স্ত্রী বললো – “কোথায় যাবে? “
“ফ্রেডরিকস নগর চলো “, আমি বললাম।
“সেটা আবার কোথায় ?” স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন।
আমি বললাম “কাছেই , বেশিদূর নয়। আমাকে বিশ্বাস করো ,ঘুরতে যাবে যখন একটু বিশ্বাস করো। “
প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু হলো। তবে এতো স্বামী স্ত্রীর গল্প নয় , তাই সমস্যা হলেও রাজি করলাম।
বললাম “চলো , কথা দিচ্ছি ঠকবে না। “
এবার দুপুর ২টোর ট্রেনে আমরা মানে আমি ,আমার স্ত্রী ও আমার ছেলে রওনা দিলাম। চললাম ফ্রেডরিকস নগর।
কোন্নগর থেকে পৌঁছতে পুরো ১০ মিনিট লাগলো।
ট্রেন থেকে নেমেই স্ত্রী আমার দিকে এগিয়ে এসে বলে “আরে এতো শ্রীরামপুর , কি উলটোপালটা নাম বলছিলে ,ফ্রেডরিকস নগর, ইয়ার্কি হচ্ছে। ” আমি বললাম “এত বিরক্ত হওয়ার কি আছে , এতো এখনকার শ্রীরামপুর। এতো আগে ফ্রেডরিকস নগরই ছিল।”
ইতিহাসের কাহিনী বলতে হবে ভেবেই আনন্দিত হয়ে প্ল্যাটফর্মেই শুরু করলাম “আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে.. , “, মাঝপথেই স্ত্রী আমাকে থামিয়ে দিয়ে , “তোমার এই ইতিহাস শুনিও নাতো ! কোথায় নিয়ে যাবে চলো। “
অগত্যা বাধ্য স্বামীর মতো টোটো স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে চললাম।
“ফ্রেডরিকস নগর ঘাট যাবে ?” এক টোটোওয়ালা কে জিজ্ঞেস করলাম।
সে শুধু ঘাট কথাটাই শুনতে পেয়ে বললো “বসুন বসুন , যাবো। “
যাক আপাতত টোটোয় বসলাম। টোটো ছেড়েও দিলো।
যেতে যেতে টোটোওয়ালা জিজ্ঞেস করলো “দাদা ,ঘাটের আগে কি যেন বললেন , ফ্রেডরিক কি যেন?”
আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম “ও ফ্রেডরিকস নগর। “
টোটোওয়ালা – “সে আবার কোথায় ?”
এবার আমি আবার শুরু করলাম, মনে হলো টোটোওয়ালা কেই শোনাব। যেই না বলতে যাবো “আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে “, স্ত্রী আমার জামা টেনে ধরে ফিসফিস করে বলছে “তোমার এই টোটোতে উঠে জ্ঞানের ভান্ডার নিয়ে না বসলেই নয় ! চুপ করো তো ! “
এবার আর কি করি। উপেক্ষিত ভান্ডার নিয়ে মনে মনে ভাবলাম , এই টোটোওয়ালা খুবই দুর্ভাগা , জ্ঞান টা পেলো না। স্ত্রী কে শোনাবার আমি আবার সাহস পেলাম না। ইতিহাসকে পেছনে ফেলে যেতে যেতে ঘাট চলে এলো। স্ত্রী আবার জিজ্ঞেস করলো “হেঁয়ালি না করে বলোতো কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ?” “ব্যারাকপুরে। ” আমি বললাম।
“প্ল্যানটা শোনো , আগে ব্যারাকপুরে যাবো। তারপর এসে তোমাকে শ্রীরামপুরের সব দেখাচ্ছি । “


নৌকো ধরে চললাম ভারতবর্ষের সবথেকে পুরোনো ক্যান্টনমেন্টে , ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট। ধুবিঘাটে (এই নামেই সবাই চেনে ) নেমেই দেখলাম অনেক ফাঁকা টোটো। একটাতে উঠে চেপে বসলাম। কথা প্রসঙ্গে বলে রাখি যে ছোটবেলা মায়েরা বলতো টোটো করে না ঘুরে পড়াশুনো করতে। কিন্তু দিনকাল যা পড়েছে পড়াশুনো করেও টোটো করেই ঘুরতে হচ্ছে। টোটোচালক ভাইটিকে বললাম চল চার্চে। পৌঁছতে ১০ মিনিট লাগলো। পৌঁছলাম সেন্ট বার্থেলমেউ চার্চ। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের পাশেই এই চার্চ।
স্ত্রীকে বললাম , এই চার্চ কিছুদিন আগেই সরকার থেকে হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে। আনুমানিক ১৮৩১ সালে স্থাপিত এই চার্চ। প্রত্যেকদিনই বিকেল ৪.৩০ মিনিট অবধি খোলা থাকে। আজ ২৫ তারিখ বলে একটু বেশি ভীড়। অন্যান্য দিন এই চার্চের গুরুত্ব একটু কমই থাকে। ভেতরে ঢুকলাম , চার্চের ভেতরটা যথেষ্ট বড়ো , বাইরে থেকে তা ঠাহর করা মুশকিল। আজকের দিনে চার্চকে খুব ভালোভাবেই সাজানো হয়েছে। চার্চের পাশেই একটি মাঠ রয়েছে , সেখানে আর যাবো কি করে। সেখানে তো সেলফি শিকারীদের ভীড়। ১৫ মিনিট মতো কাটিয়ে ব্যারাকপুরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে চললাম শ্রীরামপুরের দিকে। ফেরার পথে খেয়াল করলাম আমার স্ত্রী একটু নরম হয়েছে। নিজেই জানতে চাইলো ফ্রেডরিকস নগর এর ব্যাপারটা। আমিও সুযোগের সদব্যবহার করে শুরু করলাম।
আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি প্রচুর বিদেশী ব্যবসায়ীরা নদীপথে বাংলায় প্রবেশ করে আর হুগলী নদীর পার্শবর্তী অঞ্চলগুলিতে বসবাস শুরু করে। এরমভাবেই ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যান্ডেলে পর্তুগিজ , চুঁচুড়ায় ডাচ , চন্দননগরে ফরাসি এবং শ্রীরামপুরে ড্যানিশ উপনিবেশ তৈরী হয়। সেইজন্যে হুগলি নদীর এই অঞ্চলগুলিকে ছোট ইউরোপ ও বলা হয়। ড্যানিশরা এখানে ১৭৫৫ থেকে ১৮৪৫ অবধি থাকে, তারপর এই শহর ব্রিটিশদের হাতে হস্তান্তর হয়। শ্রীরামপুরে এখনো সেই ড্যানিশ সংস্কৃতির ছাপ বিভিন্ন স্থাপত্যের মধ্যে পাওয়া যায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ড্যানিশ কোর্ট যা এখন শ্রীরামপুর কোর্ট হয়েছে। প্রথমে আমরা গেলাম ড্যানিশ কোর্টে। ছুটির দিনে দেখার বলতে কোর্টের ফাটক ও কোর্টের প্রধান বিল্ডিংয়ের স্থাপত্য, যেটা সেই ড্যানিশ সময়কার ।

কোর্টের সামনেই রয়েছে সেন্ট ওলাভ চার্চ। এটি ১৮০৬ সালের একটি স্থাপত্য যা ড্যানিশদের বানানো। এটি একটি ক্যাথলিক চার্চ। সমস্যা হলো আমরা যখন পৌঁছেছি (বিকেল সাড়ে ৩টের দিকে )তখন চার্চ বন্ধ। চার্চ আবার খুলবে সাড়ে ৪টের সময়।

সময়ের অভাব ছিলই তাই সময় নষ্ট না করে আমরা এগিয়ে গেলাম ডেনমার্ক ট্যাভার্নের দিকে। এটি তখনকার সময়ের একটি হোটেল যা ড্যানিশ ব্যবসায়ীদের জন্যে বানানো হয়েছিল। এই হোটেল তাদের জন্যে ছিল একটি রাত্রিবাসের ঠিকানা। গঙ্গার ধারের এই হোটেল সেকালে অনেক জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ ২৫০ বছর পর ২০১৮ তে আবার নতুন করে সেজেছে ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে একটি ভারতীয় সংস্থা। খাবার তো পাওয়া যায়ই আবার রাতও কাটানো যায়। খাবারের দাম বেশি হলেও , এখানকার পরিবেশ আপনাকে দেবে সেই আমলের অনুভূতি। প্রচুর লোক এখানে সেই অনুভূতিই নিতে আসেন। যদিও আমরা ভেতরে ঢুকিনি , তাও বাইরে থেকে দেখাটাও একরকম অনুভূতি দেয়।


এরপর আমরা গেলাম এম্যাকুলেট কন্সেপশন চার্চে। এটিও ডেনমার্ক ট্যাভার্নের বেশ কাছে। এটিও বেশ পুরোনো চার্চ তবে সত্যি বলতে সালটা আমার জানা নেই। ২৫ তারিখ বলে এই চার্চও সেজে উঠেছে। এর ভেতরে মিশনারি হাসপাতালও রয়েছে , যেখানে দুঃস্থদের সেবা শুশ্রূষা করা হয়। এতক্ষন তো স্ত্রী চুপচাপ ঘুরেছে , এবার আমি বললাম “চলো আজকের শেষ জায়গাতে নিয়ে যাই , খুব ভালো লাগবে “.


একটু দূরে , তাই টোটো করে চললাম আমাদের শেষ গন্তব্য শ্রীরামপুর কলেজের দিকে। ২ বছর এই কলেজে পড়ার সৌভাগ্য তো আমার রয়েইছে , তাও আবার নিজের ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার টা আজ হয়ে গেলো। যদিও তার ছোট্ট মাথায় নস্টালজিয়ার কিছুই ঢোকে না, তাও তাকে কোলে নিয়ে কলেজে ঘোরার মজাই আলাদা। কখনো চেষ্টা করে দেখবেন , খুব ভালো লাগবে। স্ত্রীকে নিয়ে দেখালাম কলেজের প্রতিটি জায়গা যেখানে কোনো না কোনো স্মৃতি রয়েছে , সত্যি বলতে অনেকই স্মৃতি মাথাচাড়া দিলো। স্মৃতির অনুভূতি নিয়েই সবাইকে নিয়ে গেলাম কলেজের প্রধান বিল্ডিংয়ের দিকে। এইটা দেখিয়ে স্ত্রীকে বললাম “১৮১৮ সালের তৈরী , দেখো ১ বছর আগেই ২০০ বছর সম্পূর্ণ হয়েছে। ভাবতে পারছো , এরম একটা জায়গাতে দাঁড়িয়ে রয়েছো “. স্ত্রী আর কি বলবে, বললো “এরম জায়গায় তুমি আগে কেন নিয়ে আসোনি। “



যাই হোক সহধর্মিণীটির মুখের হাসি দেখে বুঝতে বাকি রইলো না , যে আজকের দিনটি তার ভালোই কেটেছে। ছুটির দিনে না গেলে কেরী সাহেবের সংগ্রহশালাটা দেখা যেত। তাই ঘোরার পর্ব চুকিয়ে প্রথমে কলেজের বাইরে ভেলমুড়ি খেলাম তারপর টোটো করে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। টোটোয় বসেই মনে পড়লো , স্ত্রীকে বললাম “এই যাহ ! তোমাদের ভারতবর্ষের প্রথম ছাপাখানাটা তো দেখানোই হলো না। কলেজের কাছেই ছিল “.
সহধর্মিনী বললো “আজ ছেড়ে দাও। ছাপাখানটা না হয় ফ্রেডরিকস নগর দ্বিতীয় পর্বের জন্যে তোলা থাক “.