৩ – পরিবেশ বিজ্ঞান

buxa-forest

ডিনার রেডি হতে হতে রাত নটা। ততক্ষণ সন্ধেবেলার এই জয়ন্তী জনপদের বাজারটিকে ঠিক কিরম লাগে, তা দেখতে আগ্রহবশত বেরিয়ে পড়লাম বাজারের দিকে। অনেকসময় গ্রামের বাজারে অনেক রকম জিনিস দেখা যায়, আবার অনেক মানুষের সাথে আলাপও হয়। হোমস্টে থেকে বাজার হাঁটাপথে মিনিট চারেক। সেই জয়ন্তী জনপদের বটগাছ লাগোয়া একটি দোকানে ঢুকলাম। এটি মূলত চায়ের দোকান, কিন্তু তেলেভাজা, মুড়ি, রুটি সবই পাওয়া যায়। গরম চা নিয়ে এক কোনায় বেঞ্চে এসে বসলাম। দেখলাম সামনের আরেকটা বেঞ্চে এক পরিবার সাফারি নিয়ে আলোচনা করছে। এক ফরেস্ট গাইড এবং তার সাথে আরেকজন যুবক রয়েছে। যুবকের বয়স খুব বেশি হলে ছাব্বিশ সাতাশ হবে। উচ্চতা খুব বেশি না। তবে মুখের গঠন আর চেহারা দেখে এই এলাকার নয় বলে মনে হলো। কৌতূহলী হয়ে ওঁদের আলোচনা শুনতে লাগলাম। বুঝলাম, বিকেলের সাফারিতে এই পরিবার জয়ন্তী রেঞ্জে গিয়েছিলেন।

ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক কথায় কথায় বললেন – সন্ধে নামার আগে যখন বালা রিভারবেডে নামলাম, তখন দেখি দূরে একটা ভাঙা ব্রীজের দুটো পিলার দেখা যাচ্ছে। ছবি তুলছি, এমন সময় দেখলাম, কোথা থেকে একটা বেড়াল এসে গেলো। নদীর ওপার থেকে এপারে হেঁটে আসলো। এমনিতেতো কিছুই দেখতে পাইনি, তাই এই বেড়ালটারি ছবি তুলে রাখলাম।

ফরেস্ট গাইডটি হেসে উঠলো। বললো – স্যার, যাই বলুন সাইটিং টা লাকের ব্যাপার। আমরা তো যেটা রুট সেটাই ফলো করি। কোনো সময় কিছু দেখা যায়, আবার অনেক সময় কিছুই দেখা যায় না। ওই তো সুমন্তরা কতবার লেপার্ড দেখেছে, আমি এত ট্যুরিস্ট নিয়ে যাই এখনো একবারও দেখতে পাইনি।

যুবক এতক্ষন মনোযোগ সহকারে সব কথা শুনে কি যেন একটা ভাবলো, তারপর ওই ট্যুরিস্ট ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলো – আচ্ছা, আপনি ওই বেড়ালের ছবিটা দেখাতে পারবেন?

ভদ্রলোক – আরে কেন পারবো না, এই নিন দেখুন। বলে মোবাইলটা যুবকের দিকে এগিয়ে দিলেন।

যুবক অনেকক্ষন ধরে ছবিটা দেখলো, তারপর হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো – আরে এটা বেড়াল তো বটেই, তবে যে সে বেড়াল নয়। এটা মার্বেলড ক্যাট। আপনি এখুনি লাকের কথা বলছিলেন, এটা আপনার একটা রেয়ার সাইটিং হয়েছে। ছবিটা আমাকে পাঠিয়ে দিন। আমি আমার কয়েকজন সিনিয়রের সাথে শেয়ার করবো।

ভদ্রলোক এবার একগাল হেসে বললেন – তাই? যাক কিছু তো একটা দেখা গেলো তার মানে। আমি এখুনি ছবিটা আপনাকে পাঠাচ্ছি। আপনার নম্বরটা দিন। ভদ্রলোকের মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝলাম ব্যাপারটার গুরুত্বটা উনি পুরোপুরি বোঝেননি। তবে আমি এটা বুঝতে পারলাম যে ঐ যুবক আদ্যোপান্ত বাঙালি। দুজনের মধ্যে নম্বর আদানপ্রদান হলো। ভদ্রলোক ছবিটা পরে পাঠাবেন বললেন।

এই ফাঁকে আমিও আর বসে রইলাম না। চা নিয়ে গিয়ে সোজা ওই যুবকের কাছে গিয়ে বললাম – আপনি কি কলকাতা থেকে?

যুবক হাসিমুখেই উত্তর দিলো – টালিগঞ্জ, আপনি?

আমি বললাম – বাড়ি হুগলি, তবে কর্মসূত্রে রাজারহাটে থাকি।

যুবক – বেড়াতে এসেছেন?

আমি – হ্যাঁ। আপনিও কি বেড়াতে?

যুবক – না। আপনি যেমন কর্মসূত্রে রাজারহাট, আমি সেরম কর্মসূত্রে এখানে থাকি।

এবার আমার কৌতুহল আরো বেড়ে গেলো। দেখলাম ওই ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক আর ফরেস্ট গাইড চায়ের দাম মিটিয়ে চলে গেলেন। আমি ঐ যুবককে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, আমার দিকে হ্যান্ডশেক করার ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো অর্কজ্যোতি, আপনি?

তীর্থঙ্কর।

জিজ্ঞেস করলাম – আমার কৌতূহল হচ্ছে যে এরম জঙ্গলে আপনি কি ধরণের কাজ করছেন।

অর্ক – আমি একটা হর্নবিলের ওপর কাজ করছি। ওদের হ্যাবিট্যাট নিয়ে রিসার্চ। আমার মনে হয় এর থেকে ডিটেইলস এ বললে আপনারও বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।

বললাম – হ্যাঁ, আমরা প্রযুক্তির ছাত্র, এইচ এসের পর থেকে স্বেচ্ছায় অঙ্ক বেছে নিয়েছিলাম।

অর্ক – ভালো বললেন তো। এখানে আমি অনেক ডিএফও দেখেছি যারা এই ফিল্ডেরই না, কিন্তু ফরেস্ট অফিসার।

আমি – তাই নাকি?

অর্ক – হ্যাঁ, একজন ডিএফও র সাথে কথা বলেছিলাম, তিনি তো আই আই টি থেকে পাশ করে এসেছিলেন। প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশুনো করে এখন জঙ্গলে।

অবাক হলাম। ভাবলাম এ কেমন প্রতিযোগিতা! দেশের শিক্ষা কাঠামোর বাছাই করা মেধাবী ছাত্ররা যারা নাকি স্বেচ্ছায় প্রযুক্তিকে বেছে নিয়েছে, তাদের তো প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিভাগে ঢোকা উচিত। তারাও যদি ফরেস্টে আসে তবে যারা এতবছর ধরে বোটানি বা জুওলজি নিয়ে পড়লো, তাদের সুযোগ কোথায়!

অর্ক বললো – আমি পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনো করেছি, ইচ্ছে আছে এই বিষয়ের ওপরে ডক্টরেট করা। তারপর যা হয় দেখা যাবে।

আমি – কোনো শিক্ষাই তো ফেলা যায় না। তবে আজকাল এই বিষয় বদলানো ব্যাপারটা আমি ঠিক মেনে নিতে পারি না।

অর্ক – আমি বুঝতে পারছি, আপনি কি বলতে চাইছেন, তবে ব্যাপারটা জটিল। এতটা সোজা নয়। আমার অনেক ক্লাসমেট কিন্তু আইটি লাইনে চাকরি করে।

আমি বললাম – হ্যাঁ, তাতো হবেই। এটা অনেকটা ওই আলো দেখিয়ে পোকামাকড় আকর্ষণ করার মতো।

অর্ক – তবে কি জানেন, এই জঙ্গলটাকে আমি ভালোবাসি। এখানে থাকতে আমার বেশ লাগে। কতকিছুর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার!

আমি – বেশ তো, কিছু শেয়ার করুন না। গল্প শুনতে আমার ভালোই লাগে। ঘড়িতে সাড়ে ছটা বাজে। সময় আছে।

অর্ক – আরেক কাপ চা চলবে?

আমি – নেয়া যেতেই পারে।

অর্ক দোকানদারের কাছে দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে এসে বসলো। শুরু হলো গল্প।

কয়েকমাস আগের কথা। কালবৈশাখীর সময়। একদিন আমার দুজন ফিল্ড এসিস্ট্যান্ট আর আমি প্ল্যান করলাম আলিপুর দুয়ারে যাবো, এক রেস্তোরাঁয় খেয়েদেয়ে তারপর এখানে ফিরবো। প্ল্যান ছিলো ডিনার করবার। সেইমতো একটা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম চারজন। আলিপুরদুয়ার এ ভালোভাবে পৌঁছে খাওয়াদাওয়া করে উঠতে উঠতে রাত নয়টা বেজে গেলো। এবার ফিরছি। রাত প্রায় সাড়ে নয়টা। আমাদের ধারণাই ছিল না যে বক্সায় বৃষ্টি হয়েছে। ফেরার পথে রাস্তা ভেজা দেখে বুঝলাম বৃষ্টির তো হয়েইছে, তার সাথে ঝড়ও হয়েছে।

রাজাভাতখাওয়া ফরেস্ট গেটে যখন পৌঁছলাম তখন রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। হাসিমুখে গার্ড আমাদের জন্যে দরজা খুলেও দিলো। গার্ড আমাদের চিনতো। জয়ন্তী মোড় পৌঁছনোর প্রায় কয়েকশো মিটার আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম রাস্তায় কিছু যেন একটা দাঁড়িয়ে। কাছাকাছি পৌঁছে যা দেখলাম তাতে আমরা ভীষণ ভয় পেলাম। রাস্তা জুড়ে উপড়ে রয়েছে একটা বিশাল বড় গাছ। তার সাথে জড়িয়ে ইলেকট্রিক তার। এমনভাবে গাছটা রয়েছে, সেটাকে টপকে যাওয়া সম্ভব নয়। এবার উপায়! আবার ফিরে গেলাম গার্ডের কাছে, বললাম, জানালেন না যে এরম একটা গাছ পড়ে রয়েছে! গার্ড বললো সেও জানে না যে, এরম একটা ঘটনা ঘটেছে। এবার আমাদের কাছে একটাই উপায়, জঙ্গলের একটা রাস্তা আছে যেটা রিভারবেড পেরিয়ে জয়ন্তীতে যায়। নয়তো আরেকটা রাস্তা আছে, যেটা দিয়ে ঘুরে যেতে ষাট কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হবে। এদিকে গাড়িতে যা পেট্রোল আছে, তাতে মেরেকেটে পাঁচ -দশ কিলোমিটার যেতে পারে। অতএব জঙ্গলের পথ ধরতে হবে। সবাই মিলেই এই সিদ্ধান্ত নিলাম।

জয়ন্তী যাওয়ার পথে ডানদিকের জঙ্গলের পথ ধরলাম। ঘড়িতে তখন রাত দশটা বেজে গেছে। গাড়িতে করে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্ত প্রতিমূহুর্তেই মনে হচ্ছে জঙ্গল একটা আলাদা দুনিয়া, আমরা এখানে বহিরাগত। নাজানি কত জোড়া চোখ আমাদের দেখছে। আর রাতের জঙ্গলের এক মায়াবি টান আছে, সেই টান যেন জঙ্গলের গভীরে নিয়ে যেতে চায়। যথারীতি কয়েক কিলোমিটার গিয়ে আমাদের গাড়ির চাকা কাদার মধ্যে ফেঁসে গেলো। বাইরে বেরিয়ে কিছু দেখাও যাচ্ছে না। পুরো অন্ধকার। মোবাইলের টাওয়ার নেই। কল করা যাবে না। বিপদ যখন আসে তখন সবদিক থেকেই আসে। মোবাইলের আলোয় বোঝা গেলো, যে চাকা কাদায় আটকেছে। গাড়ি থেকে নামতেও ভয় লাগছে এই শ্বাপদ সংকুল পরিবেশে। গাড়ির ড্রাইভার চেষ্টা করছে যদি কোনোভাবে গাড়িটিকে একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। চারপাশটা পুরো অন্ধকার। এরই মাঝে আমি সামনের সিট থেকে পেছনের দুজনকে কিছু একটা বলতে গেছি, দেখছি আমার গালের কাছে কিছু একটা নরম নরম ঠেকছে। জিনিসটা কি ? মুখ ঘুরিয়েই দেখি, এক প্রকান্ড হাতি তার শুঁড় জানালা দিয়ে ঢুকিয়ে ফেলেছে। জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম। হাতিও একটু ঘাবড়ে গেলো, এরই মাঝে ড্রাইভার প্রানপনে আয়কসিলারেটর দাবিয়ে দিতেই গাড়ি ঝট করে কিছুটা এগিয়ে গেলো। হেডলাইটের যতটা আলো সেই অস্পষ্ট আলোতেই পেছনে ঘুরে দেখলাম হাতিটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে দেখছে। উদ্দীপনা এই হাতির থেকেই পাওয়া, যার জোরে আমরা জঙ্গল পেরিয়ে লোকালয়ে পৌঁছলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, হাতিটা আমাদের তাড়াও করেনি। আমাদের কোনো ক্ষতি করেনি। বন্যপ্রাণ হলে কি হবে, ওদের হৃদয় আছে বুঝলেন। ভাবুন এরম একটা পরিবেশ যদি কোনো অচেনা শহরে হতো ? ছিনতাইবাজদের ভয় থাকতো। অনেক দিক থেকেই ওই দুনিয়ার লোকেরা মানুষের থেকে ভালো।

গল্প শেষ করে অর্ক চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলো। দেখলাম চা শেষ। গল্পেই এমন বুঁদ হয়ে ছিলাম যে কখন চা দিয়েছে, কখন খেয়েছি মনেই নেই।

ঘড়ি দেখলাম, প্রায় সাতটা কুড়ি বাজছে। অর্ককে বললাম – একটু যেতে হবে, কাল আবার সকালে উঠে রাজাভাতখাওয়ায় যাবো।

অর্ক – যান ঘুরে আসুন। ওদিকটায় বাইসন দেখা যেতে পারে। তবে অনেক গল্প তো বাকি থেকে গেলো!!

অর্ক এতক্ষনে ওর গল্পের এক ভালো শ্রোতা পেয়েছিল। আমি গল্পটা হাঁ করে গিলছিলাম। গল্প বলারও একটা কায়দা আছে, সেটি অর্ক বেশ ভালোই রপ্ত করেছে। তাই ওঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়েই আমি বললাম – আপনি দারুন গল্প বলেন তো !  উত্তেজনাটা  শুনতে শুনতেই ফিল করছিলাম।

অর্ক – আরে , এরম আরো অনেক গল্প আছে। আপনি উপকথায় বিশ্বাস করেন ? ফেবল এ ?

আমি – হ্যাঁ করি তো বটেই। তবে তার পেছনে গূঢ় রহস্যটাকেও জানার চেষ্টা করি।

অর্ক – তবে ছোট্ট করে বলি শুনুন। এই জঙ্গলের আশেপাশে স্থানীয় লোকেরা যারা থাকেন , তারা অনেকেই বুড়িমার পুজো করেন। তারা মনে করেন, বুড়িমা এই জঙ্গলকে আর এই জঙ্গলের অধিবাসীদের রক্ষা করেন।

আমি – আচ্ছা , তাই ?

আবার গল্প বলার ভঙ্গীতে অর্ক বলতে লাগলো – অনেকদিন আগে হর্নবিলের খোঁজে আমরা জয়ন্তী থেকে ভুটান বর্ডারের এক গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে কয়েকটি মাত্র বাড়ি রয়েছে। সেখানে এক স্থানীয় লোককে আমাদের কাজের ব্যাপারে জানাতে সে বলেছিলো , বহুদিন আগে ওই গ্রামের লোকেরা হর্নবিলের শিকার করতেন।

আমি – সেকি ! এরম কেউ করে নাকি ?

অর্ক – হ্যাঁ , তাই বললো। আমি অবাক হয়েছিলাম। তবে গল্প এখনো বাকি আছে। একদিন গ্রামের এক স্থানীয় লোক , হর্নবিল শিকারের জন্যে গাছের মগডালে উঠে একটি পাখিকে তাক করে মারবে বলে বসেছিল। হঠাৎ সে দেখে এক বিশালাকায় কালো রঙের পাখি , তার ডানার ঝাপটায় সেই হর্নবিলটিকে সজাগ করে তোলে। হর্নবিল ওই জায়গা ছেড়ে তৎক্ষণাৎ উড়ে যায়। পরে যখন এই গল্প ওই গ্রামে জানাজানি হয় , তখন ওই গ্রামের এক বয়স্ক লোক জানিয়েছিল যে, ওই পাখিটি গরুড়।

আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম – এটা তো রামায়ণে বর্ণিত পাখি , এখানে কি করে আসবে ?

অর্ক – আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম যে পাখির কথা ওরা বলছে , সেটি ঈগলের একটা স্পিসিস।

আমি – তারপর ?

অর্ক – তারপর আর কি , ওনারা বলেছিলেন ঈগল ওনারা ভালোমতোই চেনেন। এ পাখি ঈগলের থেকেও অনেক বড়। এর ছায়ার দৈর্ঘ্যও নেহাত কম নয়। কোথাও কোনো পাখির বিপদ এলে , গরুড় নাকি আসবেই। তবে ভালো জিনিসটা হলো , এখন ওই গ্রামে আর কেউ পাখি শিকার করে না। উল্টে পাখিদের সংরক্ষণের জন্য ওনারা বদ্ধপরিকর।

আমি – সেই পাখিকে কি দেখা যায় ?

অর্ক – গ্রামের প্রায় কেউই দেখেনি , কিন্তু ওরা মানে যে ওই গরুড় পাখিটি বুড়িমার পোষ্য। কোনো বন্য পাখি বিপদে পড়লেই , বুড়িমা তাদের রক্ষার জন্যে গরুড়কে পাঠিয়ে দেন।

মনে মনে ভাবলাম , এই কাহিনী সত্য কিনা জানি না। এর সত্যতা যাচাই করার কোনোরকম ইচ্ছেও আমার নেই। এই পৃথিবী আমাদের এই প্রকৃতিরই দান , তাই কখন কাকে কিভাবে রক্ষা করতে হবে , সেটা প্রকৃতিই ঠিক করবে। অন্তত এই গল্পের মধ্যে দিয়ে, বিহঙ্গনিধন তো বন্ধ হয়েছে।  এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি। গরুড় আসুক না আসুক , কিন্তু তার আগমনের আশঙ্কায় অনেক পাখির জীবন বেঁচেছে।

ঘড়িতে দেখলাম প্রায় আটটা বাজে। অর্কর কাছে বিদায় চাইলাম। বললাম – আজ উঠি , আমার পরিবার অপেক্ষা করে থাকবে। কাল দোকানে এলে দেখা হবে।

অর্ক – কাল আবার আমাকে ওই ছোটা মহাকালের দিকে যেতে হবে। ঐদিকে কোনো হোম স্টে তে থাকবো। কাল ফিরতে নাও পারি।

আমি – ওহ! তাহলে ফোন নম্বর টা দাও, যোগাযোগ থাকবে। সরি তুমি বলে ফেললাম।

অর্ক – আরে ঠিক আছে দাদা। আপনার নম্বরটা বলুন, আমি মিস কল করে দিচ্ছি।

ফোন নম্বর আদানপ্রদান করে নিয়ে, আমি ফিরে এলাম হোমস্টেতে। একবার ঘরে গিয়ে পরিবারের সাথে দেখা করে, জানান দিয়ে এলাম যে আমি আশেপাশেই আছি।

হোমস্টের যে জায়গায় খাবার ব্যবস্থা, তার থেকে নিচে আসলেই একটা ছোট্ট বাগান আর তার মাঝে বারবিকিউ এর ব্যবস্থা। এই সময়টায় এগুলোর আয়োজন নেই, মূলতঃ শীতকালের জন্যে রাখা রয়েছে। বাগানের মাঝে কিছু বসার ব্যবস্থা করা। এই জায়গার একদিকে, আমাদের থাকার ঘর, একদিকে এই বাড়ির পাঁচিল, একদিকে বাড়ির প্রবেশদ্বার এবং আরেকদিকে ট্রি হাউসের মতো করা দুটি রুম। ট্রি হাউসের নিচেও বাগানের কিছুটা অংশ রয়েছে। তার ঠিক পেছনেই জঙ্গলের সীমানা।  সেইদিকটায় একটু এগিয়ে যেতেই লক্ষ করলাম সেই নিবিড় বনানীর মায়াবী রূপ। অর্কর ভাষায় এই মায়াবী দুনিয়ায় কত চোখ যে আমাদের দেখছে, আর বলছে সহাবস্থানের কথা। যা আমরা মানুষরা বুঝেও বুঝতে চাইনা। এসব ভাবছি, এরই মধ্যে শুনতে পেলাম, ” স্যার কিছু খুঁজছেন নাকি ? “

ঘুরে দেখলাম বড়কাদা।

বললাম – না এই জঙ্গল দেখছি।

বড়কাদা – এদিকটায় জানেন, শীতকালে প্রচুর ধনেশ পাখি আসে, ময়ূর তো প্রায়ই দেখা যায়।

আমি – আর কোনো পশু দেখেছেন এদিকটায়?

বড়কাদা – সত্যি বলতে আমি দেখিনি। তবে চিতাবাঘ আর হাতি লোকালয়ের দিকটায় অনেক সময়ই চলে আসে।

আমি – আপনি কোথায় থাকেন বড়কাদা?

বড়কাদা – আমি এই পাশেই থাকি।

আমি – আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, এখানে লোকের মূল জীবিকা কি?

বড়কাদা – এখানে যেসব ছেলেরা থাকে, তারা অধিকাংশই ফরেস্ট গাইড। রোটেশনাল পদ্ধতিতে ওদের ডেইলি ডিউটি পড়ে।

আমি – তাতে ওদের যথেষ্ট রোজগার হয়?

বড়কাদা – স্যার যথেষ্টটা অনেক জটিল শব্দ, আমি বুঝিনা। সিজনে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসে, তখন ওদের বেশি রোজগার হয়, আবার যখন ট্যুরিস্ট কমে যায় তখন রোজগারও কমে যায়।

বড়কাদার কথা আমাকে ভাবালো। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা উত্তর দিয়েও , বড়কাদা নিরুত্তাপ। সত্যিই আমরা কি জানি , যথেষ্টর পরিমাপ  কতটা ?

বড়কাদা, বলে জোরে হাঁক দিলেন বাদলবাবুর স্ত্রী। বড়কাদাও একরকম ছুট্টে বাড়ির ভেতরে গেলেন।

বড়কাদার মতো মানুষেরাও ফরেস্ট গাইডদের মতো। যখন ট্যুরিস্টরা থাকে, তখন তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব নেন। তার বদলে কিছু রোজগার হয়। আবার যখন ট্যুরিস্ট কমে যায়, তখন ওনাদের ও রোজগার কমে যায়। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, বর্ষাকালে যখন জঙ্গল ট্যুরিস্টদের জন্যে পুরোপুরি বন্ধ তখন রোজগারের কি উপায়? এইসব ভাবছি, হঠাৎ বড়কাদার গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম।

আপনারা রাতে কটা রুটি খাবেন?

আমি বললাম দশটা মতো করে রাখুন, তার মধ্যে আমাদের সবার হয়ে যাবে।

পরের পর্ব – বক্সা টাইগার রিজার্ভ

Leave a comment