লেখাটার নামটা একটু অদ্ভুৎ , তাই না ? এটাই ভাবছেন তো? আপনাকে বলে রাখি, এটিও আমার এক আদ্যোপান্ত ভ্রমণ কাহিনী। হুগলি জেলারই তিনটি জায়গা কয়েক ঘন্টার মধ্যে ঘুরে ফেলবো, ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম একদিন দুপুর ২টোর সময়। সঙ্গে এক গাড়ি ও গুগল ম্যাপ। ব্যাস শুরুতেই চললাম বনমালীপুর , ত্রিনাথ দর্শনে।
ত্রিনাথ মন্দির
প্রথমেই বলি , আপনি এরম কি কখনো শুনেছেন যে সারা ভারতে মোট ৪ টি মন্দিরের একটি এই হুগলি জেলায়? একটু অস্বাভাবিক হলেও, এটি সত্যি। সদ্গুরু শ্রী নারায়ণ মহারাজ এর শিষ্যরা সারা ভারতে চার ব্রহ্মদত্ত ধাম বানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথম ধাম জলকোটি, মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত। দ্বিতীয়টি কন্যাকুমারীতে আর তৃতীয় মন্দিরটি এই বনমালিপুরে তৈরী হয়েছে। চতুর্থ মন্দিরটি সম্ভবতঃ হিমাচল প্রদেশে তৈরী হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন মন্দির ঘুরে বেড়ানোর সখ রাখি না; যদি না, সেই মন্দিরের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট থাকে। বুঝতেই পারছেন, সারা ভারতে কত মন্দির আছে! এরম অবস্থায় আমি একদিন ইন্টারনেটে এই মন্দিরের ছবি দেখি, কিছু স্থানীয় লোকেদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এ মন্দির বিশাল বড়ো। কত্তোবড় , এই কৌতুহলবশতঃ পৌঁছলাম ব্রহ্ম দত্ত ধাম। হ্যাঁ এই নামেই মন্দিরগুলো পরিচিত।

এতো বড় মন্দির আমি আমার জীবতাবস্থায় দেখিনি। কাশি বিশ্বনাথ দর্শন করেছি , ভীমাশঙ্কর এ গেছি, আরও অনেক জায়গাতে গিয়েছি, কিন্তু এতো বড় মন্দির দেখিনি। এ মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন ত্রিনাথ, মানে ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং মহেশ্বর। মন্দির অনেকটাই তৈরী হওয়া বাকি রয়েছে, তবে পুরো তৈরী হলে একসাথে অন্তত হাজার হাজার লোকেরা মন্দিরে প্রবেশ করে পুজো দেখতে পারবে।

মন্দিরের চারিপাশে থাকার ব্যবস্থাও হচ্ছে, সম্ভবতঃ মন্দিরের পূজারী ও অন্যান্যদের জন্যে। মন্দিরে ঢুকতেই একটি বড়ো মিনার আছে, মাঝামাঝি রয়েছে বিশাল বড়ো মন্দির ও চারপাশে থাকার জায়গার মতো তৈরী হচ্ছে। ছবিগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন। যাই হোক মন্দির দর্শন করে রওনা দিলাম পরের গন্তব্যের দিকে।

মিনার 
ত্রিনাথ 
করিডোর
রামপাড়া কালীবাড়ি
১ ঘন্টার মধ্যেই এসে পৌঁছলাম, রামপাড়া কালীবাড়ি। এটি হুগলি জেলার প্রাচীন কালিবাড়িগুলির মধ্যে একটা। প্রায় ৩০০ বছর ধরে মাকালী সিদ্ধেশ্বরী রূপে এখানে পূজিত হচ্ছেন। তখনকার দিনের নন্দীবাড়ির পুজো এটি। তারা সেখানকার জমিদার ছিলেন। ঠাকুরদালানের পুজো দেখবার সুযোগ সামনে থেকে কালিবাড়িটিকে দেখে অনুভব করলাম।

কালীবাড়ির পিছনে এখনো সেই জমিদার বাড়ি রয়েছে। বাড়ির গঠনশৈলী দেখেই বোঝা যায় সেকেলের আভিজাত জমিদার পরিবার, কেমন ভাবে দিন কাটিয়েছেন। সেই বাড়িতে এখনো লোকেরা থাকেন।

কালীমূর্তি 
জগন্নাথ মন্দির 
মন্দিরের পাশে জমিদার বাড়ি
বিশেষ কারো সাথে কথা বলিনি ইতিহাস সম্পর্কে , তবে ভালোভাবে জানতে রামপাড়া কালীবাড়ির উইকিপিডিয়া পেজটি পরে দেখতে পারেন। কালীবাড়ির পাশেই এক জগন্নাথ মন্দির রয়েছে , সেটিও দর্শন করলাম। এরপর বেরোলাম পরের গন্তব্যের দিকে।

গ্রামের নাম রাবড়ি
রাবড়ি আমরা প্রত্যেকেই খেয়েছি, কিন্তু একদিন ফেসবুকে জানতে পারি যে আমার বাড়ির কাছেই এক এমন গ্রাম রয়েছে, যেখানে প্রতি বাড়িতেই তৈরী হয় রাবড়ি। বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার , ঠিক করলাম একদিন গিয়েই দেখবো ব্যাপারটা কি! আমার এক ভাই অতনুর বাড়ির খুব কাছেই এই গ্রাম। বারুইপাড়া থেকে যাওয়া যায়। যখন ওর সাথে এইটা শেয়ার করলাম, ও বললো দেখে জানাবে। তারপর হটাৎ করে একদিন অতনু আমাকে জানালো, ও গিয়ে দেখেছে এবং খেয়েওছে। যা বললো তাতে মনে হলো, সে রাবড়ি খাওয়া মানে এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। ব্যাস আর দেরি করিনি। এই ছোট্ট ভ্রমণেই প্ল্যান করে ফেললাম রাবড়ি গ্রাম যাওয়ার।

রাবড়ি গ্রাম 
রাবড়ি প্যাকড (ছবি – অতনু মারিক)
রামপাড়া থেকে যখন রাবড়ি গ্রাম পৌঁছোই , তখন প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। তাই ছবি বিশেষ তোলা হয়নি। যা ছবি দেখছেন সবই অতনুর তোলা। এই গ্রামে কখনো গেলে অবশ্যই হেমা মুক্ত ভবনে যাবেন। ওঁনাদেরি বাড়ির রাবড়ি বিখ্যাত। রাবড়ির সাথে সরভাজাও পাওয়া যায়। আমরা ১ কেজি মতো কিনলাম, আর তার সাথে নিলাম খান কুড়ি সরভাজা। রাবড়ি এনারা কলকাতা ও শহরতলির অনেক মিষ্টির দোকানেই সাপ্লাই দেন। আমরা নিয়েছিলাম ২৮০ টাকা কেজিদরে। রাবড়ি গ্রাম থেকে বাড়ি ফিরেই আর তর সইতে পারলাম না। রাবড়ি খেয়ে দেখলাম, সত্যি বলছি খুবই ভালো খেতে। তবে সরভাজাটা মোটামুটি , কারণ ওর থেকেও ভালো সরভাজা আমি খেয়েছি।

কিভাবে যাবেন
ব্রহ্মদত্ত ধাম : হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে বারুইপাড়া লোকালে আগে বারুইপাড়া আসুন। বারুইপাড়া স্টেশন থেকে অটো পাবেন বনমালিপুর মন্দির যাওয়ার।
রামপাড়া কালীবাড়ি ও রাবড়ি গ্রাম : এই দুই জায়গাতে পৌঁছতে গেলে আপনাকে বারুইপাড়া বা ডানকুনি এসে বাস বা অটো ধরে পৌঁছতে হবে আইঁয়া। এখান থেকে দুটি গ্রামেই পৌঁছনো খুবই সহজ। টোটো বা রিক্সা পেয়ে যাবেন।