আমার মনে আছে সেই ছোটবেলায় বাবা একটা বই কিনে দিয়েছিলো , যেটাতে সব বাংলার মনীষীদের জীবনী লেখা ছিল। সেখানে তাদের জন্ম থেকে শুরু করে তাদের কাজ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখা ছিল। আজ বাবা নেই সেই বইও খুঁজে পাইনি। যেটা পেয়েছি সেটা হলো উইকিপিডিয়া। এখানে সবকিছুরই বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। সেই ছেলেবেলায় আমরা বেশি উপহার পেতাম বইপত্র এবং অনেক লেখকেরই বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি। যদিও বাংলা মাধ্যমে পড়েছি বলে অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখা পাঠ্যক্রমেই ছিল। সেরোমি এক লেখক ছিলেন শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যার লেখা মহেশ থেকে শুরু করে রামের সুমতি অনেক কিছুই আমরা পড়েছি। আমার বাড়ির কাছেই দেবানন্দপুরে শরৎ চন্দ্রের জন্মস্থান। যদিও ওই জীবনী বইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম ,তিনি ভাগলপুরে বড়ো হয়েছেন। জীবনের খুব বেশি সময় দেবানন্দপুরে কাটাননি। তারপর কাজের সূত্রে রেঙ্গুনে চলে যান। কিন্তু জীবনের শেষ ১২ বছর উনি হাওড়া জেলার সামতাবের গ্রামে ওনার বাড়িতে কাটিয়েছেন। সাল ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ অবধি। ওনার এই বাড়িতেই উনি লিখেছেন কিছু যুগান্তকারী লেখা যা নিয়ে পরবর্তী কালে অনেক ছায়াছবিও তৈরী হয়েছে যেমন দেবদাস , রামের সুমতি , দেনা পাওনা , বৈকুন্ঠের উইল , নিষ্কৃতি ও আরো কিছু বিখ্যাত উপন্যাস। এই বাড়ি রাজ্য সরকার থেকে নবীকরণ করা হয়েছে এবং নাম দেওয়া হয়েছে শরৎ চন্দ্র কুঠি।

বহু লোকই ভীড় জমান ছুটির দিনে এই বাড়ি দেখার জন্যে। আমিও এই সুযোগ ছাড়তে পারিনি , সাখ্যাৎ ইতিহাস দর্শন করা কি ছাড়া যায়। আমার বাড়ি থেকে এই জায়গা ৫০ বা ৬০ কিলোমিটার হবে , তাই একদিনেই ঘুরে আসা যায়। যদি আপনি কলকাতা এবং তার পার্শবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা না হন , তাহলে অবশ্যই আমার পথনির্দেশ টা দেখে নেবেন। নিচে দেয়া আছে।

সেই পেয়ারা গাছ 
ওনার ব্যবহৃত হুঁকো 
কোট টাঙাবার হ্যাঙ্গার 
লেখকের লেখার টেবিল 
দম দেওয়া ঘড়ি 
লেখকের কেদারা
এবার ফেরা যাক গিয়ে কি দেখলাম। আমি পুরো পরিবার সমেত রওনা দিয়েছিলাম দুপুর ১২টায়। পৌঁছে গিয়েছিলাম ১.৩০ টার সময়। অবশ্যই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম তাই। সকালে এই বাড়ি ১০ টা থেকে দুপুরে ১ টা অবধি খোলা থাকে আর বিকেলে ৩ টে থেকে ৫ টা। একটু অপেক্ষা করতে হয়েছে কিন্তু তাতে খুব অসুবিধা হবেনা কারণ পাশেই আপনি পাবেন রূপনারায়ণ নদকে। রূপনারায়ণের পারে কিছুক্ষন কাটিয়ে দুপুর ৩ টের পর দেখলাম একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বাড়ি খুললেন। তিনিই এই ছোট্ট ১৫ মিনিটের গাইড। এই ১৫ মিনিটে আমরা দেখলাম শরৎ চন্দ্রের বসার ঘর , ওনার ব্যবহৃত সেকালের দম দেওয়া ঘড়ি , আলমারি। এর সাথে বাড়ির সামনের বাগান যেখানে রামের সুমতির বিখ্যাত পেয়ারা গাছ এখনো রয়েছে যদিও সেটার অবস্থা খুব ভালো নয়। অনেক পুরোনো তো। বাড়ির সামনে সেই পুকুর যেখানে কার্তিক ও গনেশ নামের রুই ও কাতলা মাছের উল্লেখ রয়েছে রামের সুমতি গল্পে।

লেখকের শোবার ঘর 
বাড়ির পিছনের ধানের গোলা 
দোতলার আরেকটি ঘর 
বাড়ির দোতলা 
লেখক ও তাঁর স্ত্রীর সমাধি 
বাড়ির ডানপাশে
এরপর আমরা ঘুরে দেখলাম বাড়ির দোতলাটা , যেখানে লেখক নিজে থাকতেন তার সেই খাট , ব্যবহৃত বালিশ পরিপাটি করে সাজানো রয়েছে। ওনার ব্যবহৃত জুতোও রয়েছে। এরপর বাড়ির পেছনের উঠোনে রয়েছে শৌচালয় ও তখনকার দিনে গ্রামের বাড়িতে যেসব ধানের গোলা থাকতো সেসব। এই ১৫ মিনিট আমাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল। আপনি গেলেও আপনার জন্যেও যথেষ্টই থাকবে। একটা কথা বলে রাখি এই বাড়িতে অনেক স্বনামধন্য লোকের পদধূলিও পড়েছে , যেমন নেতাজি। শরৎ চন্দ্র স্বাধীনতা সংগ্রাম কে পরোক্ষভাবে সমর্থন করতেন। সেই জন্যেই অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই নিরিবিলি পরিবেশে এসে তখনকার দিনে বৈঠকও করে গেছেন। আপাতত বাড়ি ঘুরে দেখতে কোনো টাকা লাগে না , তবে মন চাইলে খুশিমনে সেই বৃদ্ধ গাইডকে আপনার সাধ্যমতো কিছু দিয়ে আসতে পারেন। আমরাও দিয়েছিলাম , আর ওনার থেকেই শুনেছি লেখকের পরের প্রজন্মের লোকেরা দক্ষিণ কলকাতায় থাকে , তারা মাঝে মাঝে আসে। ওনারাই এই বৃদ্ধ মানুষটিকে কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।

পথনির্দেশ : হাওড়া স্টেশন থেকে পাঁশকুড়াগামী যেকোনো ট্রেন ধরে দেউলটি স্টেশন নামবেন। সেখান থেকে টোটো করে শরৎ কুঠি। খুব বেশি হলে ১০ বা ১৫ টাকা নিতে পারে। মূলসড়কের কাছে নিরালা নামের একটি রিসোর্ট আছে সেখানে থাকা ও খাবার ব্যবস্থা আছে।
খুব ভালো।
LikeLike