আদিসপ্তগ্রামের ইতিকথা

আদিসপ্তগ্রাম নামের মধ্যেই আদি রয়েছে। এই আদি শব্দ ব্যবহার করা হয় কোনো প্রাচীন কিছুকে বোঝাতে। বুঝতেই পারছেন এই আদিসপ্তগ্রাম নামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের পুরোনো ইতিহাস।

বহুকাল আগে এটি সপ্তগ্রাম নামে পরিচিত ছিল। সপ্তগ্রাম কথার অর্থ সাতটি গ্রাম। সপ্তগ্রাম জায়গাটি যে সাতটি গ্রাম নিয়ে তৈরী সেগুলি হলো বাঁশবেড়িয়া , বাসুদেবপুর , কৃষ্ণপুর , নিত্যনন্দপুর , শিবপুর , বলদঘাটি ও সাম্বচোরা। সপ্তগ্রামের উল্লেখ বা ইতিহাস বাংলার সেই পাল ও সেনযুগের সময়কার। সরস্বতী নদীতীরের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এবং বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল সপ্তগ্রাম। বাংলায় বখতিয়ার খিলজি আসার পর থেকে সপ্তগ্রামের স্বর্ণযুগ শুরু হয়। পরের দিকে সপ্তগ্রাম ও ব্যান্ডেলে পর্তুগিজএর আগমন ঘটে , সরস্বতী নদীও শুকিয়ে যেতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সপ্তগ্রাম নিজের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে থাকে। পরবর্তীকালে চুঁচুড়া , চন্দননগর ও কলকাতার উত্থান শুরু হয়। শোনা যায় ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে ইবন বতুতাও একবার সপ্তগ্রামে এসেছিলেন।

সরস্বতী নদী

ভাবছেন এতো ইতিহাসের কথা আমি কেন বলছি , কারণ এর সাথেই জড়িত আছে সপ্তগ্রামের বেশ কিছু গন্তব্য। কয়েকমাস আগেই যেই জায়গাগুলি আমি ঘুরে এসেছি। পুরাকালের সপ্তগ্রাম আজ আদিসপ্তগ্রাম নামেই বেশি পরিচিত। আদিসপ্তগ্রাম স্টেশনে আপনারা বর্ধমান লোকালে আসতে পারেন অথবা ব্যান্ডেল স্টেশনে নেমেও অটো করে আসতে পারেন। দূরত্ব আনুমানিক ৪ কিমি। আমি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এখানে পৌঁছেছিলাম।

উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরবাড়ি – আদিসপ্তগ্রাম স্টেশনের কাছেই অবস্থিত এই উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরবাড়ি। এই বাড়িতে বাস করতেন উদ্ধারণ দত্ত , যিনি মনেপ্রাণে বৈষ্ণব ছিলেন। তার এই বাড়িতে একবার পদধূলি দ্যান শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু। শোনা যায় উদ্ধারণ দত্ত পূর্বজন্মে শ্রীকৃষ্ণের বাল্যসখা সুবাহু ছিলেন। নিতাই প্রভুর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন উদ্ধারণ দত্ত। অপূর্ব সুন্দর মন্দির ও ঠাকুরবাড়ি দেখতে পাবেন কখনো এখানে এলে। মন্দিরের কিছু কাজ চলছিল বলে যখন গিয়েছিলাম তখন মূল গর্ভগৃহ বন্ধ ছিল। এই গর্ভগৃহ ত্রিখিলান বিশিষ্ট , সামনেটায় একটি নাটমন্দির রয়েছে। নিতাই প্রভুর স্মৃতি বিজড়িত একটি মাধবীলতা গাছ মন্দির প্রাঙ্গনে দেখা যায়।

উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরবাড়ি
ঠাকুরবাড়ি প্রাঙ্গনের মাধবীলতা গাছ
উদ্ধারণ দত্তর স্মৃতিতে

সৈয়দ জামালুদ্দিন মসজিদ – ষোড়শ শতাব্দীতে যখন সপ্তগ্রামের স্বর্ণযুগ , তখন সৈয়দ জামালুদ্দিন এই প্রাচীন মসজিদটির স্থাপনা করেন আনুমানিক ১৫২৯ খ্রিস্টাব্দে। মসজিদের দেয়ালে কিছু টেরাকোটার কাজ দেখার মতো। পিছনদিকে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী। এই চত্বরেই সমাধিস্থ সৈয়দ জামালুদ্দিন ও তার পরিবার।

মসজিদের ভেতরে
মসজিদের দেয়ালে
জামালুদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সমাধি

সুয়াখাল পর্যটন কেন্দ্র – যদিও এটির সাথে সপ্তগ্রামের ইতিহাসের কোনো যোগ নেই তবুও সচেতনতার খাতিরে এটির ব্যাপারে লিখছি। বছর দশেক আগে সুয়াখালে বিভিন্ন উপায়ে তৈরী বিদ্যুৎশক্তির প্রদর্শনী হতো। যেমন তাপবিদ্যুৎ , সৌরবিদ্যুৎ , জলবিদ্যুৎ। আমি সেই সূত্রেই কৌতহলবশতঃ প্রবেশ করি। এখানে লোকেদের সাথে কথা বলে জানতে পারি , আজ আর কিছুই নেই , প্রদর্শনী বহু বছর থেকে বন্ধ। যন্ত্র সব বিকল হয়ে পরে রয়েছে। সরকারের অবহেলায় সুয়াখাল আজ শুধুমাত্র ডিজে পিকনিক আর ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীদের সময় কাটানোর জায়গা। একটি জিনিস ভালো লাগলো তা হলো গলা ভেজানো গ্যালো ঠান্ডা জলের জলাধার থেকে।

সুয়াখাল পার্ক

দেবানন্দপুর – এই জায়গার সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের জন্মস্থান ও আদিবাড়ি। এই বাড়িটিতেও রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে অনেক আগাছার জন্ম হয়েছে। অদূরে শরৎ স্মৃতি পাঠাগার রয়েছে , সেখানে লেখকের স্মৃতি বিজড়িত একটি সংগ্রহশালা রয়েছে। পাঠাগারের কাছের স্কুলের মাঠে দেখতে পেলাম প্রায় ১৭০ বছরের পুরোনো টেরাকোটা মন্দির। একটি মন্দিরে শিবমূর্তি চোখে পড়লো , অন্যটি বন্ধ ছিল।

শরৎচন্দ্রের মূর্তি , তাঁর পৈতৃক বাড়ির সামনে
পুরোনো আটচালা শিবমন্দির
১৭০ বছরের পুরোনো মন্দির

কৃষ্ণপুর – আদিসপ্তগ্রামে মৎসমেলার আয়োজন করা হয় প্রতিবছর মাঘ মাসের ১ তারিখে। সেই জায়গাটি হলো এই কৃষ্ণপুর। এখানে একটি ছোট্ট গল্প বলি। আপনারা অনেকেই হয়তো পানিহাটির দণ্ডমহোৎসবের কথা শুনে থাকবেন , যাকে দই চিড়ে উৎসবও বলা হয়। বহুকাল আগে শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু এক ভক্তকে দণ্ড দিয়েছিলেন সংসার ত্যাগ করে আসার জন্যে। বাকি ভক্তদের দই চিড়ে খাওয়ানো ছিল সেই দণ্ড। যে ভক্তকে তিনি দণ্ড দ্যান তিনি শ্রী রঘুনাথ দাস গোস্বামী। তাঁর বাড়ি এই কৃষ্ণপুর। অনেকদিন পুরীতে কাটানোর পর , তিনি মকর সংক্রান্তিতে বাড়ি ফেরেন। তখন একদল বৈষ্ণব তাঁর ভক্তির পরীক্ষা স্বরূপ তার কাছে ইলিশ মাছ ও আমের টক খাবার আবদার করেন। রঘুনাথ গোস্বামী শীতকালে কোথায় পাবেন এসব , বিচলিত হয়ে তিনি মনে মনে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করেন। পরে তার বাড়ির পুকুরে জোড়া ইলিশ ও বাগানে আম পাওয়া যায়। বৈষ্ণবরা বিস্মিত হয়ে যান। সেই থেকে রঘুনাথ গোস্বামীর বাড়ির সামনেই এই মৎসমেলার আয়োজন করা হয়। মেলার নাম উত্তরায়ণ মেলা। অনেক বৈষ্ণব মানুষ এই দিনে মৎস সহকারে অন্ন গ্রহণ করেন। গোস্বামী বাড়ির ঠাকুর দর্শন করে ফিরে এলাম।

গোস্বামী বাড়ি
সেই উত্তরায়ণ মেলা
গোস্বামী বাড়ির ঠাকুর

ভ্রমণ ভিডিওটি নিচের লিংকে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন।

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবেই , এই আশা রাখবেন। এরপর যখন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করবেন , অবশ্যই এক সপ্তাহান্তের বিকেলে ঘুরে নিতে পারেন আদিসপ্তগ্রাম। দেবানন্দপুরের কাছেই লাহিড়ী বাবার আশ্রম ও গায়েত্রী আশ্রমেও ঘুরে আসবেন , ভালো লাগবে।

Leave a comment