চৈতন্যময় পানিহাটি

গৌড়ের রাজা বল্লাল সেনের আমল থেকেই পানিহাটির নাম ইতিহাসের পাতায় রয়েছে। তখন “পণ্যহাটি” বলেই সবাই চিনতো। গঙ্গানদীর তীরে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ হাট বসতো এইখানে। পণ্যহাটি থেকেই ধীরে ধীরে আজকের পানিহাটি বলেই সবাই চেনে। পানিহাটির ইতিহাস কিন্তু এখানেই থমকে নেই আজ থেকে হাজার বছর আগেও বিভিন্ন পুস্তকে পানিহাটির নাম পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় পানিহাটির হাটে তখনকার দিনে শিংয়ের চিরুনি পাওয়া যেত। তা খুব বিখ্যাতও ছিল। নদীপথে ও স্থলপথে বাংলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে বণিকরা আসতেন মালপত্র কেনাবেচা করার জন্যে।

এই পানিহাটি চৈতন্যময় হয়ে উঠলো যখন শ্রীচৈতন্যদেব এখানে প্রথমবার পদার্পন করলেন। তিনি পুরী যাবার পথে একবার পানিহাটিতে আসেন। দ্বিতীয়বার বৃন্দাবন যাবার পথে পানিহাটিতে আসেন। পানিহাটির এক ব্রাহ্মণ পন্ডিত শ্রীগঙ্গানারায়ণ নিজের বাড়িতে প্রথম মদনমোহন জিউ এর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে শ্রীগঙ্গানারায়ণের পৌত্র শ্রীরাঘব পন্ডিতের সাথে স্বয়ং চৈতন্যদেব ওই বিগ্রহের পূজা করেন। রাঘব পন্ডিতের বাড়িতে ঠাকুরের আগমন হয় যখন তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে পানিহাটিতে আসেন। এই রাঘব পন্ডিতের বাড়ির তৈরি ঝালি আজও পুরীর বিখ্যাত রথযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়। রাঘব পন্ডিতের গৃহ আজ রাঘব পাঠভবন নামে পরিচিত। ভেতরে মদনমোহন জিউয়ের পুজো নিয়মিত হয়।

চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দির , পানিহাটি

শ্রীচৈতন্যদেব প্রথমবার যে ঘাটে পদার্পন করেন তা চৈতন্যঘাট নামে পরিচিত হলেও সেই ঘাট আজ আর নেই। মহাপ্রভুর স্মৃতি বিজড়িত পুরোনো ঘাটটিকে হয়েছে পৌরসভা থেকে একটি নতুন ঘাট বানিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রবীণ মানুষেরা অনেকেই বলেন সেই অক্ষয় বটগাছের কথা , যা ওই ঘাটে আজও বিদ্যমান। এই গাছের নিচেই মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যনন্দ কীর্তন করেছিলেন। পানিহাটিতে মহাপ্রভুর আগমন উৎসব বাংলার কার্তিক মাসের কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথিতে পালন করা হয়।

দই চিড়ে , দণ্ড মহোৎসব

ই শ্রীরঘুনাথ, যিনি সপ্তগ্রামের জমিদার গোবর্ধন দাসের ছেলে ছিলেন, অল্প বয়স থেকেই বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আকর্ষিত হন। শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভুর সাক্ষাতের জন্যে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে করতে এসে পৌঁছন পানিহাটি। তার উদ্দেশ্য ছিল ঠাকুরের দেখা পাওয়া ও দীক্ষালাভ করা। তিনি পানিহাটিতে যখন শ্রীনিত্যানন্দর দেখা পেলেন , নিত্যানন্দ ঠাকুর দীক্ষা তো দিলেন কিন্তু এক অভূতপূর্ব দন্ডে দণ্ডিত করলেন। কারণ কি ছিল ? রঘুনাথ তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী এবং সংসার ত্যাগ করে এসেছিলেন তাই। দণ্ড ছিল সমস্ত সংকীর্তনরত ভক্তমণ্ডলীকে চিড়ে দই সহযোগে ফলার বিতরণ। এই উৎসবই দণ্ড মহোৎসব নামে পরিচিত। এই উৎসব প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। অনেকে এঁকে চিড়ে দই উৎসবও বলে থাকেন। এ বছরও এই উৎসব পালিত হয়েছে কিন্তু পুরো উৎসবই ছিল জাকঁজমকহীন। শ্রীচৈতন্য কথামৃততে এই ঘটনাগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়।

পানিহাটি রাঘব পাটভবন
মদনমোহন জিউয়ের মন্দির , রাঘব ভবন
বিখ্যাত রাঘবের ঝালি

শ্রীচৈতন্যদেব ছাড়াও পানিহাটিতে আরো অনেক নামী ও গুণী ব্যক্তির সমাগম হয়েছে। যেমন শ্রীরামকৃষ্ণদেব। পানিহাটিতে তিনিও এসেছিলেন ও কীর্তনে অংশও নিয়েছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃততেও এর কথা লেখা আছে। এছাড়াও এসেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ

ছাতুবাবুর বাগানবাড়ি

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পদধূলি এখানে ৩ বার পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকবারই এসেছেন ছাতুবাবুর বাগানবাড়ি। হ্যাঁ ইনিই সেই বিখ্যাত ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর একজন। এই বাগানবাড়ি রবীন্দ্রনাথের খুবই প্রিয় ছিল। খুব ছোটবেলায় একবার এসেছিলেন। এখানে বাড়ির প্রায় প্রতিটি অংশ থেকেই দেখতে পাওয়া গঙ্গানদীর সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে তিনি এখানে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে আসেন। সেই সময়ই জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের জন্যে ব্রিটিশদের দেয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। হ্যাঁ তখন তিনি এই বাগানবাড়িতেই ছিলেন। প্রায় ১৫ বছর পর তিনি শেষবার এই বাড়িতে আসেন। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত এই বাগানবাড়ি আজ গোবিন্দ হোম নামে পরিচিত। এটি এখন অনাথ মেয়েদের আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর রবিঠাকুরের জন্মদিনে এখানে অনুষ্ঠান হয়। মেয়েরা রবীন্দ্রসংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করে।

ছাতুবাবুর বাগানবাড়ির ঘাটের দিকটা

পানিহাটিতে কখনও ঘুরতে এলে এগুলো ছাড়াও অবশ্যই গঙ্গাতীরের বারোশিব মন্দির ,ইস্কন মন্দির , অনুকূল ঠাকুরের সৎসঙ্গ এবং তার পাশেই ত্রাণনাথ কালীমন্দির দেখবেন।

কিভাবে আসবেন: শিয়ালদা থেকে যেকোনো সোদপুরগামী ট্রেনে সোদপুর , সেখান থেকে টোটো করে পানিহাটি ঘাট। বাসেও সোদপুর এসে পানিহাটি আসা যায়। হাওড়া দিয়েও আসা যায় , সেক্ষেত্রে ব্যান্ডেল / তারকেশ্বর গামী যেকোনো ট্রেনে চেপে কোন্নগর নামবেন। তারপর কোন্নগর ঘাটে আসবেন। কোন্নগর ঘাট পেরোলেই পানিহাটি। এখন সবই বন্ধ আছে ,হ্যাঁ লকডাউনের পরে আসাই ভালো।

তথ্যসংগ্রহ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার – শ্রী অজিত কুমার ঘোষের “ধন্য পানিহাটি” রচনা।

ছবিগুলি সংগৃহিত পানিহাটি ফেসবুক পেজ , পানিহাটি চিড়া উৎসব এবং শ্রী চৈতন্যমন্দির পানিহাটি ওয়েব পেজ থেকে।

Leave a comment