বিষ্ণুপুর এর মন্দিরগুলি

টেরাকোটা – এটি একটি ল্যাটিন শব্দ। টেরা মানে মাটি আর কোটা মানে ড্ৰাই কোটিং। টেরাকোটাকে একসঙ্গে বলা হয় বেক্ড ক্লে ওয়ার্ক বা পোড়ামাটির  ফলক। এই নদীমাতৃক বাংলায় আমরা কোনোদিনই মাটির অভাব বোধ করিনি। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে , আমাদের পুরোনো মন্দিরগুলোতে এই পোড়ামাটির অসাধারণ সব কাজ রয়েছে। বাংলার টেরাকোটার এক অন্যতম পীঠস্থান বিষ্ণুপুর। এখানে টেরাকোটা শুধু মন্দিরেই সীমাবদ্ধ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আর উপহার সামগ্রীর মধ্যেও টেরাকোটার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। আরো গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, টেরাকোটা বিষ্ণুপুরের এক জনপ্রিয় শিল্প। ইতিহাস সেখানে এই শিল্পকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে, তাইতো প্রচুর মানুষের জীবন জড়িয়ে পড়েছে এই টেরাকোটার সাথে। শতাব্দীপ্রাচীন এই ইতিহাস আর শিল্পকে সাথে নিয়ে আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বিষ্ণুপুর।

এই বিষ্ণুপুরের গল্প শুরু হয় খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের শেষ থেকে। সেই সময় আদিমল্ল রঘুনাথের হাত ধরে মল্লরাজ শুরু হয়। আদিমল্ল এর রাজধানী ছিল প্রদ্যুম্নপুর যা অধুনা জয়পুরের নিকটে অবস্থিত। বিষ্ণুপুরে অনেক পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। তবে বিষ্ণুপুরের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় প্রবল পরাক্রমী মল্লরাজা বীরহান্বিরের আমলে। যুদ্ধ ছেড়ে যখন তিনি শ্রীনিবাস আচার্য্যর কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন তখন থেকে সারা মল্লরাজত্ব জুড়ে তৈরি হয় বিষ্ণুর মন্দির, রাসমঞ্চ ইত্যাদি। সেই থেকেই এই জায়গার নামকরণ হয় বিষ্ণুপুর।

বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি বৈচিত্র্যময়। এই মন্দিরগুলির স্থাপত্যে অনেকরকম পাথরের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিছুক্ষেত্রে ঝামা বা মাকড়া পাথর এবং কিছু ক্ষেত্রে ল্যাটেরাইট পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। মন্দিরগুলির গঠনশৈলীতেও বৈচিত্র রয়েছে। অনেক একরত্ন মন্দিরের মাঝেও জোড় বাংলা শৈলীর মন্দির দেখা যায়। কোথাও পঞ্চরত্ন গঠনশৈলীও দেখা যায় ।

মুগ্ধ করার মতো টেরাকোটার অলংকরণ দেখা যায় মূলত তিনটি মন্দিরে। শ্যাম রাই মন্দির , মদনমোহন মন্দির এবং জোড় বাংলা মন্দির। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী , রামায়ণ এবং মহাভারতের ঘটনা বিশেষ , বিষ্ণুর দশাবতার , যুদ্ধ ইত্যাদির চিত্রায়ন দেখা যায় এই টেরাকোটার অলংকরণে। আবার কিছু মন্দিরের অলংকরণে পঙ্খ এবং পাথরের কাজ দেখা যায়।

বিষ্ণুপুরের বড়ো মন্দিরগুলিকে ঘিরে ভোগকক্ষ , তুলসীমঞ্চ ও নাটমন্দির নির্মাণ এর রীতি রয়েছে । এটি সবথেকে ভালো বোঝা যায় রাধামাধব এবং কালাচাঁদ মন্দির চত্বরে। পরিষ্কার এই মন্দির চত্বর, ভারতীয় প্রত্নতত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত। মদনমোহন মন্দির প্রাঙ্গণেও চারচালা ভোগকক্ষ দেখা যায়।  

বিষ্ণুপুরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হলো রাসমঞ্চ। এই স্থাপত্যটির নির্মাণশৈলীতে মিশ্র সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে। সৌধটির উপরের দিকটি পিরামিডাকৃতি , মাঝের দিকটি বাংলা চালার ন্যায় আবার নিচের খিলানগুলি ইসলামিক স্থাপত্যের মতো। আনুমানিক ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে এই মঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেন মল্লরাজ বীরহাম্বির। এর নীচের বেদী মাকড়া পাথরের তৈরী আর উপরের স্থাপত্য ইঁটের।

মল্লরাজত্বের রাজধানী থাকার কারণে বিষ্ণুপুরের আশেপাশে মোট সাতটি বাঁধ রয়েছে। শহরে জল সরবরাহের জন্য নির্মিত এই বাঁধগুলির মধ্যে অন্যতম হলো লালবাঁধ। কথিত আছে লালবাইয়ের সাথে প্রেম চলাকালীন রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ , প্রেমিকার সাথে এই দীঘিতে নৌকাবিহার করতেন।

লালবাঁধ

স্থাপত্য ছাড়াও মল্লরাজদের প্রবল পরাক্রমের একটি প্রতীক দলমাদল কামান। প্রায় ৬৩টি লোহার আংটা পেটাই করে তৈরী করা হয় এই কামান। বর্গী আক্রমণ থেকে বাঁচতে এই কামান গর্জে ওঠে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে। দলমর্দ্দন  থেকে কামানের নামকরণ হয় দলমাদল। কামানের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে বারো ফুট।  

দলমাদল কামান

মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরী বিষ্ণুপুরের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হলো একটি তোরণদ্বার। এটি বড় পাথর দরজা নামে পরিচিত। এটিই বিষ্ণুপুরের প্রাচীন দুর্গের উত্তরদিকের প্রবেশপথ। সপ্তদশ শতকে এটি নির্মাণ করেছিলেন মল্লরাজ বীরসিংহ। এখানে তীরন্দাজ এবং বন্দুকধারী সৈন্যদের অস্ত্র চালাবার জন্যে ক্ষুদ্র গর্ত ছিল। এই দ্বিতল দালান থেকেই রক্ষা করা হতো বিষ্ণুপুরের মল্লসাম্রাজ্যকে। এর অদূরেই একটি ছোট পাথর দরজাও দেখা যায়।

দেবতা আরাধনা ছাড়াও এই বিষ্ণুপুর জুড়ে রয়েছে কিছু দেবীমন্দির। এরমধ্যে সবথেকে প্রাচীন মন্দিরটি হলো মা মৃন্ময়ী মন্দির। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মল্লরাজ জগৎমল্ল এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন আনুমানিক ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে। গঙ্গামাটির তৈরী মা মৃন্ময়ীর অপরূপ মূর্তি, মুগ্ধ করে।

দলমাদল কামানের পাশের রাস্তায় রয়েছে মা ছিন্নমস্তা মন্দির। বাংলা ১৩৮০ সালে মেদিনীপুর নিবাসী স্বর্গীয় কৃষ্ণচন্দ্র গুঁই এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। অপূর্ব এই মায়ের মূর্তিটি একটি গোটা শ্বেত পাথর কেটে তৈরী করা।

মন্দির ছাড়াও বিষ্ণুপুর, বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির এক অন্যতম পীঠস্থান ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেরাকোটা শিল্প। যার কিছু ঝলক পাওয়া যায় মন্দির সংলগ্ন দোকানগুলিতে এবং বিশেষ করে পোড়ামাটির হাটে। প্রতি সপ্তাহান্তে এই হাটে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী নৃত্য।

কিভাবে ঘুরবেন – গাড়ি নিয়ে আমাদের বিষ্ণুপুর পৌঁছতে বেলা হয়ে গেছিলো। দুপুরে লাঞ্চের পর আমরা টোটো রিজার্ভ করে আগে গিয়েছিলাম রাসমঞ্চ। গাইড ভাড়া নিয়ে রাসমঞ্চ ঘুরে দেখেছিলাম। সেখান থেকে শ্যামরাই মন্দির। তারপর গিয়েছিলাম জোড় বাংলা, রাধাশ্যাম এবং লালজি মন্দির দেখতে। ওই চত্বরের পাশেই দুটি তোরণদ্বার অবস্থিত, সেগুলো দেখে গিয়েছিলাম মা মৃন্ময়ী মন্দির দেখতে। সেখানেই সন্ধে হয়ে যায়। বিষ্ণুপুর মিউজিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, বিষ্ণুপুর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। সেখানে ফটোগ্রাফি নিষেধ। মিউজিয়াম ঘুরে শেষে পৌঁছেছিলাম পোড়ামাটির হাটে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে প্রায় সন্ধে সাড়ে সাতটা বেজে গিয়েছিলো। পরদিন সকালে আটটার সময় বেরিয়ে পড়েছিলাম বাকি জায়গাগুলো দেখতে। দলমাদল কামান আর তার পাশেই অবস্থিত ছিন্নমস্তা মন্দির দেখে শুরু করেছিলাম। সেখান থেকে একে একে রাধাগোবিন্দ মন্দির , জোড় শ্রেণীর মন্দিররাজি , রাধামাধব মন্দির , কালাচাঁদ মন্দির ঘুরে নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিলাম লালবাঁধ দেখতে। লালবাঁধ দেখে গিয়েছিলাম মদনমোহন মন্দির দেখতে। তারপর বেলা দশটায় হোটেলে পৌঁছে ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে চেকআউট করেছিলাম।

খরচা – দুদিন মিলিয়ে টোটো প্রায় ৭৫০/- টাকা নিয়েছিল। গাইড চার্জ ৩৫০/- টাকা। এছাড়া মাত্র ২৫/- টাকা জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য দিয়ে আপনি রাসমঞ্চ, শ্যামরাই এবং জোড়বাংলা মন্দির ঘুরে নিতে পারেন। মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য ১০/- টাকা।

কোথায় থাকবেন – পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা বিষ্ণুপুরে অনেক রয়েছে। তবে আমার ঠিকানা ছিল নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত কাঠুরিয়া গ্রিন নেস্ট। আন্তরিকতায় ভরা ওনাদের আতিথেয়তা মন কেড়ে নেয়। মনে হয় বারবার আসি। সৌজন্যে শ্রী সজল এবং সৌমাল্য কাইটি। থাকার জন্যে রয়েছে দুটি ঘর যেখানে ২ জনের জন্য থাকার ব্যবস্থা। ২২০০/- টাকা থাকার খরচ। পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন এই ঘরে বসার চেয়ার, লেখার বা পড়ার টেবিলও রয়েছে। থাকা এবং খাওয়া বাবদ আমাদের মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০০০/- টাকার মতো। আমরা খেয়েওছিলাম অনেক কিছু, তার মধ্যে বাঁকুড়ার বিখ্যাত মেচা সন্দেশও ছিল। বিদায় নেবার সময় সজলবাবুরা উপহার স্বরূপ একটি গাছের চারা দিয়েছিলেন। এই ছোট্ট আন্তরিকতা খুব ভালো লেগেছিলো। কাঠুরিয়াতে থেকে শুধুমাত্র বিষ্ণুপুরের মন্দির ছাড়াও প্রকৃতিকেও উপভোগ করতে পারেন। পাখি দেখার শখ থাকলে, অনেক পাখিও দেখতে পাবেন। তবে সঠিক সময়ে যেতে হবে। বুকিং এর জন্যে ওনাদের কল করতে পারেন এই নাম্বারে ৯৪৩৩১-৩৮৩৫২।

কখন যাবেন – গ্রীষ্ম ও বর্ষা বাদ দিয়ে বিষ্ণুপুর এসে ঘুরে নেয়া যায়। দেড়দিনেই ঘুরে ফেলা যায় দর্শনীয় স্থান গুলি। এছাড়াও রাস উৎসবের (নভেম্বরে ) সময় এবং বিষ্ণুপুর মেলার (ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে) সময়ও বিষ্ণুপুর ঘুরে আসতে পারেন।

কিভাবে যাবেন – বিষ্ণুপুরে অনেকভাবে পৌঁছনো যায়। সাঁতরাগাছি স্টেশন থেকে সকাল সাড়ে ছোট নাগাদ ছাড়ে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস। সকাল সাড়ে নয়টায় বিষ্ণুপুর পৌঁছয়। এছাড়া হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে আসতে পারেন আরামবাগ। সেখান থেকে বাসে বিষ্ণুপুর পৌঁছতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। নিজের গাড়ি থাকলে লং ড্রাইভে জয়পুর ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে পৌঁছতে পারেন বিষ্ণুপুর। ভালো লাগবে।

Leave a comment