২ – সাফারি

শুরু হলো সাফারি। সাফারির গাড়ির সামনে একটি কেবিন। সেখানে ড্রাইভার এর পাশে একজনের বসার ব্যবস্থা। স্থানীয় একজন গাড়ি চালাবেন , আর তাঁর পাশে বসলেন বাদলবাবু। গাড়ির পেছনের দিকের নির্মাণ সাফারির  কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে। এই ধরনের গাড়িগুলিকে ক্যান্টর বলা হয়। এখানে দুটি সারিতে তিনটি করে সিট্। প্রত্যেকটি সিট্ থেকেই জঙ্গল ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। পেছনের এই বসার জায়গায় ছাউনি দেয়া রয়েছে। এই ছাউনি খোলাও যায়। ড্রাইভারের কেবিন আর এই বসার জায়গার মাঝে ছোট্ট জায়গা দিয়ে সাফারির মজা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায়। সেখানে একটি লোহার রড রয়েছে , সেটা ধরে দাঁড়ালে গাড়ি নড়লেও , ব্যালেন্স রাখা যায়। ছবি তোলার জন্যে এটি আদর্শ জায়গা। সাফারির গাড়ি আমাদের নিয়ে সেনাছাউনির পাশ দিয়ে জয়ন্তী রেঞ্জে প্রবেশ করলো। মাটির রাস্তা সোজা চলে গেছে গভীর জঙ্গলে। গাড়ির টায়ার রাস্তায় যে পথে এগিয়েছে , রাস্তার সে অংশ ছাড়া বাকি অংশে ঘাসের আবরণ। এই জিনিস শুধুমাত্র জঙ্গল সাফারিতে দেখা যায়। কিছুক্ষন এইপথে চলার পরই অস্পষ্ট হয়ে এলো জনপদের কোলাহল। প্রবেশ করলাম এমন এক জগতে যেখানে মানুষ, একজন আগন্তুক ছাড়া কিছুই না।

জয়ন্তী রেঞ্জ

প্রত্যেক জঙ্গলের একটা নিজস্ব জাদু আছে। প্রত্যেকের নিজস্ব গন্ধ, নিজস্ব আওয়াজ আর অনন্য রূপ। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হলো না। পরতে পরতে উপভোগ করতে লাগলাম বক্সার এই অনুপম সৌন্দর্য্যকে। স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা গাছের সারি যে কত পাখির বাসস্থান হতে পারে , তা তাদের আওয়াজেই টের পেতে লাগলাম। হঠাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে গেলো। বাদলবাবু বললেন – স্যার, ওই যে বার্কিং ডিয়ার।

বার্কিং ডিয়ার

আস্তে করে ক্যামেরায় হাত রাখলাম। ছবি তুলবো কি , সেই সুন্দর দৃশ্য তখন আমার নয়নবন্দী হচ্ছে। দৃশ্যটা অনেকটা এরম , সুগভীর বনের মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গায় একটা গাছের গুঁড়ি পড়ে রয়েছে। বনের রং উপরের দিকে নীলচে সবুজ। গাছের গুঁড়ির  ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে এক বাদামী রঙের হরিণ। হরিণটির গায়ে হালকা রোদ পড়ছে , কিন্তু আমার দিকে সেটির দৃষ্টি স্থির। আগন্তুকের উপস্থিতিতে সে সজাগ। ক্যামেরা তাক করতে যাবো কি , জন্তুটি কিছু একটা বুঝে, নিমেষের মধ্যে বনের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেলো। এটুকু বুঝতে বাকি রইলো না যে, পৃথিবীর সমস্ত পশুকুল এই মানবজাতিকে অতিশয় ভয় পায়। গাড়ি এগিয়ে চললো। মিনিট পাঁচেক হয়েছে কি , আবার বার্কিং ডিয়ার ! এবার আরো কাছে। কিন্তু এবার ঝোপের আড়ালে সে প্রাণীটি ঘাস খেতে ব্যস্ত। আমাদের দিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ করলো না। তাই এবার আর দেরি না করে, ক্যামেরা বন্দী করলাম হরিণটিকে। বাদলবাবুকে বললাম – চলুন, ছবি তুলে নিয়েছি।

জয়ন্তী রেঞ্জের গভীরে

কিছুদূর এগিয়ে একটা ফাঁকা গ্রাসল্যান্ডের কাছে পৌঁছলাম। সেখানে এক কৃত্রিম জলাশয় আর তার ধারে রাখা এক গাছের গুঁড়ি দেখতে পেলাম। বাদলবাবু বলতে লাগলেন – জঙ্গলের তৃণভোজী প্রাণীরা জলতেষ্টা মেটাতে এখানে আসে। ওই গাছের গুঁড়িতে লবণ রাখা থাকে , জল খাওয়ার সাথে সাথে তারা একটু করে লবণও চাটে। খাবার খেতে বসে, নিজের বাবা কাকাদের দেখেছি কাঁচা লবণ নিতে , খাবারে একটা নোনতা স্বাদ পাওয়ার জন্যে। তৃণভোজী প্রাণীরা যারা কিনা শুধুই ঘাস পাতা খেয়ে বাঁচে , তাদের জন্যে এই লবণ শুধুমাত্র স্বাদের জন্যে দেয়া হয় না, লবণের মাধ্যমে কিছুটা সোডিয়ামও তাদের শরীরেও যায়।

জঙ্গলের আরো গভীরে প্রবেশ করতে লাগলাম। মনে হতে লাগলো এই সাফারি যেন শেষ না হয়। ভুলে গেলাম ব্রেকফাস্ট এর কথা। উঁচুনীচু রাস্তা পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম বালানদীর কাছে। আমি তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাফারি উপভোগ করছি। বাদলবাবু বললেন – স্যার, সাবধানে দাঁড়াবেন , নইলে বসে পড়ুন। এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে দুলতে দুলতে গাড়ি নেমে গেলো বালা রিভারবেডে। রিভারবেড এর রং নুড়ি পাথরের কারণে সাদা হয়ে রয়েছে। দুধারে সবুজ বনাঞ্চল। এ এক অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। মাঝে মাঝে বন্যপ্রাণীরা নদীর একধারের জঙ্গল থেকে আরেকধারে যায়। ঘন্টাখানেক আগেই, এই বালা রিভারব্রীজ পেরিয়ে পৌঁছেছিলাম জয়ন্তী। এখন রিভারবেডে দাঁড়িয়ে জঙ্গল দেখতে পাচ্ছি। আশায় আশায় কিছুক্ষন কাটালাম রিভারবেডে। বাদলবাবু দূরের পাহাড়গুলো দেখালেন। দৃশ্যটি ভারী সুন্দর। এই জায়গায় নদীর প্রশস্তি বিশাল। বাদলবাবু এদিক ওদিক চোখ রাখলেন, যদি কোনো বন্যপ্রাণ দেখা যায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, তারপর আবার প্রবেশ করলাম বক্সার অন্দরমহলে। এবার আমরা যাবো জয়ন্তী রিভারবেড।

বালা নদী

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলছে। দাঁড়িয়ে থেকে চতুর্দিকে নজর রাখছি , যদি কিছু দেখা যায়। চলতে চলতে, হঠাৎ নজর পড়লো সামনের এক উঁচু গাছের দিকে। দেখতে পেলাম হর্নবিল। বাদলবাবুকে দেখাতেই উনি বললেন – ওটা গ্রেট হর্নবিল। একটা অনেক উঁচু গাছের ডালে বসে আছে। সেখান থেকে কিছুদূর এগিয়েছি কি , আবার ডানদিকের এক গাছে একজোড়া পায়েড হর্নবিলও দেখতে পেলাম। বক্সার বাস্তুতন্ত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই হর্নবিল। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এদের অবদান অপরিসীম। প্রচুর পক্ষী প্রেমী শুধুমাত্র হর্নবিল দেখতেই এই এলাকায় আসেন। মনের ভেতর এক অদ্ভুত আনন্দ হতে লাগলো। সাফারি আমার সার্থক হলো।

জয়ন্তী রিভারবেড

এতক্ষণে আমরা পৌঁছে গেছি জয়ন্তী নদীর কাছে। গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিলো রিভারবেডে। এই রিভারবেড অনেক প্রশস্ত। দূরে দেখা যায় সারি সারি পাহাড় , সিঁড়ির ধাপের মতো উঠে গেছে। নদীর একদিকে বক্সা  ন্যাশনাল পার্ক , আরেকদিকে সারি সারি পাহাড় ও জঙ্গল । অনবদ্য ভূদৃশ্য। এরম চমৎকারী ছবি শুধুমাত্র প্রকৃতির পক্ষেই তুলি দিয়েই আঁকা সম্ভব। বাদলবাবু বললেন – ওই পাহাড় গুলোর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভারত – ভুটান সীমান্ত। ভাবতে অবাক লাগে , যেখানে প্রকৃতি এই ভূখণ্ডকে সাজিয়ে তুলেছে পাহাড় আর বনাঞ্চল দিয়ে , সেখানে মানুষ হয়ে সীমান্ত টেনে এই ভূখণ্ডকে ভাগ করার অধিকার আমাদের কে দিয়েছে ?

এই রিভারবেডে বেশ কিছুক্ষন সময় কাটালাম। দেখতে পেলাম জঙ্গলের মধ্যে একটা প্রটেকশন টাওয়ার। এটি এক ধরণের ছাউনি, বনদফতরের কর্মীরা এখানে থেকে চোরাশিকারীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন। বন আর বন্যপ্রাণ কে যাতে সুরক্ষা দেয়া যায়, তারই একটা প্রচেষ্টা। জয়ন্তী রিভারবেড থেকে এবার আমাদের গাড়ি ফিরে চললো হোমস্টের দিকে। এই রেঞ্জের সাফারি আমাদের শেষ হলো। তবুও চারিদিকে দেখতে লাগলাম যদি কোনো বন্যপ্রাণের আকস্মিক আগমন ঘটে !

হোম স্টে তে ফিরে যখন ব্রেকফাস্টের কথা বললাম বাদলবাবুকে, তখন উনি বড়কা দা বলে চেঁচিয়ে কাকে যেন ডাক দিলেন। লম্বা, ছিপছিপে চেহারার এক লোক রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বাদলবাবু তাঁর কাছে গিয়ে কি যেন একটা বলতেই ওই লোকটি এসে আমাকে বললো – স্যার আসুন এইদিকে। বুঝলাম এনার নাম বড়কা। তার পেছন পেছন চললাম। সামনের যে বাড়িতে আমরা প্রথমে লাগেজ রেখেছিলাম, এবার সেই বাড়িটির ভেতর দিয়ে গিয়ে পেছনে আরেকটি বাড়িতে ঢুকলাম। এই বাড়িটিকে দেখেই বুঝতে পারলাম, এটিই আমাদের হোম স্টে ডুয়ার্স প্রকৃতি।

যেরম ইন্টারনেটে ছবি দেখেছিলাম , বাড়িটি তার থেকেও বেশি সুন্দর। বাড়িটিতে ঢুকতেই ডানদিকে একটি দোতলা বাড়ি। এখানে নিচের তলায় বাদল ছেত্রী তার পরিবার নিয়ে থাকেন। সেই বাড়িরই উপরের তলাটা কাঠের তৈরী। আমাদের থাকার জায়গা সেখানে। এই দোতলা বাড়ির একপাশে জঙ্গলের দিকে রয়েছে একটি ট্রি হাউস। কাঠের স্তম্ভ দিয়ে দোতলা সমান উঁচু একটি বাড়ি। দুটি ঘর রয়েছে সেখানে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। এটিও হোমস্টেরই একটা অংশ। এই ঘরগুলোতে ২-৩ জন থাকতে পারে। তবে আমাদের ঘরটা একেবারে আলাদা। বড়কা দা আমাদের লাগেজ আগেই ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমাদের ঘর দেখিয়ে দিয়ে বললেন – আপনারা ফ্রেশ হয়ে নিন, আমি জলখাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এই বলে বড়কা দা চলে গেলেন। দেখলাম, ছবি দেখে ঘরটা যতটা বড় ভেবেছিলাম, ঘরটি তার থেকেও অনেক বড়। দুটো ডাবল বেডের খাট, ব্যালকনি, আরেকদিকে মাদুর পেতে খাবার ব্যবস্থা। বাথরুমও বেশ বড়। আমি এর আগে যেসব জায়গায় থেকেছি, অনেক জায়গায় এই বাথরুমের থেকেও ছোট মাপের ঘর ছিল। আমার পরিবার খুব খুশি হলো। পরিবারের সাথে ঘোরার একটা আলাদা মজা আছে। নিজেকে একটু বেশি সুরক্ষিত মনে হয়, যখন পরিবারের সাথে থাকি। এরই মধ্যে বড়কাদা জানালেন – খাবার রেডি।

বাদলবাবুর বাড়িটির একদিকটা পাকা মেঝে দিয়ে সম্প্রসারিত করা। সেদিকেই আমাদের ঘরে যাবার কাঠের সিঁড়ি। এছাড়া ওই ফাঁকা জায়গাতে একটা ওপেন ডাইনিং রয়েছে। সেখানেই অতিথিদের খাবার ব্যবস্থা । আমরা ঘর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমেই এই মুক্ত ভোজনালয় এ এসে বসলাম। বড়কাদা সব সাজিয়ে রেখেছেন। লুচি আর আলুর তরকারি দিয়ে, অতিশয় তৃপ্তি করে প্রাতরাশ সেরে ফেললাম। আমার ছেলে ঈশানের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, এই জিনিসটার জন্যেই ও অপেক্ষা করছিল। খাবার শেষ করবার আগেই বাদলবাবু এসে বললেন – স্যার বৃষ্টি আসার আগেই আপনাদের বেরোতে হবে, নয়তো আপনারা ওই জায়গায় পৌঁছতে পারবেন না। আমি বললাম – কোন জায়গা ?  বাদলবাবু উত্তর দিলেন – ছোটা মহাকাল।

ভরপেট খেয়ে গাড়িতে চেপে বসলাম। এবারে এক অন্য গাইড আমাদের নিয়ে চলল ছোটা মহাকালের পথে। বাদলবাবু এবার গেলেন না। ড্রাইভার ভদ্রলোক আগে যিনি ছিলেন, এই সফরেও তিনিই আমাদের নিয়ে চললেন। জয়ন্তী জনপদের বটগাছকে ডানে রেখে সোজা নদীর দিকে রওনা দিলো গাড়ি। কিছুটা গিয়েই গাড়ি বামদিকে ব্যাঙ্ক নিলো। এবার দেখতে পেলাম, এই এলাকার এক পুরোনো স্কুল। স্কুল লাগোয়া মাঠ , ঘরবাড়ি পেরিয়ে গাড়ি এগোতে লাগলো। কয়েকশো মিটার গিয়েই গাড়ি নেমে পড়লো জয়ন্তী রিভারবেডে। গাইড বললো – স্যার শক্ত করে ধরে থাকবেন সবাই, আগে রাস্তা খারাপ। মনে মনে ভাবলাম, আমরা কি রোলার কোস্টারে চেপেছি, নাকি!

জয়ন্তী নদী দিয়ে ছোটা মহাকালের পথে

আমার কথা শেষ হতে না হতেই, গাড়ির চড়াই, উতরাই শুরু হলো। পাথরের ওপর দিয়ে চলতে গেলে ঠিক কিরম মনে হয়, তা জানতে গেলে অন্তত একবার, এখানে আসতে হবে। কোথাও ছোট নদী স্রোত, আবার কোথাও মাটিতে লুটিয়ে থাকা গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি নেচে নেচে চলতে লাগলো। দেখতে লাগলাম অদূরের সেই সারি সারি পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে সামনে চলে আসছে। আকাশ এখন কালো মেঘে ঢাকা। চারিদিকের দৃশ্য অপূর্ব। কিন্তু এই সৌন্দর্য এর মধ্যে বাদ সাধছে আমাদের গাড়ি। তাড়াহুড়োয় ছুটে চলেছে ছোটা মহাকালের পথে। বৃষ্টি নামার আগে পৌঁছতে হবে যে! অবশেষে নদী পেরিয়ে, কঠিন চড়াই উতরাই পথ অতিক্রম করে আবার অরণ্যমধ্যে প্রবেশ করলাম। ঘন বনাঞ্চলকে বামদিকে রেখে, গাড়ি এক পাহাড়ি রাস্তা ধরে পৌঁছে গেলো ছোটা মহাকাল।

ছোটা মহাকাল

গাড়ি থেকে নেমে যা দৃশ্য দেখলাম, সেটাকে নৈসর্গিক বললেও কম বলা হয়। সারি সারি পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে চলেছে জয়ন্তী নদী। প্রায় এক হাঁটু জলস্রোত বইছে। কোনদিকে তাকাবো? যেদিকেই তাকাই সেদিকের দৃশ্যই ক্যামেরাবন্দী করতে ইচ্ছে হচ্ছে। জয়ন্তীনদী এখানে দুইদিকের পাহাড়কে আলাদা করে রেখেছে। গাইড ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন দেখে, জিজ্ঞেস করলাম – চলুন, কোথায় নিয়ে যাবেন?

ভুটানের পাহাড়

গাইড বললেন – এদিকে আসুন। আমাদের এই নদী পার করে ঐদিকের পাহাড়ে যেতে হবে।

আমি আঙুল দিয়ে দেখালাম – ঐ পাহাড়টায় ?

গাইড – হ্যাঁ। জানেন স্যার, ঐদিকটা ভুটান?

আমি অবাক হয়ে বললাম – তাই? মানে আমরা আন্তর্জাতিক সীমারেখা পার করবো! ভেবেই রোমাঞ্চ হলো। ক্যামেরা বার করে ফেললাম।

গাইড – এবার তাড়াতাড়ি চলুন, বৃষ্টি পড়লেই অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।

দেখলাম এই নদী আমার মা আর ছেলে পেরোতে পারবে না। প্রচন্ড স্রোত পেরিয়ে যাওয়া, তাদের পক্ষে কষ্টকর। নদীর ধারের এক পাথরে মা আর ছেলেকে অপেক্ষা করতে বলে, আমি আর আমার স্ত্রী গাইডের পিছু পিছু চললাম।

ছোটা মহাকালের আরেকদিকে

নদীটিকে যতটা সুন্দর মনে হচ্ছিলো, নদীর স্রোতের গতি দেখে সেই ধারণা কিছুটা বদলালো। দুইজনে কোনোমতে হাত ধরাধরি করে নদীর অপর প্রান্তে পৌঁছলাম। এই পাহাড়ের যেদিকেই চোখ যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি ছোটো খাটো জলধারা পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে নামতে ঝর্ণার আকার নিয়েছে।

গাইড দেখালেন – ওই যে সামনের পাহাড়, আমাদের ঐখানে উঠতে হবে। পাঁচশো মিটার মতো হবে।

আমি দেখলাম ছোট কিছু গেরুয়া পতাকা পাহাড়ের গায়ে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত ঐটিই ছোটা মহাকাল। প্রকৃতির টানেই এগিয়ে চললাম। সহধর্মিণী কেও সেইমতো বোঝালাম, এতদূর এসেছি যখন, তখন দেখেই নি। 

ভগবান মহেশ্বরের এই একটা বৈশিষ্ট আছে। তিনি এইরকম দুর্গম জায়গায় নিরিবিলি পরিবেশেই অবস্থান করেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে তাঁকে হাতের নাগালে পাওয়া একটু কষ্টসাধ্য তো হবেই! খাড়াই রাস্তা ধরে কিছুটা ওঠার পর বুঝলাম কতটা কষ্ট। এখানের লোকেদের কাছে যেটা অভ্যেস, তা আমাদের কাছে একপ্রকার ট্রেকিং। কুড়ি পঁচিশ মিনিট পর, পৌঁছলাম ছোটা মহাকাল। পাহাড়ের গায়ে তৈরি হওয়া এক গুহার মধ্যে রয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব। তাঁকে ঘিরে আরো কিছু দেবতাদের সমাবেশ। পুরো জায়গাটিতে কেউই নেই। শুধুই আমরা। দেবাদিদেবের দর্শন সেরে নিলাম, দেখলাম দূরে আমার মা এখনো ওই পাথরের ওপর বসে। কিন্তু ঈশান এদিকে ওদিকে ঘোরাঘুরি করছে। বুঝলাম এই ছোট্ট মাথার বিভিন্ন প্রশ্নবাণের আঘাতকে প্রতিহত করছে, আমাদের পরিবারের সবথেকে বয়স্ক মানুষটি।

এরইমধ্যে গাইড বললেন – স্যার এদিকে আসুন।

দেখলাম উনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখাতে চাইছেন। ওনার পিছু নিলাম। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ডানদিকে ঘুরে দেখতে পেলাম এক অপূর্ব দৃশ্য। পাহাড়ের দুটো ঢাল অনেকটা ইংরেজী X অক্ষরের মতো রয়েছে। এক ঢাল থেকে আরেক ঢালে আছড়ে পড়ছে এক শ্বেতবর্ণ জলরাশি।

গাইড বললেন – এটিই ছোটা মহাকাল ফলস । ভক্তরা এখানে স্নান করে দেবাদিদেবের পুজো করেন।

মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। বরুনদেব কত রূপেই না এই প্রকৃতিতে বসবাস করেন! এইসব ভাবতে ভাবতেই ক্যামেরা বন্দী করলাম এই জলরাশির সৌন্দর্য।

গাইড বললেন – স্যার, আর দেরি করে লাভ নেই। চলুন ফিরে যাই। তাছাড়াও, এখানে জোঁক থাকতে পারে।

অগত্যা ফিরে চললাম। সহধর্মিণীকে সঙ্গে করে চললাম আমার পরিবারের আরো দুজন সদস্যের কাছে।

গাড়ি আমাদের নিয়ে চললো হোমস্টের দিকে। আমাদের আবার বিকেলে একটা সাফারি রয়েছে। চড়াই উতরাই রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি চলতে লাগলো। তবে এবার কিছুটা হলেও এই যাত্রাপথ উপভোগ করতে লাগলাম। প্রায় আধঘন্টা পর পৌঁছে গেলাম ডুয়ার্স প্রকৃতি।

হোটেলে ফিরে লাঞ্চের কথা জানালাম বাদলবাবুকে। উনি আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। কিছুটা হলেও উনি শান্তি পেলেন এই ভেবে যে, আমরা ছোটা মহাকাল ঘুরে নিয়েছি। রাস্তায় বৃষ্টি আসবে আসবে করেও আসেনি।

সবাই স্নান করে রেডি হয়ে নিলাম। বড়কাদাও সময়মতো এসে জানালেন খাবার রেডি। ঘড়িতে তখন প্রায় দুটো বাজে। নীচে নেমে এলাম। মধ্যাহ্নভোজের সুব্যাবস্থা। ডিমের ঝোল, গরম ভাত, ভাজা আর চাটনি সহযোগে আমাদের ভোজন সম্পন্ন হলো। ঘড়িতে তখন পৌনে তিনটে। সোয়া তিনটের মধ্যে বেরোতে হবে। এতক্ষনে বাদলবাবু এসে জানিয়ে দিয়েছেন। গাড়িও এসে গেছে। এতক্ষণে ঠিকঠাক রেস্ট পাওয়া গেলো। সে আধঘন্টারই হোক না কেন।

আমার স্ত্রী আর মা একযোগে বলে উঠলো – সকাল থেকে অনেক ছোটাছুটি হয়েছে। এবার একটু ক্লান্তি লাগছে। এইটুকু রেস্ট পাওয়া গেলো , এই অনেক।

বেশিক্ষণ রেস্ট নেয়া হলো না। মেরেকেটে পনেরো মিনিট রেস্ট আর বাকি পনেরো মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আবার আমরা সাফারির গাড়িতে চেপে বসলাম। আমাদের গন্তব্য চুনিয়া টাওয়ার।

জয়ন্তী নদীতে স্রোত

একই পথে আমাদের গাড়ি আবার জয়ন্তী রিভারবেডে গিয়ে পড়লো। এবার গাইড স্বয়ং বাদলবাবু। ছোটা মহাকাল যাওয়ার পথ রিভারবেডের বামদিকে। চুনিয়ার পথ খানিকটা সোজা। গাড়ি সোজা আমাদের নদীর অপর প্রান্তে নিয়ে চললো। আমি সকালের মতো ক্যামেরা রেডি করে অপেক্ষা করতে লাগলাম। চুনিয়া, এই বক্সা ন্যাশনাল পার্কের একটি রেঞ্জ। এই পথে উঁচু গাছের সংখ্যা কম। জঙ্গলের ঘনত্বও একটু কম। নদীর অপরপাড়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে, বামদিকে দেখতে পেলাম প্রচুর ভাঙা বাড়ি, বাড়িগুলি দেখলে মনে হবে যেন, এখানে আগে কোনো বসতি ছিলো। কৌতূহলে বাদলবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে আগে কি ছিলো ? আর এগুলোই বা কাদের বাড়ি?

বাদলবাবু জানালেন এই জায়গা ছিলো ভুটিয়াবস্তি। সরকার এই বসতি তুলে দিয়েছে। সব লোকেদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসন দিয়েছে। বেশীদিন হয়নি, তাই বাড়িগুলির ভাঙাচোরা অংশগুলো চোখে পড়ছে।

চুনিয়া রেঞ্জ

আমি জিজ্ঞেস করলাম – কিন্তু কেন?

তার কোনো স্পষ্ট উত্তর বাদলবাবু দিলেন না। এড়িয়ে গেলেন। কিছুক্ষনের জন্যে মনে হলো, সরকারি নীতির প্রকোপ, বিভিন্নভাবে সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে। কারো জন্য খুব ভালো, আবার কারোর জন্যে খুব খারাপ। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বোধহয় কিছু মুষ্টিমেয় লোকের হাতেই সীমাবদ্ধ। সেই মুষ্টিমেয় লোকেদের আমরাই নির্বাচন করেছি, তাই আক্ষেপ করেও বিশেষ লাভ নেই।

বাদলবাবু বললেন – এই এলাকাতেই বহু বছর আগে ডলোমাইটের খনি ছিল। সেই খনিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল জনবসতি। অনেক পরে এই জায়গাগুলো বন দফতরের হাতে চলে যায়।

গাড়ি এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ করে সামনের এক উঁচু গাছের ডালে একটা হর্নবিল কে উড়ে বসতে দেখলাম। ওরিয়েন্টাল পায়েড হর্নবিল। বাদলবাবুও দেখেছেন। কয়েক মুহূর্ত হয়েছে কি, বাদলবাবু সজোরে ব্রেক কষলেন। একটু জোরেই বললেন – স্যার এবার দেখুন।

আমি যা দেখলাম, সেই দৃশ্য কখনোই ভুলতে পারবো না। কমপক্ষে তিরিশটা পাখিকে উড়ে যেতে দেখলাম একসাথে, ওই উঁচু গাছটার দিকে। মন ভরে গেলো। তবে এতটা দূরের দৃশ্য ক্যামেরায় এলো না। ভগবান যে ক্যামেরা আমাদের সকলকে দিয়েছেন, তাতেই দেখতে পেলাম এক ঝাঁক সাদাকালো নভোশ্চরদের। ইংরেজিতে হর্নবিল, বাংলায় ধনেশ। শুনতে পেলাম তাদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। ধনেশের ডেরা পেরিয়ে একটু এগিয়েছি কি, বাদলবাবু বলে উঠলেন – স্যার ওই দেখুন। দেখলাম কালো রঙের একটি বড় পাখি আমাদের গাড়ির সামনে দিয়ে উড়ে গেল।

চুনিয়া ওয়াচটাওয়ারের থেকে

আপামর সর্পকূলের সাথে এই পাখির খাদ্য খাদকের সম্পর্ক। এর পোশাকি নাম সার্পেন্ট ঈগল। গাড়ি দাঁড়ালো না। এগিয়ে যেতে লাগলাম। প্রায় দুশো মিটার এগিয়ে যেতেই, গাড়ি দাঁড়িয়ে গেলো। বাদলবাবু বলে উঠলেন – স্যার এইদিক দিয়ে হাতি গেছে। খুব বেশিক্ষন হয়নি। আমি তখন সাফারি ভ্যান থেকে মাথা বার করে দাঁড়িয়ে দেখছি চারিদিক। যে পথ বাদলবাবু দেখাচ্ছেন, সেই পথের ছোট গাছগুলো নুইয়ে দুইদিকে ঝুঁকে পড়েছে। ঝোপঝাড় দুদিকে সরে গেছে। মনে হয় অনেকজন মিলে হেঁটে গিয়ে, এই রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে। বা ঝোপঝাড়ও হয়তো গজরাজকে সেলাম জানিয়ে নিজেরাই রাস্তা করে দিয়েছে। আমি তখন উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে সাফারি উপভোগ করছি। চারিদিকে চোখ রাখছি। বাদলবাবুকে বললাম একটু এগিয়ে চলুন।

হাতির দল

গাড়ি পঞ্চাশ মিটার এগিয়েছে কি, আমাদের চলার পথের ডানদিকে যে ফাঁকা ঘাসের জমি ছিলো, সেইখানে চোখ গেলো। চেঁচিয়ে উঠলাম – ওই যে, ওই যে, গাড়ি দাঁড় করান। বাদলবাবু সজোরে ব্রেক কষলেন। উনি খেয়াল করেননি, কারণ এই হাতির দল আমাদের পেছনে ছিলো। বড়ো হাতি আর বাচ্চা হাতি মিলিয়ে গোটা আটেকের দল হবে। হস্তীপরিবার নিজের বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছে। ক্যামেরাবন্দী করে নিলাম তাদের এই সুন্দর মুহূর্তকে। ছবি তোলার পর মনে হলো, পারিবারিক এই মুহূর্ততে হয়তো আমরা বিঘ্ন ঘটাচ্ছি। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মিনিটখানেকের মধ্যেই হাতির দল আবার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলো। আমরাও এগিয়ে চললাম চুনিয়া ওয়াচটাওয়ারের দিকে।

চুনিয়া ওয়াচটাওয়ার

বেশ খানিকটা এগিয়ে এক জায়গায় পৌঁছলাম। এই জায়গাটি মূলত চোরাশিকার ঠেকানোর জন্যে ব্যবহৃত হয়। নতুন করে সবুজ রং করা হয়েছে। ওয়াচটাওয়ারের ওপরে উঠলাম। সামনের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল অতোটা ঘন নয়। তুলনামূলকভাবে পেছনদিকের অঞ্চলে গাছেদের ঘনত্ব বেশী। সামনের গাছের সারি পেরোলে দেখা মিলবে জয়ন্তী নদীর। ওয়াচটাওয়ারের আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। শুধু আমরাই। এই নির্জনতাই জঙ্গলকে উপভোগ করতে সাহায্য করে। বট, শাল, পিয়াল, শিশু, শিরীষ গাছের প্রাধান্য বেশি দেখা যায় এই জায়গাতে। টাওয়ারের চারিদিকে ইলেকট্রিক ফেন্সিং দেয়া, তার মধ্যে দিয়ে সাবধানে গলে গিয়ে উঠতে লাগলাম টাওয়ারে। টাওয়ারের দুটো তলা। দুটোতেই লোক থাকার ব্যবস্থা আছে। রান্নাঘর, শৌচালয় সবের ব্যবস্থা আছে। পরিচ্ছন্নতা দেখে বোঝাই যায়, এখানে লোকের বসবাস আছে। টাওয়ারের দোতলা থেকে জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে দেখা যায়, তার এক প্রধান কারণ এখানকার গাছেদের ঘনত্ব। চোরাশিকারীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে এর থেকে ভালো ঠিকানা আর হয় না। টাওয়ার থেকে নেমে এলাম। কোথাও কিছুই দেখতে পাইনি, এক দুটো বুলবুল পাখি ছাড়া। বাদলবাবু আর আমার পরিবার কেউ ওপরে ওঠেনি। নেমে আসতেই বাদলবাবু জিজ্ঞেস করলেন – কিছু দেখতে পেলেন নাকি স্যার?

ভুটিয়াবস্তির দিকে

আমি বললাম – নাহ!

বাদলবাবু বললেন – তাহলে চলুন আরেকটা জায়গায় নিয়ে যাই, ভালো লাগবে।

ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। এতক্ষন বাদলবাবু ড্রাইভারের পাশে বসে ছিলেন, এবার ড্রাইভারকে পাশে বসিয়ে নিজেই স্টিয়ারিং ধরলেন। এবার ফেরার পথ ধরলাম। ফেরার পথে ভাবলাম ওই হাতির দলকে আবার দেখতে পাবো, কিন্তু সব দিকে তাকিয়েও, দেখতে পেলাম না। যেটা দেখতে পেলাম, সেটাও আমার জন্যে কম কিছু না। মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক টিয়া পাখি উড়ে গেল। যেরম টিয়া এর আগে দেখেছি, এগুলো একটু আলাদা। সাইজে ছোট আবার বুকের জায়গাটা একটু লালচে। বিজ্ঞানসম্মত নাম রেড ব্রেস্টেড প্যারাকীট। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে বাদলবাবু ডানদিকের পথ ধরলেন। এই রাস্তা ভুটিয়া বস্তির দিকে যায়। এখানে জঙ্গল বেশ ঘন এবং শুনশান। শুধু আমাদের গাড়ি ছাড়া আর কেউই নেই। এমনকি ভুটিয়া বস্তিও উঠে গেছে। পড়ে রয়েছে কিছু ভাঙা ঘরবাড়ি। আজ এই জায়গা বন্যপ্রাণের জন্য উন্মুক্ত । মনে মনে ভাবলাম, সাধারণত বন্যপ্রাণ উঠিয়ে শহর হতে অনেক জায়গায় দেখা যায়। এখানে ব্যাপারটা উল্টো। জঙ্গলের ভাঙাচোরা পথে ধীরে ধীরে পৌঁছলাম এক পুরোনো ওয়াচটাওয়ার এর কাছে। কতদিন ধরে যে পড়ে রয়েছে কে জানে। সন্ধেও প্রায় নেমে আসতে চলেছে। পরিবারকে নীচে বাদলবাবুর জিম্মায় রেখে, উঠতে লাগলাম ওয়াচটাওয়ারের মাথায়।

ভুটিয়াবস্তি ওয়াচটাওয়ার

অদ্ভুত এক পোকার ডাক, এত তীব্র যে মনে হচ্ছে কোথাও যেনো অনবরত ঘন্টা বাজছে। ওয়াচটাওয়ারের প্রতিটি তলা ভীষণরকম নোংরা। তার সাথে পচা গন্ধ। বহুদিন ধরে ওয়াচটাওয়ার পরিত্যক্ত। উপরে পৌঁছে চারিদিক দেখতে লাগলাম, কিছু যদি দেখা যায়। অদূরে একটি জলাশয় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, আর গাছেরা নীরব মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। আবহাওয়া গরম, এমনকি বাতাসও বইছে না। বেশিক্ষন না থেকে, নেমে এলাম। নেমে আসতেই, আমার স্ত্রী মৌমিতা উত্তেজিত হয়ে আমাকে ওয়াচটাওয়ারের একটা স্তম্ভর দিকে দেখালো। দেখলাম স্তম্ভের গায়ে কেমন একটা ঘষে যাওয়ার দাগ, কোথাও বা গর্ত। যেন কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে খোঁচানো হয়েছে।

মৌমিতা বললো – জানো, বাদলবাবু বললেন এগুলো হাতি করেছে। ওদের দাঁত এখানে ঘসেছে।

হাতির দাঁত ঘষার দাগ

সেই দাঁত ঘসার জন্যে যে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে, তার ফলে এই সিমেন্টের স্তম্ভের এই দশা। আমরা যে বহুতল নির্মাণের জন্য গর্ব করি এবং সেই নির্মাণের যে প্রাথমিক উপাদান, যা নিয়ে তাবড় তাবড় সেলিব্রিটিরা আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান, সেই উপাদান এই বন্যপ্রাণের কাছে একেবারেই তুচ্ছ। আমরা ওদের ঘর ভাঙতে পারি , কেটে ফেলতে পারি জঙ্গল , তৈরী করতে পারি নগর। তবুও আমাদের এটা জানা উচিত , এঁরাও আমাদের ঘর ধূলিসাৎ করতে সক্ষম।

জয়ন্তী নদী দিয়ে ফেরা

ওয়াচটাওয়ার থেকে নেমে, এবার সাফারি শেষ করে অবিলম্বে ফিরে চললাম। সন্ধে নামছে। তার আগেই পৌঁছতে হবে হোম স্টে। আমাদের ভ্রমণ গ্রূপের সবথেকে ছোট্ট সদস্য ঈশান কিন্তু বেশ ক্লান্ত। ঘরে ফিরে কি কি করবে, তার পরিকল্পনা করছে। এদিকে জঙ্গলের রং পাল্টাচ্ছে, গাঢ় সবুজ ধীরে ধীরে কালো হচ্ছে। তারই মাঝে এই রিভারবেড ধীরে ধীরে শ্বেত বসন ধারণ করছে। সন্ধে বেলার নদীতীর দারুন সুন্দর। অপূর্ব এই দৃশ্য ছেড়ে কি ঘরে বন্দী হতে ভালো লাগে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, এই ভ্রমণ শুধু আমার একার না, আমার পরিবারেরও। তাদের মতামত, তাদের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেওয়াও আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আজকের দিনের সাফারি শেষ হলো। নদী পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম হোমস্টে।

পরের পর্ব – পরিবেশ বিজ্ঞান

Leave a comment