক অন্য গাইড আমাদের নিয়ে চলল ছোটা মহাকালের পথে। বাদলবাবু এবার গেলেন না। ড্রাইভার ভদ্রলোক আগে যিনি ছিলেন, এই সফরেও তিনিই আমাদের নিয়ে চললেন। জয়ন্তী জনপদের বটগাছকে ডানে রেখে সোজা নদীর দিকে রওনা দিলো গাড়ি। কিছুটা গিয়েই গাড়ি বামদিকে ব্যাঙ্ক নিলো। এবার দেখতে পেলাম, এই এলাকার এক পুরোনো স্কুল। স্কুল লাগোয়া মাঠ , ঘরবাড়ি পেরিয়ে গাড়ি এগোতে লাগলো। কয়েকশো মিটার গিয়েই গাড়ি নেমে পড়লো জয়ন্তী রিভারবেডে। গাইড বললো – স্যার শক্ত করে ধরে থাকবেন সবাই, আগে রাস্তা খারাপ। মনে মনে ভাবলাম, আমরা কি রোলার কোস্টারে চেপেছি, নাকি!

জয়ন্তী নদী দিয়ে ছোটা মহাকালের পথে

আমার কথা শেষ হতে না হতেই, গাড়ির চড়াই, উতরাই শুরু হলো। পাথরের ওপর দিয়ে চলতে গেলে ঠিক কিরম মনে হয়, তা জানতে গেলে অন্তত একবার, এখানে আসতে হবে। কোথাও ছোট নদী স্রোত, আবার কোথাও মাটিতে লুটিয়ে থাকা গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি নেচে নেচে চলতে লাগলো। দেখতে লাগলাম অদূরের সেই সারি সারি পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে সামনে চলে আসছে। আকাশ এখন কালো মেঘে ঢাকা। চারিদিকের দৃশ্য অপূর্ব। কিন্তু এই সৌন্দর্য এর মধ্যে বাদ সাধছে আমাদের গাড়ি। তাড়াহুড়োয় ছুটে চলেছে ছোটা মহাকালের পথে। বৃষ্টি নামার আগে পৌঁছতে হবে যে! অবশেষে নদী পেরিয়ে, কঠিন চড়াই উতরাই পথ অতিক্রম করে আবার অরণ্যমধ্যে প্রবেশ করলাম। ঘন বনাঞ্চলকে বামদিকে রেখে, গাড়ি এক পাহাড়ি রাস্তা ধরে পৌঁছে গেলো ছোটা মহাকাল।

ছোটা মহাকাল

গাড়ি থেকে নেমে যা দৃশ্য দেখলাম, সেটাকে নৈসর্গিক বললেও কম বলা হয়। সারি সারি পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে চলেছে জয়ন্তী নদী। প্রায় এক হাঁটু জলস্রোত বইছে। কোনদিকে তাকাবো? যেদিকেই তাকাই সেদিকের দৃশ্যই ক্যামেরাবন্দী করতে ইচ্ছে হচ্ছে। জয়ন্তীনদী এখানে দুইদিকের পাহাড়কে আলাদা করে রেখেছে। গাইড ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন দেখে, জিজ্ঞেস করলাম – চলুন, কোথায় নিয়ে যাবেন?

ভুটানের পাহাড়

গাইড বললেন – এদিকে আসুন। আমাদের এই নদী পার করে ঐদিকের পাহাড়ে যেতে হবে।

আমি আঙুল দিয়ে দেখালাম – ঐ পাহাড়টায় ?

গাইড – হ্যাঁ। জানেন স্যার, ঐদিকটা ভুটান?

আমি অবাক হয়ে বললাম – তাই? মানে আমরা আন্তর্জাতিক সীমারেখা পার করবো! ভেবেই রোমাঞ্চ হলো। ক্যামেরা বার করে ফেললাম।

গাইড – এবার তাড়াতাড়ি চলুন, বৃষ্টি পড়লেই অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।

দেখলাম এই নদী আমার মা আর ছেলে পেরোতে পারবে না। প্রচন্ড স্রোত পেরিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষে কষ্টকর। নদীর ধারের এক পাথরে মা আর ছেলেকে অপেক্ষা করতে বলে, আমি আর আমার স্ত্রী গাইডের পিছু পিছু চললাম।

ছোটা মহাকালের আরেকদিকে

নদীটিকে যতটা সুন্দর মনে হচ্ছিলো, নদীর স্রোতের গতি দেখে সেই ধারণা কিছুটা বদলালো। দুইজনে কোনোমতে হাত ধরাধরি করে নদীর অপর প্রান্তে পৌঁছলাম। এই পাহাড়ের যেদিকেই চোখ যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি ছোটো খাটো জলধারা পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে নামতে ঝর্ণার আকার নিয়েছে।

গাইড দেখালেন – ওই যে সামনের পাহাড়, আমাদের ঐখানে উঠতে হবে। পাঁচশো মিটার মতো হবে।

আমি দেখলাম ছোট কিছু গেরুয়া পতাকা পাহাড়ের গায়ে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত ঐটিই ছোটা মহাকাল। প্রকৃতির টানেই এগিয়ে চললাম। সহধর্মিণী কেও সেইমতো বোঝালাম, এতদূর এসেছি যখন, তখন দেখেই নি। 

ভগবান মহেশ্বরের এই একটা বৈশিষ্ট আছে। তিনি এইরকম দুর্গম জায়গায় নিরিবিলি পরিবেশেই অবস্থান করেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে তাঁকে হাতের নাগালে পাওয়া একটু কষ্টসাধ্য তো হবেই! খাড়াই রাস্তা ধরে কিছুটা ওঠার পর বুঝলাম কতটা কষ্ট। এখানের লোকেদের কাছে যেটা অভ্যেস, তা আমাদের কাছে একপ্রকার ট্রেকিং। কুড়ি পঁচিশ মিনিট পর, পৌঁছলাম ছোটা মহাকাল। পাহাড়ের গায়ে তৈরি হওয়া এক গুহার মধ্যে রয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁকে ঘিরে আরো কিছু দেবতাদের সমাবেশ। পুরো জায়গাটিতে কেউই নেই। শুধুই আমরা। দেবাদিদেবের দর্শন সেরে নিলাম, দেখলাম দূরে আমার মা এখনো ওই পাথরের ওপর বসে। কিন্তু ঈশান এদিকে ওদিকে ঘোরাঘুরি করছে। বুঝলাম এই ছোট্ট মাথার বিভিন্ন প্রশ্নবাণের আঘাতকে প্রতিহত করছে, আমাদের পরিবারের সবথেকে বয়স্ক মানুষটি।

এরইমধ্যে গাইড বললেন – স্যার এদিকে আসুন।

দেখলাম উনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখাতে চাইছেন। ওনার পিছু নিলাম। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে ঘুরে দেখতে পেলাম এক অপূর্ব দৃশ্য। পাহাড়ের দুটো ঢাল অনেকটা ইংরেজী X অক্ষরের মতো রয়েছে। এক ঢাল থেকে আরেক ঢালে আছড়ে পড়ছে এক শ্বেতবর্ণ জলরাশি।

গাইড বললেন – এটিই ছোটা মহাকাল ফলস । ভক্তরা এখানে স্নান করে দেবাদিদেবের পুজো করেন।

মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। বরুনদেব কত রূপেই না এই প্রকৃতিতে বসবাস করেন! এইসব ভাবতে ভাবতেই ক্যামেরা বন্দী করলাম এই জলরাশির সৌন্দর্য।

গাইড বললেন – স্যার, আর দেরি করে লাভ নেই। চলুন ফিরে যাই। তাছাড়াও, এখানে জোঁক থাকতে পারে।

অগত্যা ফিরে চললাম। সহধর্মিণীকে সঙ্গে করে চললাম আমার পরিবারের আরো দুজন সদস্যের কাছে।

গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো হোমস্টের দিকে। আমাদের আবার বিকেলে একটা সাফারি রয়েছে। চড়াই উতরাই রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি চলতে লাগলো। তবে এবার কিছুটা হলেও এই যাত্রাপথ উপভোগ করতে লাগলাম। প্রায় আধঘন্টা পর পৌঁছে গেলাম ডুয়ার্স প্রকৃতি।

হোটেলে ফিরে লাঞ্চের কথা জানালাম বাদলবাবুকে। উনি আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। কিছুটা হলেও উনি শান্তি পেলেন এই ভেবে যে, আমরা ছোটা মহাকাল ঘুরে নিয়েছি। রাস্তায় বৃষ্টি আসবে আসবে করেও আসেনি।

সবাই স্নান করে রেডি হয়ে নিলাম। বড়কাদাও সময়মতো এসে জানালেন খাবার রেডি। ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজে। নীচে নেমে এলাম। মধ্যাহ্নভোজের সুব্যাবস্থা। ডিমের ঝোল, গরম ভাত, ভাজা আর চাটনি সহযোগে আমাদের ভোজন সম্পন্ন হলো। ঘড়িতে তখন পৌনে তিনটে। সোয়া তিনটের মধ্যে বেরোতে হবে। এতক্ষনে বাদলবাবু এসে জানিয়ে দিয়েছেন। গাড়িও এসে গেছে। এতক্ষণে ঠিকঠাক রেস্ট পাওয়া গেলো। সে আধঘন্টারই হোক না কেন।

আমার স্ত্রী আর মা একযোগে বলে উঠলো – সকাল থেকে অনেক ছোটাছুটি হয়েছে। এবার একটু ক্লান্তি লাগছে। এইটুকু রেস্ট পাওয়া গেলো , এই অনেক।

বেশিক্ষণ রেস্ট নেয়া হলো না। মেরেকেটে পনেরো মিনিট রেস্ট আর বাকি পনেরো মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আবার আমরা সাফারির গাড়িতে চেপে বসলাম। আমাদের গন্তব্য চুনিয়া টাওয়ার।

জয়ন্তী নদীতে স্রোত

একই পথে আমাদের গাড়ি আবার জয়ন্তী রিভারবেডে গিয়ে পড়লো। এবার গাইড স্বয়ং বাদলবাবু। ছোটা মহাকাল যাওয়ার পথ রিভারবেডের বামদিকে। চুনিয়ার পথ খানিকটা সোজা। গাড়ি সোজা আমাদের নদীর অপর প্রান্তে নিয়ে চললো। আমি সকালের মতো ক্যামেরা রেডি করে অপেক্ষা করতে লাগলাম। চুনিয়া, এই বক্সা ন্যাশনাল পার্কের একটি রেঞ্জ। এই পথে উঁচু গাছের সংখ্যা কম। জঙ্গলের ঘনত্বও একটু কম। নদীর অপরপাড়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে, বামদিকে দেখতে পেলাম প্রচুর ভাঙা বাড়ি, বাড়িগুলি দেখলে মনে হবে যেন, এখানে আগে কোনো বসতি ছিলো। কৌতূহলে বাদলবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে আগে কি ছিলো ? আর এগুলোই বা কাদের বাড়ি?

বাদলবাবু জানালেন এই জায়গা ছিলো ভুটিয়াবস্তি। সরকার এই বসতি তুলে দিয়েছে। সব লোকেদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসন দিয়েছে। বেশীদিন হয়নি, তাই বাড়িগুলির ভাঙাচোরা অংশগুলো চোখে পড়ছে।

চুনিয়া রেঞ্জ

আমি জিজ্ঞেস করলাম – কিন্তু কেন?

তার কোনো স্পষ্ট উত্তর বাদলবাবু দিলেন না। এড়িয়ে গেলেন। কিছুক্ষনের জন্যে মনে হলো, সরকারি নীতির প্রকোপ, বিভিন্নভাবে সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে। কারো জন্য খুব ভালো, আবার কারোর জন্যে খুব খারাপ। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বোধহয় কিছু মুষ্টিমেয় লোকের হাতেই সীমাবদ্ধ। সেই মুষ্টিমেয় লোকেদের আমরাই নির্বাচন করেছি, তাই আক্ষেপ করেও বিশেষ লাভ নেই।

বাদলবাবু বললেন – এই এলাকাতেই বহু বছর আগে ডলোমাইটের খনি ছিল। সেই খনিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল জনবসতি। অনেক পরে এই জায়গাগুলো বন দফতরের হাতে চলে যায়।

গাড়ি এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ করে সামনের এক উঁচু গাছের ডালে একটা হর্নবিল কে উড়ে বসতে দেখলাম। ওরিয়েন্টাল পায়েড হর্নবিল। বাদলবাবুও দেখেছেন। কয়েক মুহূর্ত হয়েছে কি, বাদলবাবু সজোরে ব্রেক কষলেন। একটু জোরেই বললেন – স্যার এবার দেখুন।

আমি যা দেখলাম, সেই দৃশ্য কখনোই ভুলতে পারবো না। কমপক্ষে তিরিশটা পাখিকে উড়ে যেতে দেখলাম একসাথে, ওই উঁচু গাছটার দিকে। মন ভরে গেলো। তবে এতটা দূরের দৃশ্য ক্যামেরায় এলো না। ভগবান যে ক্যামেরা আমাদের সকলকে দিয়েছেন, তাতেই দেখতে পেলাম এক ঝাঁক সাদাকালো নভোশ্চরদের। ইংরেজিতে হর্নবিল, বাংলায় ধনেশ। শুনতে পেলাম তাদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। ধনেশের ডেরা পেরিয়ে একটু এগিয়েছি কি, বাদলবাবু বলে উঠলেন – স্যার ওই দেখুন। দেখলাম কালো রঙের একটি বড় পাখি আমাদের গাড়ির সামনে দিয়ে উড়ে গেল।

চুনিয়া ওয়াচটাওয়ারের থেকে

আপামর সর্পকূলের সাথে এই পাখির খাদ্য খাদকের সম্পর্ক। এর পোশাকি নাম সার্পেন্ট ঈগল। গাড়ি দাঁড়ালো না। এগিয়ে যেতে লাগলাম। প্রায় দুশো মিটার এগিয়ে যেতেই, গাড়ি দাঁড়িয়ে গেলো। বাদলবাবু বলে উঠলেন – স্যার এইদিক দিয়ে হাতি গেছে। খুব বেশিক্ষন হয়নি। আমি তখন সাফারি ভ্যান থেকে মাথা বার করে দাঁড়িয়ে দেখছি চারিদিক। যে পথ বাদলবাবু দেখাচ্ছেন, সেই পথের ছোট গাছগুলো নুইয়ে দুইদিকে ঝুঁকে পড়েছে। ঝোপঝাড় দুদিকে সরে গেছে। মনে হয় অনেকজন মিলে হেঁটে গিয়ে, এই রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে। বা ঝোপঝাড়ও হয়তো গজরাজকে সেলাম জানিয়ে নিজেরাই রাস্তা করে দিয়েছে। আমি তখন উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে সাফারি উপভোগ করছি। চারিদিকে চোখ রাখছি। বাদলবাবুকে বললাম একটু এগিয়ে চলুন।

হাতির দল

গাড়ি পঞ্চাশ মিটার এগিয়েছে কি, আমাদের চলার পথের ডানদিকে যে ফাঁকা ঘাসের জমি ছিলো, সেইখানে চোখ গেলো। চেঁচিয়ে উঠলাম – ওই যে, ওই যে, গাড়ি দাঁড় করান। বাদলবাবু সজোরে ব্রেক কষলেন। উনি খেয়াল করেননি, কারণ এই হাতির দল আমাদের পেছনে ছিলো। বড়ো হাতি আর বাচ্চা হাতি মিলিয়ে গোটা আটেকের দল হবে। হস্তীপরিবার নিজের বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছে। ক্যামেরাবন্দী করে নিলাম তাদের এই সুন্দর মুহূর্তকে। ছবি তোলার পর মনে হলো, পারিবারিক এই মুহূর্ততে হয়তো আমরা বিঘ্ন ঘটাচ্ছি। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মিনিটখানেকের মধ্যেই হাতির দল আবার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলো। আমরাও এগিয়ে চললাম চুনিয়া ওয়াচটাওয়ারের দিকে।

চুনিয়া ওয়াচটাওয়ার

বেশ খানিকটা এগিয়ে এক জায়গায় পৌঁছলাম। এই জায়গাটি মূলত চোরাশিকার ঠেকানোর জন্যে ব্যবহৃত হয়। নতুন করে সবুজ রং করা হয়েছে। ওয়াচটাওয়ারের ওপরে উঠলাম। সামনের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল অতোটা ঘন নয়। তুলনামূলকভাবে পেছনদিকের অঞ্চলে গাছেদের ঘনত্ব বেশী। সামনের গাছের সারি পেরোলে দেখা মিলবে জয়ন্তী নদীর। ওয়াচটাওয়ারের আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। শুধু আমরাই। এই নির্জনতাই জঙ্গলকে উপভোগ করতে সাহায্য করে। বট, শাল, পিয়াল, শিশু, শিরীষ গাছের প্রাধান্য বেশি দেখা যায় এই জায়গাতে। টাওয়ারের চারিদিকে ইলেকট্রিক ফেন্সিং দেয়া, তার মধ্যে দিয়ে সাবধানে গলে গিয়ে উঠতে লাগলাম টাওয়ারে। টাওয়ারের দুটো তলা। দুটোতেই লোক থাকার ব্যবস্থা আছে। রান্নাঘর, শৌচালয় সবের ব্যবস্থা আছে। পরিচ্ছন্নতা দেখে বোঝাই যায়, এখানে লোকের বসবাস আছে। টাওয়ারের দোতলা থেকে জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে দেখা যায়, তার এক প্রধান কারণ এখানকার গাছেদের ঘনত্ব। চোরাশিকারীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে এর থেকে ভালো ঠিকানা আর হয় না। টাওয়ার থেকে নেমে এলাম। কোথাও কিছুই দেখতে পাইনি, এক দুটো বুলবুল পাখি ছাড়া। বাদলবাবু আর আমার পরিবার কেউ ওপরে ওঠেনি। নেমে আসতেই বাদলবাবু জিজ্ঞেস করলেন – কিছু দেখতে পেলেন নাকি স্যার?

ভুটিয়াবস্তির দিকে

আমি বললাম – নাহ!

বাদলবাবু বললেন – তাহলে চলুন আরেকটা জায়গায় নিয়ে যাই, ভালো লাগবে।

ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। এতক্ষন বাদলবাবু ড্রাইভারের পাশে বসে ছিলেন, এবার ড্রাইভারকে পাশে বসিয়ে নিজেই স্টিয়ারিং ধরলেন। এবার ফেরার পথ ধরলাম। ফেরার পথে ভাবলাম ওই হাতির দলকে আবার দেখতে পাবো, কিন্তু সব দিকে তাকিয়েও, দেখতে পেলাম না। যেটা দেখতে পেলাম, সেটাও আমার জন্যে কম কিছু না। মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক টিয়া পাখি উড়ে গেল। যেরম টিয়া এর আগে দেখেছি, এগুলো একটু আলাদা। সাইজে ছোট আবার বুকের জায়গাটা একটু লালচে। বিজ্ঞানসম্মত নাম রেড ব্রেস্টেড প্যারাকীট। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে বাদলবাবু ডানদিকের পথ ধরলেন। এই রাস্তা ভুটিয়া বস্তির দিকে যায়। এখানে জঙ্গল বেশ ঘন এবং শুনশান। শুধু আমাদের গাড়ি ছাড়া আর কেউই নেই। এমনকি ভুটিয়া বস্তিও উঠে গেছে। পড়ে রয়েছে কিছু ভাঙা ঘরবাড়ি। আজ এই জায়গা বন্যপ্রাণের জন্য উন্মুক্ত । মনে মনে ভাবলাম, সাধারণত বন্যপ্রাণ উঠিয়ে শহর হতে অনেক জায়গায় দেখা যায়। এখানে ব্যাপারটা উল্টো। জঙ্গলের ভাঙাচোরা পথে ধীরে ধীরে পৌঁছলাম এক পুরোনো ওয়াচটাওয়ার এর কাছে। কতদিন ধরে যে পড়ে রয়েছে কে জানে। সন্ধেও প্রায় নেমে আসতে চলেছে। পরিবারকে নীচে বাদলবাবুর জিম্মায় রেখে, উঠতে লাগলাম ওয়াচটাওয়ারের মাথায়।

ভুটিয়াবস্তি ওয়াচটাওয়ার

অদ্ভুত এক পোকার ডাক, এত তীব্র যে মনে হচ্ছে কোথাও যেনো অনবরত ঘন্টা বাজছে। ওয়াচটাওয়ারের প্রতিটি তলা ভীষণরকম নোংরা। তার সাথে পচা গন্ধ। বহুদিন ধরে ওয়াচটাওয়ার পরিত্যক্ত। উপরে পৌঁছে চারিদিক দেখতে লাগলাম, কিছু যদি দেখা যায়। অদূরে একটি জলাশয় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, আর গাছেরা নীরব মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। আবহাওয়া গরম, এমনকি বাতাসও বইছে না। বেশিক্ষন না থেকে, নেমে এলাম। নেমে আসতেই, আমার স্ত্রী মৌমিতা উত্তেজিত হয়ে আমাকে ওয়াচটাওয়ারের একটা স্তম্ভর দিকে দেখালো। দেখলাম স্তম্ভের গায়ে কেমন একটা ঘষে যাওয়ার দাগ, কোথাও বা গর্ত। যেন কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে খোঁচানো হয়েছে।

মৌমিতা বললো – জানো, বাদলবাবু বললেন এগুলো হাতি করেছে। ওদের দাঁত এখানে ঘসেছে।

হাতির দাঁত ঘষার দাগ

সেই দাঁত ঘসার জন্যে যে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে, তার ফলে এই সিমেন্টের স্তম্ভের এই দশা। আমরা যে বহুতল নির্মাণের জন্য গর্ব করি এবং সেই নির্মাণের যে প্রাথমিক উপাদান, যা নিয়ে তাবড় তাবড় সেলিব্রিটিরা আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান, সেই উপাদান এই বন্যপ্রাণের কাছে একেবারেই তুচ্ছ। আমরা ওদের ঘর ভাঙতে পারি , কেটে ফেলতে পারি জঙ্গল , তৈরী করতে পারি নগর। তবুও আমাদের এটা জানা উচিত , এঁরাও আমাদের ঘর ধূলিসাৎ করতে সক্ষম।

জয়ন্তী নদী দিয়ে ফেরা

ওয়াচটাওয়ার থেকে নেমে, এবার সাফারি শেষ করে অবিলম্বে ফিরে চললাম। সন্ধে নামছে। তার আগেই পৌঁছতে হবে হোম স্টে। আমাদের ভ্রমণ গ্রূপের সবথেকে ছোট্ট সদস্য ঈশান কিন্তু বেশ ক্লান্ত। ঘরে ফিরে কি কি করবে, তার পরিকল্পনা করছে। এদিকে জঙ্গলের রং পাল্টাচ্ছে, গাঢ় সবুজ ধীরে ধীরে কালো হচ্ছে। তারই মাঝে এই রিভারবেড ধীরে ধীরে শ্বেত বসন ধারণ করছে। সন্ধে বেলার নদীতীর দারুন সুন্দর। অপূর্ব এই দৃশ্য ছেড়ে কি ঘরে বন্দী হতে ভালো লাগে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, এই ভ্রমণ শুধু আমার একার না, আমার পরিবারেরও। তাদের মতামত, তাদের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেওয়াও আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আজকের দিনের সাফারি শেষ হলো। নদী পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম হোমস্টে।

পরের পর্ব – পরিবেশ বিজ্ঞান

১ – যাত্রাশুরু

রবিবারের দিনটা আর চারটে দিনের থেকে আলাদা। এদিন বাড়িতে আমরা সবাই একসাথে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করি। বিশেষ পদের রান্নাও হয়। ভাত , ডাল , ভাজা, তরকারি থেকে শুরু করে মাছ , মাংস , চাটনি , শেষপাতে দই এসব থাকেই। যাকে বলে একেবারে এলাহি  খাওয়াদাওয়া। 

আজকের দিনের মেন্যুতে ছিল ভেটকি মাছ , আর তার সাথে কাচকি মাছ ভাজা। কয়েকটি কাচকি মাছভাজা চিবোতে চিবোতে, আমার স্ত্রী মৌমিতা  আমার দিকে তাকিয়ে বললো – গরমের ছুটিতে কোথাও ঘুরতে গেলে হয় না ? ধরো এই তিন চার দিনের জন্য ?

আমি মনে মনে হাসলাম। কারণ একটাই , ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে আমার সবসময়ই হয়। এবার যখন অন্যতরফ থেকে তাল উঠলো , তখন তালে তাল মিলিয়ে বলে উঠলাম – চলো, পাহাড়ে যাই। দার্জিলিং , গ্যাংটক কিংবা সিল্করুট ? যাবে ?

একথা বলে ভাবলাম, আমার স্ত্রী বেজায় খুশি হবে , কিন্তু হলো ঠিক তার উল্টো। সহধর্মিনী কিছুটা বিরক্তির স্বরে বললে – আরে  ধুর ! সবাই এখন ঐদিকেই যাচ্ছে। কাতারে কাতারে লোক ভীড় জমাবে পাহাড়ে। বাঙালি কি জিনিস জানো ? এই গরমেও একবার পুরী বা দার্জিলিংয়ের টিকিট কেটে দেখাও দেখি ?

আমি ভেবে দেখলাম কথাটা ঠিক। ভীড় এড়াতে যেদিকে যাওয়া, সেদিকে গিয়ে আবার ভীড়ের মধ্যে পড়লে সেটা তো খুব সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না। তাই বললাম – হুম, বুঝেছি , একটু ভাবতে দাও !

কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা অন্য গন্তব্যের কথা মাথায় এলো। তবে মনে মনে ভাবলাম, আমি তো যেতেই পারি, আমার ভালো লাগবেই, কিন্তু আমার স্ত্রী, কিংবা মা কি রাজি হবে ? একটু ধন্দের মধ্যে থেকেও ঠিক করলাম , বলেই ফেলি।

মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললাম – ডুয়ার্স যাবে ? সেই পনেরো ষোলো বছর আগে স্কাউট ক্যাম্পের জন্যে একবার গেছিলাম গরুমারা। ব্যাস ওই শেষ ! তারপর আর সুযোগই হয়নি ! এবার যাবে ?

আমার স্ত্রী মৌমিতা ঘুরতে খুবই ভালোবাসে। কিন্তু তার একটি পছন্দের উইশ লিস্ট আছে। সৌভাগ্যবশত ডুয়ার্স সেই লিস্টে ছিলো। তাই এককথায় রাজী হয়ে বললো –  হ্যাঁ যাওয়াই যায়। আমার তো কখনোই যাওয়া হয়নি। শুধু শুনেছি আর ছবি দেখেছি। আশা করি মা আর ঈশানেরও ভালোই লাগবে।

আমাদের ভ্রমণ প্ল্যান সবসময় চারজনের কথা মাথায় রেখেই করতে হয় । আমরা দুজন ছাড়া , আমাদের দলের অন্য দুই সদস্য আমার মা আর আমার ছেলে ঈশান। একটা দুটো জায়গা ছাড়া, আমরা সব জায়গাতেই মা কে নিয়েই গিয়েছি , সে পাহাড় হোক কিংবা জঙ্গল। আমার মা এর আগে মালবাজার গেলেও, ডুয়ার্সে প্রবেশের সুযোগ পাননি । এবারে যাতে সেই অভিযোগ না থাকে, সেইমতো পুরো ভ্রমণের খুঁটিনাটি ছকে নিলাম। তৈরী করে ফেললাম দুই রাত তিন দিনের বক্সা ভ্রমণের প্ল্যান। আর দুটো রাত, আমাদের ট্রেনে কাটাতে হবে । প্ল্যান হলো এক শুক্রবার যাবো , আর মঙ্গলবার সকালে ফিরে আসবো।  

নিজের কয়েক বছরের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছি যে, কোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে, বিশেষ করে যখন গন্তব্য উত্তরবঙ্গ , তখন ট্রেনের টিকিট আগে কেটে নিতে হয়। তাই কোনো পরিকল্পনার আগেই টিকিট কেটে নিলাম কলকাতা শিলচর এক্সপ্রেসে। একমাত্র এই ট্রেনটিই সকাল সকাল নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছয়। আলিপুরদুয়ার দিয়ে যেতে গেলে, অনেকটাই দেরি হবে। ট্রেনটি কলকাতা স্টেশন থেকে দুপুর তিনটের সময় ছেড়ে নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছয় পরদিন সকাল ছটা  নাগাদ। ট্রেনটি প্রতিসপ্তাহে শুধুমাত্র শুক্রবারই ছাড়ে। ফেরার ট্রেন আলিপুরদুয়ার থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। দুটি ট্রেনেই অনায়াসেই মিললো টিকিট। ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা যখন হয়ে গেলো, তখন বাকি রইলো থাকা, খাওয়া আর ঘোরার ব্যবস্থা। আজকাল এই সবকিছুর দায়িত্ব হোমস্টে বা হোটেল নিয়ে নেয়। তাই এবার খোঁজ করা শুরু করলাম, কোন হোটেল বা হোমস্টে তে থাকবো। দুদিন ধরে খোঁজাখুঁজি করার পর পেলাম এক হোমস্টের সন্ধান। আমার হোমস্টে বেছে নেয়ার একমাত্র মানদণ্ড ছিলো , হোমস্টেটিকে জঙ্গলের কাছে থাকতে হবে। সেইদিক থেকে এই হোমস্টেটি একেবারে উপযুক্ত।  জঙ্গলের ধারে অবস্থিত , বলা যায় জঙ্গলের সীমারেখার পাশেই। এই হোমস্টের লোকেশন, জয়ন্তী। সত্যি কথা বলতে, আমাদের কাছে বক্সাও যা, জয়ন্তীও তাই। এই এলাকা সম্বন্ধে আমাদের কারোর কোনো ধারণাই নেই ।

হোমস্টের মালিক বাদল ছেত্রীর সাথে প্রথমবার কথা বললাম । হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম, ভদ্রলোক পরিষ্কার বাংলা বলেন। হোমস্টের, কোন রুমটি আমাদের চারজনের থাকার জন্য ভালো হবে? কিরম খরচ হবে? সবই উনি জানালেন। যে জিনিসটা আমার সবথেকে ভালো লাগলো, সেটি হলো , ভদ্রলোকের নিজস্ব সাফারির গাড়ি রয়েছে , আর উনি নিজেই একজন ফরেস্ট গাইড। ভেবে দেখলাম, এর থেকে ভালো আর কিছু হয় না। সাথে সাথে, ওনাকে কিছু টাকা পাঠিয়ে রাখলাম। আগাম বুকিংও হয়ে গেলো।

অনেকদিন পর, ঠিক আমাদের যাত্রাশুরুর  আগেরদিন, ওনার সাথে দ্বিতীয়বারের জন্যে কথা বললাম। উনি জানালেন পরিকল্পনা মাফিক সমস্ত সাফারির বুকিং উনি করে রাখবেন , শুধু আমাদের ঠিক সময়ে পৌঁছে যেতে হবে । আমাদের, নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে গাড়ি পিক আপ করে নিয়ে আসবে জয়ন্তীতে। গাড়ির ড্রাইভারের ফোন নাম্বারও বাদলবাবু সঙ্গে সঙ্গেই শেয়ার করে দিলেন । এখন আমাদের কাজ হচ্ছে , সময়মতো ড্রাইভারকে ফোন করা , উনি স্টেশনেই থাকবেন। অজানাকে জানার একটা কৌতূহল বাঙালী মাত্রেই থাকে। সেই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সমস্ত ক্যামেরা চার্জ করে রাখলাম। আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম শুক্রবারের জন্যে।

শুক্রবার অফিস থেকে কলকাতা স্টেশনে পৌঁছনোর প্ল্যান ছিল। ঠিক করেছিলাম, আমার পরিবার গাড়ি নিয়ে আমার অফিসে আসবে , সেখান থেকে সবাই মিলে কলকাতা স্টেশন যাবো। প্রথম ধাক্কাটা খেলাম শুক্রবার দুপুর বারোটায়। আইআরসিটিসির থেকে মেসেজ পেলাম যে ট্রেনটা দুঘন্টা লেট্। যেটাকে ইংরেজিতে রিশিডিউল বলে, সেটাই ট্রেনটার সাথে হয়েছে।  দুপুর তিনটের পরিবর্তে ট্রেনটি বিকেল পাঁচটায় ছাড়বে। পৌঁছবেও দেরিতে। ভ্রমণসূচি পুরোই ঘেঁটে  গেলো। বাড়িতেও জানিয়ে দিলাম দেরি করে বেরোতে। তিনটে নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। প্ল্যান অনুযায়ী, আমার পরিবার নির্ধারিত সময়ে আমার অফিসের কাছে পৌঁছে গেলো।  আমরা সবাই মিলে, যখন কলকাতা স্টেশনে পৌঁছলাম, তখন প্রায় পৌনে চারটে  বাজে। ভাগ্যবশত রাস্তায় কোনো জ্যাম ছিল না। যেটা ছিল , সেটা হলো, জুন মাসের একটা ভ্যাপসা গরম। এতক্ষণে যখন মেসেজ দেখার সুযোগ পেলাম, দেখলাম বাদলবাবু যে নম্বরটা শেয়ার করেছিলেন, তাতে লেখা, স্বপন দত্ত জয়ন্তী। বুঝলাম আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোকের নাম স্বপন দত্ত। ভাবলাম ট্রেনে উঠে ওনাকে ফোন করবো।

ট্রেন পাঁচটায় ছাড়েনি , পনেরো কুড়ি মিনিট দেরি হয়েছে। এবার খেলাম দ্বিতীয় ধাক্কা, তাও আবার ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। দার্জিলিং মেল, পদাতিক বা কাঞ্চনকন্যা যতটা ভালো, এ ট্রেন ঠিক তার উল্টো। পরিচ্ছন্নতার ওপর যদি পরীক্ষা নেয়া হতো , তাহলে এই ট্রেনটিকে শূন্য দেয়াও বাড়াবাড়ি হয়ে যেত । একটি টয়লেটে জল নেই আবার আরেকটিতে জল লিক করে পুরো ভাসাভাসি অবস্থা। কিছুই করার নেই। মনের মধ্যে একরাশ বিরক্তি আর হতাশা দানা বাঁধলো।  ভাবলাম শুরুটা এরম হলে, পুরো ভ্রমণটা হতাশাজনক হতে চলেছে। এদিকে, ট্রেন ছেড়ে দেয়ার প্রায় ঘন্টা দুই পর, আমার কাছে স্বপনবাবুর ফোন এলো। আমার ফোন করার আগেই, উনি ফোন করলেন। ফোনে প্রথমবার ওনার গলা শুনেই বুঝতে পারলাম, ফোনের ওপারের ব্যক্তি বৃদ্ধ। ওনার বাচনভঙ্গিতেও কিছু সমস্যা আছে। সে সমস্যা হয়তো শারীরিক , কিংবা বয়সজনিত। যাই হোক, ওনাকে জানালাম ট্রেনের লেট্ ছাড়ার কথা। উনি জানালেন, নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে গেলে, ওনাকে ফোনে যেন জানিয়ে দিই । উনি ঠিক সময়ে চলে আসবেন।

পরদিন সকাল ছটায় ট্রেন পৌঁছে গেলো নিউ জলপাইগুড়ি। ট্রেন অর্ধেক খালি হয়ে গেলো ওখানেই। আমি অবশ্য সহযাত্রীদের সাথে আগেই আলাপ করেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম ট্রেন নিউ জলপাইগুড়িতেই খালি হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের গন্তব্য নিউ আলিপুরদুয়ার । তাই অপেক্ষায় বসে রইলাম। নির্ধারিত সাফারির টাইম ছিল সকাল নয়টা। ঠিকঠাক চললেও, ট্রেনটি নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছলো সাড়ে আটটার পর। সৌজন্যে বন্দে ভারত। নেতা মন্ত্রীদের গাড়ির মতো ইনি গেলে, বাকিদের যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ! ট্রেনের মধ্যেও একরকম বর্ণ বৈষম্য আছে কি না !

নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনটি ছোট, কিন্তু বেশ ছিমছাম। ভীড় খুব বেশি চোখে পড়লো না। ট্রেন আমাদের বাঁদিকের প্ল্যাটফর্মে নামালো। আমি দুহাতে লাগেজ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে স্টেশনের বাইরে বেরোনোর গেটের দিকে এগোতে লাগলাম। আমার পেছনে আমার পরিবার আমাকে অনুসরণ করতে লাগলো। স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই দেখলাম, রাস্তার দুধারে দুটো সারিতে বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ গাড়িই সাদা রঙের। এতগুলো সাদা গাড়ির মধ্যে, একটিমাত্র কালো স্করপিও দাঁড়িয়ে। বাদল ছেত্রীর থেকে জেনেছিলাম কালো স্করপিও পাঠাবে , তাই বুঝতে পারলাম এটিই আমাদের গাড়ি।  স্করপিওটির দিকে একটু এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, কালো স্করপিও তে হেলান দিয়ে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে আছেন । ভদ্রলোকের চেহারায় চোখ গেলো। লম্বায় ছ ফুটের কাছে , কিন্তু ভীষণ রোগা। পরনে একটা হাফ হাতা পাঞ্জাবি আর ফুল প্যান্ট। দেখে মনে হলো, বয়স আনুমানিক ষাট হবে । কাঁচাপাকা চুল আর দাড়ি। গাল গুলো ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। ভদ্রলোক যেন আমাদেরই খুঁজছিলেন। নির্দ্বিধায় ওই ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে বললাম – স্বপনবাবু ? উনি আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে, সেই বিশেষ বাচনভঙ্গিতে উত্তর দিলেন – হ্যাঁ। ওনার গলার স্বর, শারীরিক অসুস্থতার কারণে খ্যাসখ্যাসে। গাড়ির দিকে হাত দেখিয়ে বললেন – বসুন। আমাদের মালপত্র স্বপনবাবু নিজেই স্করপিওর পেছনের সিটগুলোতে রেখে দিলেন। মাঝে মা, স্ত্রী আর ছেলেকে রেখে আমি স্বপনবাবুর পাশে গিয়ে বসলাম। এরপর চললাম বক্সার উদ্দেশ্যে।

স্বপনবাবুর সাথে আলাপ জমানোর শুরুতেই বললাম আমার বিরক্তির কথা। ট্রেন লেট্ করাতে আমাদের ভ্রমণ সূচি কিভাবে ঘেঁটে গেলো। স্বপনবাবু রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে মৃদু হাসলেন। যেন এরম ব্যাপার প্রায়ই হয়ে থাকে। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে একটা কি যে ব্যাপার ছিল , যে তৎক্ষণাৎ আমার মনে হলো , এই বিশাল দেশের এই বিশাল রেল নেটওয়ার্কে কারো না কারো সাথে এই জিনিস হতেই পারে। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তার জন্যে, এই একরাশ বিরক্তি জমিয়ে রাখা এককথায় অপ্রয়োজনীয়। স্বপনবাবুর দিকে তাকিয়ে, মনের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলাম। মনে হলো, হয়তো প্রকৃতিই আমাকে ধীর স্থির হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

এবার স্বপনবাবু মুখ খুললেন। রাস্তায় যেতে যেতে নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনের ব্যাপারে বলতে লাগলেন। এই স্টেশনটি একটু দূরে। আলিপুরদুয়ার স্টেশন থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার। বললেন, বক্সার সবচাইতে কাছের রেল স্টেশন রাজাভাতখাওয়া । কিন্তু এখানে সব ট্রেন দাঁড়ায় না। তার জন্যে এখানে আসতে গেলে, আলিপুরদুয়ার স্টেশনে নেমে আসা সব থেকে ভালো উপায় । যাওয়ার পথে উনি আলিপুরদুয়ার স্টেশনটিকেও দেখালেন। এটিই এই এলাকার একটা পুরোনো স্টেশন। স্টেশনকে বামদিকে রেখে, ধীরে ধীরে নগর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগলাম, আর বাড়তে লাগলো রাস্তার দুধারে দাঁড়ানো গাছের সারি।

কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম এক সুবিশাল বটগাছ। বটগাছের নীচে কয়েকটা দোকানপাট, সেগুলোকে ঘিরে কিছু মানুষের আনাগোনা দেখতে পেলাম। এই বটগাছ এই গরমেও যে ছায়া প্রদান করছে, তাতে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা আচ্ছাদন রয়েছে , মনে হলো।  এই গাছকে কেউ কাটেনি , এমনকি এর কোনোরকম ডালপালাকে ছাঁটাও হয়নি। অবাধে বেড়ে গিয়েছে। বটগাছের নিচ দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার সময় দেখলাম রাস্তার ডানদিকে আরেকটি রাস্তা চলে গেছে। তখন বুঝলাম, এটি একটি মোড়। গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের জায়গাকে বটতলা বলা হয়। 

সুপ্রাচীন বটগাছ

আরো যত এগোতে লাগলাম, দেখলাম পথের দুধারে গাছের ঘনত্ব বাড়তে লাগলো। বাড়ি ঘর , মানুষজন এর সংখ্যা কমে যেতে লাগলো। বুঝতে পারলাম, এ এক অন্য জগতে প্রবেশ করতে চলেছি। নগরজীবন ও নগরায়নের প্রভাব এই এলাকায় প্রায় নেই বললেই চলে। এই জগতে কোলাহল বলতে শুধুই পাখিদের কলকাকলি। পিচ রাস্তা, ভেজা।  স্বপনবাবু জানালেন গতকাল রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। যতটা এগোতে লাগলাম, তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। খেয়াল করলাম, একটি ট্রেনলাইন সমান্তরাল পথে আমাদের পাশে পাশে এই অরণ্যগামী পথে চলেছে। স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করাতে, উনি বললেন – এটিই সেই রাজাভাতখাওয়ার ট্রেন লাইন। এই পথেই, আলিপুরদুয়ার থেকে মাল জংশন হয়ে ট্রেনগুলি শিলিগুড়ি যাচ্ছে। যদিও আমরা এই পথ দিয়ে আসিনি , তবে ফেরার সময় এই পথ দিয়ে ফিরবো। 

এইভাবে চলতে চলতে অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর দেখতে পেলাম, এক সাইনবোর্ড, যাতে লেখা রয়েছে –  আপনি আমাদের দেশের সবচাইতে সুন্দর বনভূমির মধ্যে প্রবেশ করছেন – সৌজন্যে বক্সা  টাইগার রিজার্ভ । লেখাটার সততা যে কতটা, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সবাই বুঝতে পারলাম। আমার মার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো – আহা। বুঝলাম, প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য, হয়তো আমার মার মনেও প্রভাব বিস্তার করছে। এরপর আমরা আরো নিবিড় বনাঞ্চলে প্রবেশ করলাম। প্রকৃতির এতো কাছে এসে বুঝলাম , আমার মনের সমস্ত বিরক্তি , হতাশা এই সুবিশাল অরণ্যভূমির কাছে তুচ্ছ। শত অত্যাচারের পরেও প্রকৃতি যতটা সহনশীলতা প্রকাশ করে , তার সামান্য কিছুটা আমার মনের গভীরেও প্রবেশ করলো। মনের ভেতরের অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করা দুস্কর হয়ে উঠলো। তাই শুধু অনুভব করতে লাগলাম এই বনাঞ্চলকে। মনের গভীরে এক পরিতৃপ্তির অনুভব হলো। মনে হলো যেন, নিজের শেকড়ের কাছে চলে আসতে পেরেছি। চারপাশে তাকিয়ে বুঝলাম, এখানের  অধিকাংশ গাছই প্রাচীন। নির্বাধায় বেড়ে উঠেছে , উপর থেকে দেখলে মনে হবে , পুরো অঞ্চল জুড়ে কেউ যেন এক সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিও, এই চাদর  ভেদ করে মাটিতে পৌঁছতে পারছে না। কিছু কিছু জায়গায় রবিরশ্মীর লুকোচুরি খেলা চলছে, কিন্তু অধিকাংশ জায়গাই গাছের ছায়ায় ঢাকা। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হতে লাগলো , জীবনের অন্তত কিছুদিন, প্রকৃতির এই সুপ্রাচীন অভিভাবকদের মাঝে কাটাতে পারবো। আমার চোখমুখ দেখে, স্বপনবাবু কিছু হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আমাকে এই জঙ্গলের বিভিন্ন গল্প শোনাতে লাগলেন। আমি ঠিক ততটাই কৌতূহলী হয়ে শুনতে লাগলাম।

বক্সার প্রবেশদ্বারের সাইনবোর্ড

স্বপনবাবুর কথায় – বক্সা, ডুয়ার্স এলাকার এমন একটি জঙ্গল, যা প্রায় সাতশো কুড়ি বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ডুয়ার্সের অন্য কিছু  এলাকার মতো এটি গ্রাসল্যান্ড নয়। এটি ট্রপিক্যাল ফরেস্ট। এখানে নানান রকম পশু পাখির বাস। আমরা যেখানে চলেছি সেটা জয়ন্তী গ্রাম। এই ছোট্ট গ্রামে প্রায় দুহাজার মানুষ বসবাস করেন। বয়সের দিক থেকেও এই জনপদ যথেষ্ট প্রাচীন। জনপদকে একদিকে বেষ্টিত করেছে জয়ন্তী নদী আর অন্যদিকে বক্সা জাতীয় উদ্যানের জয়ন্তী রেঞ্জ। জয়ন্তী রেঞ্জের আরেকদিকে বয়ে চলেছে বালা নদী। এই এলাকায় ব্রিটিশ আমলে, ট্রেন চলাচলও করতো। একটা সময় এখানে ডলোমাইট খনি থাকার কারণে , বেশ রমরমা একটা ব্যাপার ছিল। বসবাস ছিল বহু মানুষের। আজ সেগুলো কিছুই নেই। পুরো এলাকাই নিবিড় অরণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে । স্বপনবাবুর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। অনেকটা ডাটা ট্রান্সফার করার মতো।

পথের ধারের গাছ

কথা বলতে বলতে স্বপনবাবু গাড়ি থামালেন। দেখলাম আমরা বক্সার প্রবেশদ্বারে পৌঁছে গেছি। এই জায়গার নাম রাজাভাতখাওয়া। এইখানেই অনুমতি নিতে হয়, জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করার। এই অনুমতিপত্র একদিন অবধি বৈধ থাকে। রাস্তার ডানদিকে একটি টিনের ছাউনি দেয়া বাড়ি। সেখানেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা টিকিট ঘর। কাউন্টারে কোনও ভীড় নেই। সেখানে ১০৮০ টাকা দিয়ে, চারজনের আর গাড়ির অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হলো। স্বপনবাবু জানালেন, স্থানীয় লোকেদের এই অনুমতিপত্রের দরকার পড়ে না। অনুমতিপত্র নিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। স্বপনবাবু স্টার্ট করলেন। ধীরে ধীরে আমাদের গাড়ি, ফাটক পেরিয়ে প্রবেশ করলো বক্সার অন্দরমহলে। বনানী এখানে, আরো আরো নিবিড় হয়ে এলো। মাঝে মাঝে কিছু গাড়ির দেখা মিললেও , পুরো রাস্তা ছিল খালি । পিচের রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে, আর দুধারে ঘন বনাঞ্চল। আর দেখা যাচ্ছে না, সেই ট্রেনলাইন । পথের দুধারে শুধুই তরুকূলের সমাগম। মাঝে মাঝে কিছু অচেনা পাখির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাকি আর কোনো শব্দই নেই। আমরা এখন সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। এই সুন্দর চারিপাশকে সাক্ষী রেখে , আমাদের গাড়ি পিচরাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে চলেছে।  স্বপনবাবু জানালেন, প্রথম দশ কিলোমিটার আমাদের এই পথে সোজা চলতে হবে। আমরা পিচ রাস্তার দুপাশের এই যে বনাঞ্চল দেখতে পাচ্ছি, সেটা বক্সার রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জের অন্তর্গত। স্বপনবাবুর কথা শুনতে শুনতে, খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেলো, প্রথম দশ কিলোমিটারের দূরত্ব। পৌঁছলাম জয়ন্তী মোড়।

রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ

এখানে গাড়ি দাঁড়ালো। স্বপনবাবু দেখালেন, সোজা রাস্তা চলে গেছে সান্তালবাড়ির দিকে, আর জয়ন্তী জনপদ যেতে গেলে, ডানদিকের বাঁক নিয়ে আরেকটি পিচের রাস্তা ধরতে হবে। আমাদের গাড়ি, ডানদিকে চললো। এইদিকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গেলে তবেই পৌঁছে যাবো জয়ন্তী। এইপথেও উঁচু উঁচু গাছ দিয়ে সাজানো, এই বনাঞ্চলের অনবদ্য শোভা। রাস্তা এখানে খুব ভালো। দশ মিনিট অরণ্যের সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে কেটে গেলো। আমরা পৌঁছে গেলাম এক রিভারব্রীজের কাছে। স্বপনবাবু এখানে গাড়ি দাঁড় করালেন। আমি গাড়ি থেকে না নেমেই দেখতে লাগলাম এই নদীটিকে। অসংখ্য নুড়ি পাথর ভর্তি এই নদীতে। । এটিকে রিভারবেড বলে। গতকালের বৃষ্টির কারণে এখানে একটি শীর্ণকায়, কর্দ্দমাক্ত জলরাশি বয়ে চলেছে। তবে সেই জলরাশির ব্যাপ্তি খুবই সামান্য। পুরো রিভারবেড  জুড়ে বয়ে চলার মতো বৃষ্টিপাত এখনো হয়নি। রিভারবেডের  দুধারে ঘন জঙ্গল। ব্রীজের ওপর থেকে দাঁড়িয়ে আমার বামদিকে আর ডানদিকে দুদিকেই দেখলাম ঘন জঙ্গল। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, ব্রীজের বাঁপাশে কিছুটা দূরে দুটো স্তম্ভ । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, পুরোনো ব্রীজের ভগ্নাংশ। স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি জানালেন – ওটি পুরাতন রেল ব্রীজের স্মৃতি। ওই রেল ব্রীজ আর নেই , রয়ে গিয়েছে শুধু ওই দুটি স্তম্ভ। বহুকাল আগে , গৌতম ঘোষের ” আবার অরণ্যে ”  ছায়াছবিতে ওই ব্রীজের বেশ কিছু অংশ দেখা গিয়েছিলো।

বালা রিভারব্রীজ

ব্রীজে দাঁড়িয়ে উপরদিকে তাকিয়ে দেখলাম , একটা সার্পেন্ট ঈগল পুরো এলাকার ওপর নজর রাখছে। অনেকসময় জঙ্গল থেকে পশু পাখিরা এই রিভারবেডে জল খেতে বা এপাশের জঙ্গল থেকে অপর পারে যাওয়ার জন্যে বেরিয়ে আসে। তখন তাদের দেখা পেলেও, পাওয়া যেতে পারে। স্বপনবাবু জানালেন, এই নদীর নাম বালা। গাড়িতে আবার উঠে বসলাম। মিনিট পাঁচেক গাড়ি চলার পর , আগাম আভাস মিললো যে, সামনে কোনো জনপদ রয়েছে।

জয়ন্তী জনপদের যে মূল বাজার এলাকা, সেই জায়গায় পৌঁছে দেখলাম রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সুবিশাল বটগাছ। সেই গাছকে কেন্দ্র করে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে বেশ কিছু খাবার দোকান। এখানে চা থেকে শুরু করে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং হয়তো অর্ডার দিলে ডিনারও পাওয়া যায়। বটগাছের নিচেই রয়েছে একটি মোড়। সোজা গেলে জয়ন্তী নদীতীরে পৌঁছনো যায়। সরকারি থাকার জায়গা রয়েছে সেখানে। নদীর দিকে মুখ করে তাকালে, বটগাছের বামদিকে রয়েছে একটি সেনাছাউনি। ডানদিকে গেলে দেখা যায় প্রচুর স্থানীয় লোকেদের ঘরবাড়ি । কিছু কিছু  হোমস্টেও রয়েছে । লক্ষ্য করলাম, এখানে সব বাড়িতেই টিনের ছাউনি দেয়া। বাড়িগুলির নির্মাণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঠের প্রয়োগ করা হয়েছে। আমরা বটগাছের গা ঘেঁষে নেমে যাওয়া ডানদিকের রাস্তা দিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম বাদল ছেত্রীর বাড়ি। পর্যটকদের সুবিধার্থে এই বাড়ির এক খুব সুন্দর নাম দেয়া হয়েছে। সেই পোশাকি নাম – ডুয়ার্স প্রকৃতি ।

জয়ন্তীর পথে

গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই এগিয়ে এলেন বাদলবাবু। লম্বা এবং ছিপছিপে চেহারা। গায়ের রং ফর্সা। পরনে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাঢ় সবুজ রঙের জামা এবং একটি কালো প্যান্ট। মাথার চুল সাদাকালো। আজকাল অনেকে এটিকে সল্ট পেপার বলেন। বাদলবাবুর বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে। এগিয়ে এসে বললেন – স্যার আপনাদের লেট্ হয়ে গেছে। সাফারির টাইম হয়ে গেছে। আঙ্গুল দিয়ে ডানদিকের বাড়িটির দোতলাটা দেখিয়ে বললেন – আপনারা মালপত্র রেখে, দশ মিনিটে যা ফ্রেশ হওয়ার হয়ে নিন। আর মনে করে ব্রেকফাস্ট এর অর্ডার দিয়ে দিন। আঙ্গুল দিয়ে নিজের পেছনদিকের একটি ঘর দেখালেন। বুঝলাম ঐটি কিচেন। আমরা সাফারি থেকে ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করবো।

ঘড়িতে দেখলাম, সকাল নটা বেজে গেছে। যে বাড়িটির দোতলায় উঠলাম, সেটি সম্ভবত ডুয়ার্স প্রকৃতি নয়। কারণ বাদলবাবু আমাকে আগেই রুমের ছবি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের দেরি করলে চলবে না।  আমরাও তড়িঘড়ি করে ওই ঘরে ব্যাগপত্র রেখে, মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নিলাম। এরপর দোতলার ঘর থেকে নিচে নেমে যে রান্নাঘর দেখেছিলাম , সেখানে সবার জন্যে লুচি তরকারির অর্ডার দিয়ে দিলাম। সঙ্গে করে কেক, বিস্কুট ট্রেনে ওঠার আগেই নিয়েছিলাম, এবার সেটা হাতের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম । সকলেরই খিদে পেয়েছে, সাফারির সময় কাজে লাগতে পারে। সবাই মিলে বাড়ির বাইরে যখন এলাম , তখন আর স্বপনবাবুকে দেখতে পেলাম না। উনি বাড়ি চলে গেছেন। তাড়াহুড়োর মাথায় ওনাকে বিদায় জানাতে পারলাম না । গল্প করতে করতে বলেছিলেন, ওনার বাড়ি এখানেই। ভাবলাম, উনি যখন এখানেই থাকেন, তখন এই দুদিনে নিশ্চই দেখা হয়ে যাবে। তাছাড়া আমাদের তো স্টেশনে ড্রপও লাগবে, তখন না হয় বাদলবাবুকে বলে স্বপনবাবুর গাড়িটি ভাড়া করবো। এইসব ভাবছি , সেইসময় বাদলবাবু  এসে বললেন – স্যার গাড়ি রেডি।

পরের পর্ব পড়ুন

বিষ্ণুপুর এর মন্দিরগুলি

টেরাকোটা – এটি একটি ল্যাটিন শব্দ। টেরা মানে মাটি আর কোটা মানে ড্ৰাই কোটিং। টেরাকোটাকে একসঙ্গে বলা হয় বেক্ড ক্লে ওয়ার্ক বা পোড়ামাটির  ফলক। এই নদীমাতৃক বাংলায় আমরা কোনোদিনই মাটির অভাব বোধ করিনি। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে , আমাদের পুরোনো মন্দিরগুলোতে এই পোড়ামাটির অসাধারণ সব কাজ রয়েছে। বাংলার টেরাকোটার এক অন্যতম পীঠস্থান বিষ্ণুপুর। এখানে টেরাকোটা শুধু মন্দিরেই সীমাবদ্ধ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আর উপহার সামগ্রীর মধ্যেও টেরাকোটার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। আরো গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, টেরাকোটা বিষ্ণুপুরের এক জনপ্রিয় শিল্প। ইতিহাস সেখানে এই শিল্পকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে, তাইতো প্রচুর মানুষের জীবন জড়িয়ে পড়েছে এই টেরাকোটার সাথে। শতাব্দীপ্রাচীন এই ইতিহাস আর শিল্পকে সাথে নিয়ে আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বিষ্ণুপুর।

এই বিষ্ণুপুরের গল্প শুরু হয় খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষ থেকে। সেই সময় আদিমল্ল রঘুনাথের হাত ধরে মল্লরাজ শুরু হয়। আদিমল্ল এর রাজধানী ছিল প্রদ্যুম্নপুর যা অধুনা জয়পুরের নিকটে অবস্থিত। বিষ্ণুপুরে অনেক পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। তবে বিষ্ণুপুরের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় প্রবল পরাক্রমী মল্লরাজা বীরহান্বিরের আমলে। যুদ্ধ ছেড়ে যখন তিনি শ্রীনিবাস আচার্য্যর কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন তখন থেকে সারা মল্লরাজত্ব জুড়ে তৈরি হয় বিষ্ণুর মন্দির, রাসমঞ্চ ইত্যাদি। সেই থেকেই এই জায়গার নামকরণ হয় বিষ্ণুপুর।

বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি বৈচিত্র্যময়। এই মন্দিরগুলির স্থাপত্যে অনেকরকম পাথরের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিছুক্ষেত্রে ঝামা বা মাকড়া পাথর এবং কিছু ক্ষেত্রে ল্যাটেরাইট পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। মন্দিরগুলির গঠনশৈলীতেও বৈচিত্র রয়েছে। অনেক একরত্ন মন্দিরের মাঝেও জোড় বাংলা শৈলীর মন্দির দেখা যায়। কোথাও পঞ্চরত্ন গঠনশৈলীও দেখা যায় ।

মুগ্ধ করার মতো টেরাকোটার অলংকরণ দেখা যায় মূলত তিনটি মন্দিরে। শ্যাম রাই মন্দির , মদনমোহন মন্দির এবং জোড় বাংলা মন্দির। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী , রামায়ণ এবং মহাভারতের ঘটনা বিশেষ , বিষ্ণুর দশাবতার , যুদ্ধ ইত্যাদির চিত্রায়ন দেখা যায় এই টেরাকোটার অলংকরণে। আবার কিছু মন্দিরের অলংকরণে পঙ্খ এবং পাথরের কাজ দেখা যায়।

বিষ্ণুপুরের বড়ো মন্দিরগুলিকে ঘিরে ভোগকক্ষ , তুলসীমঞ্চ ও নাটমন্দির নির্মাণ এর রীতি রয়েছে । এটি সবথেকে ভালো বোঝা যায় রাধামাধব এবং কালাচাঁদ মন্দির চত্বরে। পরিষ্কার এই মন্দির চত্বর, ভারতীয় প্রত্নতত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত। মদনমোহন মন্দির প্রাঙ্গণেও চারচালা ভোগকক্ষ দেখা যায়।  

বিষ্ণুপুরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হলো রাসমঞ্চ। এই স্থাপত্যটির নির্মাণশৈলীতে মিশ্র সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে। সৌধটির উপরের দিকটি পিরামিডাকৃতি , মাঝের দিকটি বাংলা চালার ন্যায় আবার নিচের খিলানগুলি ইসলামিক স্থাপত্যের মতো। আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে এই মঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেন মল্লরাজ বীরহাম্বির। এর নীচের বেদী মাকড়া পাথরের তৈরী আর উপরের স্থাপত্য ইঁটের।

মল্লরাজত্বের রাজধানী থাকার কারণে বিষ্ণুপুরের আশেপাশে মোট সাতটি বাঁধ রয়েছে। শহরে জল সরবরাহের জন্য নির্মিত এই বাঁধগুলির মধ্যে অন্যতম হলো লালবাঁধ। কথিত আছে লালবাইয়ের সাথে প্রেম চলাকালীন রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ , প্রেমিকার সাথে এই দীঘিতে নৌকাবিহার করতেন।

লালবাঁধ

স্থাপত্য ছাড়াও মল্লরাজদের প্রবল পরাক্রমের একটি প্রতীক দলমাদল কামান। প্রায় ৬৩টি লোহার আংটা পেটাই করে তৈরী করা হয় এই কামান। বর্গী আক্রমণ থেকে বাঁচতে এই কামান গর্জে ওঠে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে। দলমর্দ্দন  থেকে কামানের নামকরণ হয় দলমাদল। কামানের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে বারো ফুট।  

দলমাদল কামান

মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরী বিষ্ণুপুরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হলো একটি তোরণদ্বার। এটি বড় পাথর দরজা নামে পরিচিত। এটিই বিষ্ণুপুরের প্রাচীন দুর্গের উত্তরদিকের প্রবেশপথ। সপ্তদশ শতকে এটি নির্মাণ করেছিলেন মল্লরাজ বীরসিংহ। এখানে তীরন্দাজ এবং বন্দুকধারী সৈন্যদের অস্ত্র চালাবার জন্যে ক্ষুদ্র গর্ত ছিল। এই দ্বিতল দালান থেকেই রক্ষা করা হতো বিষ্ণুপুরের মল্লসাম্রাজ্যকে। এর অদূরেই একটি ছোট পাথর দরজাও দেখা যায়।

দেবতা আরাধনা ছাড়াও এই বিষ্ণুপুর জুড়ে রয়েছে কিছু দেবীমন্দির। এরমধ্যে সবথেকে প্রাচীন মন্দিরটি হলো মা মৃন্ময়ী মন্দির। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মল্লরাজ জগৎমল্ল এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন আনুমানিক ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে। গঙ্গামাটির তৈরী মা মৃন্ময়ীর অপরূপ মূর্তি, মুগ্ধ করে।

দলমাদল কামানের পাশের রাস্তায় রয়েছে মা ছিন্নমস্তা মন্দির। বাংলা ১৩৮০ সালে মেদিনীপুর নিবাসী স্বর্গীয় কৃষ্ণচন্দ্র গুঁই এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। অপূর্ব এই মায়ের মূর্তিটি একটি গোটা শ্বেত পাথর কেটে তৈরী করা।

মন্দির ছাড়াও বিষ্ণুপুর, বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থান ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেরাকোটা শিল্প। যার কিছু ঝলক পাওয়া যায় মন্দির সংলগ্ন দোকানগুলিতে এবং বিশেষ করে পোড়ামাটির হাটে। প্রতি সপ্তাহান্তে এই হাটে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী নৃত্য।

কিভাবে ঘুরবেন – গাড়ি নিয়ে আমাদের বিষ্ণুপুর পৌঁছতে বেলা হয়ে গেছিলো। দুপুরে লাঞ্চের পর আমরা টোটো রিজার্ভ করে আগে গিয়েছিলাম রাসমঞ্চ। গাইড ভাড়া নিয়ে রাসমঞ্চ ঘুরে দেখেছিলাম। সেখান থেকে শ্যামরাই মন্দির। তারপর গিয়েছিলাম জোড় বাংলা, রাধাশ্যাম এবং লালজি মন্দির দেখতে। ওই চত্বরের পাশেই দুটি তোরণদ্বার অবস্থিত, সেগুলো দেখে গিয়েছিলাম মা মৃন্ময়ী মন্দির দেখতে। সেখানেই সন্ধে হয়ে যায়। বিষ্ণুপুর মিউজিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, বিষ্ণুপুর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। সেখানে ফটোগ্রাফি নিষেধ। মিউজিয়াম ঘুরে শেষে পৌঁছেছিলাম পোড়ামাটির হাটে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে প্রায় সন্ধে সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছিলো। পরদিন সকালে আটটার সময় বেরিয়ে পড়েছিলাম বাকি জায়গাগুলো দেখতে। দলমাদল কামান আর তার পাশেই অবস্থিত ছিন্নমস্তা মন্দির দেখে শুরু করেছিলাম। সেখান থেকে একে একে রাধাগোবিন্দ মন্দির , জোড় শ্রেণীর মন্দিররাজি , রাধামাধব মন্দির , কালাচাঁদ মন্দির ঘুরে নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিলাম লালবাঁধ দেখতে। লালবাঁধ দেখে গিয়েছিলাম মদনমোহন মন্দির দেখতে। তারপর বেলা দশটায় হোটেলে পৌঁছে ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে চেকআউট করেছিলাম।

খরচা – দুদিন মিলিয়ে টোটো প্রায় ৭৫০/- টাকা নিয়েছিল। গাইড চার্জ ৩৫০/- টাকা। এছাড়া মাত্র ২৫/- টাকা জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য দিয়ে আপনি রাসমঞ্চ, শ্যামরাই এবং জোড়বাংলা মন্দির ঘুরে নিতে পারেন। মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য ১০/- টাকা।

কোথায় থাকবেন – পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা বিষ্ণুপুরে অনেক রয়েছে। তবে আমার ঠিকানা ছিল নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত কাঠুরিয়া গ্রিন নেস্ট। আন্তরিকতায় ভরা ওনাদের আতিথেয়তা মন কেড়ে নেয়। মনে হয় বারবার আসি। সৌজন্যে শ্রী সজল এবং সৌমাল্য কাইটি। থাকার জন্যে রয়েছে দুটি ঘর যেখানে ২ জনের জন্য থাকার ব্যবস্থা। ২২০০/- টাকা থাকার খরচ। পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন এই ঘরে বসার চেয়ার, লেখার বা পড়ার টেবিলও রয়েছে। থাকা এবং খাওয়া বাবদ আমাদের মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০০০/- টাকার মতো। আমরা খেয়েওছিলাম অনেক কিছু, তার মধ্যে বাঁকুড়ার বিখ্যাত মেচা সন্দেশও ছিল। বিদায় নেবার সময় সজলবাবুরা উপহার স্বরূপ একটি গাছের চারা দিয়েছিলেন। এই ছোট্ট আন্তরিকতা খুব ভালো লেগেছিলো। কাঠুরিয়াতে থেকে শুধুমাত্র বিষ্ণুপুরের মন্দির ছাড়াও প্রকৃতিকেও উপভোগ করতে পারেন। পাখি দেখার শখ থাকলে, অনেক পাখিও দেখতে পাবেন। তবে সঠিক সময়ে যেতে হবে। বুকিং এর জন্যে ওনাদের কল করতে পারেন এই নাম্বারে ৯৪৩৩১-৩৮৩৫২।

কখন যাবেন – গ্রীষ্ম ও বর্ষা বাদ দিয়ে বিষ্ণুপুর এসে ঘুরে নেয়া যায়। দেড়দিনেই ঘুরে ফেলা যায় দর্শনীয় স্থান গুলি। এছাড়াও রাস উৎসবের (নভেম্বরে ) সময় এবং বিষ্ণুপুর মেলার (ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে) সময়ও বিষ্ণুপুর ঘুরে আসতে পারেন।

কিভাবে যাবেন – বিষ্ণুপুরে অনেকভাবে পৌঁছনো যায়। সাঁতরাগাছি স্টেশন থেকে সকাল সাড়ে ছোট নাগাদ ছাড়ে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস। সকাল সাড়ে নয়টায় বিষ্ণুপুর পৌঁছয়। এছাড়া হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে আসতে পারেন আরামবাগ। সেখান থেকে বাসে বিষ্ণুপুর পৌঁছতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। নিজের গাড়ি থাকলে লং ড্রাইভে জয়পুর ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে পৌঁছতে পারেন বিষ্ণুপুর। ভালো লাগবে।

অনন্তগিরি হিলসে রোমাঞ্চকর ট্রেকিং

“অনন্তগিরি” এই নাম শুনলেই মাথায় আসে আরাকু ভ্যালি বেড়াতে গিয়ে সেই কফি প্ল্যান্টেশন দেখার কথা। আমার মতো আপনারা যারা ঘুরতে ভালোবাসেন তাদের কাছে এই নাম আরাকু ভ্রমণের সাথেই জড়িত। প্রথমবার যখন শুনলাম হায়দরাবাদের কাছে অনন্তগিরি হিলস, অবাক হলাম, ভূগোলের জ্ঞানে ভাটা পড়লো। ইন্টারনেটের দৌলতে জানতে পারলাম অনন্তগিরি হিলসের ব্যাপারে।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনন্তগিরি হিলস এ জঙ্গল ভিউ

হায়দরাবাদ শহর থেকে প্রায় ৮০ কিমি দূরে অবস্থিত এই অনন্তগিরি হিলস। অনন্তগিরি হিলসের নিকটবর্তী টাউন ভিকরাবাদ। হায়দরাবাদ শহরে জলের সমস্যা আছে সেটা অনেকেরই জানা। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি যে হায়দরাবাদ শহরের জলের দুটি প্রধান রিসার্ভার ওসমান সাগর এবং হিমায়েত সাগর। এই দুটি লেকের এর জলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্স এই অনন্তগিরি হিলস। অনন্তগিরি হিলস থেকেই উৎপত্তি হয়েছে হায়দরাবাদ শহরের বিখ্যাত নদী মুসি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনন্তগিরি হিলসের উচ্চতা আনুমানিক ৫১০ মিটারের মতো।

শ্বশুরবাড়ি থাকার সুবাদে হায়দরাবাদ শহরে আমার যাতায়াত রয়েছে। থাকার বা খাবার জায়গা নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই। গত বছরে যখন গিয়েছিলাম, তখন পরিবারের সবাই মিলে অনন্তগিরি যাওয়ার প্ল্যান হলো। তখনই অনন্তগিরির ব্যাপারে আরেকটা জিনিস জানতে পারলাম। এই হিলটির প্রায় সিংহভাগ এলাকায় রয়েছে বনাঞ্চল। 

অনন্তগিরি জঙ্গলের মধ্যে

জঙ্গল শুনেই এডভেঞ্চার করার ইচ্ছে জাগলো। সেইমতো একদিন সক্কাল সক্কাল সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম অনন্তগিরি।  পথে ব্রেকফাস্ট করতে দাঁড়িয়েছিলাম। দক্ষিণ ভারতের সেই বরা, সাম্ভার আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট করে পৌঁছতে আমাদের প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছিল। হিল এলাকায় প্রবেশ করার সময় সাইনবোর্ড ফলো করে জানতে পারলাম এই জঙ্গলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, হরিণ, শেয়াল এইগুলি দেখতে পাওয়া যায়। 

দেবাদিদেব মহাদেব

গাড়ির পার্কিং এরিয়া হিলস থেকে একটু দূরে। তবে গাড়ি থেকে নামতেই অবস্থা খারাপ হওয়ার জোগাড়। ডিসেম্বর মাসেও কাঠফাটা গরম। অগত্যা টুপি পড়তে হলো। জ্যাকেট ও খুলে গাড়িতে রেখে এগোতে লাগলাম। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে হেঁটে চলে একটু কঠিন। একটু এগোতে দেখতে পেলাম হিলের ওপরে একটা ওয়াচ টাওয়ার। লক্ষ্যস্থির করা গেলো। কিন্তু যাওয়ার রাস্তা পাহাড়ে ওঠার মতো আঁকা বাঁকা, চড়াই উতরাই। দেখতে পেলাম অনেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের গ্রুপ, কিছু পরিবারও ওই রাস্তায় ট্রেক করে চলেছে টাওয়ার এর দিকে। সাহস পেয়ে আমিও এগিয়ে চললাম। আমার এই ট্রেকিং এর সাথী হিসেবে পেলাম ছোট্ট তিতলিকে। তিতলি আমার স্ত্রীর ভাইঝি।

প্রথমে চড়াই রাস্তায় হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে হাঁপাতে লাগলাম। পাহাড়ের চড়াই আরো বাড়তে লাগলো। জঙ্গল আরো ঘন হতে লাগলো। তার ওপর আমার সাথে তিতলি। এইসব ক্ষেত্রে অন্যের দায়িত্ব নেয়াও একটু ঝুঁকিপূর্ণ। হয়তো টাওয়ারে ওঠার আগেই থেমে যেতে হতে পারে। কিন্তু তা হলো না। এগিয়ে যেতে যেতে পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারের সামনে। মন জয় করলো তিতলির এডভেঞ্চার করার ইচ্ছে এবং সর্বোপরি তাতে টিকে থাকা। পুরো ট্রেকিং এর সেই অভিজ্ঞতা নিচের ভিডিও লিংকে উপভোগ করতে পারবেন।

ওয়াচ টাওয়ারে উঠতে প্রবেশ মূল্য দিতে হয় ১০ টাকা। সেইমতো টিকিট নিয়ে উঠলাম টাওয়ারে।এরই মাঝে তিতলির অভিভাবকরা আমায় ফোন করে ফেলেছেন। কোথায় কি করছে সমস্ত তাদের জানিয়েছি। সব কিছুর পরে টাওয়ারের টপ ফ্লোরে উঠলাম। নীল আকাশের নীচে অনন্তগিরির পাহাড়ের ভিউ অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। পুরো জঙ্গল এলাকার ভিউ দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। এতটা সবুজ তো দৈনন্দিন জীবনে দেখতে পাওয়া মুশকিল। টাওয়ারে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে, অনেক ছবি তুলে নীচে নেমে এলাম।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনন্তগিরি হিল ভিউ

পাহাড়ের চড়াই রাস্তায় ওঠা যতটা সোজা, ওই রাস্তায় নেমে আসা ততটাই কঠিন। পা হড়কে গেলেই দুর্ঘটনা। তার ওপর রয়েছে বাঁদরের উৎপাত। ক্যামেরা নিয়ে থাকলে একটু ভয় তো লাগবেই। সবকিছু পেরিয়ে সাবধানে তিতলিকে নিয়ে নীচে নেমে এলাম। গাড়ি পার্কিং এলাকার পাশে একটা শিবমন্দির রয়েছে। মন্দিরের পাশে রয়েছে একটা প্রকান্ড নন্দী মূর্তি। কিছু ছবি তুললাম, আর কিছু স্থানীয় ছেলের অনুরোধে তাদের ছবি তুলেও দিলাম। গোটা ট্রেকিং রুটে দেখা মিললো পেট সাদা ফিঙে, বনমুরগি আর অরেঞ্জ বা রেড ব্রেস্টেড ফ্লাই ক্যাচারের। ইচ্ছে ছিল ইন্ডিয়ান রোলার দেখার। ইন্ডিয়ান রোলার তেলেঙ্গানার স্টেট বার্ড। কিন্তু দেখা পেলাম না। এরপর রওনা হলাম অনন্তগিরির আরেক আকর্ষণ পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের দিকে।

নন্দী মূর্তি

অনন্তগিরি হিলসের এক প্রাচীন মন্দির পদ্মনাভ স্বামী মন্দির। জনমত অনুযায়ী এই মন্দির দ্বাপর যুগে নির্মাণ করেছিলেন ঋষি মার্কন্ড। মন্দিরের গঠনশৈলী চিরাচরিত দাক্ষিণাত্য রীতি মেনে তৈরী।

পদ্মনাভ স্বামী মন্দির

যখন মন্দিরে পৌছেছিলাম তখন প্রায় একটা বাজে। ভয় ছিল বন্ধ না হয়ে যায়। ভাগ্য ভালো ছিলো বলে ভগবানের দর্শন পেয়ে গেলাম। এক স্থানীয় লোকের কাছে শুনলাম মন্দিরের পেছনে যে জঙ্গল এলাকা রয়েছে, সেইখানে প্রচুর পাখির দেখা মেলে। কিন্তু সেই এলাকায় ফেন্সিং পেরিয়ে যেতে হবে এবং প্রচুর গরম ছিল বলে আর গেলাম না। এসব ক্ষেত্রে সকাল সকাল এলে ভালো হয়। বাচ্চারা সঙ্গে ছিল বলে লাঞ্চ করার তোড়জোড় শুরু করতে হলো। সেইমতো পৌঁছলাম হরিথা রিসোর্টে। সেইখানের রেস্তোরাঁয় লাঞ্চের অর্ডার দেয়া হলো। অনেক সকালে উঠতে হয়েছিল বলে সবাই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই লাঞ্চ সেরে ফিরে চললাম।

কিভাবে যাবেন: হাওড়া স্টেশন থেকে ফলকনামা এক্সপ্রেস যাচ্ছে সেকেন্দ্রাবাদ। সকাল সাড়ে আটটায় ছেড়ে পৌঁছচ্ছে পরদিন সকাল সাড়ে দশটায়। হায়দরাবাদ থেকে গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন অনন্তগিরি। আমরা ইনোভা বুক করে গিয়েছিলাম, খরচ হয়েছিল ৬৫০০ টাকা।

হরিথা রিসোর্টের রেস্তোরাঁ

কোথায় থাকবেন: হায়দরাবাদ ভ্রমণে এলে থাকার জায়গার অভাব হবে না। গোআইবিবো থেকে পেয়ে যেতে পারেন প্রচুর হোটেলের সন্ধান। তবে সবথেকে ভালো তেলেঙ্গানা সরকারের হরিথা হোটেল। প্রতিটি জায়গাতেই হরিথা হোটেল রয়েছে। টাকা এবং ফেসিলিটিস এর দিক থেকে এটি ভালো অপশন। নীচের লিংক থেকে বুকিং করতে পারেন।

https://tourism.telangana.gov.in/hotels/AnathagiriHillsResort

অনন্তগিরি তে থাকতে হলে হরিথা রিসোর্ট বুক করতে পারেন।

https://tourism.telangana.gov.in/hotels/ThePlazaHotel

আদিসপ্তগ্রামের ইতিকথা

আদিসপ্তগ্রাম নামের মধ্যেই আদি রয়েছে। এই আদি শব্দ ব্যবহার করা হয় কোনো প্রাচীন কিছুকে বোঝাতে। বুঝতেই পারছেন এই আদিসপ্তগ্রাম নামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের পুরোনো ইতিহাস।

বহুকাল আগে এটি সপ্তগ্রাম নামে পরিচিত ছিল। সপ্তগ্রাম কথার অর্থ সাতটি গ্রাম। সপ্তগ্রাম জায়গাটি যে সাতটি গ্রাম নিয়ে তৈরী সেগুলি হলো বাঁশবেড়িয়া , বাসুদেবপুর , কৃষ্ণপুর , নিত্যনন্দপুর , শিবপুর , বলদঘাটি ও সাম্বচোরা। সপ্তগ্রামের উল্লেখ বা ইতিহাস বাংলার সেই পাল ও সেনযুগের সময়কার। সরস্বতী নদীতীরের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল সপ্তগ্রাম। বাংলায় বখতিয়ার খিলজি আসার পর থেকে সপ্তগ্রামের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। পরের দিকে সপ্তগ্রাম ও ব্যান্ডেলে পর্তুগিজএর আগমন ঘটে , সরস্বতী নদীও শুকিয়ে যেতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সপ্তগ্রাম নিজের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে থাকে। পরবর্তীকালে চুঁচুড়া , চন্দননগর ও কলকাতার উত্থান শুরু হয়। শোনা যায় ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে ইবন বতুতাও একবার সপ্তগ্রামে এসেছিলেন।

সরস্বতী নদী

ভাবছেন এতো ইতিহাসের কথা আমি কেন বলছি , কারণ এর সাথেই জড়িত আছে সপ্তগ্রামের বেশ কিছু গন্তব্য। কয়েকমাস আগেই যেই জায়গাগুলি আমি ঘুরে এসেছি। পুরাকালের সপ্তগ্রাম আজ আদিসপ্তগ্রাম নামেই বেশি পরিচিত। আদিসপ্তগ্রাম স্টেশনে আপনারা বর্ধমান লোকালে আসতে পারেন অথবা ব্যান্ডেল স্টেশনে নেমেও অটো করে আসতে পারেন। দূরত্ব আনুমানিক ৪ কিমি। আমি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এখানে পৌঁছেছিলাম।

উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরবাড়ি – আদিসপ্তগ্রাম স্টেশনের কাছেই অবস্থিত এই উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরবাড়ি। এই বাড়িতে বাস করতেন উদ্ধারণ দত্ত , যিনি মনেপ্রাণে বৈষ্ণব ছিলেন। তার এই বাড়িতে একবার পদধূলি দ্যান শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু। শোনা যায় উদ্ধারণ দত্ত পূর্বজন্মে শ্রীকৃষ্ণের বাল্যসখা সুবাহু ছিলেন। নিতাই প্রভুর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন উদ্ধারণ দত্ত। অপূর্ব সুন্দর মন্দির ও ঠাকুরবাড়ি দেখতে পাবেন কখনো এখানে এলে। মন্দিরের কিছু কাজ চলছিল বলে যখন গিয়েছিলাম তখন মূল গর্ভগৃহ বন্ধ ছিল। এই গর্ভগৃহ ত্রিখিলান বিশিষ্ট , সামনেটায় একটি নাটমন্দির রয়েছে। নিতাই প্রভুর স্মৃতি বিজড়িত একটি মাধবীলতা গাছ মন্দির প্রাঙ্গনে দেখা যায়।

উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরবাড়ি
ঠাকুরবাড়ি প্রাঙ্গনের মাধবীলতা গাছ
উদ্ধারণ দত্তর স্মৃতিতে

সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ – ষোড়শ শতাব্দীতে যখন সপ্তগ্রামের স্বর্ণযুগ , তখন সৈয়দ জামালুদ্দিন এই প্রাচীন মসজিদটির স্থাপনা করেন আনুমানিক ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে। মসজিদের দেয়ালে কিছু টেরাকোটার কাজ দেখার মতো। পিছনদিকে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী। এই চত্বরেই সমাধিস্থ সৈয়দ জামালুদ্দিন ও তার পরিবার।

মসজিদের ভেতরে
মসজিদের দেয়ালে
জামালুদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সমাধি

সুয়াখাল পর্যটন কেন্দ্র – যদিও এটির সাথে সপ্তগ্রামের ইতিহাসের কোনো যোগ নেই তবুও সচেতনতার খাতিরে এটির ব্যাপারে লিখছি। বছর দশেক আগে সুয়াখালে বিভিন্ন উপায়ে তৈরী বিদ্যুৎশক্তির প্রদর্শনী হতো। যেমন তাপবিদ্যুৎ , সৌরবিদ্যুৎ , জলবিদ্যুৎ। আমি সেই সূত্রেই কৌতহলবশতঃ প্রবেশ করি। এখানে লোকেদের সাথে কথা বলে জানতে পারি , আজ আর কিছুই নেই , প্রদর্শনী বহু বছর থেকে বন্ধ। যন্ত্র সব বিকল হয়ে পরে রয়েছে। সরকারের অবহেলায় সুয়াখাল আজ শুধুমাত্র ডিজে পিকনিক আর ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীদের সময় কাটানোর জায়গা। একটি জিনিস ভালো লাগলো তা হলো গলা ভেজানো গ্যালো ঠান্ডা জলের জলাধার থেকে।

সুয়াখাল পার্ক

দেবানন্দপুর – এই জায়গার সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের জন্মস্থান ও আদিবাড়ি। এই বাড়িটিতেও রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে অনেক আগাছার জন্ম হয়েছে। অদূরে শরৎ স্মৃতি পাঠাগার রয়েছে , সেখানে লেখকের স্মৃতি বিজড়িত একটি সংগ্রহশালা রয়েছে। পাঠাগারের কাছের স্কুলের মাঠে দেখতে পেলাম প্রায় ১৭০ বছরের পুরোনো টেরাকোটা মন্দির। একটি মন্দিরে শিবমূর্তি চোখে পড়লো , অন্যটি বন্ধ ছিল।

শরৎচন্দ্রের মূর্তি , তাঁর পৈতৃক বাড়ির সামনে
পুরোনো আটচালা শিবমন্দির
১৭০ বছরের পুরোনো মন্দির

কৃষ্ণপুর – আদিসপ্তগ্রামে মৎসমেলার আয়োজন করা হয় প্রতিবছর মাঘ মাসের ১ তারিখে। সেই জায়গাটি হলো এই কৃষ্ণপুর। এখানে একটি ছোট্ট গল্প বলি। আপনারা অনেকেই হয়তো পানিহাটির দণ্ডমহোৎসবের কথা শুনে থাকবেন , যাকে দই চিড়ে উৎসবও বলা হয়। বহুকাল আগে শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু এক ভক্তকে দণ্ড দিয়েছিলেন সংসার ত্যাগ করে আসার জন্যে। বাকি ভক্তদের দই চিড়ে খাওয়ানো ছিল সেই দণ্ড। যে ভক্তকে তিনি দণ্ড দ্যান তিনি শ্রী রঘুনাথ দাস গোস্বামী। তাঁর বাড়ি এই কৃষ্ণপুর। অনেকদিন পুরীতে কাটানোর পর , তিনি মকর সংক্রান্তিতে বাড়ি ফেরেন। তখন একদল বৈষ্ণব তাঁর ভক্তির পরীক্ষা স্বরূপ তার কাছে ইলিশ মাছ ও আমের টক খাবার আবদার করেন। রঘুনাথ গোস্বামী শীতকালে কোথায় পাবেন এসব , বিচলিত হয়ে তিনি মনে মনে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করেন। পরে তার বাড়ির পুকুরে জোড়া ইলিশ ও বাগানে আম পাওয়া যায়। বৈষ্ণবরা বিস্মিত হয়ে যান। সেই থেকে রঘুনাথ গোস্বামীর বাড়ির সামনেই এই মৎসমেলার আয়োজন করা হয়। মেলার নাম উত্তরায়ণ মেলা। অনেক বৈষ্ণব মানুষ এই দিনে মৎস সহকারে অন্ন গ্রহণ করেন। গোস্বামী বাড়ির ঠাকুর দর্শন করে ফিরে এলাম।

গোস্বামী বাড়ি
সেই উত্তরায়ণ মেলা
গোস্বামী বাড়ির ঠাকুর

ভ্রমণ ভিডিওটি নিচের লিংকে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন।

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবেই , এই আশা রাখবেন। এরপর যখন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করবেন , অবশ্যই এক সপ্তাহান্তের বিকেলে ঘুরে নিতে পারেন আদিসপ্তগ্রাম। দেবানন্দপুরের কাছেই লাহিড়ী বাবার আশ্রম ও গায়েত্রী আশ্রমেও ঘুরে আসবেন , ভালো লাগবে।

দেবীদের স্থান সিঙ্গুর

আজ আপনাদের বলবো সিঙ্গুরের কথা। রাজনৈতিক কারণে জনপ্রিয় হলেও সিঙ্গুরের একটি প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছোট করে সে ইতিহাস জেনে রাখা ভালো। খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে কলিঙ্গের রাজকুমারীর পুত্র সিংহবাহু, যিনি এই নাম একটি সিংহকে হত্যা করে অর্জন করেছিলেন, তিনি সরস্বতী নদীর তীরে নিজের রাজধানী তৈরী করেন যার নাম দেন সিংহপুর

সিঙ্গুরের ভ্রমণ ভিডিও

সিংহবাহুর পুত্র বিজয় সিংহ নিজের মন্দ কাজের জন্য রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। সাতশো অনুচর নিয়ে তিনি পাড়ি দেন এক দ্বীপে, সে দ্বীপ জয় করে নিজের রাজ্য সেখানেই স্থাপন করেন ও রাজ্যের নাম দেন সিংহল। যা এখন শ্রীলংকা নাম পরিচিত। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ বিভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিক সিংহপুরকে ভারতের নানা জায়গায় চিহ্নিত করেন। কেউ সিংহপুরকে অন্ধ্রপ্রদেশে চিহ্নিত করেন তো কেউ রাজস্থানে। কিন্তু ইতিহাসবিদ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে সিংহপুর হলো বর্তমানের সিঙ্গুর।

সিঙ্গুর

সিঙ্গুর স্টেশন থেকে রেলগেট ক্রস করে পৌঁছে গেলাম সিঙ্গুর বাজার। সেখান থেকে টোটো করে প্রথমে এলাম ডাকাত কালী মন্দির। অনেক আগে এই এলাকা ডাকাতির জন্যে প্রসিদ্ধ ছিল। কথিত আছে একবার মা সারদা অসুস্থ রামকৃষ্ণদেব কে দেখতে কামারপুকুর থেকে দক্ষিনেশ্বর যাচ্ছিলেন। এই এলাকাতেই তার পথ আটকায় একদল ডাকাত। পরে তার মুখে মা কালির অবয়ব দেখতে পাওয়ায়, ডাকাতরা তাঁকে সেই রাত্রে এখানে আশ্রয় দ্যায় এবং খেতে দ্যায় চাল ও কড়াইভাজা। সেই থেকে ডাকাতরাই এখানে কালীপুজোর সূচনা করে, পরে এখানে মন্দির নির্মিত হয়।

ডাকাত কালী মন্দির

আজও মা কালীকে ভোগ স্বরূপ চাল ও কড়াইভাজা দেয়ার প্রথা প্রচলিত। মা কালী এখানে নিত্যপূজিত, আর আপনি চাইলে দিনের যে কোনো সময় এখানে এসে মা কালির দর্শনলাভ করতে পারেন। আমরা এখানে দুপুরবেলায় পৌঁছেছিলাম। কালীমন্দিরের সামনেই একটি নাটমন্দির আছে। প্রতিবছর কালীপুজোর সময় এখানে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। ত্রিখিলান প্রবেশদ্বারের এই মন্দিরের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষন করা হয়। শ্রাবন মাসে জলযাত্রীরা তারকেশ্বর যাবার পথে এই মন্দিরে মা কালির দর্শনের জন্য ভীড় জমান।

Map Location: https://goo.gl/maps/kBTsMyLWEXhGgCZ88

ডাকাত কালী প্রতিমা

রাস্তার পাশেই একটি আটচালা শিবমন্দির আছে, তা দেখে একটু এগিয়ে পৌঁছলাম বৈদ্যবাটী তারকেশ্বর রোডে। এই রোড ধরে পুরুষোত্তমপুরের দিকে কিছুটা হাঁটলেই রাস্তার বামদিকে আছে বন বিশালাক্ষি মন্দির। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই মন্দিরে একটি প্রতিষ্ঠা ফলক রয়েছে, যদিও ঠিকঠাক পড়তে পারিনি তবুও এই মন্দির থেকে ১১৩৫ বঙ্গাব্দের মধ্যে স্থাপিত। মন্দিরের টেরাকোটার কাজ কিছুটা নষ্ট হয়ে গেলেও, যা আছে তার গুরুত্ব অপরিসীম।

বন বিশালাক্ষী মন্দির
মন্দিরের টেরাকোটার কাজ

এই মন্দিরে কয়েকটি পাথরকে পূজা করা হয়, কোনো মূর্তি নেই। মন্দিরে দুবার পুজো হয় একটি সকালে, আরেকবার মন্দির বিকেল ৫ টার পর খোলে। বন্ধ মন্দিরের দরজায় দুটো ছোট জানালা করা রয়েছে, তা দিয়েই দর্শন করা যায়। কথা বলেছিলাম কয়েকজন স্থানীয়দের সঙ্গে, তারা জানালেন এই মন্দির অনেকবার সংস্কারের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু যেই উদ্যোগ নিয়েছে তার ক্ষতি হয়েছে। মন্দিরের পাথরের মূর্তি পাশের পুকুরের জলে ডুবে রয়েছে।

Map Location: https://goo.gl/maps/5THHyVaG6F5i18159

মন্দিরের বিগ্রহ

এই মন্দির থেকে নসিবপুরের দিকে একটু যেতেই দেখলাম বিশালাক্ষি তলা। এখানেও মা বিশালাক্ষির পুজো হয়। মন্দিরের দেবী দর্শন করে চলে এলাম নসিবপুর – চন্দননগর রোডের ক্রসিংয়ে।

বিশালাক্ষী মা

এখান থেকে টোটো করে পৌঁছে গেলাম নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা। এই যে মন্দিরটি নীচে দেখছেন, এটি মা ব্রহ্মময়ী মন্দির। প্রায় ৮০-১০০ বছরের এই মন্দিরের দেবী স্থানীয় লোকেদের কাছে খুবই জাগ্রত। মন্দিরটি একটি আশ্রমের ন্যায় পরিচালিত।

নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা

মন্দির চত্বরের পিছনে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী, যা সংস্কারের অভাবে একটি খালে পরিণত হয়েছে। মন্দিরের সামনে দাঁড়ালে,ডানদিকের রাস্তা চলে গেছে চন্দননগর আর বামদিকের রাস্তা চলে গেছে নসিবপুর। এই মন্দির আস্তে গেলে নসিবপুর স্টেশনে নেমে চন্দননগরের অটো ধরে নামতে হবে নান্দা সন্ন্যাসিঘাটা তে।

মা ব্রহ্মময়ী

Map Location: https://goo.gl/maps/LD3WNg5GoXL9sJmB9

সিঙ্গুর হাওড়া – তারকেশ্বর রেল শাখার দ্বাদশতম স্টেশন। হাওড়া থেকে তারকেশ্বর , সিঙ্গুর বা আরামবাগ লোকাল ধরে পৌঁছতে পারেন সিঙ্গুর ও তার ঠিক আগের স্টেশন নসিবপুর। সেখান থেকে ঘুরে নিতে পারেন এই জায়গাগুলি।