১ – যাত্রাশুরু

রবিবারের দিনটা আর চারটে দিনের থেকে আলাদা। এদিন বাড়িতে আমরা সবাই একসাথে দুপুরে খাওয়াদাওয়া করি। বিশেষ পদের রান্নাও হয়। ভাত , ডাল , ভাজা, তরকারি থেকে শুরু করে মাছ , মাংস , চাটনি , শেষপাতে দই এসব থাকেই। যাকে বলে একেবারে এলাহি  খাওয়াদাওয়া। 

আজকের দিনের মেন্যুতে ছিল ভেটকি মাছ , আর তার সাথে কাচকি মাছ ভাজা। কয়েকটি কাচকি মাছভাজা চিবোতে চিবোতে, আমার স্ত্রী মৌমিতা  আমার দিকে তাকিয়ে বললো – গরমের ছুটিতে কোথাও ঘুরতে গেলে হয় না ? ধরো এই তিন চার দিনের জন্য ?

আমি মনে মনে হাসলাম। কারণ একটাই , ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে আমার সবসময়ই হয়। এবার যখন অন্যতরফ থেকে তাল উঠলো , তখন তালে তাল মিলিয়ে বলে উঠলাম – চলো, পাহাড়ে যাই। দার্জিলিং , গ্যাংটক কিংবা সিল্করুট ? যাবে ?

একথা বলে ভাবলাম, আমার স্ত্রী বেজায় খুশি হবে , কিন্তু হলো ঠিক তার উল্টো। সহধর্মিনী কিছুটা বিরক্তির স্বরে বললে – আরে  ধুর ! সবাই এখন ঐদিকেই যাচ্ছে। কাতারে কাতারে লোক ভীড় জমাবে পাহাড়ে। বাঙালি কি জিনিস জানো ? এই গরমেও একবার পুরী বা দার্জিলিংয়ের টিকিট কেটে দেখাও দেখি ?

আমি ভেবে দেখলাম কথাটা ঠিক। ভীড় এড়াতে যেদিকে যাওয়া, সেদিকে গিয়ে আবার ভীড়ের মধ্যে পড়লে সেটা তো খুব সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না। তাই বললাম – হুম, বুঝেছি , একটু ভাবতে দাও !

কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা অন্য গন্তব্যের কথা মাথায় এলো। তবে মনে মনে ভাবলাম, আমি তো যেতেই পারি, আমার ভালো লাগবেই, কিন্তু আমার স্ত্রী, কিংবা মা কি রাজি হবে ? একটু ধন্দের মধ্যে থেকেও ঠিক করলাম , বলেই ফেলি।

মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললাম – ডুয়ার্স যাবে ? সেই পনেরো ষোলো বছর আগে স্কাউট ক্যাম্পের জন্যে একবার গেছিলাম গরুমারা। ব্যাস ওই শেষ ! তারপর আর সুযোগই হয়নি ! এবার যাবে ?

আমার স্ত্রী মৌমিতা ঘুরতে খুবই ভালোবাসে। কিন্তু তার একটি পছন্দের উইশ লিস্ট আছে। সৌভাগ্যবশত ডুয়ার্স সেই লিস্টে ছিলো। তাই এককথায় রাজী হয়ে বললো –  হ্যাঁ যাওয়াই যায়। আমার তো কখনোই যাওয়া হয়নি। শুধু শুনেছি আর ছবি দেখেছি। আশা করি মা আর ঈশানেরও ভালোই লাগবে।

আমাদের ভ্রমণ প্ল্যান সবসময় চারজনের কথা মাথায় রেখেই করতে হয় । আমরা দুজন ছাড়া , আমাদের দলের অন্য দুই সদস্য আমার মা আর আমার ছেলে ঈশান। একটা দুটো জায়গা ছাড়া, আমরা সব জায়গাতেই মা কে নিয়েই গিয়েছি , সে পাহাড় হোক কিংবা জঙ্গল। আমার মা এর আগে মালবাজার গেলেও, ডুয়ার্সে প্রবেশের সুযোগ পাননি । এবারে যাতে সেই অভিযোগ না থাকে, সেইমতো পুরো ভ্রমণের খুঁটিনাটি ছকে নিলাম। তৈরী করে ফেললাম দুই রাত তিন দিনের বক্সা ভ্রমণের প্ল্যান। আর দুটো রাত, আমাদের ট্রেনে কাটাতে হবে । প্ল্যান হলো এক শুক্রবার যাবো , আর মঙ্গলবার সকালে ফিরে আসবো।  

নিজের কয়েক বছরের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছি যে, কোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে, বিশেষ করে যখন গন্তব্য উত্তরবঙ্গ , তখন ট্রেনের টিকিট আগে কেটে নিতে হয়। তাই কোনো পরিকল্পনার আগেই টিকিট কেটে নিলাম কলকাতা শিলচর এক্সপ্রেসে। একমাত্র এই ট্রেনটিই সকাল সকাল নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছয়। আলিপুরদুয়ার দিয়ে যেতে গেলে, অনেকটাই দেরি হবে। ট্রেনটি কলকাতা স্টেশন থেকে দুপুর তিনটের সময় ছেড়ে নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছয় পরদিন সকাল ছটা  নাগাদ। ট্রেনটি প্রতিসপ্তাহে শুধুমাত্র শুক্রবারই ছাড়ে। ফেরার ট্রেন আলিপুরদুয়ার থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। দুটি ট্রেনেই অনায়াসেই মিললো টিকিট। ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা যখন হয়ে গেলো, তখন বাকি রইলো থাকা, খাওয়া আর ঘোরার ব্যবস্থা। আজকাল এই সবকিছুর দায়িত্ব হোমস্টে বা হোটেল নিয়ে নেয়। তাই এবার খোঁজ করা শুরু করলাম, কোন হোটেল বা হোমস্টে তে থাকবো। দুদিন ধরে খোঁজাখুঁজি করার পর পেলাম এক হোমস্টের সন্ধান। আমার হোমস্টে বেছে নেয়ার একমাত্র মানদণ্ড ছিলো , হোমস্টেটিকে জঙ্গলের কাছে থাকতে হবে। সেইদিক থেকে এই হোমস্টেটি একেবারে উপযুক্ত।  জঙ্গলের ধারে অবস্থিত , বলা যায় জঙ্গলের সীমারেখার পাশেই। এই হোমস্টের লোকেশন, জয়ন্তী। সত্যি কথা বলতে, আমাদের কাছে বক্সাও যা, জয়ন্তীও তাই। এই এলাকা সম্বন্ধে আমাদের কারোর কোনো ধারণাই নেই ।

হোমস্টের মালিক বাদল ছেত্রীর সাথে প্রথমবার কথা বললাম । হিন্দিতে কথা বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম, ভদ্রলোক পরিষ্কার বাংলা বলেন। হোমস্টের, কোন রুমটি আমাদের চারজনের থাকার জন্য ভালো হবে? কিরম খরচ হবে? সবই উনি জানালেন। যে জিনিসটা আমার সবথেকে ভালো লাগলো, সেটি হলো , ভদ্রলোকের নিজস্ব সাফারির গাড়ি রয়েছে , আর উনি নিজেই একজন ফরেস্ট গাইড। ভেবে দেখলাম, এর থেকে ভালো আর কিছু হয় না। সাথে সাথে, ওনাকে কিছু টাকা পাঠিয়ে রাখলাম। আগাম বুকিংও হয়ে গেলো।

অনেকদিন পর, ঠিক আমাদের যাত্রাশুরুর  আগেরদিন, ওনার সাথে দ্বিতীয়বারের জন্যে কথা বললাম। উনি জানালেন পরিকল্পনা মাফিক সমস্ত সাফারির বুকিং উনি করে রাখবেন , শুধু আমাদের ঠিক সময়ে পৌঁছে যেতে হবে । আমাদের, নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে গাড়ি পিক আপ করে নিয়ে আসবে জয়ন্তীতে। গাড়ির ড্রাইভারের ফোন নাম্বারও বাদলবাবু সঙ্গে সঙ্গেই শেয়ার করে দিলেন । এখন আমাদের কাজ হচ্ছে , সময়মতো ড্রাইভারকে ফোন করা , উনি স্টেশনেই থাকবেন। অজানাকে জানার একটা কৌতূহল বাঙালী মাত্রেই থাকে। সেই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সমস্ত ক্যামেরা চার্জ করে রাখলাম। আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম শুক্রবারের জন্যে।

শুক্রবার অফিস থেকে কলকাতা স্টেশনে পৌঁছনোর প্ল্যান ছিল। ঠিক করেছিলাম, আমার পরিবার গাড়ি নিয়ে আমার অফিসে আসবে , সেখান থেকে সবাই মিলে কলকাতা স্টেশন যাবো। প্রথম ধাক্কাটা খেলাম শুক্রবার দুপুর বারোটায়। আইআরসিটিসির থেকে মেসেজ পেলাম যে ট্রেনটা দুঘন্টা লেট্। যেটাকে ইংরেজিতে রিশিডিউল বলে, সেটাই ট্রেনটার সাথে হয়েছে।  দুপুর তিনটের পরিবর্তে ট্রেনটি বিকেল পাঁচটায় ছাড়বে। পৌঁছবেও দেরিতে। ভ্রমণসূচি পুরোই ঘেঁটে  গেলো। বাড়িতেও জানিয়ে দিলাম দেরি করে বেরোতে। তিনটে নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। প্ল্যান অনুযায়ী, আমার পরিবার নির্ধারিত সময়ে আমার অফিসের কাছে পৌঁছে গেলো।  আমরা সবাই মিলে, যখন কলকাতা স্টেশনে পৌঁছলাম, তখন প্রায় পৌনে চারটে  বাজে। ভাগ্যবশত রাস্তায় কোনো জ্যাম ছিল না। যেটা ছিল , সেটা হলো, জুন মাসের একটা ভ্যাপসা গরম। এতক্ষণে যখন মেসেজ দেখার সুযোগ পেলাম, দেখলাম বাদলবাবু যে নম্বরটা শেয়ার করেছিলেন, তাতে লেখা, স্বপন দত্ত জয়ন্তী। বুঝলাম আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোকের নাম স্বপন দত্ত। ভাবলাম ট্রেনে উঠে ওনাকে ফোন করবো।

ট্রেন পাঁচটায় ছাড়েনি , পনেরো কুড়ি মিনিট দেরি হয়েছে। এবার খেলাম দ্বিতীয় ধাক্কা, তাও আবার ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। দার্জিলিং মেল, পদাতিক বা কাঞ্চনকন্যা যতটা ভালো, এ ট্রেন ঠিক তার উল্টো। পরিচ্ছন্নতার ওপর যদি পরীক্ষা নেয়া হতো , তাহলে এই ট্রেনটিকে শূন্য দেয়াও বাড়াবাড়ি হয়ে যেত । একটি টয়লেটে জল নেই আবার আরেকটিতে জল লিক করে পুরো ভাসাভাসি অবস্থা। কিছুই করার নেই। মনের মধ্যে একরাশ বিরক্তি আর হতাশা দানা বাঁধলো।  ভাবলাম শুরুটা এরম হলে, পুরো ভ্রমণটা হতাশাজনক হতে চলেছে। এদিকে, ট্রেন ছেড়ে দেয়ার প্রায় ঘন্টা দুই পর, আমার কাছে স্বপনবাবুর ফোন এলো। আমার ফোন করার আগেই, উনি ফোন করলেন। ফোনে প্রথমবার ওনার গলা শুনেই বুঝতে পারলাম, ফোনের ওপারের ব্যক্তি বৃদ্ধ। ওনার বাচনভঙ্গিতেও কিছু সমস্যা আছে। সে সমস্যা হয়তো শারীরিক , কিংবা বয়সজনিত। যাই হোক, ওনাকে জানালাম ট্রেনের লেট্ ছাড়ার কথা। উনি জানালেন, নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে গেলে, ওনাকে ফোনে যেন জানিয়ে দিই । উনি ঠিক সময়ে চলে আসবেন।

পরদিন সকাল ছটায় ট্রেন পৌঁছে গেলো নিউ জলপাইগুড়ি। ট্রেন অর্ধেক খালি হয়ে গেলো ওখানেই। আমি অবশ্য সহযাত্রীদের সাথে আগেই আলাপ করেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম ট্রেন নিউ জলপাইগুড়িতেই খালি হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের গন্তব্য নিউ আলিপুরদুয়ার । তাই অপেক্ষায় বসে রইলাম। নির্ধারিত সাফারির টাইম ছিল সকাল নয়টা। ঠিকঠাক চললেও, ট্রেনটি নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছলো সাড়ে আটটার পর। সৌজন্যে বন্দে ভারত। নেতা মন্ত্রীদের গাড়ির মতো ইনি গেলে, বাকিদের যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ! ট্রেনের মধ্যেও একরকম বর্ণ বৈষম্য আছে কি না !

নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনটি ছোট, কিন্তু বেশ ছিমছাম। ভীড় খুব বেশি চোখে পড়লো না। ট্রেন আমাদের বাঁদিকের প্ল্যাটফর্মে নামালো। আমি দুহাতে লাগেজ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে স্টেশনের বাইরে বেরোনোর গেটের দিকে এগোতে লাগলাম। আমার পেছনে আমার পরিবার আমাকে অনুসরণ করতে লাগলো। স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই দেখলাম, রাস্তার দুধারে দুটো সারিতে বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ গাড়িই সাদা রঙের। এতগুলো সাদা গাড়ির মধ্যে, একটিমাত্র কালো স্করপিও দাঁড়িয়ে। বাদল ছেত্রীর থেকে জেনেছিলাম কালো স্করপিও পাঠাবে , তাই বুঝতে পারলাম এটিই আমাদের গাড়ি।  স্করপিওটির দিকে একটু এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, কালো স্করপিও তে হেলান দিয়ে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে আছেন । ভদ্রলোকের চেহারায় চোখ গেলো। লম্বায় ছ ফুটের কাছে , কিন্তু ভীষণ রোগা। পরনে একটা হাফ হাতা পাঞ্জাবি আর ফুল প্যান্ট। দেখে মনে হলো, বয়স আনুমানিক ষাট হবে । কাঁচাপাকা চুল আর দাড়ি। গাল গুলো ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। ভদ্রলোক যেন আমাদেরই খুঁজছিলেন। নির্দ্বিধায় ওই ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে বললাম – স্বপনবাবু ? উনি আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে, সেই বিশেষ বাচনভঙ্গিতে উত্তর দিলেন – হ্যাঁ। ওনার গলার স্বর, শারীরিক অসুস্থতার কারণে খ্যাসখ্যাসে। গাড়ির দিকে হাত দেখিয়ে বললেন – বসুন। আমাদের মালপত্র স্বপনবাবু নিজেই স্করপিওর পেছনের সিটগুলোতে রেখে দিলেন। মাঝে মা, স্ত্রী আর ছেলেকে রেখে আমি স্বপনবাবুর পাশে গিয়ে বসলাম। এরপর চললাম বক্সার উদ্দেশ্যে।

স্বপনবাবুর সাথে আলাপ জমানোর শুরুতেই বললাম আমার বিরক্তির কথা। ট্রেন লেট্ করাতে আমাদের ভ্রমণ সূচি কিভাবে ঘেঁটে গেলো। স্বপনবাবু রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে মৃদু হাসলেন। যেন এরম ব্যাপার প্রায়ই হয়ে থাকে। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে একটা কি যে ব্যাপার ছিল , যে তৎক্ষণাৎ আমার মনে হলো , এই বিশাল দেশের এই বিশাল রেল নেটওয়ার্কে কারো না কারো সাথে এই জিনিস হতেই পারে। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তার জন্যে, এই একরাশ বিরক্তি জমিয়ে রাখা এককথায় অপ্রয়োজনীয়। স্বপনবাবুর দিকে তাকিয়ে, মনের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলাম। মনে হলো, হয়তো প্রকৃতিই আমাকে ধীর স্থির হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

এবার স্বপনবাবু মুখ খুললেন। রাস্তায় যেতে যেতে নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনের ব্যাপারে বলতে লাগলেন। এই স্টেশনটি একটু দূরে। আলিপুরদুয়ার স্টেশন থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার। বললেন, বক্সার সবচাইতে কাছের রেল স্টেশন রাজাভাতখাওয়া । কিন্তু এখানে সব ট্রেন দাঁড়ায় না। তার জন্যে এখানে আসতে গেলে, আলিপুরদুয়ার স্টেশনে নেমে আসা সব থেকে ভালো উপায় । যাওয়ার পথে উনি আলিপুরদুয়ার স্টেশনটিকেও দেখালেন। এটিই এই এলাকার একটা পুরোনো স্টেশন। স্টেশনকে বামদিকে রেখে, ধীরে ধীরে নগর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগলাম, আর বাড়তে লাগলো রাস্তার দুধারে দাঁড়ানো গাছের সারি।

কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম এক সুবিশাল বটগাছ। বটগাছের নীচে কয়েকটা দোকানপাট, সেগুলোকে ঘিরে কিছু মানুষের আনাগোনা দেখতে পেলাম। এই বটগাছ এই গরমেও যে ছায়া প্রদান করছে, তাতে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা আচ্ছাদন রয়েছে , মনে হলো।  এই গাছকে কেউ কাটেনি , এমনকি এর কোনোরকম ডালপালাকে ছাঁটাও হয়নি। অবাধে বেড়ে গিয়েছে। বটগাছের নিচ দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার সময় দেখলাম রাস্তার ডানদিকে আরেকটি রাস্তা চলে গেছে। তখন বুঝলাম, এটি একটি মোড়। গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের জায়গাকে বটতলা বলা হয়। 

সুপ্রাচীন বটগাছ

আরো যত এগোতে লাগলাম, দেখলাম পথের দুধারে গাছের ঘনত্ব বাড়তে লাগলো। বাড়ি ঘর , মানুষজন এর সংখ্যা কমে যেতে লাগলো। বুঝতে পারলাম, এ এক অন্য জগতে প্রবেশ করতে চলেছি। নগরজীবন ও নগরায়নের প্রভাব এই এলাকায় প্রায় নেই বললেই চলে। এই জগতে কোলাহল বলতে শুধুই পাখিদের কলকাকলি। পিচ রাস্তা, ভেজা।  স্বপনবাবু জানালেন গতকাল রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। যতটা এগোতে লাগলাম, তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। খেয়াল করলাম, একটি ট্রেনলাইন সমান্তরাল পথে আমাদের পাশে পাশে এই অরণ্যগামী পথে চলেছে। স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করাতে, উনি বললেন – এটিই সেই রাজাভাতখাওয়ার ট্রেন লাইন। এই পথেই, আলিপুরদুয়ার থেকে মাল জংশন হয়ে ট্রেনগুলি শিলিগুড়ি যাচ্ছে। যদিও আমরা এই পথ দিয়ে আসিনি , তবে ফেরার সময় এই পথ দিয়ে ফিরবো। 

এইভাবে চলতে চলতে অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর দেখতে পেলাম, এক সাইনবোর্ড, যাতে লেখা রয়েছে –  আপনি আমাদের দেশের সবচাইতে সুন্দর বনভূমির মধ্যে প্রবেশ করছেন – সৌজন্যে বক্সা  টাইগার রিজার্ভ । লেখাটার সততা যে কতটা, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সবাই বুঝতে পারলাম। আমার মার মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো – আহা। বুঝলাম, প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য, হয়তো আমার মার মনেও প্রভাব বিস্তার করছে। এরপর আমরা আরো নিবিড় বনাঞ্চলে প্রবেশ করলাম। প্রকৃতির এতো কাছে এসে বুঝলাম , আমার মনের সমস্ত বিরক্তি , হতাশা এই সুবিশাল অরণ্যভূমির কাছে তুচ্ছ। শত অত্যাচারের পরেও প্রকৃতি যতটা সহনশীলতা প্রকাশ করে , তার সামান্য কিছুটা আমার মনের গভীরেও প্রবেশ করলো। মনের ভেতরের অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করা দুস্কর হয়ে উঠলো। তাই শুধু অনুভব করতে লাগলাম এই বনাঞ্চলকে। মনের গভীরে এক পরিতৃপ্তির অনুভব হলো। মনে হলো যেন, নিজের শেকড়ের কাছে চলে আসতে পেরেছি। চারপাশে তাকিয়ে বুঝলাম, এখানের  অধিকাংশ গাছই প্রাচীন। নির্বাধায় বেড়ে উঠেছে , উপর থেকে দেখলে মনে হবে , পুরো অঞ্চল জুড়ে কেউ যেন এক সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিও, এই চাদর  ভেদ করে মাটিতে পৌঁছতে পারছে না। কিছু কিছু জায়গায় রবিরশ্মীর লুকোচুরি খেলা চলছে, কিন্তু অধিকাংশ জায়গাই গাছের ছায়ায় ঢাকা। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হতে লাগলো , জীবনের অন্তত কিছুদিন, প্রকৃতির এই সুপ্রাচীন অভিভাবকদের মাঝে কাটাতে পারবো। আমার চোখমুখ দেখে, স্বপনবাবু কিছু হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আমাকে এই জঙ্গলের বিভিন্ন গল্প শোনাতে লাগলেন। আমি ঠিক ততটাই কৌতূহলী হয়ে শুনতে লাগলাম।

বক্সার প্রবেশদ্বারের সাইনবোর্ড

স্বপনবাবুর কথায় – বক্সা, ডুয়ার্স এলাকার এমন একটি জঙ্গল, যা প্রায় সাতশো কুড়ি বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ডুয়ার্সের অন্য কিছু  এলাকার মতো এটি গ্রাসল্যান্ড নয়। এটি ট্রপিক্যাল ফরেস্ট। এখানে নানান রকম পশু পাখির বাস। আমরা যেখানে চলেছি সেটা জয়ন্তী গ্রাম। এই ছোট্ট গ্রামে প্রায় দুহাজার মানুষ বসবাস করেন। বয়সের দিক থেকেও এই জনপদ যথেষ্ট প্রাচীন। জনপদকে একদিকে বেষ্টিত করেছে জয়ন্তী নদী আর অন্যদিকে বক্সা জাতীয় উদ্যানের জয়ন্তী রেঞ্জ। জয়ন্তী রেঞ্জের আরেকদিকে বয়ে চলেছে বালা নদী। এই এলাকায় ব্রিটিশ আমলে, ট্রেন চলাচলও করতো। একটা সময় এখানে ডলোমাইট খনি থাকার কারণে , বেশ রমরমা একটা ব্যাপার ছিল। বসবাস ছিল বহু মানুষের। আজ সেগুলো কিছুই নেই। পুরো এলাকাই নিবিড় অরণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে । স্বপনবাবুর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। অনেকটা ডাটা ট্রান্সফার করার মতো।

পথের ধারের গাছ

কথা বলতে বলতে স্বপনবাবু গাড়ি থামালেন। দেখলাম আমরা বক্সার প্রবেশদ্বারে পৌঁছে গেছি। এই জায়গার নাম রাজাভাতখাওয়া। এইখানেই অনুমতি নিতে হয়, জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করার। এই অনুমতিপত্র একদিন অবধি বৈধ থাকে। রাস্তার ডানদিকে একটি টিনের ছাউনি দেয়া বাড়ি। সেখানেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা টিকিট ঘর। কাউন্টারে কোনও ভীড় নেই। সেখানে ১০৮০ টাকা দিয়ে, চারজনের আর গাড়ির অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হলো। স্বপনবাবু জানালেন, স্থানীয় লোকেদের এই অনুমতিপত্রের দরকার পড়ে না। অনুমতিপত্র নিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। স্বপনবাবু স্টার্ট করলেন। ধীরে ধীরে আমাদের গাড়ি, ফাটক পেরিয়ে প্রবেশ করলো বক্সার অন্দরমহলে। বনানী এখানে, আরো আরো নিবিড় হয়ে এলো। মাঝে মাঝে কিছু গাড়ির দেখা মিললেও , পুরো রাস্তা ছিল খালি । পিচের রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে, আর দুধারে ঘন বনাঞ্চল। আর দেখা যাচ্ছে না, সেই ট্রেনলাইন । পথের দুধারে শুধুই তরুকূলের সমাগম। মাঝে মাঝে কিছু অচেনা পাখির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাকি আর কোনো শব্দই নেই। আমরা এখন সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। এই সুন্দর চারিপাশকে সাক্ষী রেখে , আমাদের গাড়ি পিচরাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে চলেছে।  স্বপনবাবু জানালেন, প্রথম দশ কিলোমিটার আমাদের এই পথে সোজা চলতে হবে। আমরা পিচ রাস্তার দুপাশের এই যে বনাঞ্চল দেখতে পাচ্ছি, সেটা বক্সার রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জের অন্তর্গত। স্বপনবাবুর কথা শুনতে শুনতে, খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গেলো, প্রথম দশ কিলোমিটারের দূরত্ব। পৌঁছলাম জয়ন্তী মোড়।

রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ

এখানে গাড়ি দাঁড়ালো। স্বপনবাবু দেখালেন, সোজা রাস্তা চলে গেছে সান্তালবাড়ির দিকে, আর জয়ন্তী জনপদ যেতে গেলে, ডানদিকের বাঁক নিয়ে আরেকটি পিচের রাস্তা ধরতে হবে। আমাদের গাড়ি, ডানদিকে চললো। এইদিকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গেলে তবেই পৌঁছে যাবো জয়ন্তী। এইপথেও উঁচু উঁচু গাছ দিয়ে সাজানো, এই বনাঞ্চলের অনবদ্য শোভা। রাস্তা এখানে খুব ভালো। দশ মিনিট অরণ্যের সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে কেটে গেলো। আমরা পৌঁছে গেলাম এক রিভারব্রীজের কাছে। স্বপনবাবু এখানে গাড়ি দাঁড় করালেন। আমি গাড়ি থেকে না নেমেই দেখতে লাগলাম এই নদীটিকে। অসংখ্য নুড়ি পাথর ভর্তি এই নদীতে। । এটিকে রিভারবেড বলে। গতকালের বৃষ্টির কারণে এখানে একটি শীর্ণকায়, কর্দ্দমাক্ত জলরাশি বয়ে চলেছে। তবে সেই জলরাশির ব্যাপ্তি খুবই সামান্য। পুরো রিভারবেড  জুড়ে বয়ে চলার মতো বৃষ্টিপাত এখনো হয়নি। রিভারবেডের  দুধারে ঘন জঙ্গল। ব্রীজের ওপর থেকে দাঁড়িয়ে আমার বামদিকে আর ডানদিকে দুদিকেই দেখলাম ঘন জঙ্গল। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, ব্রীজের বাঁপাশে কিছুটা দূরে দুটো স্তম্ভ । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, পুরোনো ব্রীজের ভগ্নাংশ। স্বপনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি জানালেন – ওটি পুরাতন রেল ব্রীজের স্মৃতি। ওই রেল ব্রীজ আর নেই , রয়ে গিয়েছে শুধু ওই দুটি স্তম্ভ। বহুকাল আগে , গৌতম ঘোষের ” আবার অরণ্যে ”  ছায়াছবিতে ওই ব্রীজের বেশ কিছু অংশ দেখা গিয়েছিলো।

বালা রিভারব্রীজ

ব্রীজে দাঁড়িয়ে উপরদিকে তাকিয়ে দেখলাম , একটা সার্পেন্ট ঈগল পুরো এলাকার ওপর নজর রাখছে। অনেকসময় জঙ্গল থেকে পশু পাখিরা এই রিভারবেডে জল খেতে বা এপাশের জঙ্গল থেকে অপর পারে যাওয়ার জন্যে বেরিয়ে আসে। তখন তাদের দেখা পেলেও, পাওয়া যেতে পারে। স্বপনবাবু জানালেন, এই নদীর নাম বালা। গাড়িতে আবার উঠে বসলাম। মিনিট পাঁচেক গাড়ি চলার পর , আগাম আভাস মিললো যে, সামনে কোনো জনপদ রয়েছে।

জয়ন্তী জনপদের যে মূল বাজার এলাকা, সেই জায়গায় পৌঁছে দেখলাম রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সুবিশাল বটগাছ। সেই গাছকে কেন্দ্র করে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে বেশ কিছু খাবার দোকান। এখানে চা থেকে শুরু করে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং হয়তো অর্ডার দিলে ডিনারও পাওয়া যায়। বটগাছের নিচেই রয়েছে একটি মোড়। সোজা গেলে জয়ন্তী নদীতীরে পৌঁছনো যায়। সরকারি থাকার জায়গা রয়েছে সেখানে। নদীর দিকে মুখ করে তাকালে, বটগাছের বামদিকে রয়েছে একটি সেনাছাউনি। ডানদিকে গেলে দেখা যায় প্রচুর স্থানীয় লোকেদের ঘরবাড়ি । কিছু কিছু  হোমস্টেও রয়েছে । লক্ষ্য করলাম, এখানে সব বাড়িতেই টিনের ছাউনি দেয়া। বাড়িগুলির নির্মাণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঠের প্রয়োগ করা হয়েছে। আমরা বটগাছের গা ঘেঁষে নেমে যাওয়া ডানদিকের রাস্তা দিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম বাদল ছেত্রীর বাড়ি। পর্যটকদের সুবিধার্থে এই বাড়ির এক খুব সুন্দর নাম দেয়া হয়েছে। সেই পোশাকি নাম – ডুয়ার্স প্রকৃতি ।

জয়ন্তীর পথে

গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই এগিয়ে এলেন বাদলবাবু। লম্বা এবং ছিপছিপে চেহারা। গায়ের রং ফর্সা। পরনে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাঢ় সবুজ রঙের জামা এবং একটি কালো প্যান্ট। মাথার চুল সাদাকালো। আজকাল অনেকে এটিকে সল্ট পেপার বলেন। বাদলবাবুর বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে। এগিয়ে এসে বললেন – স্যার আপনাদের লেট্ হয়ে গেছে। সাফারির টাইম হয়ে গেছে। আঙ্গুল দিয়ে ডানদিকের বাড়িটির দোতলাটা দেখিয়ে বললেন – আপনারা মালপত্র রেখে, দশ মিনিটে যা ফ্রেশ হওয়ার হয়ে নিন। আর মনে করে ব্রেকফাস্ট এর অর্ডার দিয়ে দিন। আঙ্গুল দিয়ে নিজের পেছনদিকের একটি ঘর দেখালেন। বুঝলাম ঐটি কিচেন। আমরা সাফারি থেকে ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করবো।

ঘড়িতে দেখলাম, সকাল নটা বেজে গেছে। যে বাড়িটির দোতলায় উঠলাম, সেটি সম্ভবত ডুয়ার্স প্রকৃতি নয়। কারণ বাদলবাবু আমাকে আগেই রুমের ছবি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের দেরি করলে চলবে না।  আমরাও তড়িঘড়ি করে ওই ঘরে ব্যাগপত্র রেখে, মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নিলাম। এরপর দোতলার ঘর থেকে নিচে নেমে যে রান্নাঘর দেখেছিলাম , সেখানে সবার জন্যে লুচি তরকারির অর্ডার দিয়ে দিলাম। সঙ্গে করে কেক, বিস্কুট ট্রেনে ওঠার আগেই নিয়েছিলাম, এবার সেটা হাতের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম । সকলেরই খিদে পেয়েছে, সাফারির সময় কাজে লাগতে পারে। সবাই মিলে বাড়ির বাইরে যখন এলাম , তখন আর স্বপনবাবুকে দেখতে পেলাম না। উনি বাড়ি চলে গেছেন। তাড়াহুড়োর মাথায় ওনাকে বিদায় জানাতে পারলাম না । গল্প করতে করতে বলেছিলেন, ওনার বাড়ি এখানেই। ভাবলাম, উনি যখন এখানেই থাকেন, তখন এই দুদিনে নিশ্চই দেখা হয়ে যাবে। তাছাড়া আমাদের তো স্টেশনে ড্রপও লাগবে, তখন না হয় বাদলবাবুকে বলে স্বপনবাবুর গাড়িটি ভাড়া করবো। এইসব ভাবছি , সেইসময় বাদলবাবু  এসে বললেন – স্যার গাড়ি রেডি।

পরের পর্ব পড়ুন

Leave a comment